আদিবাসীদের অভিযানে আবার আলোড়িত চঁচুড়া!

adivasi

২৫-২৬ জুন। বর্ষা বিলম্বিত। বাইরে শুধুই দাবদাহ। ঝলসে যাচ্ছে ঘড়ির মোড়। একদিকে প্রকৃতির ভ্রুকুটি, অন্যদিকে ‘পরিবর্তনের পরিবর্তন’ এই আওয়াজ নিয়ে জেলার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল জুড়ে চলছে বিজেপির দাপাদাপি, যাতে সামিল দরিদ্র কৃষিজীবী জনগণ! এই বাতাবরণকে অগ্রাহ্য করে ২৫ জুন অন্তত শ-পাঁচেক আদিবাসী নেতা ও ২৬ জুন ১২৬টি আদিবাসী গ্রামের প্রায় প্রতিটি থেকে কুড়ি থেকে পঞ্চাশ জনের সংগঠিত মানুষ উপস্থিত হলেন চুঁচুড়াতে। রোদের দাপট উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক ঘড়ির মোড় ঘিরে যখন চলছে ধামসা-মাদলের রণধ্বনি, তালে তালে নাচছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা; সে সময় মঞ্চে উপস্থিত একদিকে সরস্বতী বেসরা, শম্বা মাণ্ডি, বিশ্বনাথ সরেন, পাগান মুর্মু, মহাদেব মুর্মুর মতো প্রতিষ্ঠিত আদিবাসী নেতা। অন্যদিকে হাজির সিপিআই(এমএল) নেতা প্রবীর হালদার, কার্তিক পাল, বটকৃষ্ণ দাস, স্বপন গুহ, বর্ষীয়ান নেতা সনৎ রায়চৌধুরী, কৃষক নেতা তপন বটব্যাল, মুকুল কুমার সহ অন্যরা। সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখলেন কার্তিক পাল, সনৎ রায়চৌধুরী, পাগান মুর্মুরা। ২৬ জুন এরপর জনপ্লাবনের আকারে কোর্টচত্বর, পুলিশ সুপারের দপ্তরের পাশ দিয়ে মিছিল এগোল ঠিক দেড়টায় তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অভিমুখে; সামনে তীর-ধনুক হাতে আদিবাসী কর্মীদের প্রতীকী উপস্থিতি আর ধামসা-মাদলের শব্দে সে এক অনন্য অনুভূতি। পথের দুপাশে বিস্মিত মানুষের অবাক উপস্থিতি, বিজেপির এই রমরমা বাজারে হাজারো মানুষের নেতৃত্বে সিপিআই(এমএল)-র পরিচিত নেতারা! অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশের স্বগতোক্তি এটাই বাংলা। এটাই বাংলার বামপন্থা। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা পারি সংগঠিত হতে, পারি সংগঠিত করতে।

advasi rally

 

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অনেকগুলি দাবির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি সাংস্কৃতিক কর্মীদের সরকারি স্বীকৃতি । ২০১৩ সালে ঘোষিত এই সরকারি প্রকল্পে রাশ টেনেছে সরকার, ডিপার্টমেন্টে আভ্যন্তরীণ সার্কুলার মারফৎ ২০১৭-তে। কিন্তু ততদিনে এটি বিশেষত আদিবাসী জনসমাজে এক জনপ্রিয় আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত।

আদিবাসীদের মঞ্চ এই আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দিতে কোমর বেঁধে নেমেছে আন্দোলনে। শুধুমাত্র একটা দুটো ডেপুটেশন নয়, এর জন্য হাজার হাজার ফর্মজেরক্স করা, ফর্মফিল আপ করা, ফর্মে পঞ্চায়েত প্রধান, বিডিও-র থেকে ফরওয়ার্ড করানো; সব মিলিয়ে এক বড় হস্তক্ষেপ, গণ সক্রিয়তা। এরপর হাজারে হাজারে সংগঠিতভাবে ডেপুটেশন এসে আবেদনপত্র জমানিতে জেলা প্রশাসনকে বাধ্য করা; এখনো পর্যন্ত আন্দোলন এগোচ্ছে এই পথেই ২৬ জুন আন্দোলনকারীরা কার্যত অবরুদ্ধ করে দেন প্রথমে তথ্য ও সংস্কৃতি পরে জেলা শাসকের দফতর। জেলার পশ্চাৎপদ দফতরের অধিকর্তা দীর্ঘ আলোচনায় প্রকল্পটির গুরুত্ব স্বীকার করেন, মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে দেওয়া স্মারকলিপি ও আবেদনকারী সংগঠনগুলির নাম, ঠিকানা সহ সংযুক্তিটি দ্রুত মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর আশ্বাস দেন । চিঠির প্রতিলিপি সংগঠনকে দেবেন জানান। এরপর মঞ্চে ফিরে এসে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়। লোকসভা নির্বাচনের আগে আগে আদিবাসী বাড়ি গিয়ে বিজেপি, তৃণমূল প্রার্থীদের মধ্যাহ্নভোজের হিড়িক পড়েছিল হুগলী কেন্দ্রে। ভোট শেষ হতেই শেষ গিমিকের রাজনীতি। জয়ী প্রার্থী বিজেপির লকেট চ্যাটার্জি এখন ব্যস্ত সিঙ্গুরের জমিতে বিতাড়িত টাটাদের ফিরিয়ে আনতে। আদিবাসীদের সাথে সেদিন ভোটের টানে নেচেছিলেন লকেট, আজ এই লোকশিল্পীরা সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনে পাশে পাচ্ছেন না তাঁকে,তাঁদের পাশে আছে আদিবাসী মঞ্চের নেতৃত্ব। এই বাস্তবতা নিয়েই এগিয়ে চলেছে মঞ্চ, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে । আগামী ৩০ জুন পোলবার সেঁইয়াতে মঞ্চের কেন্দ্রীয় হুল কর্মসূচি। আগামী একমাস ধরে আদিবাসীদের বার্ধক্য ভাতা আদায়ের দাবিতে আবেদনপত্র সংগ্রহ করা ও জেলা ট্রাইবাল দফতর থেকে দাবি আদায়ের কর্মসূচি। এভাবেই জনসংযোগ ও আন্দোলন এগিয়ে যেতে হবে মঞ্চকে।

adivasi in chinsura

 

খণ্ড-26
সংখ্যা-18
27-06-2019