মোদীর গড়াপেটা ‘সাক্ষাৎকার’ থেকে আমরা কি শিখতে পারি

(এম এল আপডেট সম্পাদকীয়, ১৪ মে ২০১৯)

মোদীর গড়াপেটা ‘সাক্ষাৎকার’ থেকে আমরা কি শিখতে পারি ২০১৯-এর সংসদীয় নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন বেছে নেওয়া কয়েকজন সাংবাদিককে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘সাক্ষাৎকার’ তাঁর নিজের এবং তাঁর রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছুরই জানান দেয়। যে সাংবাদিকরা তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের কাজ যথাযথভাবে করাকে এড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ঐ সমস্ত কিছু জানা যাচ্ছে। এই সাংবাদিকদের মধ্যে যারা একেবারে নিকৃষ্ট তারা চামচাসুলভ চীয়ারলিডারের ভূমিকা পালন করেছে; আর তাদের মধ্যে যারা তুলনায় ভালো তারাও তাৎপর্যপূর্ণ এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করেছে।

নিউজ নেশন মোদীর যে সাক্ষাৎকার নেয় তাতে অনবধানতাবশত সুনিশ্চিতভাবেই ফাঁস হয়ে গেছে যে, প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন দর্শকরা দেখতে পেয়েছেন মোদীর হাতে ছাপা অক্ষরে লেখা একটা কাগজ ছিল যাতে তাঁকে সদ্য জিগ্যেস করা প্রশ্নটি (তাঁর কবিতা সম্পর্কে) ছিল এবং সেই কবিতাটাও লিপিবদ্ধ ছিল যেটা তিনি পাঠ করেন। ঐ ছাপা কাগজটা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ‘সাক্ষাৎকার’টা ‘গড়াপেটা’ ধরনের ছিল! সেটা মোদীর এই দাবিটাকেও নস্যাৎ করে যে, তিনি কবিতাটা সদ্যই অস্পষ্ট অক্ষরে হাতে লিখেছিলেন।

নিউজ নেশন-এর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী মোদীকে প্রশ্ন করেন যে, তিনি টাকা রাখার কোনো ব্যাগ ব্যবহার করেন কি না : এটা এমনই এক প্রশ্ন যা অক্ষয় কুমারের করা আম সম্পর্কে ‘অরাজনৈতিক’ প্রশ্নে নিহিত প্রশস্তিময় আমড়াগাছির তুচ্ছতা এবং অবান্তরতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালাতে পারে। দেখা গেল, অমন একটা অসার প্রশ্নের উত্তর দিতেও মোদীর আগে থেকে তৈরি উত্তরের প্রয়োজন।

নিউজ নেশন-এর নেওয়া সাক্ষাৎকার অসাবধানে এটাও প্রকাশ করে দিয়েছে যে, মোদী এবং বিজেপির যুক্তিবাদহীনতা দেশের পক্ষে কতটা বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিচ্ছে। মোদী বড় গলায় বলেন যে, বিশেষজ্ঞরা খারাপ আবহাওয়ার জন্য বালাকোট বিমান হানাকে পিছিয়ে দিতে চাইলেও তিনিই সিদ্ধান্ত নেন যে ঐ হানাদারি তখনই চালাতে হবে, কেননা মেঘ থাকায় পাকিস্তানের র‍াডার ভারতীয় বিমানের অস্তিত্বকে ধরতে পারবে না! তিনি এই ইঙ্গিতই করলেন যে, বিশেষজ্ঞরা খারাপ আবহাওয়া দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেও তিনি, নরেন্দ্র মোদী, রাডার সম্পর্কিত বিজ্ঞান না জেনেও খারাপ আবহাওয়াকে আড়াল করার হাতিয়ার হিসাবে কাজে লাগানোর দুর্দান্ত ধারণার অবতারণা করলেন। বিজেপি মোদীর এই দাবিকে টুইটের মধ্যে দিয়ে ছড়াল — তারপর সামাজিক মাধ্যম যখন মোদীর অজ্ঞতা নিয়ে বিদ্রুপ ও ক্রোধে ফেটে পড়ল বিজেপি তখন ঐ টুইটটাকে তুলে নিল। এটা অবশ্য জানানো হয় যে, মেঘের আড়ালকে ছিন্ন করে চিহ্নিত করাটাই রাডারের কাজ।

মোদী হয় বালাকোটে হানাদারি চালানোর সিদ্ধান্তের জন্য অন্যায্যভাবে কৃতিত্ব নেওয়া এবং বালাকোট আখ্যানে নিজেকে এক নায়ক হিসাবে সেঁধিয়ে দেওয়ার জন্য ‘মেঘ’ আখ্যানকে বানিয়েছিলেন। আর না হয় তিনি বস্তুত বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অবজ্ঞা করে নিজের অজ্ঞ মতামতকে চাপিয়ে দিয়েছিলেন — যার মধ্যে দিয়ে তিনি ভারতীয় বিমান বাহিনীর সেনাদের জীবন এবং বিমান বাহিনীর অভিযানের সাফল্যকে বিপন্ন করে তুলেছিলেন।

ঐ একই সাক্ষাৎকারে মোদী এই দাবিও করেন যে, ১৯৮৭-৮৮ সালে তাঁর কাছে ভারতের প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরাটি ছিল এবং ঐ একই বছরে তিনি প্রথম ই-মেল ব্যবহারকারীদের অন্যতম ছিলেন এবং ই-মেলের মধ্যে দিয়ে তিনি আদবানীর একটি রঙীন ছবি পাঠিয়েছিলেন। ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও বাণিজ্যিকভাবে ই-মেল ব্যবহারের কোনো সুযোগ ছিল না — মোদীর এই দাবি অতএব হাস্যকর। প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা বিক্রি হয় ১৯৮৭ সালে — যে মোদী দাবি করে থাকেন যে যুবক বয়সে তিনি কপর্দকশূণ্য ছিলেন সেই বছরেই একটা ডিজিটাল ক্যামেরার মালিক তিনি হলেন কিভাবে?

সাম্প্রতিক সময়ে মোদী অন্য আরেকটি সাক্ষাৎকার দেন ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাকে। এই সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকরা অন্তত ‘সাক্ষাৎকার’-এর হাবভাবটা বজায় রেখেছেন, টাকার ব্যাগ বা কবিতা লেখার মতো প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষাৎকারটিতেও সাংবাদিকরা রাফাল চুক্তিতে জড়িত স্যাঙাত পোষণ সম্পর্কে, মোদীর শাসনে ভারতে বেকারির হার রেকর্ড পরিমাণ হওয়া সম্পর্কে অথবা কোনো হিন্দুই কোনদিন সন্ত্রাসবাদী ছিল না বা হতে পারে না বলে মোদী বারবারই যা বলেছেন সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করাকেই এড়িয়ে গেছেন। বিপরীতে মোদী নিজেই প্রজ্ঞা ঠাকুরের প্রার্থী পদের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন — এই বিবৃতির জের টেনে তাকে চ্যালেজ্ঞ করে কোনো প্রশ্নও ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সাংবাদিকরা করেননি। এই সাক্ষাৎকার গ্রহণটি সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কর্তব্য পালনে কতটা ব্যর্থ তার অনুধাবনে এটির সঙ্গে অন্য একটি সাক্ষাৎকারের তুলনা করা যায়, যেটিতে ব্রিটিশ সাংবাদিক মেহদি হাসান প্রজ্ঞা ঠাকুরকে প্রার্থী করা নিয়ে বিজেপি মুখপাত্র নলিন কোহলিকে প্রচণ্ড জেরা করেন, সেই প্রশ্নগুলিই তিনি করেন যেগুলি ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিকদের করা উচিৎ থাকলেও তাঁরা করেননি।

একটা সময়ে তাঁর সমর্থকদের ঘৃণায় প্ররোচনা দেওয়া সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মোদী বলেন, ‘‘অনুগ্রহ করে আমাকে একটা দৃষ্টান্ত দিন যেখানে আমাদের সরকার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য দেখিয়েছে।’’ ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রস-এর সাংবাদিকদের এর জের টেনে পাল্টা প্রশ্ন করা উচিৎ ছিল যে, মোদী সরকারের প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জিতে (এনআরসি) প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হয়েছে কি না। কেন না, এই দুটিতে হিন্দু অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আর মুসলিম ও খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণে বাধ্যতামূলকভাবে নথি পেশ করার কথা বলা আছে। তাঁরা কিন্তু সিএবি কিংবা এনআরসি-র কোনো উল্লেখই করলেন না।

নির্বাচনী প্রচারের গোটা পর্যায়েই মোদী তাঁর সরকারের জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা এবং দায়বদ্ধতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্নকেই আমল দিতে চাননি। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম মোদীকে জবাবদিহিতে বাধ্য করার পরিবর্তে নিজেকে গৌরবান্বিত করে তোলার মঞ্চই তাঁকে যুগিয়েছে। সংবাদ মাধ্যম সহ প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যর্থ হওয়ায় ও যোগসাজশ চালানোয় মোদী ও তাঁর সরকারকে দায়বদ্ধ করার কাজটা ভারতীয় ভোটারদের ওপরই বর্তাচ্ছে।

 

খণ্ড-26
23-05-2019