সাধারণ কর্মসূচী -- সি পি আই (এম এল) লিবারেশন

মুখবন্ধ

চূড়ান্ত শ্রেণী-লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সংগ্রামরত ভারতীয় সর্বহারা শ্রেণীর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সংগঠন হল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। এই পার্টি জনগণের অগ্রণী বাহিনীকে নিয়ে গঠিত এবং সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খল, সাম্রাজ্যবাদ ও বৃহৎ পুঁজির লুণ্ঠন ও আধিপত্যের হাত থেকে মুক্তির জন্য এবং লিঙ্গ, জাত-পাত, ধর্মমত, ভাষা বা জাতিসত্তা নির্বিশেষে স্বাধীন নাগরিক হিসাবে সমঅধিকার ও দ্রুত প্রগতি অর্জনের জন্য এগিয়ে যেতে ভারতীয় জনগণের নেতৃত্বের কেন্দ্র হিসাবে কাজ করে।

ভারতে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার ন্যূনতম কর্মসূচী থেকে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ও সাম্যবাদে পৌঁছানোর সর্বোচ্চ কর্মসূচী রূপায়ণের জন্য পার্টি নিজেকে উৎসর্গ করে। পার্টির চূড়ান্ত লক্ষ্য হল মানুষের দ্বারা মানুষের সমস্ত রকমের শোষণের বিলোপ সাধন।

পার্টি মার্কসবাদী দর্শন থেকে তার বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গী আহরণ করে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও জে দঙ চিন্তাধারার অখণ্ড ব্যবস্থাকে কাজের দিশা হিসাবে গ্রহণ করে। ভারতীয় বিপ্লবের সঠিক লাইনকে বিকশিত করতে পার্টি তার ভেতরে ও বাইরে সংস্কারবাদ, সংশোধনবাদ, বিলোপবাদ, বুর্জোয়া উদারতাবাদ, নৈরাজ্যবাদ ও অন্যান্য সমস্ত ভুল ধ্যানধারণা ও প্রবণতার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালায়।

পার্টি সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ও অনুশীলন করে এবং সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, উপনিবেশবাদ/নয়া উপনিবেশবাদ, সম্প্রসারণবাদ, বর্ণবিদ্বেষ, উগ্র জাতিদম্ভ, আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্ত ধরনের কর্তৃত্বের বিরোধিতা করে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সমস্ত বিপ্লবী কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট এবং ওয়ার্কার্স পার্টি ও সংগঠনের সাথে ঐক্যের আকাঙ্খা পোষণ করে। বিশ্ব জুড়ে শ্রমিক, নিপীড়িত জনগণ ও জাতিসমূহের সংগ্রামকে সমর্থন করে এবং সমগ্র মানব জাতির সম্পূর্ণ মুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়ার শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সব সংগ্রামের সাধারণ উদ্দেশ্যের সাথে একাত্মতা বোধ করে। ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পার্টি স্বাধীনতা, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার নীতিতে অবিচল থাকে।

তত্ত্বের সাথে প্রয়োগের সমন্বয় সাধন, জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সমালোচনা-আত্মসমালোচনা ও সময় থাকতেই সংশোধনের রীতি অনুশীলন – এই তিনটি হল পার্টি কর্মধারার মূল নীতি। অনুশীলনের বিকাশ সাধনে পার্টি সব সময় তথ্য থেকে সত্য অনুসন্ধান এবং গভীর অনুসন্ধান ও অধ্যয়নের রীতিতে অবিচল থাকে।

পার্টি সদস্যদের রয়েছে জনগণের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা। তাঁরা ভারতীয় সমাজের চমৎকার বিপ্লবী ঐতিহ্যগুলোকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন এবং তাঁদের রয়েছে জীবনের মূল্যেও সত্য ও কমিউনিজমের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার সাহস।

ভারতীয় সমাজ

ভারতকে এশিয়ার এক উদীয়মান শক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক অতিবৃহৎ শক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা হলেও এবং মিলিয়ন ও বিলিয়ন ডলারপতিদের সংখ্যাবৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রে এই দেশ পৃথিবীর সবথেকে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম হলেও ভারতেই বিশ্বের সবথেকে বেশি দরিদ্র জনগণের বাস। ভারতীয় কর্পোরেটরা বিশ্বের আকাশে ডানা ছড়াচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেশ নগণ্য মাথাপিছু আয়ের হার নিয়ে মানব উন্নয়নের সূচকের নিরিখে বিশ্বের সবথেকে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম।

একদিকে লাগামহীন সঞ্চয় ও আড়ম্বরপূর্ণ পণ্য উপভোগে মেতে থাকা ওপরতলার ক্ষুদ্র অংশ এবং অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক বুনিয়াদী জনগণ, যারা সমস্ত সম্পদ তৈরি করেও বঞ্চনার অতলে নিমজ্জিত – এই দুয়ের মধ্যকার নির্মম বৈপরীত্য হল চরম বৈষম্যমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনারই ফসল। এই পরিকল্পনায় কৃষির – যা এখনও ব্যাপক সংখ্যাধিক জনগণের জীবনধারণ ও কর্মসংস্থানের উৎস হলেও আধা-সামন্ততান্ত্রিক ক্ষুদ্র কৃষি অর্থনীতির প্রাধান্যের দ্বারা ভারাক্রান্ত ও জমিদারী পথে পুঁজিবাদী উত্তরণের চিরসংকটে আবদ্ধ – ক্ষয়ের পথ প্রশস্ত করা হয়; অধিকাংশ চিরাচরিত শিল্প স্থিতাবস্থায় পড়লেও যে সমস্ত ক্ষেত্র রপ্তানির বাজার, বৈদেশিক স্বার্থ, ধনীদের ভোগ্যপণ্য সরবরাহের সাথে যুক্ত সেগুলোর অগ্রগতি ঘটে আর বৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসাবে ফাটকা কারবার ও রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং এর সাথে আমাদের প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদকে ক্রমেই বেশি বেশি করে সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

কৃষিক্ষেত্র সহ সর্বত্র আরও বেশি বেশি করে পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটছে উৎপাদন সম্পর্ক ও মূল্যবোধের জগতে নাছোড়বান্দা সামন্ততান্ত্রিক অবশেষগুলোকে নির্মূল করার বদলে সেগুলোকেই কাজে লাগিয়ে এবং এই প্রক্রিয়ায় সেগুলোকে নতুন নতুন রূপে সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই অবশেষগুলো ভারতীয় বৃহৎ পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদ উভয়ের জন্য শুধু সস্তা শ্রমশক্তি ও কাঁচা মালের যোগানকেই সুনিশ্চিত করছে না, বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও সংকীর্ণ ধ্যানধারণা এবং জাতপাত ও সামন্ত-পিতৃতান্ত্রিক নিপীড়নের জন্য, যা প্রায়শই বর্বর রূপ গ্রহণ করে, এক কাঠামোগত ভিত্তিও হাজির করে। এক কথায়, দেশের অর্থনৈতিক জীবনরেখা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর্পোরেটদের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামন্ততান্ত্রিক অবশেষগুলো উৎপাদিকা শক্তির বিকাশকে ব্যাহত ও বিকৃত করছে এবং ভারতীয় সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিকীকরণের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করছে।

তার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক পেশি-শক্তি সত্ত্বেও শাসক একচেটিয়া আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্রেণী রাজনীতিগতভাবে তার আদি মুৎসুদ্দি চরিত্রকেই বজায় রাখে। সে অনেক অ-সাম্রাজ্যবাদী দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বিভিন্ন বিদেশী শক্তির সঙ্গে দরকষাকষির বেশ কিছু ক্ষমতা গড়ে তুলেছে, নিজের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্খাকে চরিতার্থ করতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ও তার বাইরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজি রপ্তানি করছে এবং তেল ও খনিজ সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু এ সবকিছুই ঘটে চলেছে সাম্রাজ্যবাদের ওপর মূলগত নির্ভরশীলতার কাঠামোর মধ্যে যা নীচুতলায় নিজেকে প্রকাশিত করে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বিপণন সংক্রান্ত গাঁটছড়া রূপে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে ওপরতলায় নয়া উদারবাদের অর্থনৈতিক দর্শনকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করা এবং সাম্রাজ্যবাদী নকশার কাছে অধীনতার রাষ্ট্রীয় নীতি রূপে।

এর ফলে সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বহুপাক্ষিক সংস্থা ও বিদেশী শক্তিগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ করতে এবং ভারতকে 'রণনৈতিক অংশীদারিত্ব'র নামে তাদের ভূ-রাজনৈতিক খেলাতে এক ছোট অংশীদার হিসাবে টানতে সক্ষম হয় যার জন্য জাতির স্বাধীনতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর তাই শাসকদের ক্রমবর্ধমান নয়া উপনিবেশিক নির্ভরশীলতার নিগড়ে বাঁধা পড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের আরও ক্ষয় হওয়ার বিপদ সর্বদাই থেকে যাচ্ছে।

দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ঘটাবার নামে শাসকশ্রেণী কর্পোরেট লুণ্ঠনকে সুগম করতে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার নীতি নিয়েছে – উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের ভূমিকাকে প্রায় পুরোপুরি কমিয়ে আনা হচ্ছে, জনগণের বুনিয়াদী পরিষেবা পাওয়াকে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়কে পরিত্যাগ করা হচ্ছে এবং অর্থনীতির লাগামকে তুলে দিচ্ছে বাজারের শক্তির হাতে, যে শক্তি পরিচালিত হচ্ছে বৃহৎ পুঁজির দ্বারা। ভারতীয় বৃহৎ কোম্পানিগুলো বিদেশী কর্পোরেশনগুলোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে কাজ করছে। রাষ্ট্রের দ্বারা মদত পাওয়া ও রূপায়িত বাজার চালিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতির ফলে অল্প কিছু লোকের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ জমেছে। সেই সঙ্গে ধনী ও গরিবদের মধ্যেকার বৈষম্য মারাত্মক পরিমাণে বেড়েছে। শ্রমজীবী জনগণের ব্যাপক অংশ উচ্ছেদ হচ্ছে, সবকিছুই হারাচ্ছে ও নিঃস্ব হচ্ছে। কর্পোরেটমুখী, সাম্রাজ্যবাদমুখী এই নীতি সংক্রান্ত জমানা কর্পোরেট প্রচারমাধ্যমের প্রাধান্যকারী অংশ ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে যারা আরও স্বচ্ছল হয়ে উঠছে তাদের প্রভাবশালী অংশের কাছ থেকে সমালোচনাহীন সমর্থন ভোগ করছে। অবশ্য ক্রমপ্রসারমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৃহৎ অংশ কর্পোরেট লুট ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামকে সমর্থন করে এবং প্রায়শই জনগণের  গণতান্ত্রিক অধিকার ও আশা-আকাঙ্খার জন্য লড়াইয়ের ধারকে তীক্ষ্ণতর করতে তোলে।

সংক্ষেপে, পার্টি ভারতবর্ষকে দেখছে এক কৃষিপ্রধান পশ্চাদপদ পুঁজিবাদী সমাজ হিসাবে, যা অনমনীয় সামন্ততান্ত্রিক অবশেষ এবং উপনিবেশিক জেরকে বহন করার কারণে গতিরুদ্ধতায় ভুগছে, আবার সেগুলোকেই শক্তিশালীও করে তুলছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্ব পুঁজির লোভাতুর আধিপত্যের অধীনে নিষ্পেষিত হচ্ছে।

ভারতীয় রাষ্ট্র

জমিদার ও কুলাকদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভারতের সাম্রাজ্যবাদমুখী বৃহৎ বুর্জোয়ারা ভারতীয় রাষ্ট্রকে পরিচালনা করছে। বিশ্ব পুঁজির সহযোগে ভারতীয় পুঁজি দেশের বাইরে তার ব্যবসাকে প্রসারিত করছে। ভারতীয় রাষ্ট্রও আরও বেশি বেশি করে এক আঞ্চলিক আধিপত্যকারী শক্তি হিসাবে সামনে আসছে, যদিও সেটা ঘটছে মার্কিন সাম্রাজবাদের আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অন্যতম মূল সহযোগী হিসাবে।

ভারতীয় রাষ্ট্রের কার্যকলাপ সাধারণভাবে এক সাংবিধানিক ও সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সংসদ, রাজ্য বিধানসভা ও বিভিন্ন পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠান, মিউনিসিপ্যাল প্রতিষ্ঠান বা স্বশাসিত কাউন্সিলগুলো নির্বাচিত করার আনুষ্ঠানিক অধিকার জনগণ ভোগ করেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে নীচেরতলার নির্বাচিত সংস্থাগুলোর হাতে অল্পই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং নীচেরতলায় সরাসরি অংশগ্রহণভিত্তিক গণতন্ত্রের যে কোনো ধারণাকে সম্পূর্ণ অমান্য করে আমলাতন্ত্র আধিপত্য করে চলেছে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক পরিচিতি ও আঞ্চলিক বিভাজনের মধ্যকার ভঙ্গুর ভারসাম্যের জায়গায় কলকাঠি নেড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন শাখা ও প্রাধান্যকারী প্রচার মাধ্যমের ওপর নিজেদের কব্জা কায়েম করে সাম্রাজ্যবাদ, বৃহৎ পুঁজি ও সামন্ত কুলাকদের জোট সংসদীয় গণতন্ত্রের সমগ্র নেটওয়ার্কের ওপর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি শাসক কংগ্রেস সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে, নাগরিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে সীমিত করতে বা এগুলোর ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করতে, নির্বাচনকে পিছিয়ে দিতে ও এমনকি বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের নেতাদের গ্রেপ্তার করতে দেশে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু জাতীয় স্তরে এই ধরনের পরিস্থিতির আর পুনরাবৃত্তি হয়নি। কিন্তু দেশের নানা অংশে একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে এবং বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরকে নিয়মিত দমন করা হচ্ছে। তদুপরি, গুরুত্বপূর্ণ নীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সংসদকে এড়িয়ে চলা সরকারের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে এবং এমনকি সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে সংসদের অনুমোদন বা জনগণের মধ্যে কোনো আলোচনা ছাড়াই, আর কোনো ধরনের গণভোটের তো প্রশ্নই ওঠে না। বৃহৎ ব্যবসায়ী ও শাসকশ্রেণীর পার্টিগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আঁতাতের ফলে, তা সর্বভারতীয় স্তরে বা রাজ্য স্তরে উভয় ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও বড় বড় কেলেঙ্কারীর জন্ম হচ্ছে এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলোর দ্বারা অভূতমাত্রায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ধ্বংসপ্রাপ্তি ঘটছে।

ভারতবর্ষে আইন, বিচার ও প্রশাসন সংক্রান্ত উপরিকাঠামো এবং সামরিকবাহিনী এখনও অনেকটাই ঔপনিবেশিক চরিত্রের রয়ে গেছে। অধীনস্থ প্রজাদের শাসন ও দমন করার উদ্দেশ্যে বিদেশী শক্তির দ্বারা তৈরি এই উপরিকাঠামো ভারতীয় জনগণের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে স্বাধীন নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা দিতে অস্বীকার করে। ঔপনিবেশিক যুগের শাসক-শাসিত সম্পর্কের যে সংস্কৃতি তা আজও নাগরিকত্ব সম্পর্কে আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারণাকে ছায়াবৃত করছে, একইসঙ্গে কঠোরভাবে জাত-পাতের বিভাজিত সমাজ এবং গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের পিতৃতান্ত্রিক শাসন ব্যক্তির স্বাধীনতা ও অধিকারকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত, এমনকি ধ্বংস করে। দানবীয় আইন; আইন বহির্ভূত ও বিচার বহির্ভূত দমনপীড়ন; জেল হেফাজতে অত্যাচার, ধর্ষণ ও হত্যা; মিথ্যা 'সংঘর্ষ'; বিনা বিচারে আটক; সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড়; জনগণের প্রতিবাদী আন্দোলনের ওপর পুলিশী বর্বরতা এবং তথাকথিত 'উপদ্রুত এলাকা'য় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ, যেখানে সেনাবাহিনী কোনো ধরনের শাস্তির ঝুঁকি ছাড়াই ভোগ করে দমনপীড়নের 'বিশেষ ক্ষমতা' – উপনিবেশ-উত্তর ভারতবর্ষে এই 'আইনের শাসন' নিয়মিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমার্থক হয়ে উঠেছে।

ভারতে রয়েছে বহু জাতিসত্তা ও জনজাতি-ভাষাগোষ্ঠী। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও পারস্পরিক অঙ্গীভবন, যার পিছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামগুলোর মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্য – আমাদের সমাজের বহুজাতিক চরিত্রের ওপর এক ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় মুখচ্ছবি প্রদান করেছে। কিন্তু জনগণের ঐক্য গড়ে ওঠার এই প্রক্রিয়াকে কণ্টকিত করছে প্রকট আঞ্চলিক বৈষম্য এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ও অতি-কেন্দ্রিক ভারতীয় রাষ্ট্রের নির্লজ্জ বৈষম্যমূলক আচরণ তথা ধারাবাহিক দমনের নীতি, যার চরম প্রকাশ দেখা গেছে কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। বিভিন্ন জাতিসত্তা ও জাতীয় সংখ্যালঘুদের তাই বিভিন্ন রূপ ও মাত্রার আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই সমস্ত আকাঙ্খা ও সংগ্রামকে বর্বরভাবে দমন করা ছাড়াও রাষ্ট্র 'ভাগ কর ও শাসন কর'র কৌশল এবং বিদ্রোহ দমনে সামরিক অভিযান চালিয়ে থাকে, সংকীর্ণ জনজাতিগত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষকে উস্কে দেয় এবং ধারাবাহিক হিংসা ও নিরীহ নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতিকে বজায় রাখে।

ভারতবর্ষ বহুধর্মের দেশও বটে। কিন্তু ধর্মীয় বিষয়গুলো থেকে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বলবৎ করার পরিবর্তে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ন্যূনতম ধারণাতে পর্যবসিত করেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের শক্তিশালী সাম্প্রদায়িক সমাবেশের মুখে রাষ্ট্র পিছু হঠে ও এমনকি সাম্প্রদায়িক হিংসার শক্তিগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার দ্বারা ইসলামকে ভয়ঙ্কররূপে চিত্রিত করা এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হত্যার রাজনীতি প্রচার ও অনুশীলন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতাবাদের ইতিহাসকে মদত যোগাচ্ছে। ভারতের গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসী সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতা এক ফ্যাসিবাদী বিপদ হাজির করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা অর্জন তাই ভারতের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এক মূল কর্তব্য হিসাবে রয়েছে।

ব্রাহ্মণ্যবাদ ও নয়া-ব্রাহ্মণ্যবাদের মতাদর্শ ও সংস্কৃতির দ্বারা জাতপাতগত নিপীড়ন ও বৈষম্য হল ভারতের রাষ্ট্র ও সমাজে অপর এক দূষিত দিক। সামাজিক নিপীড়নের অবসান ও জাতপাত ব্যবস্থার বিলোপ তাই বিপ্লবী লক্ষ্যের আর একটা মৌলিক কর্তব্য। ভারতীয় রাষ্ট্র সমস্ত ধরনের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ও শক্তিগুলোকে রক্ষা করে ও তাদের বাড়বাড়ন্ত ঘটায়, একইসাথে মহিলাদের সমতা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে বড় বড় কথা বলে থাকে। ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, লিঙ্গ বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গী, অন্যান্য জাতির প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা, ভাষাগত ও আঞ্চলিক জাতিদম্ভের পরিঘটনাগুলো ফেলে আসা  নিছক সামন্ততান্ত্রিক-ঔপনিবেশিক যুগের স্মারকচিহ্ন নয়, তারা 'আধুনিক' ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শাসকশ্রেণী ও তাদের পার্টিগুলো শ্রমজীবী জনগণের ক্রমবর্ধমান গণতান্ত্রিক ঐক্য ও জাগরণকে দুর্বল করা ও ভাঙ্গার জন্য এই সমস্ত হাতিয়ারগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগায়।

বিপ্লবের স্তর

ভারতীয় সমাজে রয়েছে চারটি মুখ্য দ্বন্দ্ব – সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, সামন্ততান্ত্রিক অবশেষ তথা শৃঙ্খল ও ব্যাপক জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বৃহৎ পুঁজি ও ভারতীয় জনগণ, বিশেষত শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এর মধ্যে প্রথম তিনটি দ্বন্দ্ব বৈরী প্রকৃতির, শেষেরটি সাধারণভাবে অবৈরীমূলক যা দরকষাকষি ও আপসের জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাধান হয়। বৈরীমূলক দ্বন্দ্বগুলোর তীব্রতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ, বৃহৎ পুঁজি ও সামন্ত অবশেষ কার্যত একটি জোট হিসাবে দেখা দেয় যার পাষাণভারের নীচে আমাদের জনগণ আর্তনাদ করছেন। এইভাবে এই জোট ও ব্যাপক ভারতীয় জনগণের মধ্যকার বৈরীতা বর্তমান ভারতীয় সমাজে প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখা দেয় এবং এই দ্বন্দ্বকে আয়ত্ত করা ও সমাধান করার মধ্য দিয়েই কেবলমাত্র বিদ্যমান নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা যাবে।

এই মুখ্য দ্বন্দ্বগুলো আমাদের বিপ্লবের স্তর নির্ধারণ করে দেয় – জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর, যার অক্ষ হল কৃষিবিপ্লব। এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রাথমিক লক্ষ্য হল সমস্ত সামন্ত অবশেষের বিলোপসাধন, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অবসান, কার্যকরী কর ব্যবস্থার জাতীয়করণ ও অন্যান্য উপায়ের মাধ্যমে বৃহৎ পুঁজিকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণ করা এবং সমগ্র শাসনযন্ত্র ও ব্যবস্থাপনার গণতান্ত্রিকীকরণ ঘটানো। বিজয়ী গণতান্ত্রিক বিপ্লব হয়ে উঠবে সমাজতন্ত্রের দিকে এক দৃঢ় পদক্ষেপ এবং তা নিরবচ্ছিন্ন সমাজতান্ত্রিক উত্তরণের বস্তুগত ভিত্তিকে শক্তিশালী করবে।

শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব

ভারতীয় জনগণের সবচেয়ে দৃঢ় বিপ্লবী এবং সবথেকে সংগঠিত ও অগ্রণী বাহিনী হিসাবে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বেই ভারতবর্ষে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হতে পারে।

জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে বিজয় পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে শ্রমিকশ্রেণীকে এক ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে এবং সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর নিজের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। এই লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণী অবশ্যই

ক)   গ্রামাঞ্চলে তার বৃহত্তম বাহিনী ও শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যাপক অসংগঠিত শ্রমিকদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিজেকে ঐক্যবদ্ধ করবে, শ্রমজীবী জনগণের কাজের পরিবেশ ও জীবনযাত্রার উন্নয়নের জন্য লড়াই করবে, আন্তর্জাতিক পুঁজি ও ভারতীয় বৃহৎ বুর্জোয়াদের পর্যায়ক্রমিক যে সংকটের মুখোমুখি হতে হয় তার বোঝাকে ভারতের জনগণের কাঁধে চাপানোর প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করবে;

খ)   বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামগুলোকে সমর্থন ও সংগঠিত করবে এবং গ্রামাঞ্চলে শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তুলবে ;

গ)   ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সবধরনের সংগ্রামকে সমর্থন ও সংগঠিত করবে;

ঘ)   নারী মুক্তির আন্দোলনকে সংগঠিত করবে, সমর্থন জানাবে ও তার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবে;

ঙ)   দলিত ও অন্যান্য নিপীড়িত জাতিগুলোর বিরুদ্ধে চলতে থাকা সমস্ত ধরনের নিপীড়ন, বৈষম্য ও তীব্র ঘৃণার অবসান এবং জাতপাতের ব্যবস্থাকেই বিলোপ করার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামগুলোকে সমর্থন করবে, সংগঠিত করবে ও তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবে;

চ)   নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, উপজাতি সম্প্রদায় ও অন্যান্য দেশীয় জনগণের মর্যাদা, সমতা ও ন্যায়ের অধিকারের জন্য তাদের সংগ্রামগুলোকে সমর্থন করবে, সংগঠিত করবে ও তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবে;

ছ)   বুদ্ধিজীবীদের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা ও উদ্যোগগুলোকে সমর্থন জানাবে ও সেগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাবে;

জ)   কর্পোরেট সংস্থাগুলোর আধিপত্যে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল প্রচারমাধ্যমের বিপরীতে এক গণতান্ত্রিক প্রচারব্যবস্থা গড়ে তোলার এবং পলায়নবাদী বিনোদনের প্রধান ও আধিপত্যকারী ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে জনগণের সংস্কৃতির দিগন্তকে প্রসারিত করার প্রতিটি প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানাবে;

ঝ)   দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যত্র জনগণের প্রগতিশীল সংগ্রামকে সমর্থন করবে ও তার সঙ্গে সংহতি গড়ে তুলবে;

ঞ)   সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অধিকার ও মর্যাদার জন্য প্রবাসী ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জনগণের প্রগতিশীল সংগ্রাম ও উদ্যোগকে সমর্থন করবে ও তার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবে;

ট)   আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য বিশ্বের জনগণের সংগ্রামকে সমর্থন জানাবে।

শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক আঘাত হানার ক্ষমতাকে তীক্ষ্ণতর ও সংহত করার জন্য পার্টি সমস্ত বাম শক্তির মধ্যে আন্দোলনভিত্তিক ঐক্য গড়ে তুলতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করবে যাতে সাম্রাজ্যবাদ ও বৃহৎ পুঁজির আক্রমণকে প্রতিহত করা যায়। সমস্ত বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ব্যাপক ভিত্তিক ঐক্য গড়ে তুলতে প্রতিটি উদ্যোগের পাশাপাশি পার্টি সমস্ত ভারতীয় কমিউনিস্টদের একটি একক পার্টির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার ঐতিহাসিক লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যে ঐক্য গড়ে উঠবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যকার সমাজগণতান্ত্রিক প্রবণতা এবং বাম দুঃসাহসিকতাবাদ ও আধা-নৈরাজ্যবাদী ঝোঁকগুলোর বিরুদ্ধে অব্যাহত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

জনগণতান্ত্রিক মোর্চা

শাসকশ্রেণীর নির্মম শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণ বারে বারে সংগ্রামে জেগে উঠেছেন। তাদের জাগরণ নানা রূপ পরিগ্রহ করে এবং বিভিন্ন পার্টি ও অ-পার্টি শক্তিসমূহ, এমনকি কোনো কোনো সময় বিরোধী অবস্থানে থাকা শাসকশ্রেণীর পার্টিগুলোও এইসব সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। পার্টি এই সমস্ত সংগ্রামগুলোকে সমর্থন করে এবং জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যাভিমুখে সেগুলোকে দিশা প্রদানের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকে।

শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান শক্তিই হল কৃষক। পার্টি সম্পূর্ণভাবে গরিব কৃষক ও গ্রামীণ সর্বহারাদের ওপর নির্ভর করে, দৃঢ়তার সাথে মধ্যকৃষক ও মধ্যশ্রেণীর অন্যান্য অংশের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এমনকি ধনীচাষিদেরও একটি অংশকে জয় করার সাথে সাথে বাকি অংশটিকে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করে যাতে অধিকাংশকে বিপ্লবের শত্রুদের সঙ্গে যোগ দেওয়া থেকে নিবৃত্ত করা যায়। শহরাঞ্চলে পার্টির মূল ভিত্তি হল শহরের গরিব ও মেহনতি জনগণ আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কিছু অংশ হলেন গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। ছোট ব্যবসায়ী ও উৎপাদক এবং অন্যান্য ছোট ও মাঝারি পুঁজিপতি ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের সাধারণত দোদুল্যমান এবং অস্থায়ী মিত্র হিসাবে দেখা যায়।

জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে শেষ অবধি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে, এই সমস্ত শ্রেণীগুলোকে নিয়ে জনগণতান্ত্রিক মোর্চা গঠন করা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে পার্টি বহু ধরনের শ্রেণী ও স্তরের সংগঠন এবং বহু শ্রেণীর যুক্তমোর্চার সংগঠন গড়ে তোলে এবং তাদের ভেতর থেকে ও তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজ চালায়। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী পার্টি ইস্যুভিত্তিক যৌথ আন্দোলনে সমস্ত লড়াকু গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে এবং এমনকি অল্প সময়ের জন্য হলেও উপযুক্ত সাধারণ কর্মসূচীর ভিত্তিতে জোট গঠন করতেও প্রস্তুত থাকবে।

বিপ্লবের পথ

ভারতের মতো বিশাল ও জটিলতাপূর্ণ দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে গেলে কমিউনিস্ট পার্টিকে কাজের সম্ভাব্য প্রতিটি ক্ষেত্রকে ও সংগ্রামের অসংসদীয় ও সংসদীয় রূপকে এবং একটি রূপ থেকে অন্য রূপে দ্রুত উত্তরণকে আয়ত্ত করার ব্যাপারে বিশেষ দক্ষ হতে হবে। পার্টি তাই সমস্ত প্রয়োজনীয় রূপের সংগ্রাম ও সংগঠনের মধ্যে অঙ্গাঙ্গী সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে এক সামগ্রিক বিপ্লবী অনুশীলনের বিকাশ ঘটাতে সচেষ্ট থাকে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় শাসনব্যবস্থা কমিউনিস্টদের খোলা, আইনী ও সংসদীয় উপায়ে কাজ করার সুযোগ দেয়। সংসদীয় ক্ষেত্রে, পার্টির বুনিয়াদী যুক্তমোর্চার লাইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যথাযথ নির্বাচনী কৌশল গড়ে তুলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপ্লবী বিরোধীপক্ষের ভূমিকা গ্রহণে পার্টিকে প্রস্তুত থাকতে হবে। নির্বাচনী সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্টদের পক্ষে স্থানীয় সংস্থাগুলোতে, এমনকি রাজ্য বিধানসভাগুলোতেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব। দীর্ঘস্থায়ী ও জোরদার রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রেণীশক্তির ভারসাম্য অনুকূলে ঘোরানোর পাশাপাশি পার্টি স্বাধীনভাবে অথবা সমমনোভাবাপন্ন শক্তিগুলোর সাথে যুক্তভাবে এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে প্রস্তুত, তবে তা এই শর্তে যে নির্বাচকদের কাছে প্রদত্ত নিজস্ব প্রতিশ্রুতিগুলোকে পূরণ করার মতো শক্তি পার্টির থাকা চাই।

যাই হোক না কেন, এই সমস্ত স্থানীয় সংস্থা ও সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখা ও সেগুলোর মধ্যে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত মৌলিক নীতিগুলোর দ্বারা পার্টি পরিচালিত হবে :

ক)   যে কোনো মূল্যেই পার্টিকে স্বাধীন সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যেতে হবে ও রাজনৈতিক উদ্যোগ হাতে রাখতে হবে,

খ)   স্থানীয় সংস্থা বা সরকারের ক্ষমতাকে মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলো চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং একটি নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দিশায় জনগণের চেতনা বিকাশের জন্য পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে,

গ)   কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত পরবর্তী উচ্চতর সংস্থার সাপেক্ষে এই ধরনের স্থানীয় সংস্থা ও সরকারগুলো এক বৃহত্তর বিপ্লবী বিরোধীপক্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে কাজ করবে,

ঘ)   স্থানীয় সংস্থা/সরকার ও পার্টি উভয়কেই নিশ্চিত করতে হবে যাতে গণতান্ত্রিক শক্তি, গণতান্ত্রিক চেতনা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বাধীন বিকাশ কোনো অবস্থাতেই বাধাপ্রাপ্ত না হয়।

ভারতবর্ষের উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম, কমিউনিস্ট আন্দোলন ও কর্পোরেট বিরোধী বিকাশমান আন্দোলনের ইতিহাস বিভিন্ন রূপে ও মাত্রায় জনগণের ক্ষমতার উদ্ভবের দৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ রয়েছে – যেমন নীচেরতলায় বিভিন্ন ধরনের জনগণের কমিটি, কারখানা ও/বা শ্রমিকদের বসবাসের স্থলে শ্রমিক/নাগরিক কাউন্সিল ও জনগণের স্বশাসনের বিভিন্ন কাঠামো – তা সেগুলো যতই স্বল্পস্থায়ী হোক না কেন। জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় এই ধরনের জনগণের স্থানীয় ক্ষমতার উদ্ভবের সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করতে ও তা বাস্তবায়িত করতে পার্টি সচেষ্ট থাকবে।

কোনো ব্যতিক্রমমূলক একগুচ্ছ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে – দৃষ্টান্তস্বরূপ, এক নির্ধারক গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতিতে – সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির অনুকূল ভারসাম্যের অবস্থায় অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণভাবেও বিপ্লবী শক্তির কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় চলে আসার সম্ভাবনাকে পার্টি একেবারে নাকচ করে দেয় না। কিন্তু যে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্থাগুলো মূলগতভাবেই ভঙ্গুর ও সংকীর্ণ ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং যেখানে এমনকি জনগণের ছোটখাটো বিজয় বা আংশিক সংস্কারও অর্জন করা ও ধরে রাখা কেবলমাত্র জঙ্গী গণআন্দোলনের ওপর নির্ভর করেই সম্ভব, সেখানে সর্বহারার পার্টিকে সম্ভাব্য সমস্ত ধরনের প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের মোকাবিলা করে চূড়ান্ত নির্ধারক বিজয় অর্জন ও তা ধরে রাখার মাধ্যমে বিপ্লব সফল করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সুতরাং পার্টির অস্ত্রাগারে বিপ্লবের দুটি মৌলিক অস্ত্র হল জনগণতান্ত্রিক মোর্চা ও গণফৌজ।

জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র

বৃহৎ বুর্জোয়া-জমিদার জোটের শাসনকে উৎখাত করে বিজয়ী বিপ্লব শ্রমিক, কৃষক ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণী ও গণতান্ত্রিক স্তরসমূহের শাসন অর্থাৎ এক জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটাবে যা নিম্নলিখিত কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করবে ও সমাজতান্ত্রিক উপাদানগুলোকে বিকশিত করার নয়াগণতান্ত্রিক দিশাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে।

১। রাষ্ট্রের কাঠামো ও পরিচালনার পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিকীকরণ :

ক)   প্রতিটি স্তরে সর্বজনীন, সমতাপূর্ণ ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংস্থার হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্পণ করা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে জনগণের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে নিয়ে আসা;

খ)   দায়বদ্ধতাকে নিশ্চিত করতে ও ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে জনগণের হাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ও সাথে সাথে সরকারী পদাধিকারীদেরও ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা প্রদান করা;

গ)   জনগণের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক পার্টি ও সংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে পুরোপুরি সুনিশ্চিত করা;

ঘ)   রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, পুলিশী নৃশংসতা এবং অসামরিক ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের অবসান ঘটানো এবং পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে নতুন করে গঠন করা এবং তাদের মধ্যে মানবাধিকারকে সম্মান করা এবং জনগণ ও জাতির প্রতি সেবার মনোভাবকে সঞ্চারিত করা;

ঙ)   রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিকে নির্মূল করা এবং দ্রুত ও প্রগতিশীল ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা।

২। যুক্তরাষ্ট্রীয়, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের পুনর্গঠন :

ক)    জাতিসত্তাগুলোর বিচ্ছিন্নতার অধিকার সহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বিভিন্ন মাত্রায় স্বীকার করা এবং তার সাথে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে একাত্মতা, সমতা ও নিরাপত্তা বোধের সঞ্চার করা;

খ)   জাতি গঠনে জনগণের অংশগ্রহণকে সুনিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ বণ্টনের কার্যকরী গণতান্ত্রিকীকরণ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ, যাতে যথাযথ জোর থাকবে পশ্চাদপদ অঞ্চলের ওপর।

৩। আত্মনির্ভর, অব্যাহত রাখা সম্ভব ও ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া
     এবং গণ-দারিদ্রের অবসান :

ক)   আমূল ভূমিসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে কৃষির শক্তিশালী বিকাশ ঘটানো এবং কৃষিতে রাষ্ট্রের সার্বিক সহায়তা প্রদান;

খ)   কৃষিজমি রক্ষা করা এবং সমস্ত খনিজ সম্পদ এবং তেল ও গ্যাসের জাতীয়করণ করা;

গ)   দেশের প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদের বিচক্ষণ ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে সর্বাঙ্গীন শিল্পায়ন;

ঘ)   ছোট ও মাঝারি শিল্পের উন্নতি সাধন, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও বিপণন সুবিধার জন্য সহায়তা প্রদান, হস্তশিল্প ও দেশজ উৎপাদনগুলোর উন্নতি সাধন, সেগুলোকে সমবায়ের মধ্যে সংগঠিত হতে সহায়তা করা;

ঙ)   আত্মনির্ভর উপায়ে দেশের শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনকে পূরণ করা, বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো, পারমাণবিক শক্তি ও বৃহৎ বাঁধের মতো বিপদজনক উপায়গুলোকে এড়িয়ে চলা এবং শক্তি উৎপাদনের বিকল্প ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য উপায়গুলো বাড়িয়ে তোলা;

চ)   একচেটিয়া-বহুজাতিক-মাফিয়া-জমিদার-কুলাকদের জোটের হাত থেকে নিয়ে দেশের অর্থনীতির লাগামকে রাষ্ট্র ও জনগণের বিভিন্ন সংগঠনের হাতে প্রদান করা, দেশে বা বিদেশে সঞ্চিত বেআইনি সম্পদ ও কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করা;

ছ)   সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করা, কৃষি-উৎপাদনের সরকারী ক্রয় এবং সকলের জন্য বুনিয়াদী পরিষেবা ও পণ্যের সংস্থান নিশ্চিত করা;

জ)   নীতি নির্ধারণ ও উৎপাদনের বিষয়ে শ্রমজীবী জনগণকে মতামত দেওয়ার কার্যকরী অধিকার প্রদান করা এবং উচ্চ মেধার মানুষদের জন্য দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি এবং দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করে মগজ চালানকে প্রতিহত করা;

ঝ)   আত্মনির্ভরতা, জনকল্যাণ ও উন্নততর জীবনযাত্রার মান সহ শ্রমজীবী জনগণের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য প্রয়োজনগুলো পূরণের লক্ষ্যে বর্তমান অগ্রাধিকারগুলোর পুনর্বিন্যাস ঘটানো ও বর্তমান নীতিগুলোকে পরিবর্তিত করা;

ঞ)   চুক্তি প্রথা বাতিল করে শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থার আমূল উন্নতিসাধন, গোপন ব্যালট সহ ট্রেড ইউনিয়নের পূর্ণ অধিকারকে সুনিশ্চিত করা, যৌথ দরকষাকষি ও ধর্মঘটের অধিকারকে সুরক্ষিত করা, সমস্ত শ্রমিকের জন্য জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নির্ধারণ করা ও তা নিশ্চিত করা, অক্ষম ও অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কঠোরভাবে সমকাজে সমমজুরি কার্যকরী করা, শিশুশ্রমের অবসান ঘটানো ও শ্রমসময়কে ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা।

৪। জনগণের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাগুলো ও জনকল্যাণকে সুনিশ্চিত করা :

ক)   জনগণের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রগুলোতে বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের অবসান ঘটানো; সকলের জন্য খাদ্যের অধিকার, সমস্ত স্তরে অবৈতনিক ও উচ্চমানের শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার, বিনা খরচে ও উন্নতমানের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার এবং পানীয় জল, বাসস্থান, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা, সরকারী পরিবহণ, ক্রীড়া ও বিনোদন, সার্বিক শিশু কল্যাণ, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও দুর্দশাগ্রস্তদের তত্ত্বাবধান ইত্যাদি বুনিয়াদী সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা; সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে সমস্ত বঞ্চিত ও সহায়-সম্বলহীন অংশের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগের বন্দোবস্ত করা।

খ)   ভূ-প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে সুরক্ষিত করা, মহামারী ও সংক্রমণমূলক ব্যাধিগুলোকে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রাকৃতিক দুর্বিপাক ও পরিমণ্ডল পরিবর্তনের বিপর্যয়কর প্রতিক্রিয়াগুলোকে প্রতিহত করা; কমিয়ে আনা ও মোকাবিলা করার লক্ষ্যে কার্যকরী কর্মসূচী ও ব্যবস্থার প্রবর্তন।

গ)   উচ্ছেদের মাধ্যমে 'উন্নয়ন'-এর বিকৃত মতবাদ বর্জন করা, কর্পোরেট চালিত 'উন্নয়ন' নীতির ফলে উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের কার্যকরী পুনর্বাসন ও পুনঃস্থাপনকে সুনিশ্চিত করা এবং আদিবাসী জনগণ ও বনবাসীদের চিরাচরিত অরণ্যের ও জীবিকার অধিকার সুনিশ্চিত করা।

৫। সমগ্র সমাজের আধুনিক গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক রূপান্তর সাধন :

ক)   অবক্ষয়ী সামন্ততান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতিকে হঠিয়ে তার স্থানে এক গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে বিকশিত করা এবং আমাদের জনগণের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলোকে উৎসাহিত করা এবং তার সঙ্গে আধুনিক সাংস্কৃতিক রূপ ও শাখাগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া;

খ)   খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে ভারতীয় যুবকদের মধ্যে নিহিত বিপুল সম্ভাবনাকে রূপ দেওয়া যায় এবং খেলাধুলার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রদর্শনকে উন্নত করা যায়।

গ)   নারীদের ওপর সমস্ত ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও যৌন শোষণের অবসান ঘটানো এবং জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে তাদের সমমর্যাদা ও সমানাধিকারকে সুনিশ্চিত করা, জাতপাতগত নিপীড়ন ও বৈষ্যমকে নির্মূল করা, আদিবাসী জনগণ ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারকে সুরক্ষিত করা, সামাজিক প্রগতির দৌড়ে সমকক্ষ হতে দুর্বলতর অংশগুলোকে সাহায্য করা ও তাদের সমমর্যাদাকে সুনিশ্চিত করা।

৬। এক প্রগতিশীল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিদেশনীতি গড়ে তোলা :

ক)   ভারতের শাসকশ্রেণীগুলো সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যে সমস্ত অসম চুক্তি ও বোঝাপড়া সম্পাদিত করেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর যে সমস্ত অসম চুক্তি চাপিয়ে দিয়েছে, সেগুলোকে বাতিল করা।

খ)   সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে ও অন্যান্য প্রগতিশীল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সরকারের সাথে দৃঢ় ঐক্যের এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্কের বিকাশ ঘটানো, মুক্তির জন্য এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন, আধিপত্য ও যুদ্ধের – তা সে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বা সাম্রাজ্যবাদ মদতপুষ্ট বেনামে যুদ্ধ যাই হোক না কেন – বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জনগণের সঙ্গে সংহতি গড়ে তোলা, যাতে বিশেষ জোর থাকবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশীয় স্তরে সংহতি গড়ে তোলার ওপর।

গ)   শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পঞ্চশীল নীতির ভিত্তিতে সমস্ত দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা।

 

জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের এই কর্মসূচী নিয়ে পার্টি ভারতবর্ষে কমিউনিজমের মহান বিপ্লবী আদর্শের প্রতি নিজেকে সর্বতোভাবে উৎসর্গ করছে।

একবিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের জনগণ অবশ্যই পূর্ণ ও সুসঙ্গত গণতন্ত্র এবং প্রকৃত সামাজিক, লিঙ্গগত, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ন্যায় অর্জন করবেন।