কাঁকিনাড়া থেকে জগদ্দল শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য মিছিল

Kankinada rally

১০ জানুয়ারি ২০১৯ ভাটপাড়া, উত্তর ২৪ পরগণা: লোকসভা নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিশেষত ভাটপাড়া জগদ্দল, নৈহাটি, বীজপুর অঞ্চলে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংঘর্ষ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ভাটপাড়া-জগদ্দলে তা সাম্প্রদায়িক চেহারা নিয়েছে। বিজেপির ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দু হাজারের বেশি সংখ্যালঘু মানুষ বাড়ি ঘর ছেড়ে স্কুল বা অন্যত্র আত্মীয় স্বজনের কাছে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দুষ্কৃতীরা লুঠপাট আগুন জ্বালানো বিনা বাধায় করতে থাকে। পুলিশ বাহিনী মোতায়েন সত্ত্বেও তারা ছিলেন দর্শকের ভুমিকায়। এরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী এলেন। কোন শান্তির বার্তা না দিয়ে প্রাদেশিকতার বার্তা ছড়িয়ে গেলেন।

দশ বারো দিন পর জনজীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে। যে সাতটা জুটমিল আছে তাতে কর্মীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। যারা বাইরে চলে গেছিলেন তাদের বেশিরভাগ ধীরে ধীরে বাড়িতে ফিরে আসছেন। এখনও কিছু মানুষ স্কুলের আশ্রয় শিবিরে আছেন।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ১০ জুন শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য ঐ অঞ্চলে মিছিল করে। কাঁকিনাড়া স্টেশন থেকে মিছিল শুরু হয়ে ভাটাপাড়া পৌরসভা, কাঁকিনাড়া বাজার, আর্যমন্দির, জগদ্দল জুটমিল হয়ে জগদ্দল থানায় গিয়ে মিছিল শেষ হয়। মিছিল চলাকালীন রাস্তার দু’ধারে অগুনতি মানুষ দাঁড়িয়ে মিছিল দেখছিলেন। মিছিলের সামনের সারিতে সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, বিসিএমএফ নেতা মহ: জহিম, ওমপ্রকাশ রাজভর, মাজাহার খান, কৃষ্ণা বেহারা প্রমুখ ছিলেন। মিছিল শান্তি সম্প্রীতির শ্লোগানে মুখরিত ছিল। মিছিলের মাঝে গণ শিল্পীরা শান্তি সৌভ্রাতৃত্বের গান গাইছিলেন, তাদের সঙ্গে অনেকেই গলা মিলিয়েছেন। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক।

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন: আমাদের আজকের মিছিল শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য মিছিল। নির্বাচন চলাকালীন ও নির্বাচনের পরেও আমাদের শান্তি ও একতার জন্য লড়তে হচ্ছে। এবারের নির্বাচন ছিল ব্যাপক ব্যয়বহুল। নির্বাচনের আগে শ্রমিক কৃষক ও বেকার যুবকদের যে দাবিগুলো ছিল তা পিছন দিকে চলে গেল। নির্বাচনের পর সারাদেশে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে হিংসার রাজনীতি চলছে। ভয়ের রাজনীতি এমনভাবে চলছে, যেন ভয়ে সবাই কুঁকড়ে যায়। আজকের মিছিল সেই ভয় ভাঙার ও সাহস যোগানোর মিছিল। ঘৃণার বিরুদ্ধে মিছিল। আমাদের একতা মজবুত করার জন্য মিছিল। আমাদের সংবিধান, আইন ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য একতা খুবই জরুরি।

এই অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। ১০ বছর আগে এখান থেকে বামপন্থীরা সাংসদ ও বিধায়ক হয়েছেন। বদল হয়ে হয়েছে টিএমসি। এখন আরও একবার বদল হয়ে হয়েছে বিজেপি। বিজেপি পুরো বাংলাকে কব্জা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভোটে যে পার্টির জনসমর্থন আছে সে জিতবে। কিন্তু পরিবর্তনের নামে ঘৃণা ও বিদ্বেষ চলবে কেন? পরিবর্তন মানে আইনের শাসন চলুক, জনতার কথা অনুযায়ী চলুক। কিন্তু এখানে বদলাও হয়েছে গণতন্ত্র হত্যা ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে। এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হচ্ছে।

বেকারদের চাকুরি, রুটিরুজির সমাধানের পরিবর্তে ভয় তৈরি করা হচ্ছে। এই এলাকায়, বাংলায়, সারাদেশে সন্ত্রাস ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হছে। আমাদের একসঙ্গে থেকে ভয়কে কাটাতে হবে। বিশেষ করে লাল ঝাণ্ডার মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। লজ্জার কথা, বাংলায় সম্প্রীতির জন্য মিছিল করতে হচ্ছে! তবুও সম্প্রীতি এবং ঐক্য গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ এখানকার জুটমিল শ্রমিক, আমাদের পার্টি, ইউনিয়ন ও লাল ঝান্ডাকে নিতে হবে ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

আমাদের কিছু বামপন্থী সাথী তৃণমূল থেকে বাঁচার জন্য বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। নিজেদের বিচারধারা ও ভোট পরিবর্তন করেছেন। মজদুর একতার পক্ষে এটা খুবই বিপদজ্জনক। আগে এখানে দাঙ্গা খুব বেশি হত না। এখন ধর্ম ভাষা নিয়ে মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে। আপনার ধর্ম, ভাষা বা রাজনীতি যাই হোক, এই রাজ্যে এই দেশে থাকার অধিকার সংবিধান আপনাকে দিয়েছে।

আমাদের সংবিধানে চারটি স্তম্ভ আছে। স্বাধীনতা, সমতা, সম্প্রীতি ও ন্যায়। আজকে হামলা হচ্ছে স্বাধীনতা, সমতা, সম্প্রীতি ও ন্যায় বিচারের উপর। শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য আমরা আবেদন জানাচ্ছি। এখানে কোন ভাষাভিত্তিক বিভাজন আমরা করতে দেব না। বদলের কথা বলা হচ্ছে, আসলে কিছুই বদলায়নি। বদলেছে সাইনবোর্ড। যারা শ্রমিক কৃষকদের বিরোধিতা করেছে তারা অন্য দলের নেতা হয়েছে। মারা যাচ্ছেন শ্রমিক, কৃষক, যুবক, ছোট দোকানদার। আমরা পরিবর্তন বলতে বুঝি সাধারণের অংশীদারিত্ব, সুরক্ষা, কথা বলার অধিকার, একতা ও সম্প্রীতি রক্ষা করা। সবাই সবাইকে সাহায্য করুন, ভয় পাবেন না। যেখানে ঘৃণা, সেখানে ভালোবাসা ও সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে যান। এই কর্মসূচি একদিনের জন্য নয়, ধারাবাহিকভাবে চলবে। বাংলাকে ঘৃণা ও হিংসার গবেষণাগার বানানো এবং অশান্ত করার যে চেষ্টা চলছে তার বিরুদ্ধে ৩০ জুলাই কলকাতায় কনভেনশন হতে চলেছে। আসাম, ঝাড়খন্ড, বিহার, ওড়িশা থেকে প্রতিনিধিরা আসবেন। এখানে ঘৃণা, হিংসা, ধর্মীয় ও ভাষাগত বিভেদ চলবে না। এই দেশ আম্বেদকর, সুভাষ বসু, ভগৎ সিং, চারু মজুমদারের। এই বাংলা আমাদের, এই দেশ আমাদের।

সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য চলাকালীন জেলা সম্পাদকের নেতৃত্বে নারায়ণ দে, কৃষ্ণা বেহেরা, ওমপ্রকাশ রাজভর এবং নবেন্দু দাশগুপ্ত থানার আই সি কে স্মারকলিপি জমা দেন। শেষে সুব্রত সেনগুপ্ত উপস্থিত জনতাকে আইসি-কে দেওয়া স্মারকলিপির বিষয় ও আইসি-র সাথে কথোপকথন তুলে ধরেন। এরপর কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সবাই ফিরে এলাম। উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল শান্ত পরিবেশ। আমরা নিশ্চিন্ত হলাম। মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। রাতে ফোন এলো আবার হাঙ্গামা হয়েছ। কারণ স্পষ্ট নয়। দিনের আলো ফোটার সাথে ও খবরের কাগজে প্রকাশ হল বোমের আঘাতে দু’জনের মৃত্যু। সন্দেহের তীর বিজেপির দিকে। কি ঘটেছিল সেখানে?

জগদ্দলে সম্প্রীতি মিছিল আর্য সমাজ গলির পাশ দিয়ে যায়। ঐ গলি দিয়ে ঢুকলেই বারুইপাড়া। খবরে প্রকাশিত রাত ১১ টার পর ঐ বারুইপাড়ায় এক সংখ্যালঘু পরিবারের উপর হামলা চালায় বিজেপির গুন্ডা বাহিনী।

বোমার আঘাতে দু’জনের মৃত্যুঘটে একজন অবসারপ্রাপ্ত জুটমিল শ্রমিক মহম্মদ হালিম (৬২) এবং অন্যজন মহম্মদ মোক্তার (৪৫)। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মধ্যে একটি বাচ্চা ছেলেও আছে। মোট ২ জন সংখ্যালঘু মানুষকে হত্যা করলো ফ্যাসিস্ট বাহিনী।

খবরে প্রকাশ সকাল থেকে বিজেপি জগদ্দলনৈহাটি সহ সর্বত্র অপপ্রচার শুরু করে যে হামলা নয়, মুসলিমরা বোমা বাঁধতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা গেছে। ‘ওরা’ বোমা বানাচ্ছে, তাই হিন্দুরা তৈরী হ‌ও।

এই অপপ্রচার থেকে স্পষ্ট বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতিতে ওরা একতরফা এই হামলা চালিয়ে, ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনীতি করছে। জেলাজুড়ে এই হিংসা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে জোরালো গণ জমায়েত করে ফ্যাসিস্টদের আস্ফালন রুখতে হবে।

খণ্ড-26
13-06-2019