ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করলেন মোদী

তিনি তো আদতে কৃচ্ছ্রসাধনকারী এক হিন্দু তপস্বী, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যার তুলনা মেলা ভার। দেশের কল্যাণে উৎসর্গীকৃত এই সেবককে দেশবাসী দেখেন ৭ দফা নির্বাচনী ঝড়ো প্রচারের শেষে কেদারনাথের পবিত্র গুহায় গৈরিকবসনে ধ্যানমগ্ন, ধ্যানের শেষে মন্দিরে প্রদক্ষিণ, হিন্দু পূজা- আচারের ছিল না কোনো কার্পণ্য । তিনি এমন এক ফকির যার রিক্ত-নিঃস্ব ঝুলি দেশবাসী ভোট ভিক্ষায় পরিপূর্ণ করে দেয়, আর, তাই, এই জয় তিনি ঘোষণা করেন, তার নয়, এ জয় তাদের — ভারতবাসীর!

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বি-পু-ল জয় হাঁসিল করার পর বিজেপির সদরদপ্তরে নরেন্দ্র মোদী সমবেত জনসমুদ্রের সামনে যে ভাষণ দেন সেখানে ছত্রে ছত্রে তিনি নিজের বিপণন করেন এক সর্বত্যাগী হিন্দু যোগীপুরুষ হিসাবে, যিনি সমস্ত জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে হেলায় বিসর্জন দিয়ে দেশমাতৃকার সেবার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নন, হয়েছেন ‘কর্মযোগী’। ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে মহাভারতের যুদ্ধের সময় এই ‘কর্মযোগী’ হওয়ার আদেশ দেন, যে কর্মফলের আশা না করে নিজের কর্তব্য পালন করে যায়। তাঁর এই সর্বত্যাগী ভাবমূর্তিকে খুবই পরিকল্পনামাফিক গড়ে তোলা হয়েছে। তাঁর জীবনীতে রয়েছে, খুবই অল্প বয়সে তিনি সমস্ত জাগতিক বিষয়-আশয় পরিত্যাগ করে হিমালয়ের কোলে আশ্র‍য় নেন, বছর দুয়েক সেখানে ঘুরে বেড়ান, তারপর যোগ দেন আরএসএস এর সঙ্গে, দেশসেবার তাগিদে এমনকি নিজের স্ত্রীকেও পরিত্যাগ করেছেন। নেহেরুর মতো অভিজাত পরিবারে তার জন্ম হয়নি, তিনি নেহাতই সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বেছে নিয়েছেন হিন্দুদের সবচেয়ে পবিত্রতম ধর্মীয় শহর বেনারস (আর রাহুল গাঁধীকে কটাক্ষ করেছিলেন কেরলের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি আসন থেকে ভোটে লড়ার জন্য)। তিনি তার বিজয় বক্তৃতায় বারংবার হিন্দুদের মন কাড়তে নানান ধর্মীয় উপমা হাজির করেন, ভাষণের সময় প্রবল বৃষ্টিকে তুলনা করেন এই বিজয়োৎসবে স্বয়ং মেঘরাজের সামিল হওয়ার উল্লেখ করে।

ইনি হচ্ছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী।পরিহাস হলো, সচেতন ভাবে যিনি হিন্দুত্ববাদীদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে নির্মাণ করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রধান কান্ডারীর ভাবমূর্তি। আর, এই ভাবমূর্তি সজোরে প্রতিষ্ঠিত করতে বিদেশের সংবাদমাধ্যমের কাছে পেয়েছেন “বিরাট বিভাজকের’’ শিরোপা।

এবারের ৩০৩ নির্বাচিত বিজেপি সাংসদের মধ্যে একজনও মুশ্লিম সাংসদ নেই মোদীর এই নতুন ভারতে! আর, তার জন্য তাঁর এক ফোঁটা আফশোষ নেই। অর্থাৎ, ভারতের আইন সভায় সাধ্বী প্রজ্ঞার মতো এক কুখ্যাত হিন্দু সন্ত্রাসবাদীর জায়গা বিজেপি করে দিতে পারে, কিন্তু সেখানে স্থান নেই একজনও সংখ্যালঘুর।

এনডিএ সাংসদদের সামনে বক্তৃতায় মোদী এক নতুন শ্লোগান হাজির করলেন — সবকা সাথসবকা বিকাশ-সবকা বিশ্ওয়াস (বিশ্বাস)। মুশ্লিমদের মন জয় করতে গিয়ে তিনি বললেন, এতদিন ধরে ভারতে চলা ‘ভোট ব্যাঙ্ক রাজনীতি’ সংখ্যালঘুদের মধ্যে কল্পিত আতঙ্ক তৈরি করেছে। মিথ্যা ভয়ের এই পরিমন্ডল তাদের দূরে সরিয়ে রাখছে যাতে কেবলমাত্র নির্বাচনের সময়ে ব্যবহার করা যায়। আর এটাকেই মোদী ‘মেকী’ ধর্মনিরপেক্ষতা বলে চিন্হিত করেছেন। এটাকেই তিনি তাঁদের তোয়াজ করার কথা বলেছেন। অর্থাৎ, এই বলে মোদী ধর্মনিরপেক্ষতার এক মারাত্মক বিপজ্জনক সংজ্ঞা হাজির করলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকেই ভারতের সংখ্যালঘুদের ভেতর যে আতঙ্ক, অবিশ্বাস জন্ম নেয়, সংখ্যালঘুদের উইপোকা ও অনুপ্রবেশকারী হিসাবে অমিত শাহ যেভাবে দাগিয়েছে, একের পর এক গোহত্যার হুজুগ তুলে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা,খুন, প্রভৃতি হাজারো ঘটনাগুলোকে এইভাবে মোদী পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিল। সবকা সাথসবকা বিকাশ-সবকা বিশ্ওয়াস-এর অর্থ যদি এটা হয় যে আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক অংশগ্রহণে ধর্মীয় পরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না (যা ইতিমধ্যেই নির্বাচিত সাংসদের ক্ষেত্রে ঘটেছে), তবে অন্য কথা। আর্থিক-সামাজিক ক্ষেত্রে সম-মর্যাদা নিয়ে অবস্থানের পাশাপাশি আগ্রাসী সংখ্যাগুরুতন্ত্রের হামলার মুখে ভারতীয় রাষ্ট্র যদি সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় সত্ত্বা ও পরিচিতি রক্ষা করাটাকে মেকী ধর্মনিরপেক্ষতা বা সংখ্যালঘু তোষণ বলে এখন থেকেই প্রচার করে, যা খোদ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে বলা হলো তবে আগামীতে কী অপেক্ষা করছে তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে!

সংখ্যালঘুদের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ালেই পাকিস্তানের চর বলে দাগিয়ে দেওয়া আর গোটা নির্বাচনী প্রচারে হিন্দুত্ববাদকে নব্য দেশপ্রেমের স্তরে উন্নীত করার সংঘী প্রচার কৌশল আমরা দেখেছি। আর সেই অ্যাজেন্ডায় অন্য সব দলকে টেনে নামিয়ে আসর মাত করে দেওয়ার পরও এ রাজ্যে মমতা বিন্দুমাত্র শিক্ষা নিল না। মোদীকে বিরোধিতা করতে তিনি বলেই বসলেন, যে গরু দুধ (পড়ুন ভোট) দেয় তিনি তার লাথি খেতে প্রস্তুত। এই নেতিবাচক মেরুকরণের কৌশল যে আগামীদিনে বিজেপির হাতে আরও মোক্ষম অস্ত্র তুলে দেবে তা বলাই বাহুল্য।

ধর্মনিরপেক্ষতার বিপন্ন ভিত্তিভূমির উপর হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারত কোন দিকে এগোবে তা বলবে আগামীর ভারত।

খণ্ড-26
সংখ্যা-14
30-05-2019