সভ্যতার সংকটের মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ
rabindra

১৯৪১ সালে তাঁর জীবনের শেষ জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পড়ার জন্য একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই প্রবন্ধটি আমাদের সুপরিচিত সভ্যতার সংকট। এই লেখা এবং এর কাছাকাছি সময়ে রচিত আরো কিছু লেখায় সভ্যতার সংকটের, দেশের সংকটের দিকটিকে নানাভাবে দেখার চেষ্টা তিনি করেছেন। তবে এর কোনোটি কোনোটি নিয়ে তিনি ভাবছেন দীর্ঘদিন ধরেই। কয়েক দশক ধরে নানা জায়গায় নানা লেখায় তিনি সেগুলিকে ধরার চেষ্টা করেছেন।

বিশ্ব সভ্যতার সংকটকে রবীন্দ্রনাথ যে দুটি প্রধান জায়গা থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন তার একটি হল ফ্যাসিবাদ, যা তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আর অন্যটি হল সাম্রাজ্যবাদ ও দেশে দেশে তার চাপিয়ে দেওয়া পরাধীনতার অন্ধকার। এই বৈশ্বিক সঙ্কটের পাশাপাশি আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতপাতের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজনের অভিশাপের মতো দুটি বিষয় নিয়েও রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন। এর প্রথমটি নিয়ে তাঁর চর্চা শুরু হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার কিছু পর্যবেক্ষণ ও তার কারণ অনুসন্ধান দিয়ে। দেশ ও বিশ্ব সভ্যতার সংকটগুলি নিয়ে কথাবার্তার পর কীভাবে, কোন পথে সভ্যতার এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব – তার অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশিকা নিয়েও রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিন্তাভাবনা জানিয়েছেন।

মৃত্যুর কয়েকমাস আগে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ রচনার পাতা কয়েকের সীমিত আয়তনেই রবীন্দ্রনাথ খুব সংহতভাবে একবার ফিরে দেখেছেন তাঁর গোটা জীবন ও সমসাময়িক বিশ্বকে। এই লেখা যখন তিনি লিখছেন তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফ্যাসিবাদের মদমত্ত আস্ফালন কোটি কোটি মানুষের জীবনকে নরক করে দিচ্ছে। তারই উল্টোদিকে চলছে এর বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো ভারতেও তৈরি হয়েছে ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সভাপতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ফ্যাসিবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতা দখল করে নেয় নানান নামে। প্রায় সর্বত্রই এই ভয়ংকর মতাদর্শের প্রভাব বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশের ভেতরে যেমন জাত্যাভিমান কেন্দ্রিক উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তেমনি চলতে থাকে পররাজ্য গ্রাস ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রক্রিয়া।

ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের ঘটনাটির পর বিচলিত রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত আফ্রিকা কবিতাটি। এই কবিতায় বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির উপনিবেশ দখলের প্রক্রিয়াকে তিনি দেখেছেন এক পরাধীন নিপীড়িত জাতির প্রতিনিধি হিসেবে। শাসক রাষ্ট্রের নিজেদের সুখ শান্তি সমৃদ্ধির সমাজ কীভাবে উপনিবেশের লুন্ঠন শোষণ দারিদ্রের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে, তার স্পষ্ট উচ্চারণ রয়েছে কবিতাটিতে।

তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
    পঙ্কিল হল ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে;
        দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
            বীভৎস কাদার পিণ্ড
            চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।

সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়
        মন্দিরে বাজছিল পুজোর ঘণ্টা
            সকালে সন্ধ্যায়, দয়াময় দেবতার নামে;
                শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে;
                    কবির সংগীতে বেজে উঠছিল
                        সুন্দরের আরাধনা।

আবিসিনিয়াতে যুদ্ধ চলাকালীনই জেনারেল ফ্ল্যাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনে নেমে আসে ফ্যাসিস্ট অত্যাচার (‌জুলাই, ১৯৩৬)‌। স্পেনের ঘটনার পরপরই ‘‌লিগ এগেইনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়ার’–এর ভারতীয় শাখা তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সভাপতি হন। তারপরেই জাপান চিনকে আক্রমণ করে (‌জুলাই, ১৯৩৭)‌। জাপানের হাতে ১৫ ডিসেম্বর (‌১৯৩৮)‌ নানকিং শহরের পতন হয়। প্রায় ৩ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে জাপানি সৈন্য। এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে তিনি‌ লেখেন ২৫ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ লেখেন —

‘‌নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।’‌
  (প্রান্তিক, ১৮ সংখ্যক)

অমিয় চক্রবর্তীকে ‌২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ এ লেখা এক চিঠিতে‌ রবীন্দ্রনাথ সরাসরি ফ্যাসিজমের পরাজয় কামনা করলেন। সেই লেখার মধ্যে তিনি বললেন — ‘‌এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড ফ্রান্স জয়ী হোক একান্ত মনে এই কামনা করি। কেননা মানব – ইতিহাস ফ্যাসিজমের নাৎসিজমের কলঙ্ক প্রলেপ আর সহ্য হয় না।’‌ ১৯৪০ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি হিটলারের বাহিনীর হাতে ফ্রান্সের পতনের পর তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান  রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখে যুদ্ধে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান।

রবীন্দ্রনাথ যে কোনও পরাশক্তির আগ্রাসন, দমন, শাসন, শোষণের উল্টোদিকে বরাবর দাঁড়িয়েছেন। তবু ফ্যাসিজম এমন একটা শক্তি যার তুলনায় ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের মত ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয়কেও তিনি শ্রেয় মনে করেছেন। ইংরেজের হাতে ভারতবর্ষের পরাধীনতা সত্ত্বেও এই অবস্থান এক ধরনের লেসার ইভিলকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা। ইংরেজের ঔপনিবেশিক শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে এবং সামগ্রিকভাবেই ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের ক্ষোভগুলি বারবার ভাষা পেয়েছে।

সভ্যতার সংকট প্রবন্ধটিতে ইংরেজ শাসককে তিনি কীভাবে দেখেছেন তার পরিচয় আছে। বেড়ে ওঠার প্রথম পর্বে ইংরেজি শিক্ষা সংস্কৃতির প্রভাবে তিনি তাঁর সমসাময়িকদের অনেকের মতোই আবিষ্ট ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “তখন ইংরেজি ভাষার ভিতর দিয়ে ইংরেজি সাহিত্যকে জানা ও উপভোগ করা ছিল মার্জিতমনা বৈদগ্ধ্যের পরিচয়। দিনরাত্রি মুখরিত ছিল বার্কের বাগ্মিতায়, মেকলের ভাষাপ্রবাহের তরঙ্গভঙ্গে ; নিয়তই আলোচনা চলত সেক্স্‌পিয়ারের নাটক নিয়ে, বায়্‌রনের কাব্য নিয়ে এবং তখনকার পলিটিক্সে সর্বমানবের বিজয়ঘোষণায়। তখন আমরা স্বজাতির স্বাধীনতার সাধনা আরম্ভ করেছিলুম, কিন্তু অন্তরে অন্তরে ছিল ইংরেজ জাতির ঔদার্যের প্রতি বিশ্বাস। সে বিশ্বাস এত গভীর ছিল যে একসময় আমাদের সাধকেরা স্থির করেছিলেন যে, এই বিজিত জাতির স্বাধীনতার পথ বিজয়ী জাতির দাক্ষিণ্যের দ্বারাই প্রশস্ত হবে।” কিন্তু এই বিশ্বাসের জায়গাটা যে অচিরেই ধ্বস্ত হয়ে গেল ও ব্রিটিশ শাসন শোষণ অত্যাচারের কদর্য রূপগুলি তাঁর চোখে ধরা পড়ল, তা তিনি জানাচ্ছেন। “নিভৃতে সাহিত্যের রসসম্ভোগের উপকরণের বেষ্টন হতে একদিন আমাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। সেদিন ভারতবর্ষের জনসাধারণের যে নিদারুণ দারিদ্র্য আমার সম্মুখে উদ্‌ঘাটিত হল তা হৃদয়বিদারক। অন্ন বস্ত্র পানীয় শিক্ষা আরোগ্য প্রভৃতি মানুষের শরীরমনের পক্ষে যা – কিছু অত্যাবশ্যক তার এমন নিরতিশয় অভাব বোধ হয় পৃথিবীর আধুনিক - শাসনচালিত কোনো দেশেই ঘটে নি। অথচ এই দেশ ইংরেজকে দীর্ঘকাল ধরে তার ঐশ্বর্য জুগিয়ে এসেছে। যখন সভ্যজগতের মহিমাধ্যানে একান্তমনে নিবিষ্ট ছিলেম তখন কোনোদিন সভ্যনামধারী মানব – আদর্শের এতবড়ো নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই পারিনি; অবশেষে দেখছি, একদিন এই বিকারের ভিতর দিয়ে বহুকোটি জনসাধারণের প্রতি সভ্যজাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য।

যে যন্ত্রশক্তির সাহায্যে ইংরেজ আপনার বিশ্বকর্তৃত্ব রক্ষা করে এসেছে তার যথোচিত চর্চা থেকে এই নিঃসহায় দেশ বঞ্চিত।”

শুধু ভারতবর্ষ নয়, আফিম ব্যবসা থেকে লাভের নেশায় আরেক জনবহুল ও প্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ চীনকেও ধ্বস্ত করার কথাগুলি জুড়ে নিচ্ছেন নিজ দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। “ভারতবর্ষ ইংরেজের সভ্যশাসনের জগদ্দল পাথর বুকে নিয়ে তলিয়ে পড়ে রইল নিরুপায় নিশ্চলতার মধ্যে। চৈনিকদের মতন এতবড়ো প্রাচীন সভ্য জাতিকে ইংরেজ স্বজাতির স্বার্থসাধনের জন্য বলপূর্বক অহিফেনবিষে জর্জরিত করে দিলে এবং তার পরিবর্তে চীনের এক অংশ আত্মসাৎ করলে”।

ঔপনিবেশিকতার সঙ্কটকে শুধু শারীরিক অত্যাচার বা শোষণের মাধ্যমে আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবার ব্যাপার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ দেখেননি। ঔপনিবেশিক শাসক তাঁর শাসনকে নিষ্কন্টক রাখার আগ্রহ থেকে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করে। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটিতে ফ্যাসিবাদের চরিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করেননি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের একটি বৈশিষ্ট্য যে মানুষে মানুষে বিভাজন, এবং দেশের একাংশের মানুষকে অন্য অংশের মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিয়ে শাসনকে নিষ্কন্টক রাখার চেষ্টা – তার বিপদটিকে নিজের দেশের প্রেক্ষিতে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। হিটলারের ক্ষেত্রে এটা ইহুদি বিদ্বেষের মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে নক্কারজনকভাবে ফুটে উঠেছিল বিশ্ব ইতিহাসে। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের বুকে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করে কী বিরাট ক্ষতি করেছে তা দ্বর্থ্যহীন ভাষায় বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। “সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাব মাত্র নয়; সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ, যার কোনো তুলনা দেখতে পাইনি ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান স্বায়ত্তশাসন – চালিত দেশে। আমাদের বিপদ এই যে এই দুর্গতির জন্যে আমাদেরই সমাজকে একমাত্র দায়ী করা হবে। কিন্তু এই দুর্গতির রূপ যে প্রত্যহই ক্রমশ উৎকট হয়ে উঠেছে, সে যদি ভারত – শাসনযন্ত্রের ঊর্ধ্বস্তরে কোনো – রাএক গোপন কেন্দ্রে প্রশ্রয়ের দ্বারা পোষিত না হত তা হলে কখনোই ভারত – ইতিহাসের এতবড়ো অপমানকর অসভ্য পরিণাম ঘটতে পারত না।”

আমাদের দেশের যে সাম্প্রদায়িক সংকট আজ পর্যন্ত আমাদের সমাজের প্রধান সংকট হিসেবে আছে, তা যে গোটা বিশ্বের চেহারা নয়, মুসলমান – অমুসলমান দ্বন্দ্বের স্বাভাবিকতা দিয়ে সেকাল থেকে একাল অবধি অনেকে যাকে ব্যাখ্যা করেন, একেবারেই তা যে সত্য নয়, বরং শাসকের দ্বারা সৃষ্ট ও পুষ্ট এক অভিশাপ – তা এখানে স্পষ্টভাবে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। বস্তুতপক্ষে এই সমস্যাটি নিয়ে বিশ শতকের চারটি দশক জুড়েই নিরন্তর ভেবেছেন তিনি।

সামাজিক বিভাজনের সমস্যা ও বর্ণহিন্দুদের তরফ থেকে মুসলিমদের নানাভাবে দূরে ঠেলে রাখা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতো ব্যাপারগুলি থেকেই যে দুই সম্প্রদায় পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে অনেক জায়গায়, সেটা রবীন্দ্রনাথ নানা লেখায় সে সময় সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরেন।

“আমাদের দেশে যখন স্বদেশী-আন্দোলন উপস্থিত হয়েছিল তখন আমি তার মধ্যে ছিলেম। মুসলমানরা তখন তাতে যোগ দেয়নি, বিরুদ্ধ ছিল। জননায়কেরা কেউ কেউ তখন ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ওদের একেবারে অস্বীকার করা যাক। জানি, ওরা যোগ দেয়নি। কিন্তু, কেন দেয়নি। তখন বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এত প্রবল যোগ হয়েছিল যে সে আশ্চর্য! কিন্তু এতবড়ো আবেগ শুধু হিন্দুসমাজের মধ্যেই আবদ্ধ রইল, মুসলমানসমাজকে স্পর্শ করল না! সেদিনও আমাদের শিক্ষা হয়নি। পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছেদের ডোবাটাকে আমরা সমাজের দোহাই দিয়ে গভীর করে রেখেছি। সেটাকে রক্ষা করেও লাফ দিয়ে সেটা পার হতে হবে, এমন আবদার চলে না। এমন কথা উঠতে পারে যে, ডোবা তো সনাতন ডোবা, কিন্তু আজ তার মধ্যে যে দুশ্চিকিৎস্য বিভ্রাট ঘটছে সেটা তো নূতন, অতএব হাল আমলের কোনো একটা ভূত আমাদের ঘাড় ভাঙবার গোপন ফন্দি করেছে, ডোবার কোনো দোষ নেই, ওটা ব্রহ্মার বুড়ো আঙুলের চাপে তৈরি। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, ভাঙা গাড়িকে যখন গাড়িখানায় রাখা যায় তখন কোনো উপদ্রব হয় না। সেটার মধ্যে শিশুরা খেলা করতে পারে, চাই কি মধ্যাহ্নের বিশ্রামাবাসও হতে পারে। কিন্তু, যখনই তাকে টানতে যাই তখন তার জোড়ভাঙা অংশে অংশে সংঘাত উপস্থিত হয়। যখন চলিনি, রাষ্ট্রসাধনার পথে পাশাপাশি রয়েছি, গ্রামের কর্তব্য পালন করেছি, তখন তো নাড়া খাইনি। আমি যখন আমার জমিদারি সেরেস্তায় প্রথম প্রবেশ করলেম তখন একদিন দেখি, আমার নায়েব তাঁর বৈঠকখানায় এক জায়গায় জাজিম খানিকটা তুলে রেখে দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞেস করলেম, এ কেন, তখন জবাব পেলেম, যে-সব সম্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্য ঐ ব্যবস্থা। এক তক্তপোষে বসাতেও হবে অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক। এ প্রথা তো অনেক দিন ধরে চলে এসেছে; অনেকদিন মুসলমান এ মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিম-তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম-পাতা আসনে অন্যে বসেছে। তার পর ওদের ডেকে একদিন বলেছি, আমরা ভাই, তোমাকেও আমার সঙ্গে ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, কারাবাস ও মৃত্যুর পথে চলতে হবে। তখন হঠাৎ দেখি অপর পক্ষ লাল টকটকে নতুন ফেজ মাথায় দিয়ে বলে, আমরা পৃথক। আমরা বিস্মিত হয়ে বলি, রাষ্ট্র ব্যাপারে পরস্পর পাশে এসে দাঁড়াবার বাধাটা কোথায়। বাধা ঐ জাজিম-তোলা আসনে বহুদিনের মস্ত ফাঁকটার মধ্যে। ওটা ছোটো নয়। ওখানে অকূল অতল কালাপানি। বক্তৃতামঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাক দিলেই পার হওয়া যায় না।”  (কালান্তর বইয়ের স্বামী শ্রদ্ধানন্দ প্রবন্ধ)।

কালান্তর গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধগুলি ছাড়াও গোরা বা ঘরে বাইরের মতো উপন্যাসে এবং বেশ কিছু কবিতা গানে এই সংকট ও তার সমাধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। গোরা উপন্যাসে ধর্মীয় আইডেনটিটির জায়গা থেকে শুরু করে এর নায়ককে শেষপর্যন্ত ভারতবাসীর বড় আইডেনটিটির জায়গায় পৌঁছে দেন রবীন্দ্রনাথ। তবে ন্যাশানালিটির ধারণাটিও রবীন্দ্রনাথে খুব সরল বা একরৈখিক নয়। এমনকী জাতীয়তাবাদের ধারণাটির ওপর অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে তার অতিরেক থেকে কী কী সমস্যা হতে পারে, রবীন্দ্রনাথ সেই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বলেছেন।

rabv

 

সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে ভারতবর্ষীয় সামাজিক সদাচারের প্রসঙ্গে মনুসংহিতার উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “সিভিলিজেশন’, যাকে আমরা সভ্যতা নাম দিয়ে তর্জমা করেছি, তার যথার্থ প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় পাওয়া সহজ নয়। এই সভ্যতার যে রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার। অর্থাৎ, তা কতকগুলি সামাজিক নিয়মের বন্ধন। সেই নিয়মগুলির সম্বন্ধে প্রাচীনকালে যে ধারণা ছিল সেও একটি সংকীর্ণ ভূগোলখণ্ডের মধ্যে বদ্ধ। সরস্বতী ও দৃশদ্বতী নদীর মধ্যবর্তী যে দেশ ব্রহ্মাবর্ত নামে বিখ্যাত ছিল সেই দেশে যে আচার পারম্পর্যক্রমে চলে এসেছে তাকেই বলে সদাচার। অর্থাৎ, এই আচারের ভিত্তি প্রথার উপরেই প্রতিষ্ঠিত — তার মধ্যে যত নিষ্ঠুরতা, যত অবিচারই থাক। এই কারণে প্রচলিত সংস্কার আমাদের আচারব্যবহারকেই প্রাধান্য দিয়ে চিত্তের স্বাধীনতা নির্বিচারে অপহরণ করেছিল। সদাচারের যে আদর্শ একদা মনু ব্রহ্মাবর্তে প্রতিষ্ঠিত দেখেছিলেন সেই আদর্শ ক্রমশ লোকাচারকে আশ্রয় করলে।”

রবীন্দ্রনাথের সমকালেই আম্বেদকর ও দলিত আন্দোলনের তরফে মনুস্মৃতি পোড়ানোর ঘটনাটি ঘটেছিল ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের জাত ব্যবস্থা ও দলিতদের ওপর বহুযুগ লালিত কাঠামোগত অত্যাচারকে উপড়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তা থেকে। প্রশ্ন হল ভারতের জাতিয়তাবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের মহড়া নিচ্ছে, তখনও জাতিয়তাবাদ এর মধ্যে উগ্রতার দিকটির বিপদ সম্পর্কে বেশ কিছু সতর্কতা উচ্চারণ করছেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের সমাজের ভেতরকার বিভাজনগুলির সমাধান না করে জোর করে একটা ঐক্যবদ্ধ ন্যাশানালইজম তৈরি করার সমস্যাটি নিয়ে আম্বেদকর থেকে একালের সমাজবিদেরা অনেকেই ভেবেছেন। প্রসঙ্গত আমরা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘নেশন অ্যান্ড ইটস ফ্রাগমেন্টস’ রচনাটির কথা ভাবতে পারি। রবীন্দ্রনাথ নেশন ও ন্যাশানালিজম নিয়ে কীভাবে ভেবেছিলেন সেই সংক্রান্ত আলোচনার জন্য আমরা দেখতে পারি তাঁর ‘রাবীন্দ্রিক নেশন কী?’ বা ‘রাবীন্দ্রিক নেশন প্রসঙ্গে আরো দু চার কথা’ র মতো প্রবন্ধগুলি।

পরিশেষে আসা যাক রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদে জর্জরিত পৃথিবীর সামনে মুক্তির সামনে কোনো ভাবনার কথা বলেছেন। সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে ইউরোপের পরাশক্তির তথাকথিত সিভিলাইজেশন মিশনের বাগাড়াম্বর ও মিথ্যাচারকে রবীন্দ্রনাথ শয়তানি মনে করেছেন ও এককথায় তাকে খারিজ করে লিখেছেন, “পাশ্চাত্য জাতির সভ্যতা অভিমানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা অসাধ্য হয়েছে। সে তার শক্তিরূপ আমাদের দেখিয়েছে, মুক্তিরূপ দেখাতে পারেনি।” তবু মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাতে না চেয়ে তিনি আশা করেছেন, “একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।” কিন্তু তার পথটা কী ?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর রাশিয়া ভ্রমণের পর থেকেই যে রাশিয়ার নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে আপ্লুত হয়েছিলেন, তার বহু প্রমাণ রয়েছে ‘রাশিয়ার চিঠি’ নামের বইটিতে। রাশিয়ায় বলশেভিকদের নেতৃত্বে গোটা দেশ ও প্রভাবাধীন অঞ্চলে যে বিরাট মন্থন চলছিল, তা যে রাশিয়া ভ্রমণের সাময়িক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, তার প্রমাণ রয়েছে দশ বছর পর জীবন সায়াহ্নে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ এর এই অংশে – “রাশিয়ার মস্কাও নগরীতে জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের আরোগ্যবিস্তারের কী অসামান্য অকৃপণ অধ্যবসায়—সেই অধ্যবসায়ের প্রভাবে এই বৃহৎ সাম্রাজ্যের মূর্খতা ও দৈন্য ও আত্মাবমাননা অপসারিত হয়ে যাচ্ছে। এই সভ্যতা জাতিবিচার করে নি, বিশুদ্ধ মানবসম্বন্ধের প্রভাব সর্বত্র বিস্তার করেছে। তার দ্রুত এবং আশ্চর্য পরিণতি দেখে একই কালে ঈর্ষা এবং আনন্দ অনুভব করেছি। মস্কাও শহরে গিয়ে রাশিয়ার শাসনকার্যের একটি অসাধারণতা আমার অন্তরকে স্পর্শ করেছিল – দেখেছিলেম, সেখানকার মুসলমানদের সঙ্গে রাষ্ট্র – অধিকারের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে অমুসলমানদের কোনো বিরোধ ঘটে না; তাদের উভয়ের মিলিত স্বার্থসম্বন্ধের ভিতরে রয়েছে শাসনব্যবস্থার যথার্থ সত্য ভূমিকা। বহুসংখ্যক পরজাতির উপরে প্রভাব চালনা করে এমন রাষ্ট্রশক্তি আজ প্রধানত দুটি জাতির হাতে আছে — এক ইংরেজ, আর – এক সোভিয়েট রাশিয়া। ইংরেজ এই পরজাতীয়ের পৌরুষ দলিত করে দিয়ে তাকে চিরকালের মতো নির্জীব করে রেখেছে। সোভিয়েট রাশিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রিক সম্বন্ধ আছে বহুসংখ্যক মরুচর মুসলমান জাতির — আমি নিজে সাক্ষ্য দিতে পারি, এই জাতিকে সকল দিকে শক্তিমান করে তোলবার জন্য তাদের অধ্যবসায় নিরন্তর। সকল বিষয়ে তাদের সহযোগী করে রাখবার জন্য সোভিয়েট গভর্নমেন্টের চেষ্টার প্রমাণ আমি দেখেছি এবং সে সম্বন্ধে কিছু পড়েছি। এইরকম গভর্নমেন্টের প্রভাব কোনো অংশে অসম্মানকর নয় এবং তাতে মনুষ্যত্বের হানি করে না। সেখানকার শাসন বিদেশীয় শক্তির নিদারুণ নিষ্পেষণী যন্ত্রের শাসন নয়।” এই কথাগুলি থেকে বোঝা যায় সভ্যতার যে মডেলটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের (এবং পরবর্তীকালের মার্কিনী নয়া ধাঁচের সাম্রাজ্যবাদের) মধ্যে দিয়ে ফেরি করা হয়েছিল, তা শোষণ, উপনিবেশকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া, ও সেখানকার মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার কাজটাই কেবল করেছিল। অল্পের জন্য অধিকাংশের মেহনতের ফসল চুরি হওয়ার বিপরীত এক সার্বজনিক উন্নতির মডেল সোভিয়েত ব্যবস্থায় দেখার পর রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে একেই ভারতের উন্নতির পথ বলে স্বাগত জানাতে অসুবিধে হয়নি। এর মধ্যেকার কিছু সমস্যার কথা রাশিয়ার চিঠিতে উল্লেখ করেও দুটো দিক থেকে তাকে অনেক শ্রেয় বলে মনে করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এক – রাশিয়ার ভেতরে সমাজের সব ধরনের মানুষের জীবনের ব্যবহারিক দিকগুলির; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুযোগ সুবিধার বিকাশ এবং দুই – প্রভাবাধীন অঞ্চলগুলিতেও একই ধরনের সুযোগ সুবিধে তৈরি করা, সেগুলিকে শোষণ না করা, সেখানে শাসন করার পদ্ধতি হিসেবে বিভাজন নীতি চালু না করা। সাম্প্রদায়িকতার সংকট বিদ্ধ ভারতের মাটিতে বসে রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করছেন, “সেখানকার মুসলমানদের সঙ্গে রাষ্ট্র – অধিকারের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে অমুসলমানদের কোনো বিরোধ ঘটে না; তাদের উভয়ের মিলিত স্বার্থসম্বন্ধের ভিতরে রয়েছে শাসনব্যবস্থার যথার্থ সত্য ভূমিকা।”

সেই সময়ের মতো আট দশক পরে আজও ভারত যখন এই সব সমস্যার মধ্যে পড়ে আছে, নানা ধরনের পুরনো সমস্যা নতুন নতুন চেহারায় আত্মপ্রকাশ করছে, তখন সভ্যতার সংকটের এই বর্তমান মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথকে ফিরে পড়বার বিশেষ দরকার আছে।

খণ্ড-27