শ্রমজীবীদের শোষণ মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন শংকর রায়
sankar roy

sankar roy passed awayপ্রবীণ সাংবাদিক, বিশিষ্ট মার্ক্স চর্চাকার, কবি, প্রাবন্ধিক, চিত্র সমালোচক ও একদা ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিআই) সদস্য শ্রী শংকর রায়ের জীবনাবসান হল কলকাতার হাসপাতালে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। সংবাদ জগতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শংকরদার অভিজ্ঞতার ঝুলি ছিল অফুরান। যে কোনও সংবেদনশীল ব্যক্তির সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটলেই তিনি তাঁকে অদ্ভুতভাবে আপন করে নিতে পারতেন। বিশেষ করে জ্ঞান চর্চার জগতে যে কোনও তরুণ তাঁর বন্ধু হয়ে উঠতেন বয়সের সীমারেখা না মেনেই। অনুজপ্রতীম ওই সমস্ত বন্ধুদের সঙ্গে হয় যাদবপুর কফি হাউসে বা দূরভাষে যোগাযোগ রাখতেন। এবং এই বন্ধুদের সীমা কলকাতা ছাড়িয়ে সারা বাংলা, ভারতবর্ষ, এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান, বাংলাদেশ হয়ে বিদেশের বহু রাষ্ট্রে বিস্তৃত ছিল। দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার একদা সম্পাদক শ্রী সুনন্দ দত্ত রায়, ওই পত্রিকার কলামনিস্ট অদতি রায় ঘটক, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে সাড়া জাগানো অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা, আই পি এ পরচালক নিত্য চক্রবর্তী তাঁর বন্ধু ও স্বজন ছিলেন। শংকরদার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের যোগ প্রায় চার দশকের, প্রয়াত বন্ধু বরেন ভট্টাচার্যের মাধ্যমে। স্বপ্নাদির (দেব) সম্পাদনায় বন্ধু বরেন কাজ করত ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকায়। স্বপ্নাদিরা ইংরেজি পত্রিকা ‘পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট’ দেবেশ রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশ করছিলেন ১৯৮৬ সাল থেকে, প্রতিক্ষণ অবশ্য ১৯৮৩ সাল থেকে বেরত। শংকরদা তখন ‘ক্যাপিটাল’ পত্রিকায় যুক্ত ছিলেন। একদা কিংবদন্তী কমিউনিষ্ট নেতা জলি মোহন কলের সম্পাদনায় ‘ক্যাপিটাল’ প্রকাশিত হত। শংকরদার হাতও ধরেই স্টেটসম্যান পত্রিকার অত্যন্ত শক্তিশালী কলামনিস্ট ও সাংবাদিক অদিতি রায় ঘটক-এর উত্থান ‘ক্যাপিটাল’ পত্রিকায় কাজ করে। শংকরদা ‘পয়েন্ট কাউন্তার পয়েন্ট’-এও কাজ করেছেন। আরও কিছুটা পরে তিনি ‘বিজনেস অ্যাণ্ড পলিটিক্যাল অবজার্ভার’ (পরে ‘দ্য অবজার্ভার’)-এ কাজ করে অবসর নেন। কর্পোরেট সাংবাদিক হয়েও শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের হয়ে কাজ করে গিয়েছেন আজীবন। শ্রমজীবী মানুষের শোষণমুক্তির স্বপ্নে বিভোর শংকরদা নিজের, পরিবারের, সুখস্বাচ্ছন্দ্যের কথা কখনও ভাবতেন না। প্রায় ছয় দশকের সাংবাদিকতার জীবন যার সূত্রপাত কালান্তর পত্রিকা দিয়ে। এক সময় ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্যপদও নিয়েছিলেন। একদা বঙ্গ সিপিআই সম্পাদক প্রাক্তন সাংসদ ডা. রণেন সেন-এর আপ্তসহায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন। কাজ করেছেন রাজ্য সরকারের কৃষি পরিকল্পনা দফতরের গণনাকার হিসাবেও।

ভবানীপুরে জন্ম হলেও তাঁর আদি বাড়ি ছিল কৃষ্ণনগর। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (ডি এল রায় নামেই যিনি সমধিক পরিচিত) বংশধর শংকরদার মামা ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সম্পাদক। ভবানীপুরের স্কুলে ম্যাট্রিকুলেশনের পর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে থেকে আইএসসি ও ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে স্ট্যাটিস্টিক্স-এ ডিপ্লোমা নিয়ে উত্তীর্ণ হন। সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি ‘ক্যাপিটাল’ পত্রিকায় যোগ দেন যার সম্পাদক ছিলেন কমিউনিষ্ট নেতা জলি মোহন কল। গত শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকে প্রকাশিত নরহরি কবিরাজের সম্পাদনায় ‘মূল্যায়ন’ পত্রিকার সঙ্গে তরুণ কর্মী হিসাবে তিনি ও তপন বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ করেছেন। নানান বিষয়ে কলমকে শানিত করেছেন। দেশ বিদেশের বহু সাময়িক পত্রে লিখেছেন। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের কর্মী সমর্থক ও নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও তাঁর দল সিপিআই-এর প্রতিই দুর্বল ছিলেন এমনকি ২০০০ সালে দল ছেড়ে দেওয়ার পরেও। পরের দিকে কালান্তরে ছদ্মনামে লিখতেন। লিবারেশন (সিপিআইএমএল-এর মুখপত্র) ও আজকের দেশব্রতীতে লিখতেন।

জীবনের শেষ এক দশক নিবিড় মার্ক্স চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। এর প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক মার্ক্স চর্চাকার ও গবেষক এবং অধ্যাপক পরেশ চট্টোপাধ্যায়ের সংগে তাঁর নাড়ির যোগ থাকা, এছাড়াও প্রদীপ বকশির সসঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল — যিনি এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলা তো বটেই সারা ভারতবর্ষের মধ্যে অন্যতম মার্ক্স চর্চাকার ও সমাজতাত্ত্বিক। কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক মার্চেলো মুস্তোর (মার্ক্স চর্চায় যার পৃথিবীর ২০টি ভাষায় বই প্রকাশিত) লেখা ‘অ্যানাদার মার্ক্স’ শংকরদা ‘অন্য এক মার্ক্স’ শিরোনামে অনুবাদ করেছেন যা উত্তর ২৪ পরগণার বাদুর আখর প্রকাশনা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ প্রকাশিত। সম্প্রতি অধ্যাপক চট্টোপাধ্যায়ের মার্ক্স-এর উপর বাংলায় লেখা কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন যা অনুষ্টুপ থেকে ২০২৩-এর বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর ও শৈবাল গুপ্তর সম্পাদনায় মার্ক্স-এর জন্মের দ্বিশত বর্ষ উপলক্ষে পাটনায় আদর (এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে ১৫টি গবেষণাপত্র ‘প্রোবিংস অ্যাণ্ড রি-প্রোবিংস, এসেজ ইন মার্ক্সিয়ান অ্যাওয়েকিং’ প্রকাশিত হয়েছে দিল্লির আকর প্রকাশনা সংস্থা থেকে ২০২১ সালে। কথা ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মার্ক্স-এর উপর বই লেখার। নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক নব দত্তের অনুরোধে ‘বিপন্ন পরিবেশ’ সম্পাদনা করেছিলেন। ফ্রন্টিয়ার, মেইনস্ট্রিম, দর্শনে মুক্তমন, সপ্তাহ, জনস্বার্থ বার্তা, শিস সহ বহু ছোট পত্রিকায় লিখেছেন। সমাজমাধ্যমেও সক্রিয় থেকেছেন। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম, কাফিলা ডটকম ইত্যাদি ওয়েব পোর্টালেও লিখেছেন। শংকরদা চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টই আমাদের পথের দিশারি হয়ে থাকবে। রেখে গেলেন স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধু, নাতনি, কন্যাসম সাবি সহ অসংখ্য গুণমুগ্ধদের।

- নিত্যানন্দ ঘোষ

খণ্ড-30
সংখ্যা-5