দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় মোদী সরকার প্রাথমিক সংকেতগুলো এবং পুনরুজ্জীবিত চ্যালেঞ্জ সমূহ

(এম এল আপডেট সম্পাদকীয়, ৪ জুন ২০১৯)

ব্যাপকতর স্তরের প্রত্যাশার বিপরীতে মোদী সরকার আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। বিজেপি একাই আগেরবারের তুলনায় আরো বড়ো সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং প্রদত্ত ভোটের আরো বেশি অংশ লাভ করেছে। গত পাঁচ বছরে আমরা দেখেছি, মোদী সরকার কিভাবে ২০১৪-র বিজয়কে লাইসেন্স হিসাবে ব্যবহার করেছে শুধু কর্পোরেট লুট ও আগ্রাসনকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই নয়, সংবিধানের ওপর ধারাবাহিক যুদ্ধ চালিয়ে, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্ততাকে এবং বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার মধ্যে দিয়ে আরএসএস-এর এজেণ্ডাকে নামিয়ে তাকে বলবৎ করতেও সে তা করেছে। মোদী সরকার তার দ্বিতীয় পর্বে ক্ষমতাকে কিভাবে কাজে লাগাতে চাইবে তা অনুমান করা কঠিন নয়। প্রথম দশ দিনেই তার যথেষ্ট প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে।

যে প্রতারণাময় বাগজালের তিনি সিদ্ধহস্ত, তার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে মোদী সবাইকে সুশাসন দেওয়ার বাঁধাগতের আপ্তবাক্য উচ্চারণ করেন, বিজয়ে বিনীত হওয়ার কথা নিজের দলকে বলেন এবং সংখ্যালঘুদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। এর লক্ষ্য সম্ভবত ছিল আন্তর্জাতিক জনসমাজে ছাপ ফেলা যেখানে তিনি টাইম পত্রিকায় দেওয়া আখ্যার দ্বারাই পরিচিত : ভারতের ‘বিভেদ শিরোমণি’। দেশে তাঁর অনুগামীরা তাঁর কথার মধ্যে অবশ্য আস্কারা ও শাস্তিহীনতার ব্যঞ্জনা খুঁজে পেল, কেননা, ওরা ওদের বিজয় উৎসবকে বহু সংখ্যক সন্ত্রাসের আখ্যান দিয়ে সাজালো। বিরোধী পক্ষের কর্মীদের হত্যা করা হল, ভোটারদের প্রহার করা হল এবং ত্রিপুরায় বিজেপির বিজয় উদযাপনের জন্য অর্থ সংগ্রহের নামে বিরোধী ভোটারদের ওপর শাস্তিমূলক জরিমানা চাপানো হল। আর পশ্চিমবাংলায় স্তম্ভিত করে দেওয়ার মত নির্বাচনী সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে ওরা বলতে গেলে রাজ্য জয়ের এক অভিযানেই নেমেছে, টি এম সি থেকে দলে দলে লোক ভাঙিয়ে নিচ্ছে।

নতুন মন্ত্রীসভা গঠন হতেই নতুন সরকারের সুস্পষ্ট সংকেতগুলো সামনে এল। অমিত শাহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রূপে মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছেন, যেটাকে মন্ত্রীসভার দ্বিতীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ বলে গণ্য করা হয়। স্মরণ করা দরকার যে, শাহ গুজরাটের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন এবং একগুচ্ছ সংঘর্ষের ঘটনার পিছনে তিনিই ছিলেন মূল মাথা। এর জন্য তাঁকে জেলে যেত হয় এবং সন্দেহজনক পথে নিজেকে খালাস করতে পারার আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাঁর গুজরাটে ঢোকা বারণ ছিল। ২০১৯-এর নির্বাচনে মোদী এবং শাহ উভয়েই আগ্রাসী প্রচার চালিয়ে এনআরসি বলবৎ করা এবং নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের কথা বলেন, অভিবাসীদের অনুপ্রবেশকারী ও উইপোকা বলে অভিহিত করেন এবং তাদের বলপূর্বক বিতাড়িত করার প্রতিশ্রুতি দেন। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারা বিলোপের মতো আরএসএস-এর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এজেণ্ডা বিজেপির ২০১৯-এর ইস্তাহারে গুরুত্বের সঙ্গে ঠাঁই পেয়েছে। এবং মোদী সরকার সংবিধান এবং প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চালাচ্ছে তাকে তীব্রতর করে তোলায় অমিত শাহর যে এক প্রধান ভূমিকা থাকবে তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

আরো যে দুজন মোদী মন্ত্রীসভায় ঠাঁই পেয়েছেন, সেটাও আমাদের জানাচ্ছে যে সরকার কোন অভিমুখে চালিত হবে। মোদী মন্ত্রীসভায় ২০১৫-র জানুয়ারি থেকে ২০১৮-র জানুয়ারি পর্যন্ত বিদেশ সচিব হিসাবে কাজ করা প্রাক্তন আমলা সুব্রমনিয়ম জয়শঙ্করকে বিদেশ মন্ত্রী করা হয়েছে। মোদী সরকার কিভাবে প্রণালীবদ্ধ ধারায় আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ ঘটিয়ে তাদের স্বায়ত্ততাকে ধ্বংস করছে, এই নিয়োগটা সুস্পষ্টভাবে তা দেখিয়ে দিচ্ছে। এই অভিমুখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপকে ইতিমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি—নতুন চালু করা ‘ঘুর পথে অন্তর্ভুক্তির’ মাধ্যমে বাছা বাছা ব্যক্তিদের দিয়ে আমলাতন্ত্রকে ভরিয়ে তোলা হচ্ছে এবং তারপর আমলাদের মন্ত্রীসভায় ঢোকানো হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা প্রধান এবং পেশাদার আমলারা মন্ত্রীসভায় যোগ দেওয়ায় আমরা সহজেই দেখতে পাচ্ছি যে আর এস এসএর সহায়তায় সরকার কিভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই জোরদারভাবে ঢুকে পড়ে একটা একচ্ছত্রবাদী রাষ্ট্রের ভিত তৈরি করছে। মন্ত্রীসভায় অন্য ‘চমকে দেওয়ার মত অন্তর্ভুক্তিটা’ হল উড়িষ্যা থেকে প্রতাপ চন্দ্র সারঙ্গির। তাঁকে অনাড়ম্বরতা এবং ‘সমাজ সেবা’-র প্রতিমূর্তীরূপে জাহির করা হলেও ওঁকে সবচেয়ে ভালোভাবে চেনা যাবে উড়িষ্যার বজরং দল প্রধান হিসাবে যিনি ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলীয় মিশনারী গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই ছেলেকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় প্ররোচনা দিয়েছিলেন।

মোদী সরকার তার প্রথম পর্বে ‘‘সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয়তা’’ শব্দবন্ধটি তৈরি করেছিল, কিন্তু সরকার অতি-কেন্দ্রীভূত যন্ত্র হিসাবে কাজ করে ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর যুক্তরাষ্ট্রীয়তার সমস্ত চিহ্ন মুছে দিয়ে তাকে ক্রমেই আরো বেশি অতিকেন্দ্রিক করে তোলে। মোদী এবারও শুরু করেছেন আর একটা সংক্ষিপ্ত নির্দশক শব্দ নারা (এনএআরএ) দিয়ে যার লক্ষ্য নাকি জাতীয় উচ্চাকাঙ্খা ও আঞ্চলিক আকাঙ্খার মেলবন্ধন ঘটানো। কিন্তু সংসদে বিজেপির সাংসদ দলের মধ্যে যেমন একজনও মুসলিম সাংসদ নেই, সেরকমই মোদী মন্ত্রীসভায় দক্ষিণের রাজ্যগুলো থেকে প্রতিনিধিত্বও নামমাত্র, যে রাজ্যগুলো ক্রমেই বেশি করে আর এস এস-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান মডেলের চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষানীতির যে খসড়ায় সমস্ত অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে তৃতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করতে চাওয়া হয়েছে, তার থেকেও মোদী সরকারের যুক্তরাষ্ট্রীয়বিরোধী বৈচিত্র্য-বিরোধী চরিত্র সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। মোদী সরকারের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবনের প্রবণতা এনডিএ-র মধ্যে ভারসাম্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, যার ফলে বিজেপির দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক জে ডি ইউ মন্ত্রীসভায় তাদের প্রতি প্রস্তাবিত প্রতীকী প্রতিনিধিত্বকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে।

নির্বাচনের সময় জনগণ যাতে তাদের কাজের বিচার করতে না পারে তার জন্য মোদী সরকার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। সরকার জিডিপি এবং বেকারির শোচনীয় পরিসংখ্যানকে চেপে দেয় যার প্রতিক্রিয়ায় উচ্চপদস্থ পরিসংখ্যানবিদরা পদত্যাগে বাধ্য হন। ঐ পরিসংখ্যানগুলো এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এখন সরকারিভাবেই স্বীকৃত যে ২০১৯-এর প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম হয়েছে : দুই অঙ্কের বৃদ্ধির লম্বাচওড়া দাবির বিপরীতে ঐ হার মাত্র ৫.৮ শতাংশ। আর বৃদ্ধির হার যখন সর্বনিম্ন, বেকারি তখন গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। মোদী সরকার দাবি করে থাকে যে তারা বিশ্বের দরবারে ভারতকে আরো বেশি স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বেতাদের ক্ষমতায় ফেরার সাথে সাথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে, তারা ভারতকে আর জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সের মর্যাদা (জিএসপি, রপ্তানির শুল্কহীন সুবিধা) দেবে না, যার ফলে ভারত থেকে আমেরিকায় রপ্তানি হওয়া প্রায় ৫০টি পণ্য আরো মহার্ঘহয়ে উঠবে এবং ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোমাত্রায় ধাক্কা খাবে, যাদের হাত দিয়েই ব্যাপক পরিমাণ জিএসপি রপ্তানি হত। এই সমস্ত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা তারা কিভাবে করতে চায় তার কোনো ইঙ্গিত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সরকার কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের সংস্থাগুলোর বেসরকারিকরণ এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার খর্ব করার পথ মানচিত্রের ঘোষণায় অত্যন্ত তৎপরতা দেখিয়েছে।

এতদিন ধরে তারা যা করে এসেছে তারই পুনরাবৃত্তির পথে তারা ফিরে এসেছে  —অর্থনীতিকে ধ্বংস করা, জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক বুনটকে চূর্ণ করা। ভারতের জনগণকেও তাই অচিরেই তাদের প্রতিরোধ আবার শুরু করতে হবে।

খণ্ড-26
13-06-2019