বকেয়া বেতন প্রদান, আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে ছাঁটাই রোধ ও অবিলম্বে ৪-জি মোবাইল পরিষেবা চালু করার দাবিতে বিএসএনএল কনভেনশনে গৃহীত প্রস্তাব

অত্যন্ত কঠিন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই কনভেনশন যখন বিএসএনএল দপ্তরে প্রায় ৭৯,০০০ জন কর্মচারি ভিআরএস নিতে বাধ্য হয়েছেন। ২ মাসের বেতন বাকি রেখে ভিআরএস প্রকল্প রূপায়িত করেছে মোদী সরকার। বাকি ৭৫,০০০ কর্মচারি যারা রয়েছেন রিভাইভাল অব বিএসএনএল রূপায়িত করার জন্য তারাও জানে না কবে হবে তাদের আগামী দিনের বেতন। আর ক্যাজুয়াল-কনট্রাক্ট কর্মচারির অবস্থা সহ্যসীমার বাইরে চলে গেছে। প্রায় আট দশ মাস ধরে বেতন বাকি রেখে ছাঁটাই করতে চাইছে মোদী সরকার। বিলগ্নীকরণের নীতি কার্যকরী করতে ব্যাঙ্ক বীমা টেলিকম এখন খতম তালিকায় প্রথম সারিতে। রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পগুলির শেয়ার বিক্রি করে বিলগ্নিকরণ ভান্ডার পূরণ করতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিএসএনএল ও এমটিএল-এ সেই নীতি কার্যকর করতে আনা হয়েছে রিভাইভাল অব বিএসএনএল প্যাকেজ।

গত অক্টোবর মাসে টেলিকম মন্ত্রীর ঘোষণা ছিল ভিআরএস দিয়ে কর্মচারিদের বাড়ি পাঠানোই হবে বিএসএনএল পুনরুজ্জীবনের প্রথম শর্ত। ৪-জি মোবাইল পরিষেবা দেবার শর্ত হিসেবে ভিআরএস আনা হলেও আজও ৪-জি সার্ভিস চালু হলনা, অথচ ৭৯,০০০ কর্মচারিকে স্বেচ্ছাবসর নিতে বাধ্য করল মোদী সরকার। বিএসএনএল পুনরুজ্জীবন করার শর্ত হিসাবে আরও একটি কাজে হাত দিয়েছে মোদী সরকার, তা হল জনগণের পয়সায় গড়ে ওঠা বিপুল পরিমাণ জমি ও বাড়ি বিক্রি করতে চাইছে বিএসএনএল ম্যানেজমেন্ট। সেই লক্ষ্যে ২০২০ সালেই তারা প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রি করার তালিকা তৈরি করেছে, যার মধ্যে আছে এরাজ্যের টেলিফোন ভবন, টেলিকম ফ্যাক্টরি ও সল্টলেক ট্রেনিং সেন্টার। এক কথায় বিএসএনএল দপ্তরকে সংকুচিত করার লক্ষ্যেই সচেষ্ট মোদি সরকার। কিন্তু কথা রাখেনি মোদি সরকার, আজও ৪-জি সার্ভিস চালু হয়নি, দেওয়া হয়নি কর্মচারিদের বেতন। অথচ ভিয়ারএস পরবর্তী পরিস্থিতির মোকাবিলায় আউটসোর্সিং প্রজেক্ট আনা হচ্ছে। শুরুতে বেতন দিতে দেরী হত, পরবর্তী কালে ৫০% কন্ট্রাক্ট কর্মচারি ছাঁটাই করার আদেশ জারি করে, তারও পরে ১৩ দিনের কাজের মাস চালু করে ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু ভিআারএস-উত্তর পরিস্থিতিতে তারা বর্তমান কন্ট্রাক্ট কর্মচারি প্রথা পরিবর্তন করে আউটসোর্সিং চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে সারা দেশে কর্মচারি ছাঁটাই-এর আশঙ্কাটা থেকে যাচ্ছে।

এই কনভেনশন লক্ষ্য করেছে বেতন না পেয়ে কর্মচারি আত্মহত্যা করলেও বিএসএনএল ম্যানেজমেন্টের কন্ট্রাক্ট কর্মচারিদের বেতন দিতে অনীহা রয়েছে। এমনকি সিএমডি মহাশয়ের ঘোষণা মত ২ মাসের বেতন এখনও ঠিকা-কর্মচারিদের হাতে পৌঁছয়নি। নিয়মিত কর্মচারিদেরও ২ মাসের বেতন বকেয়া রাখার পাশাপাশি বেতন থেকে কেটে নেওয়া ব্যাঙ্ক ও কো-অপারেটিভের টাকা জমা না হওয়াতে ক্ষোভ জানাচ্ছে আজকের এই কনভেনশন। অত্যন্ত কম দামে অন্যায়ভাবে আলিপুর ও গোপালপুর টেলিকম ফ্যাক্টরির জমি বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। স্বীকৃত ইউনিয়নের সাথে আলোচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এই পটভূমিকায় আজকের এই কনভেনশন সারা রাজ্যব্যাপী এই আক্রমণ ব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে। এই কনভেনশন মনে করে বিএসএনএলকে বিক্রি করে বা রুগ্ন করে বন্ধ করতে চায় মোদী সরকার মূলত আদানী আম্বানী কর্পোরেট লবিকে সুবিধা করে দিতে। তার মোকাবিলায় শুধুমাত্র নিয়মিত, অনিয়মিত, পেনশনার্স সংগঠন ঐক্য যথেষ্ট নয়। তাই গ্রাহকদেরও আমাদের আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে। যুক্ত করতে হবে আপামর জনসাধারণ তথা যুব সমাজকে। কেননা দুটি রাষ্ট্রায়ত্ব দপ্তরের প্রায় ৯২,৭০০ স্থায়ী পদের অবলুপ্তি ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে চাকুরি প্রার্থিদের ওপর এ এক চরম আঘাত।

আজকের এই কনভেনশন সরকারের এই অপচেষ্টাকে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছে। এই পটভূমিকায় আগামী ৩ মার্চ দিল্লি অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে আজকের এই কনভেনশন। ‘নো আউটসোর্সিং, সেভ বিএসএনএল’ এই দাবিতে ব্যাপকতম আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে আজকের এই কনভেনশন। প্রতিটি জেলা স্তরে জিএম দপ্তরে ব্যাপকতম অবস্থান গড়ে তোলা হবে আগামী ফেব্রুয়ারী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। কলকাতায় ৪৮ ঘন্টার লাগাতার অবস্থানে সামিল হওয়ার জন্য  আহ্বান জানাচ্ছে আজকের এই কনভেনশন। রাজ্যের সমস্ত ট্রেড ইউনিয়নগুলি এই আন্দোলনের সমর্থনে দুই সিজিএমের কাছে ডেপুটেশন দেবে। জনগণকে যুক্ত করে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে এই কনভেনশন। এই কনভেনশন লক্ষ্য করেছে এই আন্দলন ভাংতে ট্রান্সফার করার জঘন্য চক্রান্ত করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই জেলায় জেলায় বিভিন্ন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বন্ধ করার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানাচ্ছে আজকের এই কনভেনশন। আহ্বান জানাচ্ছে সারা রাজ্যে ব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তুলে এই আন্দোলন নীচু তলায় নিয়ে যেতে নিবিড় প্রচার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই কনভেনশন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে মেহনতি মানুষের ঐক্য ও সংহতিকে বিভাজিত করার উদ্দেশ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসি-সিএএ-এনপিআর-এর মত বিষয়গুলি শ্রমজীবি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য প্রয়াস চালাচ্ছে। কনভেনশন মনে করে দপ্তরের অস্তিত্ব রক্ষা ও সমস্ত অংশের কর্মচারিদের দাবি দাওয়ার লড়াইয়ের পাশাপাশি এর বিরুদ্ধেও আমাদের সোচ্চার হতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে যে সমস্ত কর্মসূচী রূপায়িত করার আহ্বান জানাচ্ছে এই কনভেনশন তা নিম্নরূপ –

১। ১৭ - ২২ ফেব্রুয়ারি সপ্তাহব্যাপি জেলাগত গণ অবস্থানে প্রতি জেলাতেই অনুরূপ গণ অবস্থানের কর্মসূচী নেওয়া হবে। প্রচারান্দোলন গড়ে তুলতে পোস্তার, লিফলেট সহ মিডিয়ার কাছে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতে হবে। টেলিফোন ফ্যাক্টরি ও টেলিফোন ভবন বিক্রয়ের বিরুদ্ধে আন্দলন গড়ে তোলা হবে।

২। ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারী কলকাতায় লাগাতার ৪৮ ঘন্টা ধর্নায় বসবে বিএসএনএল কর্মিরা। লাগাতার এই গণ অবস্থানের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে দুই সিজিএমটির কাছে ডেপুটেশন দেবে রাজ্যের সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন ও গণ সংগঠনগুলি।

৩। ৩ মার্চ দিল্লি কর্পোরেট অফিস অভিযানে অংশ নেবে বিএসএনএল কর্মিরা।

৪। গ্রাহকদের যুক্ত করতে ও অন্য সংগঠনগুলিকে যুক্ত করতে আরও ব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রেস কনফারেন্সও করা হবে। প্রয়োজনে আরও বড় গণকনভেনশন হবে।

- বিএসএনএল এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন
ক্যালকাটা টেলিফোনস ঠিকা মজদুর ইউনিয়ন
বিএসএনএল ক্যাজুয়াল মজদুর ইউনিয়ন পশ্চিমবঙ্গ
এআইবিডিপিএ পশ্চিমবঙ্গ সার্কল, সিটিডি, স্টোর্স ও ফ্যাক্টরি

খণ্ড-27
সংখ্যা-8
19-03-2020