অর্থনৈতিক দিক থেকে পশ্চাদপদদের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণ দৃষ্টি ঘোরানোর মোদী সরকারের মরিয়া প্রচেষ্টাকে উন্মোচিত ও প্রত্যাখ্যান করুন

(এম এল আপডেট সম্পাদকীয়, ৮ জানুয়ারি ২০১৯)

২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নরেন্দ্র মোদী বছরে ২ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন। ক্ষমতায় সরকারের চতুর্থ বছরে, ২০১৮ সালে ভারতে ১ কোটি ১০ লক্ষ কাজ নষ্ট হয়েছে এবং বেকারির হার চড়চড় করে বেড়ে চলেছে।

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আর কয়েকমাস মাত্র বাকি রয়েছে এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উত্তর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে তারা পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ায় মোদী সরকার ‘উন্নয়ন’ এবং ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ নিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণের সীমাহীন ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টিকে ঘোরাতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টিকে ঘোরানোর তার সাম্প্রতিক কৌশল হল উচ্চ শিক্ষার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং সরকারি চাকরিতে ‘সাধারণ বর্গের’ মধ্যে অর্থনৈতিক দিক থেকে পশ্চাদপদ অংশের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণ চাল করা। এই সম্পর্কিত আইন অতি সম্প্রতি লোকসভায় পাশ হয়েছে।

মোদী সরকারের এই পদক্ষেপ মূলগতভাবে অনেক কারণেই অসৎ। প্রথমত, সংবিধানের ৩৪০ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সামাজিক এবং শিক্ষাগত পশ্চাদপদতাই সংরক্ষণের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে। অন্যভাবে বললে, সংবিধান এই নীতিটাকেই স্বীকৃতি দিয়েছে যে সংরক্ষণ অর্থনৈতিক বঞ্চনার মোকাবিলার হাতিয়ার নয়—সংরক্ষণ (কিছুটা মাত্রায়) প্রণালীবদ্ধ সামাজিক এবং শিক্ষাগত বৈষম্য ও বঞ্চনার সুরাহাই শুধু করতে পারে। উচ্চবর্ণের জনগণ, এমনকি তাদের মধ্যে দরিদ্ররাও শিক্ষা ও চাকুরির ক্ষেত্রে প্রণালীবদ্ধ বৈষম্য, বঞ্চনা এবং কম প্রতিনিধিত্বের শিকার হয়—এই দাবি অযৌক্তিক। কর্মহীনতা এবং দারিদ্র্য একটা স্বতন্ত্র সমস্যা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎকৃষ্ট মজুরি প্রদানের মধ্যে দিয়েই যার সমাধান হতে পারে—আর এই ক্ষেত্রে মোদী সরকার লক্ষণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

চাকুরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে তফশিলি জাতি-তফশিলি জনজাতি-ওবিসি-দের জন্য কোটা চালু করার ধারণা মোদীই যে প্রথম নিয়ে এলেন তা কিন্তু নয়। নরসিমা রাও সরকার এই ধরনেরই একটা আইন তৈরি করে ‘‘সংরক্ষণের বর্তমান প্রকল্পগুলির আওতার বাইরে থাকা অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল জনগণের পশ্চাদপদ অংশের’’ জন্য সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। সুপ্রিম কোর্টের নয় সদস্যের এক সাংবিধানিক বেঞ্চ ঐ আইনকে বাতিল করে দেয় এবং তারা এই অভিমত পোষণ করে যে, শুধুমাত্র দারিদ্র্য পশ্চাদপদতা বিচারের মানদণ্ড হতে পারে না এবং তাঁরা বলেন, সামাজিক ও শিক্ষাগত পশ্চাদপদতাই হল সংরক্ষণের একমাত্র ভিত্তি। এরপর থেকে কয়েকটি রাজ্য সরকার একই ধরনের আইন তৈরি করলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। মোদী সরকার এই ব্যবস্থা চালু করছে ২০১৯-এর সংসদীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এবং তাদের এই পদক্ষেপ যে আইনি এবং সাংবিধানিক বাধার মুখে পড়বে এই কথা খুব ভালো করে জেনেও তারা ঐ উদ্যোগ নিচ্ছে। অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সংরক্ষণকে সফল করতে মোদী সরকার যদি সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয় তবে তার মধ্যে এই আশঙ্কা জোরালো হয়েই দেখা দেয় যে, এই পদক্ষেপ হবে পরবর্তী কালে তফশিলি জাতি/উপজাতি/ওবিসি কোটার ভিত্তিকে বিপর্যস্ত করার রাস্তা খুলে দেওয়ার এক প্রচ্ছন্ন পদক্ষেপ, যে দাবি আরএসএস দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে। বাস্তব অবস্থা হল, সংরক্ষণ ব্যবস্থার মধ্যে ক্রমেই বেশি করে বিলম্ব ঘটতে, ফাঁকফোকর থাকতে এবং তার রূপায়ণ না হতে দেখা যাচ্ছে। এবং এখন আবার শিক্ষা এবং কাজের ক্ষেত্রে ব্যাপক বেসরকারিকরণের ফলে তার ভিত্তির ক্ষয় ঘটছে। দীর্ঘদিনের দাবি হওয়া সত্ত্বেও মোদী সরকার বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষণ চাল করতে দেয়নি।

অন্য প্রশ্নটা হল অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত মানদণ্ড সম্পর্কে। মোদী সরকার প্রস্তাবিত মানদণ্ড হল পারিবারিক আয় বছরে ৮ লক্ষ টাকার কম হওয়া অথবা ৫ একরের কম চাষযোগ্য জমি থাকা। এটা এমন একটা বিস্তৃত বর্গ আর আওতায় তফশিলি জাতি/তফশিলি উপজাতি/ওবিসি জনগণের বাইরে থাকা জনগণের প্রায় ৯০ শতাংশই পড়বে, যা ‘দারিদ্র্য’র সংজ্ঞাকে অর্থহীন করে তুলবে এবং উচ্চবর্ণের মধ্যে প্রকৃতই দরিদ্র ও বেকারদের সফলভাবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হবে। বছরে ৮ লক্ষ টাকার কম আয়ের পরিবারের লোকজনদের কোটা-বহির্ভূত সরকারি চাকরিতে ইতিমধ্যেই ১০ শতাংশেরও বেশি ভাগ রয়েছে—কাজেই সরকারের তৈরি আইন থেকে কেউ সুবিধা পাচ্ছে না: এটা সমস্ত অর্থেই একটা ‘জুমলা’—তা এমন একটা আলোচ্য বিষয় ও বুলিসর্বস্ব কৌশল একটু খুঁটিয়ে দেখলে তা ফাঁপা ও শূন্যগর্ভ রূপে প্রতীয়মান হয়।

এছাড়া, আয়তনে ক্রমেই ছোট হয়ে আসা একটা ব্যবস্থা থেকেই এই পদক্ষেপের সুবিধাপ্রাপকদের সুবিধা দিতে চাওয়া হচ্ছে। মোদী সরকার যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি, তেমনি সরকারি চাকুরিতে শূন্য পদগুলি পূরণেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৩-র তুলনায় ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রক ও বিভাগগুলিতে সরাসরি নিয়োগ ৮৯ শতাংশ কমে যায় (সংরক্ষিত বর্গগুলিতে নিয়োগ হ্রাসের হার হয় ৯০ শতাংশ)। ২০১৮ সালে সংসদে পেশ করা তথ্য জানাচ্ছে, সরকারি স্কুলগুলিতে ১০ লক্ষ পদ শূন্য রয়েছে; পুলিশ বাহিনীতে শূন্য রয়েছে ৫.৪ লক্ষ পদ, রেলে পূরণ না হওয়া পদের সংখ্যা ২.৫ লক্ষ, শূন্য পদের সংখ্যা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ১.২ লক্ষ, আধা সামরিক বাহিনীতে ৬১ হাজার, আদালতগুলিতে ৫,৮০০ এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ১.৫ লক্ষ। মারাঠাদের জন্য কোটার হার কত—জনৈক সাংবাদিকের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই ব্যাপারটাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়করি স্বীকার করে নেন যখন তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘সরকারি নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ। কাজ কোথায়?’’

এই সম্পাদকীয় লেখা যখন চলছে, ভারতের শ্রমজীবী জনগণের প্রায় সমস্ত অংশই তখন দু-দিনের ধর্মঘট করছেন যার প্রভাব অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্রেই পড়েছে। ধর্মঘটী শ্রমিকরা দাবি করছেন ন্যূনতম মজুরি ১৮ হাজার টাকা করতে হবে এবং সম কাজে সম মজুরির ব্যবস্থা কঠোরভাবে রূপায়িত করতে হবে যা কাজের অবাধ ঠিকাকরণ বন্ধের দাবি জানায়। এই ধর্মঘট খাদ্য সহ অত্যবশ্যকীয় দ্রব্যগুলির তীব্র মূল্যস্ফীতি এবং বেকারির ক্রমবর্ধমান হারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতার প্রশমনের সদিচ্ছা সরকারের যদি সত্যিই থাকে তবে তাকে ন্যূনতম মজুরি ১৮ হাজার টাকা করা দিয়ে শুরু করতে হবে এবং ন্যূনতম মজুরি ও অন্যান্য শ্রম আইনের কঠোরতম রূপায়ণ সুনিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবটা হল, মোদী সরকার দরিদ্রদের জীবনকে আরো দুর্বিসহ করে তুলেছে। ২০১৮ সালে কাজ নষ্ট হয়েছে এক কোটিরও বেশি, যার ৮৪ শতাংশই হয়েছে গ্রামীণ ভারতে। নষ্ট হওয়া ১ কোটি ১০ লক্ষ কাজের মধ্যে মেয়েরাই হারিয়েছেন ৮৮ লক্ষ কাজ। খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বিমুদ্রাকরণ এবং জিএসটি ছোট-ছোট ব্যবসায়ী সংস্থাগুলোকে জোরালো ঘা দিয়েছে এবং দরিদ্রদেরও তীব্র আঘাত করেছে।

যাঁরা কাজে রয়েছেন, তাঁদের এমন পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয় যাকে মোদী সরকার আগের তুলনায় আরো নিরাপত্তাহীন এবং শোষণমূলক করে তুলেছে। শ্রমিকদের সারা ভারত ধর্মঘটের ঠিক আগে মোদী মন্ত্রীসভা ট্রেড ইউনিয়ন (সংশোধনী) বিল, ২০১৮-তে অনুমোদন দিয়েছে যা কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে স্বীকৃতি দানের প্রশ্নে ত্রিপাক্ষিক (কর্মী, নিয়োগকারী এবং সরকার) ঐকমত্যের প্রক্রিয়াকে সরিয়ে তার স্থানে সরকারের খেয়ালখুশির ক্ষমতাকে আনতে চায়। এছাড়া, ঐ বিলে সংস্থা/প্রতিষ্ঠান স্তরে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ভিত্তিতে ট্রেড ইউনিয়নে স্বীকৃতি প্রদান বাধ্যতামূলক হওয়ার কোনো বিধান নেই, আরো নেই ইউনিয়ন গঠনে উদ্যোগ নেওয়া শ্রমিকদের শাস্তি দান থেকে আইনি সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা।

ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকা এ বছরের ধর্মঘট শুধু সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের কাছ থেকেই অভূতপূর্ব মাত্রার ব্যাপক বিস্তৃত সাড়া ও অংশগ্রহণই পাচ্ছে না, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, ছাত্র, যুবক ও কৃষকদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলছে। সমস্ত অর্থেই এটা হল ভারত হরতাল—যা হল বিশাল আকারেই সারা দেশের শাটডাউন এবং মোদী সরকারের প্রতি অনাস্থা ভোট প্রদান। ‘সাধারণ বর্গে’ দরিদ্রদের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের জুমলা আসলে হল মোদী সরকারের এক মরীয়া প্রয়াস যার সাহায্যে তারা উচ্চবর্ণ এবং তাদের গোঁড়ামোকে তুষ্ট ও সমাবশিত করতে, বেকারি ক্রমেই বেড়ে চলার পিছনে প্রকৃত কারণগুলো থেকে উচ্চবর্ণের ভোটারদের দৃষ্টিকে ঘোরাতে এবং যে কোন ভাবেই হোক সারা দেশে তাদের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা জনগণের ক্রোধ সঞ্চিত হওয়াকে বিপথগামী করতে চাইছে।

খণ্ড-26
সংখ্যা-3
17-01-2019