রাফাল চুক্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মোদী সরকারের প্রতি ‘ক্লিন চিট’ বলা যায় না

(লিবারেশন, জানুয়ারি ২০১৯ সংখ্যা থেকে)

রাফাল যুদ্ধ বিমান ক্রয় চুক্তি সম্পর্কে সিবিআই বা বিশেষ তদন্তকারী দলকে (সিট) দিয়ে তদন্ত করানোর আবেদন জানিয়ে যে জনস্বার মামলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ তাকে খারিজ করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, রাফাল চুক্তিতে বিমান ক্রয়ের দামের বিষয়ক পরীক্ষা করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার তাদের নেই। রাফাল চুক্তিতে দাম নিয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাকে খতিয়ে দেখার ক্ষমতা তাদের নেই, এই কথা বলে সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু মোদী সরকারকে ‘ক্লিন চিট’ দিচ্ছে না—চুক্তিতে উল্লিখিত দাম সম্পর্কে এবং পদ্ধতিগত দিক নিয়ে মোদী সরকারকে প্রশ্ন করার সমস্ত অধিকার সংসদ, সংবাদ মাধ্যম এবং জনগণের রয়েছে।

তবে, সুপ্রিম কোর্টের রায়েও কিন্তু গুরুতর ত্রুটি রয়ে গেছে, তাতে এমন তথ্যগত ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যাকে সহজেই খণ্ডন করা যায় এবং ঐ রায়ে কয়েকটি পদ্ধতিগত এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে হয় ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া হয়নি, আর না হয় একেবারেই ওপর-ওপর ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা জলজ্যান্ত তথ্যগত ভুলকে স্বীকার করে নিয়ে এবং তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নিজেকেই চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে : আর সেই ভুলটা হল, মুকেশ আম্বানির আর আই এল-কেই (যার সঙ্গে ২০২২ সালে ডাসোল্টের একটা চুক্তি হয়েছিল) অনিল আম্বানির রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচারের ‘‘আদি কোম্পানি’’ বলে মেনে নেওয়া। এই রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচার হল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে একেবারেই অনভিজ্ঞ এক কোম্পানি, একেবারে শেষ মুহূর্তে নেওয়া সন্দেহজনক এক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হ্যালকে বাদ দিয়ে এই কোম্পানিকে বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়। বিভ্রান্তির ধূম্রজাল সৃষ্টির লক্ষ্যে বিজেপি নেতৃবৃন্দ এবং ডাসোল্টের সিইও এই মিথ্যাটাকেই ফেরি করছে। তথ্যকে যাচাই করা এবং তাকে সুস্পষ্ট রূপে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা না করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কৌশলের এই ফাঁদে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে পা দিল, তাকে কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আর একটা যে প্রকট তথ্যগত ভ্রান্তি রয়ে গেছে তা হল এই দাবি যে, বিমান ক্রয়ের দামের খুঁটিনাটি ক্যাগকে জানানো হয়েছে এবং রাফাল চুক্তি নিয়ে ক্যাগের রিপোর্ট পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসি) পরীক্ষা করেছে। এবং পিএসি আবার ক্যাগের রিপোর্টের সম্পাদিত একটা অংশ সংসদের কাছে পেশ করেছে এবং তাকে প্রকাশ্যে এনেছে। পিএসসি-র সদস্যরা জানিয়েছেন, এই ধরনের কোন রিপোর্ট তাঁদের দেওয়া হয়নি, অথবা তাঁরাও সংসদে পেশ করেননি।

এখানে দুটো প্রশ্ন মাথাচাড়া দিচ্ছে। ক্যাগ রিপোর্ট তৈরি হয়েছে এবং তা পিএসি-র কাছে জমা করা হয়েছে, এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে (মুখ অাঁটা খামে বক্তব্য পেশ করে এবং প্রকাশ্যে না এনে) সরকার কি সুপ্রিম কোর্টকে বিপথে চালিত করেছে? এবং সুপ্রিম কোর্ট কিভাবেই বা নিজেকে এইভাবে বিপথে চালিত হতে দিল? সুপ্রিম কোর্ট কিভাবে যথেষ্ট মনোযোগী না হয়ে সরকারের দাবিকে একেবারে প্রাথমিক দিক থেকেও যাচাই করতে ব্যর্থ হল?

গণতন্ত্রের দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ—সংবাদ মাধ্যম এবং সুপ্রিম কোর্ট—যখন যথাযথ অভিনিবেশের সঙ্গে সরকারের দাবির বৈধতাকে যাচাই না করে অন্ধভাবে তাকে মেনে নেয়, গণতন্ত্রের পক্ষে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দেখা দেয়।

সুপ্রিম কোর্ট কেবলমাত্র দামের বিষয়টা নিয়েই চর্চা করেছে এবং সরকার যে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার নগ্ন লঙ্ঘন করেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটাকে এড়িয়ে গেছে। পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার এই লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে একেবারে শেষ মুহূর্তে আগের তৈরি একটা চুক্তিকে বাতিল করে তার স্থানে নতুন এবং সন্দেহজনক একটা চুক্তি করা।

রাফাল চুক্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাদের ‘ক্লিন চিট’’ দিয়েছে বলে বিজেপি যে দাবি করছে, সংসদ, সংবাদ মাধ্যম এবং জনগণকে কখনই তা মেনে নিলে চলবে না এবং উত্তর দাবি করতে এবং তথ্যকে যাচাই করতে হবে। এক বিশাল আকারের প্রতিরক্ষা দুর্নীতি এবং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে রয়েছে যে সরকার, তার মিথ্যা দাবির—যে দাবি মিথ্যা বলে প্রমাণ করা সম্ভব—যে পুনরাবৃত্তি সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে ঘটিয়েছে, তাকে যে মেনে নেওয়া যায় না এবং তা যে অমার্জনীয়, সেটাও স্বীকার করতে হবে।

খণ্ড-26
সংখ্যা-3
17-01-2019