জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে

১।      জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে ব্যাপক আকারে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন গত কয়েক দশক ধরে এক প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হয়ে রয়েছে। আমাদের নিকটতম পরিপার্শ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট চিহ্নগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি।

২।      উদাহরণস্বরূপ, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগ খুঁজে পাওয়া গেছে। হিমালয় পর্বতের হিমবাহগুলি গলছে, যার ফলে ভারতের বরফগলা জলে বাহিত নদীগুলির সারা বছরের প্রবাহ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা জানি, এই নদীগুলি ভারতীয় কৃষির প্রাণস্বরূপ — আর তাই গুরত্বপূর্ণ এই সম্পদটিতে যে কোনো বিপর্যয়ই ইতিমধ্যেই সংকটে পড়া কৃষি অর্থনীতিতে সর্বনাশা প্রভাব ফেলবে।

৩।      বরফগলা জল বাহিত নদীগুলি ছাড়াও নানান প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের বিন্যাসগুলির উপরও জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রতিকুল প্রভাব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধারাও ক্রমেই আরও বেশি-বেশি এলোমেলো হয়ে উঠছে; বনজঙ্গল এবং জলাশয়ের পরিমাণ ক্রমেই কমে আসছে, আর যেগুলোকে আমরা “অস্বাভাবিক’ প্রাকৃতিক ঘটনা বলতাম, সেগুলো ক্রমেই নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

৪।      এই রূপান্তর ও পরিবর্তনগুলো বেশ কয়েকটি বিষয়ের পরিণাম, যার মধ্যে ‘উন্নয়ন’-এর গৃহীত মডেলের ধরন, যথাযথ শাসনকার্য ও নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং ভূল স্থানে নীতির অগ্রাধিকারকে রাখাও রয়েছে। পরিমণ্ডলের ওপর চাপানো একচেটিয়া বিত্ত পুঁজি চালিত ক্রমবর্ধমান দাবিও পরিমণ্ডলের সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। উপরন্তু, নয়া উদারবাদী নীতি কাঠামো সমস্ত নিয়ন্ত্রণকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

৫।      এই সংকটের কারণগুলো যেহেতু ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রোথিত, এর সমাধানকেও তাই ব্যবস্থাগতই হতে হবে। ব্যক্তি বিশেষদের ‌‘নৈতিক’, ‘ন্যায়পরায়ণ’ বিবেকের প্রতি আবেদন জানিয়ে এবং তাদের উপভোগ ও জীবনযাপনের ধরনে পরিবর্তন আনার উপদেশ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

৬।      জলবায়ু পরিবর্তনে বড়-বড় বহুজাতিক সংস্থাগুলিরই ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কার্বন মেজরস ডাটাবেস সংস্থার ২০১৭ সালের একটি রিপোর্ট জানিয়েছে, ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বে যত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়েছে মাত্র ১০০টি কোম্পানিই তার ৭০ শতাংশ ঘটিয়েছে, এবং ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বে শিল্পগুলি থেকে যত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়েছে তার অর্ধেকেরও  বেশি ঘটিয়েছে মাত্র ২৫টি কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা।

৭।      পরিবেশগত ভারসাম্যে এই পরিবর্তনগুলি সৃষ্ট বিপত্তির বোঝা তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি বইতে হয়েছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণকে — শ্রমজীবী মানুষ, ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক, জমির উপর নির্ভরশীল আদিবাসী জনগণ, গ্রামীন মহিলা, ক্রমেই আরো ঘিঞ্জি হয়ে ওঠা শহরগুলোর বস্তিবাসীদের।

৮।      লভ্য সমস্ত বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা জানাচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকাকে ভয়ংকরভাবে বিপন্ন করে তুলবে। আর সবথেকে বেশি ধাক্কাটা পড়বে কৃষি এবং মৎস্য চাষের উপর। আইএলও-র প্রকাশ করা ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, প্রাকৃতিক বিপদআপদের কারণে ১৯.৩ মিলিয়ন জনগণ নতুন স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়, আর এর মধ্যে ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশের জনগণের সংখ্যাই বেশি। আর তাই আমরা যারা ভারতে থাকি তাদের এই বিষয়টির মোকাবিলাকে এড়িয়ে গেলে চলবে না।

৯।      সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ন্যায় পরিমণ্ডলের প্রতি ন্যায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। যে গভীর আন্তসম্পর্কে এগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, সে কথা বিবেচনায় এনে বৃহত্তর ইস্যুটির একটি দিককে অন্য দিকগুলির থেকে আলাদা করলে তা অবশ্যই এক বড় ভুল হবে। ভারতে আমরা ইতিহাসগতভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটিকে প্রায় সম্পূর্ণ রূপেই জলবায় পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আলাপ-আলোচনায় গৃহীত (অথবা গৃহীত নয় এমন) অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করে এসেছি। আমরা বিশ্বাস করি, ইতিহাসের আজকের এই সন্ধিক্ষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটির মোকাবিলায় একইসাথে অভ্যন্তরীণ পরিপ্রেক্ষিতের উপরও মনোনিবেশ করতে হবে।

১০।      মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিবাজির প্রতিরোধ করা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে গণতান্ত্রিক আলাপ-আলোচনার উপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগ শুরু করাটাও জরুরি। এই উদ্যোগগুলির নিশানা হবে ভারত সরকার, আর স্থানীয় স্তরে জেলা প্রশাসন, শিল্প পরিচালকমণ্ডলি এবং রাজ্য সরকারগুলো। বিশেষভাবে জোর দিতে হবে রাষ্ট্রচালিত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ ক্ষেত্রে শক্তির পর্যাপ্ততার উপর যাতে খাদ্য এবং জ্বালানি পাওয়া সুনিশ্চিত হয়।

১১।      জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলাপ-আলোচনা প্রসঙ্গে আমাদের পুনরায় ঘোষণা করা প্রয়োজন যে, এই আলোচনাকে সমতা এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার দুটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাদের এই কথাটা স্বীকার করতে হবে যে, পরিমণ্ডলের উপর পৃথিবীর প্রতিটি নাগরিকেরই সমান অধিকার রয়েছে। ম্যালথাসীয় কাঠামো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলির তথাকথিত ‘জনসংখ্যার বিস্ফোরণকে’ ধিক্কার জানায় এবং দুষণের একমাত্র দায় ‘অত্যধিক জনসংখ্যা সম্পন্ন’ তৃতীয় বিশ্বের উপর চাপায়। সন্দেহজনক এই দাবির বিরোধিতা করে তার প্রতিরোধ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্লজ্জ হুমকিবাজি এবং ভারত ও চীনের দরিদ্রদের কলঙ্কিত করার প্রচেষ্টা দেখা গেছে। সবচেয়ে উদ্ভট ঘটনাটা হল, ধান চাষ এবং গো-পালন থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসকে চরম মাত্রায় শিল্পায়ন ঘটা বিশ্বের দেশগুলির কলকারখান এবং মোটর গাড়ি থেকে নিঃসৃত গ্রিনহাউস গ্যাসের সঙ্গে একাকার করে তোলা হয়েছে। এই বিষয়টাকে জোরালোভাবে প্রতিরোধ করতে হবে এবং মাথাপিছু গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ভিত্তিতে আলোচনা চালাতে হবে।

১২।      এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলির যে অবদান রয়েছে, আলাপ-আলোচনার সময় সেই ঐতিহাসিক দায়কেও অবশ্যই বিবেচনাধীন করতে হবে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, ভারত সরকার আন্তর্জাতিক স্তরে আলাপ-আলোচনায় সাধারণ হলেও ভিন্ন-ভিন্ন দায়বদ্ধতার নীতিগত অবস্থানকে (নিঃসরণ কমানোর বোঝাকে ঐতিহাসিক নিঃসরণের ভিত্তিতে বন্টন করা) একরকম পরিত্যাগই করেছে। সারা বিশ্বের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার পরিবর্তে সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতিস্বীকারের পথেই গেছে। ১৯৯৭-এর কিয়োটো চুক্তি নিঃসরণ কমানোর মাথাপিছু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করে শিল্পোন্নত দেশগুলির জন্য কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর মাথাপিছু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালে ডারবানে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনায় ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে মাথাপিছু নি:সরণের মানদণ্ডকে পরিত্যাগ করতে সম্মত হয়। এর ফলে দায়বদ্ধতা পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে চীন ও ভারতের মতো দেশের ঘাড়ে অসমঞ্জসভাবে অনেক বেশি বোঝা চাপে।

১৩।      ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েরই জলবায়ু পরিবর্তনের পরিঘটনাটিকে উপহাস এবং অস্বীকার করার ইতিহাস রয়েছে। ২০১৪ সালে মোদী অত্যন্ত নিন্দনীয়ভাবে বলেন যে, জলবায়ুর পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের ঠাণ্ডা সহ্য করার ক্ষমতার। তারপর থেকে মোদী জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকারের এ ধরনের চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে সরে এসে বিষয়টিতে কিছু মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ট্রাম্প কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে এসেছেন, সেটিকে “মার্কিন উৎপাদনকে অ-প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার লক্ষ্যে চীনাদের দ্বারা এবং চীনাদের জন্য সৃষ্ট’’ “ঠগদের কাজ’’, একটা “কল্পকথা’’ বলে দাবি করেছেন। ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আবার জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্যারিস চুক্তি থেকে সরে এসেছে।

১৪।      পরিবেশ সংক্রান্ত আলোচনাধারা ‘বিশ্বের দক্ষিণ’-এর বিরুদ্ধে ‘বিশ্বের উত্তরকে’ উসকিয়ে তুলে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত চর্চাকে মেরুকৃত করার দিকে চালিত হয়েছে। জলবায়ুর সংকট সৃষ্টি ও তা আরও তীব্র হয়ে ওঠার পিছনে ‘উত্তর’-এর শিল্পোন্নত দেশগুলির ভূমিকাকে নিশ্চিতরূপে নির্দেশিত করার সাথে-সাথে আমাদের বিশ্বের ‘উত্তর’-এর দেশগুলির মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলিকেও স্বীকার করতে হবে। ভারতের বিত্তশালী মানুষরা যেমন তাদের ভোগের ধরনধারণের মধ্যে দিয়ে জলবায়ু সংকটে মাথাপিছু অনেক বেশি অবদান রাখে, সেরকমভাবেই জলবায়ু সংকটে বিশ্বের উত্তরের ধনীদের যে অবদান তার সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণী, দরিদ্র জনগণ এবং তথাকথিত ‘উন্নত’, শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলির প্রান্তে বাস করা জনজাতি জনগণের অবদানের কোনো তুলনাই চলে না। আজ অতএব যা প্রয়োজন তা হল, নির্দিষ্ট দেশের সীমানা ছাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতই ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের মধ্যে পরিবেশগত সংহতি গড়ে তোলা — যে সংহতিটা হবে দরিদ্র, কালো মানুষ এবং জনজাতি জনগণের মধ্যে, জলবায়ু সংকটের বোঝাটা তুলনায় যাদের অনেক বেশি বইতে হয়।

১৫।      জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আলাপ-আলোচনা ছাড়া অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও আমাদের একটা সুস্পষ্ট অবস্থান সূত্রবদ্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্তরে একটা নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়ার জন্য ভারত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি আমাদের এটাও সুনিশ্চিত করতে হবে যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে ভারত সরকার এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় তার দায়বদ্ধতাকে যেন এড়িয়ে না যায়। ট্রাম্প শাসনাধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আক্ষরিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের আগুনে ‘গ্যাসোলিনের ঘৃতাহুতি দিচ্ছে’, আমাদের তখন শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক আলাপ-আলোচনার উপর নির্ভরশীল হলে চলবে না।

১৬।      আমাদের গণসংগঠনগুলোকে, বিশেষভাবে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে তাদের চিন্তাধারা এবং সুনির্দিষ্ট দাবিগুলির মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের এজেন্ডাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিজেদের সক্রিয় করতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত গণসংগঠনগুলিকে এবং পাহাড়, উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অন্যান্য এলাকায় কর্মরত গণ সংগঠনগুলিকে বন-ভিত্তিক কর্মনীতিগুলোর উপর নজররাখতে হবে। এটা বিশেষভাবে অপরিহার্য এই কারণে যে, বহুজাতিক সংস্থাগুলো এবং তাদের বুদ্ধিদাতারা এমন সমস্ত কর্মনীতি হাজির করতে চাইছে যার ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের নজর সরে যাবে ‘উন্নয়নশীল’ দেশগুলোর উপর এবং সেই অপকর্মে মদত যোগাবে বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আইএমএফ এবং তার সাথে স্থানীয় স্তরের বশংবদ সরকারগুলো। এইভাবে, কার্বন সিঙ্ক-এর (বন, সমুদ্র, মাটি, গাছপালার মতো কার্বন সঞ্চয়ের আধার) জন্য বাজার তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ‘মোকাবিলার’ নামে স্থানীয় বন-জঙ্গল এবং সম্পদসমূহকে বহুজাতিক সংস্থা এবং বিদেশী সরকারগুলোর নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। এটাকে তৎপরতার সঙ্গে প্রতিরোধ করতে হবে, এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলো এবং তার সাথে স্থানীয় প্রশাসনগুলোর বিরুদ্ধে প্রচারাভিযানও এই প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এশিয়া এবং আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোকে ধনী দেশগুলোর আঁস্তাকুড় হতে দেওয়া যাবে না, আবার, শিল্পোন্নত দেশগুলোতে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ার প্রশমনে দরিদ্র দেশগুলোর মূল্যবান সম্পদকে ব্যবহৃত হতেও দেওয়া যাবে না।

১৭।      নদীগুলোকে পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত করার প্রস্তাব প্রথম হাজির করে উপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজ এবং অটল বিহারি বাজপেয়ীর বিজেপি জমানায় ২০০০ সালে সেটি পুনরুজ্জীবিত হয়ে সামনে আসে। ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, বর্তমান সরকার ঐ প্রস্তাবকে তুলে ধরতে আবারও সক্রিয় হবে। অসংখ্য মানুষের উচ্ছেদ এবং জীবিকা নাশ এবং তার সাথে বনের পরিমাণ ও জীববৈচিত্র্যের হ্রাসের মধ্যে দিয়ে বিপুলাকায় এই প্রকল্প সারা দেশে পরিবেশের যে সর্বনাশ ঘটাবে, তার জন্য এই প্রকল্পের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। বিপুল ব্যয়বহুল এই প্রকল্প রূপায়িত হলে তা জলবায়ু সংকটকেও বাড়িয়ে তুলবে। বন ধ্বংসের অর্থ বস্তুত হল মূল্যবান কার্বন সিঙ্ক-এরও ধ্বংস। এছাড়া, প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য হল, ক্রান্তীয় অঞ্চলে জলাধারগুলি মিথেন ও কার্বনডাইঅক্সাইডের উৎস। এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় যে কোনো প্রচেষ্টাকেই তাই দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

১৮।      শহর এবং গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণের মধ্যে কর্মরত আমাদের গণসংগঠনগুলিকে এমন প্রচারাভিযান সংগঠিত করতে হবে যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা সম্পর্কিত ইস্যুগুলি দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা হয়ে ওঠে। সরকার পরিচালিত গণ পরিবহন ব্যবস্থার লভ্যতা, মোটর গাড়ির পরিশুদ্ধ জ্বালানি, পরিশুদ্ধ রান্নার গ্যাস এবং নির্মল বিদ্যুৎ সুনিশ্চিত করার উপর আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। দিল্লীর বায়ু পরিমণ্ডলে দূষণের জন্য মোটর গাড়িগুলিতে ক্রমেই আরো বেশি পেট্রল-ডিজেলের ব্যবহার এবং জেনারেটর  ব্যবহারের দিকে আঙ্গুল না তুলে কেন্দ্রীয় সরকার এবং অন্যান্য সরকারগুলি কৃষকদের দায়ি করে। ইথানল ভিত্তিক জ্বালানি ও প্রযুক্তির দিকে যাওয়ার দাবি তুলতে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। ইথানল তৈরিতে ভারতে উৎপন্ন আখকে কাজে লাগানো যেতে পারে এবং তা কৃষি অর্থনীতিকেও মদত জোগাবে।

১৯।      আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত দাবিগুলির সূত্রপাত করতে হবে — জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় অনিচ্ছুক শিল্প পরিচালকদের প্রযুক্তি এবং কারখানা স্তরে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনগুলি গ্রহণে বাধ্য করতে হবে। এর মধ্যে উন্নততর দূষণ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি বসানোর দাবি, শক্তি ও জল সংরক্ষণের জন্য পরিকাঠামো নির্মাণের দাবি, প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সফলভাবে তা করতে গেলে আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে সম্ভাবনাগুলির বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত পছন্দগুলির মূল্যায়ন এবং সেগুলির পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে হবে। জরুরী ভিত্তিতে তা করতে হবে। এই প্রযুক্তিগত মাত্রাগুলিকে চিহ্নিত করে সেগুলির সমাধানে নির্দিষ্ট শিল্প-ভিত্তিক সমীক্ষা চালানো যেতে পারে। নির্দিষ্ট শিল্প-ভিত্তিক দাবিগুলিকে ট্রেড ইউনিয়নের অন্যান্য দাবিগুলির সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন শিল্প থেকে সংগৃহীত জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত দাবিগুলিকে মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জমা দেওয়ার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত একটি সর্বাঙ্গীণ সনদ তৈরি করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট কারখানাগুলিকে যে সুনির্দিষ্ট কর্মনীতি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলি অনুসরণ করতে হবে, এই সনদ হবে তার সমাহার, এবং সেটিকে রূপায়িত করার লক্ষ্যে কর্মনীতি নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে।

২০।      জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকেও মাথায় রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সৌর ও বায়ু চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বাড়িয়ে তোলার উপর আমাদের গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় আমরা যে পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বাড়িয়ে তোলার কথা বলতে পারি না, সে কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তথ্য ও পরিসংখ্যান স্বতই প্রতীয়মান, এবং কয়লা থেকে তৈরি তাপ বিদ্যুতের চেয়ে পারমানবিক বিদ্যুৎ পরিবেশগত দিক থেকে অনেক বেশি হিতকর এ সম্পর্কে নিজেদের আশ্বস্ত করে আমরা কখনই পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক আকারে বৃদ্ধির অনুমতি দিতে পারি না। তথ্য বলছে, পারমানবিক বিদ্যুৎ জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদের প্রশমনে কেবলমাত্র তখনই যথেষ্ট মাত্রায় অবদান রাখতে পারে যদি পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির নির্মাণ  অভূতপূর্ব হারে বেড়ে চলে। একটি নির্ভরযোগ্য আনুমানিক হিসেব বলছে, সারা বিশ্বে পারমানবিক বিদ্যুতের বর্তমান আনুপাতিক অবদানকে বজায় রাখতে গেলে প্রতি ছ-সপ্তাহ অন্তর একটি করে নতুন পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যেটা কার্যত অসম্ভব। পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে এমন ব্যাপক হারে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতার দিকে থেকেই সন্দেহজনক শুধু নয়, পারমানবিক বর্জসমুহের অপসারণ অনিবার্যভাবেই যেমন বিপর্যয়কর পরিণামের জন্ম দেবে, সেরকমভাবে দীর্ঘ সময় ধরে তেজস্ক্রিয়তার মুখোমুখি হওয়াটা শিল্প ও খনি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যেও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। বস্তুত, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থাও (আইএইএ)—বিশ্বে পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়ভার যাদের উপর রয়েছে—স্বীকার করেছে যে, “পারমানবিক বিদ্যুৎ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের আশু বা দীর্ঘমেয়াদি পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সমাধান নয়। কার্বন নিঃসরণকে অবিলম্বে এবং লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তা এমন কর্মপ্রণালীর দাবি জানায় যাকে পারমানবিক চুল্লি নির্মাণের চেয়ে অনেক দ্রুত রূপায়িত করা সম্ভব।” এছাড়াও, পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলগতভাবে মুনাফার বেসরকারিকরন ঘটায় এবং মানুষকে দিতে হওয়া ভয়াবহ মুল্য ও ঝুঁকির সামাজিকীকরণ ঘটায়। আর তাই কুড়ানকুলান, জয়িতাপুর এবং অন্যান্য যে সমস্ত স্থানে নতুন পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেগুলির বিরোধিতা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে।

২১।      কারখানা এবং শিল্প স্তরে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলির স্বপক্ষে যুক্তি দিলেও আমরা জলবায়ু সংকট প্রশমনে যে কোনো প্রযুক্তি-নির্ভর ‘সমাধানের’ প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করি। উৎপাদনের পুঁজিবাদী ধরনে উৎপাদন এবং ভোগকে ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে চলার যে প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য প্রবণতা থাকে, সেখানে সমস্ত প্রযুক্তিগত ‘সমাধানেরই’ গুরুতর সীমাবদ্ধতা থাকবে। নিজেকে ধরে রাখতে না পারা, জিডিপি মগ্নতা, ‘অর্থনৈতিক বৃদ্ধি’র উপর ভিত্তি করে চলা যে অর্থনীতির মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য, তাতে প্রযুক্তিগত সমাধানের দৌড় ঐটুকুই হবে। একইসাথে বিভিন্ন রূপের ‘সবুজ ধোলাই’ সম্পর্কেও আমাদের হুঁশিয়ার থাকতে হবে, যেখানে দুষণ সৃষ্টিকারী শিল্পগুলো হয় ‘প্রযুক্তি হস্তান্তরের’ আবরণে তাদের দূষণ এবং দূষণ সৃষ্টিকারী প্রযুক্তিগুলিকে দরিদ্র দেশগুলোতে পাচার করায় লিপ্ত হয়, আর না হয় প্রযুক্তির ধূম্রজালের আড়ালে তাদের দরিদ্র-বিরোধী, আদিবাসী-বিরোধী, পরিবেশ-বিরোধী কাজকারবারগুলোকে গোপন করে। অন্যভাবে বললে, পরিবেশ অথবা প্রযুক্তির প্রশ্নগুলোকে অর্থনৈতিক এবং ‘উন্নয়ন’-এর মডেলের বৃহত্তর, ব্যবস্থাগত প্রশ্নগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।

২২।      বর্তমানে চালু অর্থনৈতিক মডেলটি বস্তুত নানা ধারায় গুরুতর পরিবেশগত দ্বন্দ্বের জন্ম দিচ্ছে। জমি ব্যবহারের ধরনে দ্রুত পরিবর্তন—উদাহরণস্বরূপ, বনভূমির পরিমাণ এবং কৃষি জমি হ্রাসের মধ্যে দিয়ে যা প্রকাশ পাচ্ছে এবং তার সাথে দ্রুত হারে বেড়ে চলা নগরায়নের বিষয়টিকে লক্ষ্য করতে হবে। জমি ব্যবহারে এই পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তন সৃষ্ট প্রতিকূল প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করার যে কোনো কৌশলের উপরই গুরুতর প্রভাব ফেলবে। কার্বন সিঙ্ক হিসাবে কাজ করতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ বনভূমিকে ধ্বংস করা হচ্ছে, পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে যে রক্ষাকবচগুলি বর্তমানে রয়েছে (উপকূলবর্তী অঞ্চলে অথবা নদীর তলদেশে থাকা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ), বিভিন্ন “উন্নয়ন’’ প্রকল্প ধীরে-ধীরে সেগুলিকে দুর্বল করে তুলছে। যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে এই বিষয়গুলিকে আমাদের তুলে ধরতে হবে।

২৩।      প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বের কথা আমাদের পুনরায় ঘোষণা করতে হবে। দেশের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে রাজ্য সরকারসমূহ আজ যখন প্রাকৃতিক সম্পদের বেসরকারিকরণ ঘটাতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, ঐ সমস্ত পদক্ষেপের প্রতিরোধ তখন অবশ্যই আমাদের করতে হবে। সম্পদের উপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক ধারায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃহত্তর প্রশ্ন থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করার প্রশ্নটিকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। মুনাফাবাজি এবং সম্পদের কর্পোরেট লুণ্ঠণে মদতদানকারী জমানায় জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সংকটের প্রশমন সম্ভব নয়।

২৪।      বিভিন্ন ফ্রন্টেই জলবায়ু সংকটের সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনাকে আরো গণতান্ত্রিক ধারায় চালিত করা এবং বিশ্বের শ্রমজীবী দরিদ্র এবং স্থানীয় স্তরের জনগণের সঙ্গে আরো বেশি স্থায়ী সংহতি গড়ে তোলার উপর জোর দিতে হবে। জাতীয় স্তরে আমাদের যা করতে হবে তা হল—প্রাকৃতিক সম্পদের উপর স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকে সুরক্ষিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাপনা ও ফলদায়ী প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করার প্রচারকে শক্তিশালী করে তোলা। সর্বোপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইটা একটা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত লড়াই, যা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।