বিপন্ন মানবতা – নির্মম রাষ্ট্র
bip

[ স্ট্র‍্যান্ডেড ওয়ার্কার্স অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (সোয়ান) পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বার্থে গড়ে তোলা এক নেটওয়ার্ক, যেটা ২৭ মার্চ থেকে পরিযায়ীদের সাথে সক্রিয়ভাবে বিরাট পরিধি জুড়ে যোগাযোগ রেখে আসছে। রিলিফ, খাদ্য সরবরাহ, নিঃস্ব রিক্ত শ্রমিকদের আর্থিক সাহায্য দিয়ে বিপন্ন সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই মঞ্চের তরফ থেকে ১৪ই এপ্রিল, তারপর ১ মে আর শেষে ৫ জুন একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ রিপোর্টের একটা অংশের অনুবাদ এখানে দেওয়া হলো। শিরোনাম আমাদের – সম্পাদকমণ্ডলী]

চতুর্থ দফার লকডাউন শেষ হয় ৩১ মে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ৩০ মে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে ‘ধাপে ধাপে সচল করার’ ( আনলক – ১.০) এক রূপরেখা প্রকাশ করে। লকডাউনের প্রতিটি পর্যায়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা নানান যন্ত্রণা ও হয়রানির শিকার হন। লকডাউনের প্রথম দু’টি পর্যায়ে বিভিন্ন রাজ্যে আটকে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রধান সমস্যা ছিল খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র ক্রয় করার মতো হাতে কোনো টাকা পয়সা না থাকা। এই যন্ত্রণা বহুগুণ বেড়ে যায় পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে সরকার সৃষ্ঠ হরেক ধরনের বিশৃঙ্খলা। পথ দুর্ঘটনায়, দীর্ঘ পথ হাঁটার ফলে পরিশ্রান্ত, ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর একের পর এক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তার উপর পুলিশী বর্বরতা তো আছেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে, কেন্দ্রীয় সরকার, দেশের বিচার বিভাগ কী ধরনের ভূমিকা নেয়, তা দেখে নেওয়া যাক।

প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনা ছিল অর্থমন্ত্রীর তরফ থেকে ঘোষিত প্রথম আর্থিক প্যাকেজ। কিন্তু তাতে পরিযায়ী শ্রমিকরা পেলেন না এক কানাকড়িও। উপরন্তু, এই প্রকল্প সম্পর্কে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো হয়। অনেক অর্থশাস্ত্রী, এমনকি আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর সম্মিলিত ব্যয় বরাদ্দ হল ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকা – কেন্দ্রের ঘোষিত ১.৭ লক্ষ কোটি টাকা নয়। কেন্দ্রীয় সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য যে ত্রাণ সাহায্য করছে তাতে সন্তুষ্ট হয়ে শীর্ষ আদালত ২১ এপ্রিলের মামলাটার নিষ্পত্তি করে, যা লকডাউনের প্রথম পর্যায়ে দায়ের করা হয় পরিযায়ী শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি প্রদানকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকদের রিলিফ দেওয়ার যে দাবি কেন্দ্রীয় সরকার করেছে তা নেহাতই অসাড়। সোয়ানের সংস্পর্শে আসা ৮২ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক জানায় তাঁরা কোনো ধরনের সরকারী রেশন পাননি। ৭০ শতাংশ পায়নি রান্না করা খাবারের একটিও দানা। লকডাউনের দ্বিতীয় পর্যায়ে যে দুই তৃতীয়াংশের সাথে যোগাযোগ হয়, তাঁদের পকেটে ১০০ টাকাও ছিল না।

train

 

দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউন শেষ হওয়ার মুখে, ২৯ এপ্রিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রথম বিজ্ঞপ্তি জারি করে পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়। ১ মে বিশেষ শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন মারফত তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ২৯ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অন্তত আটখানা পরস্পর বিরোধী বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এর ফলে তৈরি হয় বিরাট মাত্রায় বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা, মৃত্যু ও বিপর্যয়। অপর্যাপ্ত যানবাহন ও চূড়ান্ত পরিকল্পনাহীনতার জন্য অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক দুঃসহ যন্ত্রণার থেকে মুক্তি পেতে সাইকেল, বা ভাঙ্গাচোরা ট্রাকে করে ফিরে আসার চেষ্টা করে। বহু শ্রমিক হাজার হাজার কিলোমিটার হেঁটে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯ মে মহারাষ্ট্রের ঔরাঙ্গাবাদে ১৬ জন শ্রমিক ট্রেনের তলায় কাটা পড়লেন ঘরে ফেরার পথে। দীর্ঘ পথ হাঁটার পর ক্লান্ত অবসন্ন শরীরগুলো এলিয়ে পড়ে রেল লাইনে। ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁরা চিরনিদ্রায় শায়িত হয়।

৪৫ দিন ধরে তৈরি করা এই সংকটের পর অর্থমন্ত্রী হাজির হন আত্মনির্ভর ভারত নামাঙ্কিত এক ত্রাণ প্যাকেজ নিয়ে। এর মধ্যে একটা অংশ রয়েছে ‘গরিব’, পরিযায়ী ও চাষিদের উন্নতিকল্পে। অর্থমন্ত্রীর আত্মনির্ভর প্রকল্পের মধ্যে দুটো আশু দিক বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। এই প্রথমবার স্বীকার করা হল, বিভিন্ন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের খাদ্যশস্য বিলিবণ্টন করা দরকার। আর, অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যটাই খারিজ করে দেয় সলিসিটার জেনেরাল তুষার মেহতার তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ আদালতের কাছে দেওয়া কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সেই ঘোষণা যে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনার ত্রাণ প্রকল্প পরিযায়ী সহ সমস্ত গরিব মানুষের সমস্ত দৈনন্দিন প্রয়োজনের স্বার্থেই পরিচালিত হয়েছে।

bad

 

দ্বিতীয়ত, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারত সরকার শীর্ষ আদালতকে জানায়, গোটা দেশজুড়ে সরকার ১৫ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে। যদিও, নতুন প্যাকেজে তারা ঘোষণা করে, কেন্দ্রীয় সরকার এটা সুনিশ্চিত করছে ৮ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক মাথাপিছু ৫ কেজি খাদ্য শস্য, এবং পরিবার পিছু দু’মাস ধরে এক কেজি ছোলা পাবেন। তবে সেই সমস্ত পরিযায়ীরাই এই সুবিধা পাবেন, যাদের নাম জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন বা রাজ্যস্তরে নথিভুক্ত নেই। এটা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে আনলো। কেন্দ্রীয় সরকার যদি আন্তঃরাজ্য পরিযায়ীদের একটা আনুমানিক সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই থাকে তবে কী করেই বা তারা এপ্রিলে ঘোষণা করলেন যে ১৫ লক্ষ পরিযায়ীদের আশ্রয়স্থলগুলোতে তারা খাবার বিতরণ করেছে? যারা যারা আশ্রয় শিবিরে নেই, চাল-চুলো-রুটি-রুজি হারিয়ে নানা জায়গায় আটকে পড়েছেন, তাদের কেন ধর্তব্যের মধ্যে আনা হচ্ছে না? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, আদালত কোন বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় বক্তব্যকে চোখ-কান বন্ধ করে অনুমোদন দিয়ে বসলো?

mig

 

মে মাসের মাঝামাঝি কেন্দ্রীয় সরকার যে আত্মনির্ভর প্রকল্প ঘোষণা করলো তাতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার ৩,৫০০ কোটি টাকা মূল্যের রেশন বিতরণ করবে। এমন সময়ে এই ঘোষণাটা এলো যখন পরিযায়ীরা নিজ নিজ ঘরের দিকে পাড়ি দিতে শুরু করেছে। পরিযায়ীদের চিহ্নিত করে রেশন বিতরণের কাজটা ছেড়ে দেওয়া হলো রাজ্য সরকারগুলোর উপর। এখন, বেশিরভাগ পরিযায়ীরা সরকারের আশ্রয়স্থলে থাকেন না। তাঁরা থাকেন তাঁদেরই কর্মস্থলের কাছাকাছি কোনো আস্তানায়। রাজ্য সরকারগুলোর তরফ থেকে তাঁদের নাম নথিভুক্ত করার ঘটনাটাও রীতিমতো বিরল। কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের হাতে আটকে থাকা পরিযায়ীদের কোনো রেকর্ড নেই। তা সত্ত্বেও, মূখ্য শ্রম কমিশনার সমস্ত রাজ্যের শ্রম-কমিশনারকে জানিয়েছেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সেই তালিকা জমা দিতে। রাজ্য সরকারগুলো বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা চালিয়ে পরিযায়ীদের সনাক্ত করতেই হিমশিম খাচ্ছে, আর উক্ত ঘোষণার দুই সপ্তাহ পরে ও আমাদের সামনে আটকে পড়া পরিযায়ীদের সংখ্যাকে নির্দিষ্ট করা যায়নি। এখনো গণনা করে বলা যাচ্ছেনা কতজনই বা প্রতিশ্রুতি মতো খাদ্যশস্য পেয়েছেন। হরিয়ানার উদাহরণটাই সামনে আনা যাক। বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজের সন্ধানে এই রাজ্যে আসেন। যাদের রেশন কার্ড নেই, তাঁদের রেশন দেওয়ার ঘোষণা ১৪ এপ্রিল করা হলেও রাজ্য সরকার এখনো বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার কাজে আটকে রয়েছে, এখনো তালিকা মেলানো, কুপন ছাপানোর মধ্যেই আটকে আছে। বাস্তব জমিতে নেমে রেশন বিতরণ এখনও দূর অস্ত।

nirmam

 

আত্মনির্ভর প্যাকেজ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, লকডাউনের পর, ২৮ মার্চ থেকে যে সমস্ত শহুরে গৃহহীনরা আশ্রয়স্থলে থাকবেন (শেল্টারস ফর আরবান হোমলেস) তাঁদের দিনে তিনবার স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে রান্না করা খাবার দেওয়া হবে। যদিও, সিংহভাগ পরিযায়ী শ্রমিকরা কোনো সরকারী আশ্রয়স্থলে থাকেন না, আর আটকে পড়া পরিযায়ীদের সরকারী আশ্রয়স্থলে সম্মানজনক ভাবে স্থানান্তরিত করার বিন্দুমাত্র কোনো প্রচেষ্টা আজ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।

ttt

 

১৬ মে, রেলমন্ত্রী পীযুষ গোয়েল বেনেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ভাষণে বলেন, “বিগত তিন মাস যাবত, আমরা একজনকেও অভুক্ত অবস্থায় থাকতে দিইনি। এটা শুধুমাত্র কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে সম্ভবপর হয়েছে, তা নয়, এটা করা গেছে ১৩০ কোটি ভারতবাসীর প্রচেষ্টায়।” অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার দু’দিন পর তিনি ওই কথা বলেন, যে ঘোষণায় শেষ পর্যন্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার কথা পরোক্ষে স্বীকার করে নেওয়া হয়। এই নিদারুণ অসংবেদনশীল মন্তব্যের সময়ে একবারও নজরে আসলো না সমকালীন নানা সমীক্ষা ও প্রামান্য নথি কী কী তথ্য সামনে তুলে ধরলো। উদাহরণ স্বরূপ, আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে দশটি রাজ্যে ৫,০০০ পরিবারের মধ্যে এক সমীক্ষা চালানো হয়। সেই সমীক্ষা করুণ এক ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। সেই সমীক্ষার মতে, ৭৭ শতাংশ পরিবার আগের তুলনায় কম পরিমাণে খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছে, আর, ৪৭ শতাংশের হাতে এক সপ্তাহের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার কোনো টাকা পয়সা নেই। চারটের মধ্যে একটা পরিবার রেশন পাচ্ছে না। ৩৪৭টি পরিবারের মধ্যে ৩১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে যে রেশন দোকান গুলো আগে যেমন খুলতো, এখনো তেমনভাবেই চলছে। ইন্ডাস অ্যাকশনের তরফ থেকে ১৫ রাজ্যে ৫,০৪৬টি পরিবারের মধ্যে সমীক্ষা চালানো হয়। দেখা গেছে, ৬টি পরিবারের মধ্যে অন্তত একটি পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটের সম্মুখীন। এই সময়ে সমস্ত সমীক্ষাগুলোতে ফুটে উঠেছে চরম বুবুক্ষা, অনাহার, অর্থাভাবের নিদারুণ ছবি। তা সত্ত্বেও, শাসক দল চোখ বন্ধ করে ক্ষমাহীন এক পরিতৃপ্তি ও নির্লিপ্ততার মধ্যে দিনযাপন করছে।

mah

সংযোজন -
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে চালানো সমীক্ষায় যে তথ্যগুলো উঠে এসেছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এই সমীক্ষা দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষের রুটিরুজির উপর নেমে এসেছে লকডাউনের মারাত্বক ধ্বংসাত্মক প্রভাব। আর, এর দরুণ মহিলারাই সবচেয়ে আক্রান্ত, বিপন্ন।

শহরের শ্রমজীবীদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে ৮২ শতাংশ ক্যাজুয়াল মহিলা শ্রমিক ও ৮০ শতাংশ ক্যাজুয়াল পুরুষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। ৮৯ শতাংশ স্বনিযুক্ত মহিলা কর্মী এবং ৭৭ শতাংশ স্বনিযুক্ত পুরুষ কর্মী কাজ হারিয়েছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, লকডাউনের ফলে নিয়মিত চরিত্রের বেতনভুক কর্মীরাও চাকরি চ্যুত হয়েছেন।

চারজন শহুরে বেতনভুক কর্মীদের মধ্যে তিনজনের ও বেশি মহিলা ও পুরুষ তাদের চাকরি খুইয়েছেন। ৮৯ শতাংশ শহরে বসবাসকারী পরিবার জানিয়েছে তারা পরের মাসে ঘর ভাড়া দিতে অক্ষম। ৪১ শতাংশ শহুরে পরিবারগুলো জানিয়েছে যে তারা খরচ চালাতে ঋণ নিয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের পরিবারের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৫ ও ৩৩ শতাংশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়া হয়েছে।

ভাষান্তর ও সংযোজন – অতনু চক্রবর্তী 

খণ্ড-27