করোনার হানা থেকে জনসাধারণকে বাঁচাতে হবে, এনপিআর নামানো চলবে না, প্রত্যাহার কর

১৪-১৬ মার্চ কলকাতায় মৌলালি যুবকেন্দ্রে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পরে এক সাংবাদিক বৈঠকে পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য জানান যে, বিশ্বমহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিবারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে পার্টি ৩১ মার্চ পর্যন্ত তার সমস্ত জনসমাবেশ বন্ধ রাখবে।

তিনি এও বলেন যে,ভারতের করোনা ভাইরাসের আক্রমণ দেখিয়ে দিয়েছে সমাজের সম্পত্তিবান ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গও দুর্বলতম ও বঞ্চিততম অংশের তুলনায় বেশি নিরাপদ অবস্থায় নেই। দেশের জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও জনগণের সাধ্যের মধ্যে থাকা উৎকৃষ্ট মানের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থার বড়সড় অভাবই এই সংক্রমণের পরিস্থিতিতে দেশকে বিশেষভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। বহু কর্মক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য দিনমজুরি ও অন্যান্য অসংগঠিত ক্ষেত্রের সুরক্ষাবিহীন জীবিকানির্ভর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়ের পক্ষেই দিন গুজরান করা কঠিনতর হয়ে পড়বে। পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা ছাড়া তাঁদের পক্ষে করোনা প্রতিরোধমূলক সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাও অসম্ভব।

করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে জনসাধারণকে বাঁচানোর জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন যে দাবিগুলি পেশ করছে তা হল:

(১) সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষা ও কোয়ারান্টাইনের ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে।

(২) সামাজিক দূরত্বের (ভিড় করে কাছাকাছি না থাকা) রক্ষার্থে বেতনভুক সমস্ত কর্মচারিদেরকে সবেতন ছুটি ও বেতনবিহীন কর্মচারিদেরকে ক্ষতিপূরণ ও বিনামূল্যে রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

(৩) জনগণনা ও অন্যান্য সমীক্ষার কাজ স্থগিত ঘোষণা করতে হবে এবং এনপিআর সমীক্ষার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ সমীক্ষার কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এই সংক্রমণের শিকার ও বাহক হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

(৪) ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোয় থাকা সকল ব্যক্তিকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে এবং জেলগুলোতে অতিভীড় ঠেকাতে বিচারাধীনদেরকে মুক্ত করতে হবে। জেল, আশ্রয়ভবন ও ত্রাণশিবিরগুলোতে স্বাস্থ্যকর সতর্কতা বজায় রাখা সুনিশ্চিত করতে পদক্ষেপ করতে হবে।

(৫) ভারতের প্রতিটি দরিদ্র ও বঞ্চিত পরিবারে সাবান, জল ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার (নির্বীজক) সরবরাহ করতে হবে। স্যানিটাইজার, মাস্ক ও অন্যান্য অপরিহার্য দ্রব্যের গোপন মজুতদারী কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে।

(৬) জরুরী পরিষেবাগুলো জারি রাখতে জনগণের একটা নির্দিষ্ট অংশের কাছে কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী, কৃষক, সমবায় শ্রমিকরাও আছেন যাঁদের জনগণকে পরিষেবা প্রদান বা ফসল ফলানো ও বীজ বপনের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে করা প্রয়োজন। এই অংশের মানুষদেরকে স্বাস্থ্যবিধিজনিত সতর্কতা অবলম্বন করতে প্রয়োজনীয় সবকিছুই (সরকারী) খরচে সরবরাহ করতে হবে।

কমরেড দীপঙ্কর জনগণের সমস্ত অংশের কাছে গুজব ছড়ানো আটকাতে ও আতঙ্কে মৃত্যু প্রতিরোধ করতে এবং দায়িত্ব সহকারে প্রয়োজনীয় সমস্তরকম সতর্কতা অবলম্বন করতে আবেদন জানান।

তিনি আরো বলেন যে, এই ভয়ঙ্কর ভাইরাসের মোকাবিলায় আরো কিছু বিশেষ দায়িত্ব অবশ্যই সরকারগুলিকে গ্রহণ করতে হবে। বিপুল সংখ্যক অসংগঠিত ক্সেত্রের শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন রুজি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। কাজের জন্য না বেরোলে তাদের খাবার জুটবে না। অতএব, সরকার থেকে তাদের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের বন্দোবস্ত করতে হবে। তিনি বলেন যে, ভারতে মাত্র ৫২ টি করোনা ভাইরাস পরীক্ষাগার আছে। দ্রুততার সঙ্গে সেই পরীক্ষাগারের সংখ্যা বাড়িয়ে আক্রান্তদের সনাক্তকরণের দ্রুত বন্দোবস্ত করতে হবে। পাশাপাশি, সন্দেহভাজনদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন  বিচ্ছিন্নাগার ও আক্রান্তদের জন্য উন্নত ও সঠিক চিকিৎসা পরিষেবার বন্দোবস্ত করা জরুরি।  গণসচেতনতা বাড়াতে ‘করোনা ঠেকাও’  শ্লোগানকে সামনে রেখে গণসংযোগে নামছে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন।

কমরেড দীপঙ্কর বলেন যে, এনপিআর-এনআরসি নিয়ে ধারাবাহিক মিথ্যাচার করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী এনপিআর-এনআরসি-তে সন্দেহভাজন বলে কেউ চিহ্নিত হবে না। তেমনটাই যদি হয় তাহলে সরকার সেই মর্মে আইনসিদ্ধ বিজ্ঞপ্তি জারি করুক, কেবল মুখের কথায় চলবে না।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয় যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সদ্য সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন যে, এনপিআর প্রক্রিয়া চলাকালীন কাউকেই সন্দেহজনক নাগরিক ঘোষণা করা হবেনা। এই ঘোষণা এটাই প্রমাণ করে যে সিএএ-এনআরসি-এনপিআর প্রতিরোধে চলমান আন্দোলন ভালোরকম যুক্তিপূর্ণ ছিল। শাহের বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই বিভ্রান্তিকর। যেহেতু এনপিআর তথ্যাবলী এনআরসি প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হবে তাই মানুষকে সন্দেহজনক হিসাবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে এনপিআরের পরে, এনপিআরের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে। তদুপরি সংসদে শাহের বক্তব্যের কোনো আইনি ভিত্তিও নেই। শাহের প্রতিশ্রুতিকে আইনি বৈধতা দেওযার জন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধিতে এনপিআর ও “সন্দেহজনক নাগরিক” সংক্রান্ত সমস্ত ইঙ্গিত ও নির্দেশিকাকে বাদ দিয়ে সংসদে সংশোধনী পাশ করতে হবে।

তাছাড়া করোনা ভাইরাস সংকটকালে সরকারকে অবিলম্বে সর্বতোভাবে এনপিআর প্রক্রিয়া থামাতে হবে এবং এনপিআরের সমস্ত রকম আপত্তিকর সংস্থান ও বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলতে আইনি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে। এইসকল দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সিপিআই (এম-এল) জনগণকে এনপিআর পদ্ধতি মেনে না চলার আবেদন জানাচ্ছে এবং #সিএএ-এনআরসি-এনপিআর প্রকল্প সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবিতে সরকারের উপর চাপ জারি রাখতে আহ্বান করছে।

খণ্ড-27
সংখ্যা-8
19-03-2020