বিকাশ দুবে পরিঘটনা : দুর্বৃত্ত-পুলিশ-রাজনীতিবিদ আঁতাত ও সংঘর্ষরাজ উত্তরপ্রদেশে আইনশাসনের কাছে বিপর্যয় হয়ে দেখা দিয়েছে
biks

বিকাশ দুবে আখ্যান উত্তরপ্রদেশে সংঘর্ষ-হত্যার দীর্ঘ তালিকায় আরও একটা সংযোজন মাত্র নয়, তার অধিক কিছু। এই পরিঘটনা ভারতে রাষ্ট্রশাসনের বিদ্যমান মডেলের মূল নীতিটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। জনপ্রিয় ভাষায় যাকে দুর্বৃত্ত-পুলিশ-রাজনীতিবিদ আঁতাত বলা হয় তার কিছু বুনিয়াদি বিষয়ের ব্যাখ্যাও হাজির করছে, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন তথা সাংবিধানিক শাসনপ্রক্রিয়ায় সংকটজনক ধ্বসের এক নতুন মাত্রাকে নির্দেশিত করছে।

প্রথমে আমরা ২-৩ জুলাইয়ের মাঝ রাতে কানপুরের একটা গ্ৰামে দুর্বৃত্ত ধরতে যাওয়া পুলিশ দলের ওপর হতবাক করে দেওয়ার মতো আক্রমণ সংগঠিত হওয়ার কথা জানলাম, কুখ্যাত উত্তরপ্রদেশের সীমা ছাড়িয়ে বিকাশ দুবের নাম অন্যান্য রাজ্যের ঘরে-ঘরে পৌঁছে গেল। পুলিশদলের ওপর এই মাত্রায় এরকম হামলা যোগী আদিত্যনাথের সরকার সম্পর্কে প্রচলিত কিংবদন্তিগুলো ধুলিসাত করে দেয়। যোগী সরকার ‘সংঘর্ষ হত্যাকে’ রাষ্ট্রশাসনের নীতি হিসাবে গ্ৰহণ করে তা সরকারের সবচয়ে বড় সাফল্য বলে তুলে ধরছে। উত্তরপ্রদেশের সংঘর্ষগুলোকে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৯ সালে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু” বলে অভিহিত করার পর উত্তরপ্রদেশ সরকার প্রজাতন্ত্র দিবসের শোভাযাত্রায় সেগুলোকে প্রচারের বিষয় করে তুলে সর্বসমক্ষে জাহির করে।

আদিত্যনাথের পরিচালনায় উত্তরপ্রদেশে পাঁচ হাজারেরও বেশি সংঘর্ষের ঘটনা তথা একশোরও বেশি সংঘর্ষ-হত্যা সংগঠিত হয়েছে। তার পরও বিকাশ দুবের মতো এক দুর্বৃত্ত পুলিশ দলের ওপর আক্রমণ হানতে পারল! এই ঘটনাটা সংঘর্ষ-রাজের “কার্যকারিতার” তত্ত্বকের অসার প্রতিপন্ন করে। বস্তুত, পরের পর সংঘর্ষ হত্যাকাণ্ডগুলোর অবৈধতার কথা যদি বাদও দেওয়া যায়, ভাষ্যকাররা এইসব সংঘর্ষ-হত্যার অন্তর্নিহিত সামাজিক বৈষম্যমূলক চরিত্রের ওপরও আলোকপাত করেছেন। মার্কামারা সংঘর্ষগুলির বলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলিত বা অন্যান্য নিপীড়িত জাত বা মুসলিম সম্প্রদায়ের অসহায় প্রান্তিক নিরপরাধ নাগরিক, হত্যাকে যুক্তিযুক্ত করে তুলতে হত্যার পর তাদের বিরুদ্ধে নতুন নতুন অভিযোগ লাগানো হয়। ওই সংঘর্ষের বলি কখনই এমন কোনও “মোস্ট ওয়ান্টেড” দাগি দুর্বৃত্ত হবে না যে অবাধে তার কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেরকম তার আত্মসমর্পণ এবং তথাকথিত সংঘর্ষহত্যার আগে পর্যন্ত বিকাশ দুবে চালিয়ে যেতে পেরেছিল।

নিজেদের সংঘর্ষ নীতি নিয়ে উত্তরপ্রদেশ সরকারের ঔদ্ধত্য এতটাই যে, দুবের মৃত্যুর “ব্যাখ্যায়” পুলিশের পেশ করা সংঘর্ষ চিত্রনাট্যের সংশয়হীন রূপের ভুয়ো চরিত্রকে গোপন করার কোনো চেষ্টাই তারা করল না। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বানানো বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) গঠনের মধ্যেও সেই একই ধরনের ধৃষ্টতা দেখা গেল। তিন সদস্যের সিট-এর একজন হলেন ডিআইজি জে রবিন্দর গৌড়, যিনি নিজেই ২০০৭ সালে বেরিলির এক তরুণ ওষুধ ব্যবসায়ী মুকুল গুপ্তর ভুয়ো সংঘর্ষ-হত্যায় অভিযুক্ত। এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট ওই হত্যাকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিলেও পর্যায়ক্রমে উত্তরপ্রদেশের কোনো সরকারই চার্জশীট প্রাপ্ত পুলিশদের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর অনুমতি দেয়নি। আর, মুকুল গুপ্তর অভিভাভকরা, যাঁরা সিবিআই তদন্তের দাবিতে হাইকোর্টে মামলা করেন, তাঁরাও ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে খুন হয়ে যান। তদন্তের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এই ধরনের হওয়ায় উত্তরপ্রদেশে আজ পর্যন্ত সমস্ত সংঘর্ষ হত্যাই যে যুক্তিসংগত বলে প্রতিপাদিত হয়েছে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সরকার এখন আবার এক সদস্যের বিচারবিভাগীয় তদন্তের কথা ঘোষণা করেছে, কিন্তু সংঘর্ষ হত্যার সঙ্গে পুলিশ দলের ওপর আক্রমণকেও জুড়ে দেওয়ায় তদন্তটা সংঘর্ষ হত্যার চেয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ নিয়েই যে বেশি হবে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

রাজনীতিবিদ এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগের মধ্যেই যে বিকাশ দুবের মতো দুর্বৃত্তদের ক্ষমতার উৎস, তার উল্লেখ না করলেও চলবে। এখন বিজেপি এবং তার আগে বিএসপি-র সঙ্গে বিকাশ দুবের রাজনৈতিক সংযোগের কথা তো সুবিদিত। উত্তরপ্রদেশের আইনমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠকের সঙ্গে বিকাশ দুবের একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। যখন আমরা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের কথা বা দুর্বৃত্ত-পুলিশ-রাজনীতিবিদ গাঁটছড়ার কথা বলব, তখন এই গাঁটছড়ার মধ্যে রাজনীতিরই সবচেয়ে কর্তৃত্বকারী ভূমিকা থাকার কথা ভুললে চলবে না।

মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যে সমস্ত গুরুতর অপরাধের মামলা থেকে যোগী আদিত্যনাথ নিজেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, এক ভিন্ন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সেগুলোর জন্যই তাঁকে হয়ত বা জেলে থাকতে হত। তাঁর সরকার সংঘর্ষের পরিসংখ্যানগুলো সবসময় জাহির করলেও এই বিষয়টারও উল্লেখ জরুরি যে, মুজাফ্ফরনগর সাম্প্রদায়িক গণহত্যার প্রায় সমস্ত মামলাই তারা বন্ধ করে দিয়েছে। সাংসদ সঞ্জিব বালিয়াঁ ও ভরতেন্দ্র সিং, বিধায়ক সঙ্গীত সোম ও ঊমেশ মালিক, মন্ত্রী সুরেশ রানা ও সাধ্বী প্রাচী — এই সমস্ত সুপরিচিত বিজেপি নেতা সরকারী মার্জনার ফলে লাভবান হয়েছেন। এই ধরনের ঘটনা এর আগে আমরা গুজরাটে ঘটতে দেখেছি, আর এখন ঘটতে দেখছি দিল্লীতে যেখানে অতি শক্তিশালী সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কপিল মিশ্রর মতো বিজেপি নেতাদের অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।

একটা পর্যায়ের পর দুর্বৃত্তদের বোধকরি ঝেড়ে ফেলা যায়, বিকাশ দুবের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ঘটানো কাণ্ড যেমনটা দেখাল। অনেকেই মনে করছেন, ওকে ধোঁকা দিয়ে মধ্যপ্রদেশে আত্মসমর্পণ করানো হয়, আর তারপর উত্তরপ্রদেশে নিকেশ করা হয়। রাজনৈতিক শাসকদের কাছে কে কতটা কাজে লাগবে তার রকমফের অনুযায়ী পুলিশ অফিসারদের সঙ্গেও আচরণের তারতম্য ঘটে। বুলন্দশহরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমার সিংকে, আর আমরা দেখতে পাচ্ছি সমস্ত অভিযুক্তরাই জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এসেছে এবং বিজেপি যথারীতি তাদের সংবর্ধিত করেছে। চালু ব্যবস্থায় সঞ্জিব ভাট ও অমিতাভ দাসের মতো পুলিশ অফিসারদের তুলনায় বানজারা ও দাবিন্দার সিং-এর মতো পুলিশ অফিসারদের ভিন্ন মাপকাঠিতে বিচার হয়, অপ্রত্যাশিতভাবে এদের অনাচার ধরা পড়ার পরও এরা পুরস্কৃত ও সুরক্ষিত হতে থাকেন। আর সঞ্জিব ভাট এখন জেলে পচছেন, এবং অমিতাভ দাসকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছে (বিহার ক্যাডারের এই আইপিএস অফিসার রণবীর সেনা কিংবা মাফিয়া ডনদের সঙ্গে বিহারের শক্তিশালী রাজনীতিবিদদের সংযোগকে উন্মোচিত করেন)।

আরজেডি শাসিত বিহার অথবা এসপি শাসিত উত্তরপ্রদেশকে বিজেপি ‘জঙ্গলের রাজত্ব’ বলে বর্ণনা করতেই অভ্যস্ত ছিল। মণ্ডল-পরবর্তী সময়কালে পশ্চাদপদ জাতি সমূহের রাজনৈতিক উত্থানকে কলঙ্কিত করতে দীর্ঘদিন ধরেই ওরা এই উত্থানের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য হিসাবে ‘অপরাধ’ বা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের উপমা ব্যবহার করে আসছে। আজ বিহার এবং উত্তরপ্রদেশ উভয় রাজ্যেই বিজেপি/এনডিএ শাসনাধীনে অপরাধ এবং সন্ত্রাসের বিপুল বৃদ্ধি আমরা দেখতে পাচ্ছি। নিজেদের ঢাক পেটানো ‘সুশাসন’-এর দাবি বাস্তবের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণরূপে নাকচ হয়ে যাচ্ছে, প্রাধান্যকারী মিডিয়া যদিও ঘটে চলা দুর্বৃত্তায়নের প্রকৃত ব্যাপ্তি ও চরিত্রকে যথাযথ মাত্রায় প্রতিফলিত করছে না। সংঘ বাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এই দুর্বৃত্তায়নকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামন্ততান্ত্রিক-সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এবং এর নিশানা হচ্ছে নিপীড়িত সামাজিক গোষ্ঠীসমূহ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। উত্তরপ্রদেশে এই সামন্ততান্ত্রিক-সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তায়ন এবং সংঘর্ষ-হত্যার নীতি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ধারণার প্রতি এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ খাড়া করছে। এই নকশার শঙ্কাজনক পরিণাম কী হতে পারে তা আমরা গুজরাটে দেখেছি। উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারও যদি এই গুজরাট মডেল অনুসরণ করে তবে আইনের শাসনের অবক্ষয় ঘটে তা পর্যবসিত হবে প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা ও নৈরাজ্যে।

(এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ১৪ জুলাই ২০২০)  

খণ্ড-27