ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং বুদ্ধদেব বসু

‘ফ্যাসিবাদ বুর্জোয়া প্রজ্ঞার নতুন চিৎকার নয়, নৈরাশ্যময় অজ্ঞতার শেষ আর্তনাদ।’ —ম্যাকসিম গোর্কি

শিয়রে যখন বিপদ নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় তখন কর্তব্য স্থির করার আর সময় থাকে না। রুখে দাঁড়ানোই তখন নিয়ম। সেই তাৎক্ষণিক রুখে দাঁড়াবার মধ্যে প্রাণের তাগিদই বড়ো হয়ে দাঁড়ায় অন্য প্রস্তুতি থাকুক আর নাই থাকুক। কিন্তু বিপদের পদধ্বনি শোনার পরমুহূর্তথেকেই যদি প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া যায় তবে প্রস্তুতির মধ্যে থাকে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার মানচিত্র। শত্রুর মোকাবিলা সেক্ষেত্রে অনেক সহজ হয়। কিন্তু যা হয়নি তা নিয়ে আক্ষেপের সময় আর নেই। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ফ্যাসিবিরোধী কবিতা সংকলন ‘একসূত্রে’র অন্যতম সম্পাদক গোলাম কুদ্দুস লিখেছিলেন, ‘আমাদের টনক নড়ল জাপান যুদ্ধ ঘোষণা করার পর’। আর তার প্রায় ছিয়াত্তর বছর পরে নতুন করে আরও এক ফ্যাসিবাদের বিপদ শিয়রে এসে দাঁড়ানোর পর আমাদের আজ ‘টনক’ নড়ছে। বিজেপির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে চর্চা চলছে বেশ কিছুকাল ধরে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের এই অঘনবদ্ধ চর্চার ফাঁকফোকর দিয়ে কখন যে সে অপরিমেয় শক্তি সংগ্রহ করে নিঃশব্দে শিয়রে এসে দাঁড়িয়ে আমাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে আমরা প্রকৃত অর্থেটের পাইনি। কিন্তু এখন আর অন্য সব চিন্তার চাইতে বড়ো হয়ে উঠেছে এই মানবতাদলনকারী, সভ্যতার ভয়াবহ শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আর একই সঙ্গে প্রয়োজন এই শত্রুর বিরুদ্ধে বন্ধুর বিস্তার ঘটানো যাতে করে আমাদের এই প্রতিরোধ লড়াই ক্রমশই আরও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে পারে। এরই সঙ্গে প্রয়োজন ফ্যাসিবিরোধী শিল্পসাহিত্যের ‘ক্ষণকীর্তন’ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী এবং যুগ-অতিক্রমনের অভিযাত্রা নিয়ে এই যুদ্ধের ময়দানে সামিল হওয়া।

ফ্যাসিবিরোধী শিল্পসাহিত্যের ‘ক্ষণকীর্তন’- এর বিপ্রতীপে ফ্যাসিবিরোধী শিল্পসাহিত্যের যুগ-অতিক্রমনের অভিযাত্রায় সামিল হতে গেলে আমাদেরও এই পরিক্ষেত্রে সতর্ক বন্ধুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র সমকালের বন্ধুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আকর ঘেঁটে তুলে ধরতে হবে সেইসব শিল্পী- সাহিত্যিক ও তাঁদের ঐতিহাসিক সৃষ্ট শিল্প ও সাহিত্য যা এক সময় ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল। সেইসব শিল্পসাহিত্য এবং তার মহান স্রষ্টাদের পুনরাবিষ্কার এবং তার জীবন্ত চর্চার মধ্যে দিয়ে আমাদের বর্তমান ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। তবে এই ব্যাপারে একরৈখিক এবং প্রকট সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হওয়া একান্তই জরুরি। এই সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির জন্যেই বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের ফ্যাসিবিরোধী গৌরবময় সাংস্কৃতিক সংগ্রামের অনেক যোদ্ধাই পরবর্তীতে দূরে সরে গিয়েছিলেন। সেইসব ঘটনার দীর্ঘ সাত দশক অতিক্রমণের পরও যদি আমরা সেই ভুল থেকে শিক্ষা না নিই তবে আরও একটা ক্ষমাহীন ভুলের পুনরাবৃত্তি আমরা প্রতিহত করতে পারবো না।

এই পর্যায়ে আমরা কবি-প্রাবন্ধিক-ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসুর ফ্যাসিবিরোধী ভূমিকার চর্চা করতে পারি। এই বুদ্ধদেব বসু কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। আবার তিনি সমকালীন কংগ্রেস রাজনীতির শরিকও ছিলেন না। অথচ ছিলেন তীব্র ফ্যাসিবিরোধী। তাঁর এই ফ্যাসিবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমসময়ে ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক সংগ্রামে সামিল করেছিল। তিনি প্রগতি লেখক সংঘে যুক্ত হয়েছিলেন, ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের ১৯ এবং ২০ তারিখে কলকাতায় নিখিল বঙ্গ ফ্যাসিবিরোধী যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার সহযোগী সভাপতি হিসেবে তিনি তাঁর প্রদত্ত অভিভাষণে বলেছিলেন যে রমাঁ রলাঁর বিখ্যাত বাণী—‘সকল উৎপীড়কের বিরুদ্ধে সকল উৎপীড়িতের সঙ্গে’—নিজেদের বাণী হিসেবে ‘আজ আমরা’ গ্রহণ করবো। এদিনের অভিভাষণে তিনি সাবেগ উচ্চারণে ঘোষণা করেছিলেন :

... যে মেদস্ফীত মদাপ্লুত অন্যায় পশুশক্তি বীভৎস মাৎলামিতে আজ পৃথিবী ভরে ছারখার করে বেড়াচ্ছে তাকে আমরা বলব : তুমি সব পারো কিন্তু আমাদের মনুষ্যত্ব কাড়তে পারো না—তুমি যা করছ আমাদের দিয়ে তা করাতে পারবে না—তাই তুমি পরাজিত আর আমরাই জয়ী।

সমসময়ে ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের তরফ থেকে প্রকাশিত এক সংকলনে ‘সাহিত্যিকের জবানববন্দি’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর ‘সভ্যতা ও ফ্যাসিজম’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। সেই প্রবন্ধে বুদ্ধদেব লিখেছিলেন যে ‘পশুত্বের বিরুদ্ধে’ আমাদের অর্থাৎ লেখক শিল্পী সাহিত্যিকদের ‘রুখে দাঁড়াতেই’ হবে অন্যথায় ‘আমাদের অস্তিত্বই’ বিপন্ন হয়ে পড়বে। স্বভাবতই ‘আমরা যারা’ সংস্কৃতি তথা ‘বিশ্বমানবের ঐতিহাসিক প্রগতিতে আস্থাবান’ তাঁদের সামনে এই ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অন্য কোনও বিকল্প পথ নেই। প্রগতিতে আস্থা না রাখতে পারলে, তাঁর মতে, জীবন নিরর্থক হয়ে যাবে। তাই বুদ্ধদেব বসু নির্দ্বিধায় বলেছিলেন :

চোখ বুজে বলে দেয়া যায় যে ফ্যাশিস্ট মনোবৃত্তি ... বাঁধন-ছেঁড়া ক্ষিপ্ত কুকুরের মত ছুটে বেরিয়ে এসে তাদেরই কামড়াতে যাবে মুক্তির সাধনায় জীবন যাদের উৎসর্গিত।

এই অমোঘ উক্তি করার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধদেব লক্ষ্য করেছিলেন যে সমসময়ের লড়াইয়ে ফ্যাসিবাদের আপাত জয়লাভের সংবাদে ‘আমাদের দেশের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল’ শক্তির প্রতিভূরা ‘প্রবল উৎসাহে’ উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন যে ‘আমরা যারা প্রগতিতে বিশ্বাসী’ তাদের ‘একত্রিত’ হয়ে এই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে এই মর্মে শপথ নিতে হবে যেহেতু ‘আমরা’ এর তীব্র ‘বিরোধী’ সেইহেতু এই অপশক্তির প্রতিরোধকল্পে আমরা ‘যা কিছু করার সব করবো, তার জন্য যত নির্যাতন সইবার সব সইবো’।

এইসব অসাধারণ ও ঐতিহাসিক উক্তি ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিরোধ আন্দোলনে সামিল হয়ে বুদ্ধদেব বসুই করেছিলেন। কবি বুদ্ধদেব বসুর সাধারণ পরিচিতির চেনা পরিক্ষেত্রের বাইরে এই বুদ্ধদেব বসু অন্য ভূমিকায় এক অসাধারণ এবং স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ফ্যাসিবাদের ভয়াবহ চেহারায় আত্মপ্রকাশ এবং আক্রমণাত্মক রূপ পরিগ্রহ করার আলোগ্রাসী দুঃসময়ে।

এক অদ্ভুত অপ্রথাগত দার্শনিকের দূরদৃষ্টি দিয়ে তিনি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ‘বিদেশী ইম্পীরিয়ালিজমকে তাড়িয়ে তার গদিতে স্বদেশি ন্যাশনালিজমকে অধিষ্ঠিত করলে’ দেশের মানুষের বিপদ কিছুমাত্র কমবে না, কারণ ‘উগ্র স্বাজাতিকতা সুযোগ পেলেই নিদারুণ সাম্রাজ্যতন্ত্রে পরিণত হয়ে ওঠে।’ বুদ্ধদেব আদৌ রাজনীতির কারবারি ছিলেন না, তিনি মার্কসবাদও চর্চা করেন নি। কিন্তু তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদের তীব্র বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদের অপরিপোষক এবং কংগ্রেসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ অথচ গান্ধীজির প্রতি তাঁর একটা মুগ্ধবোধ ছিল। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মার্চ নরেশ গুহকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘কংগ্রেসের মূল সুরের সঙ্গে আমরা তো সুর মেলাতে পারবো না।’ তাঁর এই বক্তব্যে ‘আমরা’ শব্দটি লক্ষণীয়। বুদ্ধদেবের এই অবস্থানের নিরিখে তিনি সমসময়ে দ্বিমুখী আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যার ‘পূর্বাশা’ পত্রিকায় তাঁকে আক্রমণ করে লেখা হয়েছিল যে নিছক আত্মস্বার্থচরিতার্থতার কারণেই বুদ্ধদেব বসু নাকি ‘বামপন্থী’ এবং ‘সোশ্যালিস্ট’ হয়ে উঠেছেন! আর ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায় বুদ্ধদেবকে সরাসরি ‘কমিউনিস্ট’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল! অন্যদিকে আবার ‘পরিচয়’ পত্রিকায় (চৈত্র-বৈশাখ ১৩৫৭-৫৮ বঙ্গাব্দ) স্বয়ং এক প্রথিতযশা বামপন্থী কবি বুদ্ধদেব বসুকে আক্রমণ করে লিখেছিলেন যে তিনি জনসাধারণের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে গিয়েছেন!

সমসময়ের এই অনভিপ্রেত আচরণ অনেক বন্ধুকে আরও কাছে টেনে আনবার বিপরীতে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সমসময়ের অকমিউনিস্ট, অবামপন্থী কবি লেখকরা অনেকেই প্রগতি লেখক সংঘ কিম্বা ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সামিল হয়ে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এঁদের কীভাবে আরও কাছে টেনে নেওয়া যায় সেই প্রচেষ্টায় ব্রতী হওয়ার বিপ্রতীপে হেয় করার দরুণ এঁরা একে একে দূরে সরে গিয়েছিলেন। পার্টি ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিহীন বা অননুমোদিত ‘আমিত্ব’-র প্রভাব চাপিয়ে দেওয়া থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া দরকার নতুবা পুরানো ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

আজ বিজেপি তথা সঙ্ঘপারিবারিক ফ্যাসিবাদের এই আগ্রাসী বিপদের মোকাবিলায় আমাদের অনেক বন্ধুরই সন্ধান মিলবে যাঁরা তাঁদের মতপথের সঙ্গে আমাদের মতপথের কেবলমাত্র মিলনাত্মক জায়গা থেকে সংঘপারিবারিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের সঙ্গী হচ্ছেন। এঁরা এই মহতী সংগ্রামে আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আমাদের আচরণ যেন তাঁদের দূরে সরিয়ে না দেয়। বরং আমাদের আন্তরিক বন্ধুতায় তাঁরা কোনও একদিন আমাদের শিবিরে অন্যতম সেনানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। আবার নাও পারেন। লেনিনের সেই অমোঘ কথাটি মনে রাখা দরকার : আমাদের লড়াইয়ে আজ যারা সঙ্গী হচ্ছেন, তাঁরা আমাদের সঙ্গে শেষপর্যন্ত না হাঁটতেও পারেন, কিন্তু তাঁরা যেটুকু পথ আমাদের সঙ্গে থাকবেন, তার যোগ্য সম্মান দিতে আমরা যেন কার্পণ্য না করি।

- অশোক চট্টোপাধ্যায়

খণ্ড-26
সংখ্যা-4
24-01-2019