নির্বাচনের পরেই পশ্চিমবঙ্গের ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকে বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত মোদী সরকার
After the election, the Modi government is ready to sell

ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা সরকারের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা নরেন্দ্র মোদী ও সেই সরকারের অযোগ্যতম অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের মুখে প্রায়শই একটি মন্ত্র উচ্চারিত হয়, ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট ম্যাক্সিমাম গভার্নেন্স’। বাংলা করলে  দাঁড়ায়, ন্যুনতম সরকার অধিক নিয়ন্ত্রণ। যদিও এই বাক্য বন্ধটির অর্থ সম্ভবত নরেন্দ্র মোদীও জানেন না, অন্যরা তো কোন ছাড়। কিন্তু অধিকতর নিয়ন্ত্রণটি অন্তত মন্ত্রী শান্ত্রীদের উপরে এতটাই জোরালো যে, কেউ রাজাকে জিগ্যেস করতে রাজি নয়, রাজা তোর কাপড় কোথায়?

বাক্য বন্ধটিকে ভাঙলে দুটি অংশ পাওয়া যায়, (১) ন্যুনতম সরকার, (২) অধিকতর নিয়ন্ত্রণ। পরবর্তীটি অবশ্যই মোদী সরকার চালু করেছে, তবে ধনী ও পুঁজির মালিকদের জন্য বিপরীতমুখে। বৃহৎ পুঁজির উপরে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রণকেই আর রাখছে না সরকার। জল-জঙ্গল-জমি-আকাশ-বাতাস, কৃষি-শিল্প-পরিষেবা সমস্ত ক্ষেত্রেই পুঁজিকে অবাধ বিচরণের মধ্য দিয়ে ন্যুনতম নিয়ন্ত্রণকেও লোপাট করে দিচ্ছে। অন্য কথায় ভারতের অর্থনীতি তথা সমাজকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া হচ্ছে বড় পুঁজির মালিকদের। অন্য দিকে কঠোরতম নিয়ন্ত্রণ বা সর্বোচ্চ শাসনের আওতায় আনা হচ্ছে শ্রমিক-কৃষক-গরিব-মেহনতি জনতাকে ও তাদের পক্ষে দাঁড়ানো মানবাধিকার বা গণতান্ত্রিক অধিকারের কর্মীদের বিভিন্ন ভুয়ো মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে ভরে।

প্রথম অংশটিকেও অবশ্য মন্ত্রীসভার মাপের দিক থেকে ভাবলে অসফল বলে মনে হবে। কারণ, প্রথম এনডিএ মন্ত্রীসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ৭৮, যা ইউপিএ-র ৭১ জন মন্ত্রীর তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয়টির মাপ বাড়ানোর সুযোগ এখনো আসেনি, কোভিড বাদ সেধেছে। কিন্তু সরকারি কর্মচারির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে, নিয়োগ মোটামুটি বন্ধ। তাছাড়া, সরকারের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রনাধীন শিল্প সংস্থাগুলিকে ক্রমাগত বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ওই ন্যুনতম সরকারের শ্লোগানটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোভিডের সময়ে মহামারী নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৮৯৭-কে ব্যবহার করে সমস্ত শ্রমিক সংগঠনগুলিকে নিস্ক্রিয় করে রেখে, কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা ছাড়া, শ্রম আইন ও কৃষি আইনকে পুঁজির স্বার্থে সংশোধন করা হল এবং ২০২১-২২ সালেরে বাজেট বক্তৃতায় প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলিকে বিক্রি করে বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা করা হল।

অর্থাৎ, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, সিবিআই, এনআইএ, আধা সামরিক বাহিনীর জনজীবনে প্রবল উপস্থিতির মধ্য দিয়ে ন্যুনতম সরকারের শ্লোগানকে হাস্যকর করে তোলা হচ্ছে একদিকে, অন্যদিকে সমস্ত উৎপাদন ও পরিষেবা মায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবের ক্ষেত্রে সরকারের সবরকমের অনুপস্থিতিকে নিশ্চিত করার দিকে পদক্ষেপ নিয়ে ন্যুনতম সরকার কথাটির তাৎপর্য রক্ষা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রগুলিকে তুলে দেওয়ার জন্য মোদীজির ছটফটানি দেখবার মতো। এমনভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপিত করা হয় যেন, সমস্ত সরকারী সংস্থা লোকসানে চলছে। কিন্তু সরকারি তথ্য তেমন কথা বলে না। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, নিতি আয়োগের কর্তারা, মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সকলে মিলে রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রকে অপদস্থ করার যে কর্মসূচি নিয়েছে তার উপরে দাঁড়িয়ে বেসরকারীকরণের পথকে প্রশস্ত করা হয়েছে। গত অতিমারীর সময়ে সুযোগ বুঝে প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকেই (ব্যাঙ্ক, বীমা, কয়লা, জ্বালানী তেল সমেত) বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়ার প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। এইভাবেই নাকি আত্মনির্ভর ভারত গড়ে উঠবে।

রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রকে বেসরকারী মালিকানায় তুলে দেওযার মোদী সরকারের যে চক্রান্ত তা এরাজ্যের শিল্প-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের জটিল পরিস্থিতিকে আরো সংকটগ্রস্ত করে তুলবে। আত্মনির্ভর ভারতের আগেই ২৬টি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাকে বেসরকারীকরণের কথা ঘোষনা করা হয়েছিল। তার মধ্যে এরাজ্যের দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, এ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট, ব্রিজ এন্ড রুফ ও বেঙ্গল কেমিক্যাল রয়েছে। অসত্য ভাষণে পটু চতুর বিজেপির নেতারা, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে সেগুলিকে বেসরকারিকরণের কথা একবারও মুখে আনছে না। বাবুল সুপ্রিয়র হিন্দুস্তান কেবলের পুনরুজ্জীবনের কথা বলে আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রে নির্বাচন জেতার কথা সকলেরই হয়তো মনে আছে। প্রতিশ্রুতি রাখার দস্তুর যে বিজেপির সাংসদদের নেই, নরেন্দ্র মোদী নিজের আচরণ দ্বারা বহুবার জানিয়ে দিয়েছেন। বাবুল ২০১৪ সালের মে মাসে সাংসদ হলেন, মন্ত্রী হলেন। তার বাড় বাড়ন্ত হল। ওদিকে হিন্দুস্তান কেবল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এতদিনে সকল শ্রমিক কর্মচারীর ছুটি হয়ে গেছে, মানে এক্কেবারে ছুটি।

ভারতীয় অর্থ ব্যবস্থাকে তাদের সাঙাতদের হাতে তুলে দেওযার জন্য বহুদিনকার রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রগুলিকে ধ্বংস করতে বিজেপি বদ্ধ পরিকর। সরকারি তথ্য অনুসারে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলির কাছ থেকে আয়কর ও উৎপাদন শুল্ক বা পণ্য-সেবা কর থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ২০১৮-১৯ সালে ৩ লক্ষ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। উক্ত সংস্থাগুলি সামগ্রিকে লভ্যাংশ প্রদান করেছে ৭২ হাজার কোটি টাকা। তা সত্বেও লাভজনক সংস্থাগুলিকে ব্যক্তি মালিকদের হাতে তুলে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী- সীতারামনরা। কেবল তাই নয়, কেন্দ্রীয় রাস্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলিতে ১০ লক্ষ ৩১ হাজার শ্রমিক কর্মচারী কাজ করত ২০১৮-১৯ সালে, তার মধ্যে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও পশ্চাতপদ শ্রেণির সংখ্যা যথাক্রমে ১ লক্ষ ৮১ হাজার, ১ লক্ষ ২ হাজার ও ১ লক্ষ ৯৭ হাজার। ফলে সংরক্ষিত পদে রয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ কর্মী। বেসরকারীকরণ করা হলে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও পশ্চাতপদ শ্রেণির সংরক্ষণ লুপ্ত হবে।

হিন্দুস্তান কেবলকে নরকে পাঠানোর পরে মোদী সরকার আসানসোলের নিকটবর্তী দুর্গাপুরে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট ও এ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট দুটিকেও বেসরকারি হাতে তুলে দিয়ে শ্রমিক কর্মচারী তথা দুর্গাপুরের সর্বনাশ করার জন্য পরিকল্পনা করছে। দুর্গাপুর ইস্পাত কিন্তু লোকসানে চলছে না, লাভ করছে। ২০১৯-২০ সালে ১০৮ কোটি টাকা লোকসানের পরে ২০২০-২১-তে এই অতিমারির মধ্যেও সেটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে ও ২০২০-২১ অর্থবর্ষের ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ পর্যন্ত ৯ মাসে ৪৭৩ কোটি টাকা ও ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকে ৪৫২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে দুর্গাপুর ইস্পাত। এ্যালয় ইস্পাতের ক্ষেত্রে সামান্য লোকসান হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকে ১২ কোটি টাকা। বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে বাঙালীর সেন্টিমেন্ট ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত লোকসানে চললেও তার পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ও পরপর ৪ বছর মুনাফা করেছে। ২০১৯-২০ অর্থ বর্ষে কর দেওযার পরে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি টাকা, অতিমারীতে উৎপাদন শেষ দিকে ব্যাহত হওযা সত্বেও। তার আগের বছরে ২০১৮-১৯ সালে মুনাফার পরিমাণ ছিল ২৫ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ সালে ব্রিজ এন্ড রুফ সংস্থার মুনাফা হয়েছে ৩৩ কোটি টাকা, তার আগের বছরে হয়েছিল ১৭ কোটি টাকা। ওই সমস্ত সংস্থাগুলি এছাড়াও কোম্পানি আয় কর ও জিএসটি বাবদ আরো অনেক টাকা সরকারের রাজকোষে ঢুকিয়েছে। ফলে এই কারখানাগুলিকে বেচে দেওযার কোনো যুক্তি সরকারের কাছে নেই।

পশ্চিমবঙ্গের যে ৪টি সংস্থাকে বেসরকারী হাতে তুলে দেবে মোদী সরকার সেগুলি কর মারফত সরকারী রাজকোষে অর্থ সরবরাহ করে চলেছে। দুর্গাপুর ইস্পাত ও এ্যালয় ইস্পাতের দেয় আয়কর ও পণ্য-সেবা কর স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিযার (সেইল) হিসেবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সেইল সরকারী কোষাগারে ওই সব বাবদ ১০, ৯১৬ কোটি টাকা দিয়েছে (২০১৮-১৯ সালে), ব্রিজ এন্ড রুফ দিয়েছে আয়কর ও পণ্য-সেবা কর বাবদ ১৩৩ কোটি টাকা ও লভ্যাংশ বাবদ ৫ কোটি টাকা; বেঙ্গল কেমিক্যালের থেকে সরকার পেয়েছে কর বাবদ ৪ কোটি টাকা। এতদসত্বেও মোদী-সীতারামনের সন্তুষ্টি হচ্ছে না। তারা সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে বধ করে সব ডিম এক সাথে নিতে উন্মুখ। তাতে পশ্চিমবঙ্গের সর্বনাশ হোক তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলি তুলনামূলকভ ভাবে শ্রম নিবিড় হওয়ায় সেগুলি বন্ধ হয়ে গেলে রাজ্যের কর্মসংস্থান ধাক্কা খাবে। একই সঙ্গে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও পশ্চাতপদ শ্রেণির জন্য সংরক্ষণ অর্থহীন হয়ে যাবে। নির্বাচনের আগে শাসক দল এই বেসরকারীকরণের কাজকে নির্বাচক মণ্ডলীর কাছে আড়াল করে রাখবে, কারণ ভারতীয় জনতা পার্টির ভোট ব্যাঙ্কের এক বিরাট অংশ তফশিলি জাতি ও উপজাতি। বিজেপি তাদের সংকল্প পত্রে লাখো লাখো যুবককে কাজ দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা যে নিয়োগের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেয় না সেটা রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রগুলিকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টাতেই প্রকট। একদিকে লাখো লাখো যুবকের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার অবলুপ্তি এই দ্বিচারিতার নামই হচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি।

- অমিত দাশগুপ্ত 

খণ্ড-28
সংখ্যা-14