খাদ্যশস্যে ভর্তুকি হ্রাসের অপচেষ্টা
reduce foodgrain subsidies

গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্টিত খাদ্যশস্যের উপরে ভর্তুকির পরিমাণকে ২০% কমানোর লক্ষ্যে নিতি আয়োগ একটি আলোচনাপত্র প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক বাজেটে (২০২১- ২) খাদ্যে ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছে ২.৪৩ লক্ষ কোটি টাকা। যদি নিতি আয়োগের মতকে গ্রহণ করা হয় তাহলে ওই ভর্তুকি বার্ষিক ৪৭২৩২ কোটি টাকা পর্যন্ত কমবে বলে নিতি আয়োগের অনুমান। নীতি আয়োগের প্রস্তাবে খাদ্য সুরক্ষা আইনে (এনএফএসএ) পরিবর্তন ঘটিয়ে গণবণ্টনের মাধ্যমে খাদ্যশস্য পাওয়ার জন্য যোগ্য নাগরিকদের সংখ্যা কমানোর সপক্ষে মতো দিয়েছে। এনএফএসএর বর্তমান রূপে ভারতের গ্রামীণ জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ ও শহুরে জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া মূল্যে খাদ্যশস্য পাওয়ার যোগ্য। ওই ৭৫ শতাংশ-৫০ শতাংশ সূত্র মেনে গণবণ্টনে মূলত দুধরনের সুবিধে প্রদান করা হয়; দেশের দরিদ্রতম নাগরিকদের অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার মাধ্যমে মাসে পরিবারপিছু ৩৫ কিগ্রা করে খাদ্যশস্য দেওয়া হয়-যার আওতায় রয়েছে ৯.০১ কোটি মানুষ (১ ফেব্রুয়ারীতে), আর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত পরিবারের ৭০.৩৫ কোটি মানুষকে জনপিছু মাসে ৫ কিগ্রা করে খাদ্যশস্য প্রদান করা হয়। নীতি আয়োগের প্রস্তাব হল খাদ্যশস্য পাওয়ার যোগ্য গ্রামীণ জনসংখ্যার ও শহুরে জনসংখ্যার অনুপাতদুটিকে কমিয়ে যথাক্রমে ৬০ ও ৪০ শতাংশ করা। তা করা হলে ২৯২০ সালের জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য পাওযার যোগ্য জনসংখ্যা ৮৯.৫২ লক্ষ কোটি থেকে কমে ৭১.৬২ লক্ষ কোটি টাকা হবে।

গত বছরের বাজেটের সময় কোভিড সংক্রমণের বিষয়ে মোদি সরকারের চিন্তা ছিল না, যদিও ব্রাত্যজনেরা সেদিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ফলে খাদ্যে ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল দেশ। ২০১৯-২০ সালের বাজেটে খাদ্য ভর্তুকির বরাদ্দ ছিল ১.৮৪ লক্ষ কোটি টাকা, কিন্তু সংশোধিত বাজেটে সেই বরাদ্দ কমে ১.০৮ লক্ষ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০২০-২১ এর বাজেট বরাদ্দ পূর্বতন বছরের বাজেট বরাদ্দের থেকে প্রায় ৩৮% কমিয়ে ১.১৫ লক্ষ কোটি টাকা করা হয়। সাধারণত প্রকৃত ব্যয় বাজেট বরাদ্দের থেকে আলাদা হয়। যদি ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষের প্রকৃত ব্যয়, ১.৭ লক্ষ কটি টাকাকে মাথায় রাখা হয়, তাহলে ২০২০-২১ এর বাজেট বরাদ্দ মোদি সরকারের প্রথম বছরের ব্যয়ের থেকেও কম। মনে রাখা দরকার মাঝখানে কেটে গেছে ৬ বছর, টাকার দাম কমেছে ফলে প্রকৃত হিসেবে ওই হ্রাস অনেকটাই কম।

সাধারণত খাদ্যশস্যের গণবণ্টনের জন্য ভর্তুকি বাজেটে উল্লেখিত ভর্তুকির তুলনায় বেশিই থাকে কারণ ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এফসিআই)ও ধার করে যা বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করলে ভর্তুকি অনেকটাই বাড়ত। সম্প্রতি ২০২০-২১-এর সংশোধিত বরাদ্দ ও ২০২১-২২এর বাজেট বরাদ্দ হিসেবের সময়ে সামগ্রিক হিসেব করা হযেছে। যেহেতু ২০২০-২১ অর্থবর্ষে কোভিড মহামারী জনিত কারণে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনায় অতিরিক্ত চাল, গম, ডাল দেওয়া হয়েছিল তাই বর্তমান অর্থবর্ষে ভর্তুকির পরিমাণ ৪.২২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০২১-২২ সালে ওই ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ করা হয় ২.৪৩ লক্ষ কোটি টাকা। এই অতিমারীর সময়ে ২০২০-২১ সালের ৪.২২ লক্ষ কোটি টাকার তুলনায় ২০২১-২২ এর ২.৪৩ লক্ষ কোটি টাকা অনেকটাই, প্রায় ৪৩ শতাংশ কম। তাই বলাই যেতে পারে খাদ্যে ভর্তুকি কমানোর কাজটি চলছে।

ফলে নীতি আয়োগের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার আলোচনাটি কোনো হঠাৎ ভাবনা নয়, অর্থমন্ত্রকের মুখ্য উপদেষ্টা প্রণীত ২০১৯-২০র অর্থনৈতিক সমীক্ষাতে একটি পুরো অধ্যায় বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ কমানো নিয়ে ব্যয় করা হয়েছে। ওই সমীক্ষায় লেখা হয়েছে, “সরকারী নীতির ফলে খাদ্যশস্যের বৃহত্তম সংগ্রাহক ও মজুতদার হিসেবে সরকারের উদ্ভব ঘটেছে -- ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে,যার ফলে এফসিআই-এর গুদামে বাড়তি খাদ্য শস্য উপচে পড়ছে, বিপুল খাদ্য ভর্তুকির বোঝা চাপাচ্ছে, খাদ্যশস্যের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ফারাক তৈরি করছে এবং শস্য বৈচিত্র আনয়নের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছে”। বলা হয়েছে, “এনএফএসএ র আওতায় কেবলমাত্র নীচের ২০% কেই রাখা উচিৎ। এছাড়া আগেও প্রথম মোদি সরকার দ্বারা গঠিত বিজেপি এমপি শান্তাকুমারের নেতৃত্বাধীন কমিটি সুপারিশ করেছিল এনএফএসএকে সংশোধন করে কেবল ৪০% মানুষকে ওই আইনের আওতায় আনার জন্য। আদতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকার নিয়োজিত কমিটিগুলি ‘শ্লট মেশিন কমিটি’ (যেখানে নিয়োগকর্তা যেমনটা চায় তেমনি রিপোর্ট পায়)।

শান্তাকুমার কমিটি, মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, অর্থমন্ত্রক, নীতি আয়োগ প্রমুখ তাবড় বিজ্ঞজন বা তাদের সমাবেশ অনায়াসে খাদ্যে ভর্তুকি কমানো এবং মনে মনে তুলে দেওয়ার কথা বলে কারণ তারা মনে করে যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সরকারের হস্তক্ষেপ অনুচিৎ। তারা ইচ্ছে করেই ভুলে যায় যে, ভারতে এখনো বিপুল ক্ষুধা ও অপুষ্টি রয়েছে। পুষ্টিহীনতার একটি বড় লক্ষণ অপুষ্ট ও খর্বাকৃতি শিশুর প্রাচুর্য। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, ২০২০ অনুসারে ১০৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৯৪তম, ভারতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের শীর্ণতা সর্বোচ্চ, ১৭.৩ শতাংশ এবং খর্বাকৃতি শিশুর অনুপাত ৩৪.৭ শতাংশ। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা ৪ অনুসারে ৫ বছরের নীচে থাকা ৩৫.৭ শতাংশ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের থেকে কম. ৩৮.৪ শতাংশ খর্বাকৃতি ও ২১ শতাংশ অতি দুর্বল। সামগ্রিক জাতীয় পুষ্টি সমীক্ষা এই পরিস্থিতিকে দীর্ঘকালীন অপুষ্টির সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা সূচক, ২০২০ অনুসারে ভারতের স্থান ১১৩টি দেশের মধ্যে ৭১তম। অক্সফ্যামের খাদ্য প্রাপ্তির সূচকেও ভারতের স্থান ছিল ৯৭তম।

শান্তাকুমার কমিটির সুপারিশকে গ্রহণ করলে শেষ বিচারে ফুড কর্পোরেশনকে তুলে দেওয়াই হত। কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী মাত্র ৬% কৃষক ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ফসল বিক্রি করে। অর্থাৎ, ন্যূনতম সহায়কমূল্য অর্থহীন। অন্যদিকে কমিটির বক্তব্য অনুসারে হিসেব করে দেখা গিয়েছে যে, রেশনিং ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে ৪৭% শস্যে চুরি হযে যায় (যদিও বিশ্বব্যাঙ্কের ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্য মোকাবিলা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে ভারতের গণ বণ্টন ব্যবস্থায় চুরি বা লিকেজ ২০০৪-০৫ সালের ৫০% থেকে কমে ২০০৭-০৮ এ ৪৪% ও ২০১১-১২ সালে ৩৫%-এ নেমে এসেছিল)। ফলে এমএসপি বা রেশনিং বহুলাংশেই নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়। ও দুটি না থকলে ফুড কর্পোরেশনের (এফসিআই) কোন প্রয়োজন থাকে না। সব মিলিয়ে এমএসপি, রেশন ও এফসিআই এক ধাক্কায় সব কিছুকেই অনাবশ্যক দেখানোই যেন কমিটির উদ্দেশ্য ছিল।

মুক্ত বাজারের অর্থনীতি গত ৩ দশক ধরে দেশে চালু হলেও গত কয়েক বছরের বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার শাসনকালে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ইজ অফ ডুইং বিজনেস জাতীয় বিভিন্ন ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’র কথা জোরের সঙ্গে উপস্থাপিত হচ্ছে। সরকার যেভাবে সরকারী মালিকানাধীন সরকার পরিচালিত সংস্থার বিরোধিতা করছে তা আগে কখনো হয়নি। সরকারী প্রশাসনিক আমলাদের বিরুদ্ধে সরকারের প্রধান অকর্মণ্যতার অভিযোগ আনছে, সরকারি প্রশাসনে দক্ষতা আনার জন্য যুগ্ম সচিব উপসচিব স্তরে সরাসরি বেসরকারী সংস্থার কর্মীদের নিয়োগ করা হচ্ছে। ২০১৯-২০ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষার উল্লেখিত অধ্যায়ের নাম ছিল ‘বাজারের কার্যকারিতা ক্ষয়যখন সরকারের হস্তক্ষেপে লাভের থেকে ক্ষতি বেশি হয়’। ওই অধ্যায়ের ছত্রে ছত্রে অত্যাবশ্যক পণ্য আইন (ইসিএ) ও তার আওতায় ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রন বা পণ্যের মজুত নিয়ন্ত্রণ, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি), এফসিআই, খাদ্যে ভর্তুকির মতন সরকারী ব্যবস্থা কত খারাপ তার সপক্ষে তথ্য ও তত্ব হাজির করা হয়েছে। বলা হয়, ওই নীতির ফলে অতি-দ্রুত বর্ধমান খাদ্য ভর্তুকির বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে খাদ্য সুরক্ষার আওতায় সস্তায় খাদ্যশস্য কেবল ২০ শতাংশ মানুষকে দিলেই চলবে বাকিদের ক্ষেত্রে বিক্রয় মূল্য সংগ্রহ মূল্যের উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হলেই চলবে। এও বলা হয যে ওই ভর্তুকি যুক্ত খাদ্যশস্য দেওয়ার বদলে ব্যাঙ্ক খাতায় সরাসরি অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে। যদি তেমনটা হয় তাহলে এমএসপি, খাদ্য শস্য সংগ্রহ, এফসিআই সব কিছুই উঠে যাবে। ওই সমীক্ষা ইঙ্গিত করেছিল ইসিএ তুলে দেওয়ার। সরকার কিন্তু কোভিডের সময়ে তেমনটাই করেছে। ফলে খাদ্যে ভর্তুকি তোলার যে কথা শুরু হয়েছে তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি পণ্য ও খাদ্যশস্যের বাজারকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে এগুলি সব তুলে দেওয়া আবশ্যিক। কর্পোরেটদের হাতে কৃষিকে তুলে দিতে গেলে মোদি সরকারকে এই এজেন্ডাকে সম্পূর্ণ করতে হবে।

গত কয়েক বছরে সরকার জনকল্যাণমূলক অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বাতিল করতে উঠে পড়ে লেগেছে। পেট্রল-ডিজেল-কেরোসিনে ভর্তুকি তুলে দেওয়া হয়েছে আগেই। রান্নার গ্যাসেও ভর্তুকি নামমাত্র। রেলের যাত্রী টিকেটের দাম বাড়ানো হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রকেও বেসরকারীকরণ করা হচ্ছে ক্রমাগত। এমএসপি তোলার প্রক্রিয়াটি কৃষকদের আন্দোলনের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষা স্বাস্থ্যকেও বেসরকারী পুঁজির কাছে ছেড়েই দেওয়া হয়েছে। সরকার চায় সমস্ত ভর্তুকি তুলে দিতে। কিন্তু জনমতের কথা ভেবে তা কার্যকরী করতে পারছে না। খাদ্যশস্যে ভর্তুকি তুলে দিতে পারলে মোদি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভীষ্ট পূর্ণ হয়। কিন্তু তা কৃষক ও সাধারণ ভোক্তাদের জীবন বিপর্যস্ত করবে।

- অমিত দাশগুপ্ত   

খণ্ড-28
সংখ্যা-8