প্রতিবেদন
বিজেপি’র নির্বাচনি ধাপ্পা : ৭৫ লক্ষ চাকরি
job

পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য উদগ্রিব বিজেপি। ‘অখন্ড ভারত’ নির্মাণের লক্ষ্যে বঙ্গবিজয় তাদের কাছে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এবং তাই বর্গিবাহিনী নখ দাঁত উন্মোচিত করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রাজ্যের ওপর। সাবেকি সমস্ত আগ্রাসনের মতো এই আক্রমণও দুমুখো – একদিকে আছে আইন শৃংখলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, যাবতীয় শিষ্টাচার বিসর্জন দিয়ে, গাড়ি চাপা দিয়ে বিরোধী নেতাদের মেরে ফেলার হুমকির মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা আবার অন্যদিকে আছে মনভোলানো ৭৫ লাখ চাকরির আষাঢ়ে গপ্পো। খবরে প্রকাশ নির্বাচনে জয়লাভ করলে নতুন বিজেপি সরকার আগামী পাঁচ বছরে ৭৫ লক্ষ বেকার ছেলেমেয়েকে চাকরি দেবে। তাঁরা মানুষের ঘরে ঘরে যাবেন, ফর্ম ভর্তি করাবেন এবং দুই মাসের মধ্যে চাকরির একটি ‘প্রতিশ্রুতি কার্ড’ প্রার্থির হাতে তুলে দেবেন। রাজ্যবাসীর চক্ষু চড়কগাছ তো হয়েছেই বিরোধীরাও মন্তব্য করেছেন যে এটা কোনো ‘প্রতিশ্রুতি কার্ড’ নয় এটা আদপে একটি ‘প্রতারণা কার্ড’।

গালভরা প্রতিশ্রুতি ও ভারতীয় গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ২০১৪ সালে প্রত্যেক ভোটারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা জমা করার অঙ্গীকার ইতিহাসে এক অভাবনীয় জুমলা হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করতে একটা দল যে কী বেলাগাম মিথ্যাচার করতে পারে এটি তার উৎকৃষ্টতম প্রমাণ। তারপর তো এলো বিমুদ্রাকরণ নামে সেই মহাবিপর্যয় যখন বলা হল এই একটা পদক্ষেপের ফলে সমস্ত কালো টাকা উদ্ধার হবে এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ এবং দেশদ্রোহী কার্যকলাপ নির্মূল হয়ে যাবে। উল্টে দেখা গেলো সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানত লুটপাঠ করে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নীরব মোদী ও মেহুল চোক্সি নামক দুই জালিয়াত দেশ ছেড়ে পলায়ন করল। শাসক তবুও অননুতপ্ত। এই ধরণের দু’চারটে ঘটনা হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে তাদের যাত্রাপথে মামুলি কিছু যতি চিহ্ন মাত্র। ২০১৯-এর ভোটে আরও মনোমোহিনী প্রতিশ্রুতি তারা বাজারে ছাড়ল, এবার দুই কোটি চাকরি, বেকার সমস্যার একটা হেস্তনেস্ত করেই তাঁরা ছাড়বে। উল্টে দেখা গেলো লকডাউনের সময় দুই কোটি স্থায়ী চাকরি বিলোপ হয়ে গেল। লকডাউন কোনো অজুহাত হতে পারে না কারণ বিভিন্ন রিপোর্ট দেখাচ্ছে মহামারীর প্রাদুর্ভাবের আগেই শহরে বেকার সমস্যা ২০%র আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিলো, যা এক কথায় অভূতপূর্ব। ঐ নির্বাচনের সঙ্কল্পপত্রে তারা অঙ্গীকার করেছিলো যে কৃষকদের আয় ২০২২ এর মধ্যে তারা দ্বিগুণ করে দেবে, উল্টে দেখা যাচ্ছে পুরো কৃষিক্ষেত্রটা তারা কিষাণদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আম্বানি আদানিদের হাতে তুলে দেবার আয়োজন করে ফেলেছে।

বেকার সমস্যার সমাধান করতে সম্পূর্ণ অপারগ শাসক দল এখন একটা নতুন কায়দা চালু করার চেষ্টা করছে। তারা বলছে সরকার খালি চাকরি দেবে এমনটা হবে না, সরকার উপার্জনের সুযোগ, বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেবে। কম সুদে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাবে, আমলাতান্ত্রিক লালফিতে আলগা হবে, কাঁচামাল সহজলভ্য হবে যাতে প্রচুর নতুন সংস্থা ও উদ্যোগপতি তৈরি হয়। এরফলে নতুন সব ক্ষেত্র তৈরি হবে যা বেকারত্ব লাঘব করতে সাহায্য করবে। প্রথম কথা সরকার রেল, ব্যাংক, সরকারী চাকরিতে নিয়োগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এরফলে বেকার সমস্যা সমাধান করার বিপুল ক্ষেত্র রুদ্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংকের প্রচুর কাজ এখন আউটসোর্সিং, বা বাইরের সংস্থাকে দিয়ে করানো হয়। রেলের ক্যাটারিং তো বেসরকারী হাতে চলেই গেছে, তেজস এক্সপ্রেসের মতো বেসরকারী ট্রেন চালু হয়েছে, এছাড়া বিভিন্ন বড় স্টেশনে হকারদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হচ্ছে। বিশাল বিপুল জনস্রোতে এই সব মানুষ যে কোথায় হারিয়ে গেছেন তা কারো জানা নেই। সরকারী ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব প্রতিটি  কর্মচারির কাজের মূল্যায়ন করা চালু হচ্ছে। যাঁদের মনে করা হবে ‘অলস’, ‘ফাঁকিবাজ’ ইত্যাদি তাঁদের অবসর গ্রহণ করতে হবে। সুতরাং নতুন চাকরি তো দূর অস্ত, পুরানো কর্মচারিদের নিজেদের কাজ টিকিয়ে রাখাই এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্বিতীয়ত স্টার্ট-আপ বা নতুন ব্যবসা শুরু করতে যুবক যুবতীরা দ্বিধাগ্রস্ত। ব্যাংকে নতুন ব্যবসা-ঋণের জন্য আবেদনে কোন উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়নি। অথচ অর্থমন্ত্রী মে মাসে এমএসএমই (মাইক্রো, স্মল, মিডিয়াম) শিল্পে অতিরিক্ত জামিন বিহীন (কোল্যাটারাল) ৩ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ পাওয়ার সুযোগের কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ব্যবসা শুরু করলেই তো হল না, ক্রেতা কোথায়? লোকের হাতে টাকা নেই, কে কিনবে নতুন সব পণ্য? সরকার ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’-এর কথা বলে এবং সেটার জন্য নাকি শ্রম আইন কঠোর করা প্রয়োজন। কিন্তু কয়েক বছর আগে চেম্বার অফ কমার্সের রিপোর্ট বলছে যে আমাদের দেশে ব্যবসা করার মূল প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, জমি পাওয়ার অসুবিধা, পরিকাঠামোর অভাব, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, অনভিপ্রেত সরকারি হস্তক্ষেপ ইত্যাদি। শ্রমিক সমস্যা তালিকায় অনেক পরে আসছে। এখন এরসাথে যোগ হয়েছে চাহিদার অভাব। সুতরাং রাতারাতি প্রচুর উদ্যোগপতি তৈরি হবে এবং তার ফলে চাকরির বাজারে জোয়ার আসবে এটা একটা ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছু না।

মিথ্যাচার, জুমলা এই কেন্দ্রীয় সরকারের ইউএসপি। বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে প্রচুর ঢাকঢোল পেটানো হয়, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে জানা যাবে যে যতটা সাফল্য দাবি করা হয়, বাস্তবে তা অনেক কম। ধরা যাক ‘প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনা’ যা বিনামুল্যে নিম্নবিত্তের ঘরে রান্নার গ্যাস পৌঁছে দেয়। দাবি ইতিমধ্যে ৬ কোটি পরিবার এই সুযোগ পেয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এর ২০% নতুন সিলিন্ডার কেনার পয়সা না থাকার কারণে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঘরে ওভেন, সিলিন্ডার পরে থাকে তাঁরা চিরকালের মতো কাঠের আগুনই ব্যবহার করেন। আয়ুষ্মান ভারতে দাবি করা হয় ৫০ কোটি মানুষ নাকি স্বাস্থ্যবিমা পেয়েছে, আদপে মাত্র ২.৮৯ কোটি মানুষ বেনিফিসিয়ারি কার্ড পেয়েছেন। দাবি করা হয় দেশ উন্মুক্ত জায়গায় শৌচকর্ম থেকে মুক্ত, বাস্তবে ২৩% মানুষ নতুন তৈরি হওয়া শৌচাগার ব্যবহারই করেন না। মূল কারণ হচ্ছে জলের অপ্রতুলতা, নলবাহিত জলের ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অবশ্যই দারিদ্র। যাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের সমস্যা তাঁরা শৌচাগার নিয়ে কী করবেন! গ্রামে গেলে দেখা যাবে শৌচাগারগুলো অনেক জায়গাতেই গুদাম ঘরে পরিণত হয়েছে। শেষ একটা উদাহরণ দেখা যাক যা এখন খুব প্রাসঙ্গিক - কৃষকদের এমএসপি (নূন্যতম সহায়ক মূল্য)। সরকার নির্বিকার ভাবে দাবি করছে যে তারা নাকি স্বামীনাথন কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী এমএসপি দিচ্ছে। কমিটির সুপারিশ হচ্ছে সমস্ত খরচা (বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ), ব্যাংক ঋণের ওপর সুদ, পারিবারিক শ্রমের মূল্য, লিজ নেওয়া জমির ভাড়া সব যোগ করে সেটার ওপর দেড়গুণ কৃষককে দিতে হবে। সরকার উপরে উল্লেখিত সমস্ত খরচা এবং মজুরি ব্যতীত আর কিছুই দিচ্ছে না। এর ফলে প্রতি কুইন্টালে চাষির ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান। মিথ্যাচার, জুমলাবাজিকে এই সরকার একটা শিল্পে পরিণত করেছে। এই ৭৫ লক্ষ চাকরির গপ্পো ধাপ্পাবাজির সেই লম্বা তালিকার আর একটি মাত্র।

- সোমনাথ গুহ     

খণ্ড-27
সংখ্যা-46