২৫ মে ৫২তম নকশালবাড়ি দিবস

Nakshal bari 25 may

দার্জিলিং জেলা

২৩ মে লোকসভা ভোটের ফল ঘোষণার মধ্যে দিয়ে যখন আবারও ফ্যাসিস্ট শক্তি দ্বিতীয়বারের জন্য দেশকে ছারখার করার ছাড়পত্র পেয়েছে তখনই ঠিক দুইদিনের মধ্যে ২৫ মে শহর শিলিগুড়ি সাক্ষী থাকলো লালপতাকা ব্যানার এবং কমরেড চারু মজুমদারের ছবিতে সুসজ্জিত এক দৃপ্ত মিছিলের। ৫৩তম নকশালবাড়ি দিবসে পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটির আহ্বানে শহরের এয়ারভিউ মোড় থেকে শুরু হয়ে মিছিল শেষ হয় সুভাষ পল্লিতে কমরেড চারু মজুমদারের মর্মর মূর্তির সামনে। সেখানে সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং দার্জিলিং জেলা সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার রাজ্য কমিটির সদস্য বাসুদেব বোস, পবিত্র সিংহ, জেলা সদস্য পুলক গাঙ্গুলী, খেমু সিংহ। সকলেই এই ফ্যাসিস্ট সরকার পুনর্বার নির্বাচিত হওয়াতে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও একমাত্র সংগ্রামী বামপন্থী ঐক্য মেহনতি মানুষের ঐক্যের মধ্য দিয়েই এই সরকারের বিরুদ্ধে সঠিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব সেকথা বলেন। বক্তারা সরব হন রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের স্বৈরতন্ত্রের এবং একদল বাম সমর্থক কর্মীর বিরুদ্ধেও যারা মনে করেন রাজ্যে তৃণমূলকে শিক্ষা দিতে বিজেপি একমাত্র বিকল্প। সকলেই বলেন বিজেপি তথা আরএসএস-এর বিরুদ্ধে সমস্ত ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাস্তাই একমাত্র বিকল্প। এই নতুন সন্ধিক্ষন এক নতুন লড়াইয়ের দাবী রাখে। নকশালবাড়ির দিশায় সেই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উপস্থিত সকলেই অঙ্গীকারবদ্ধ হন। তবে বলা বাহুল্য এই সভার আসল মেজাজ বেঁধে দেন কমরেড মীরা চতুর্বদীর গান তরাই জ্বলছে গো ... এবং কমরেড গৌতম চক্রবর্তীর আবৃত্তি ও গান — অন্য সময়ের সন্ধানে আছি। ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চলছে চলবে।

নকশালবাড়ি লাল সেলাম।

Nakshalbari 25

 

কলকাতা

নকশালবাড়ী দিবস উপলক্ষে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ঝান্ডা উত্তোলন, শহীদদের স্মরণ করে আজকের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচার ও সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।

ক্রীক রো-র রাজ্য অফিসে নকশালবাড়ি দিবস পালন করা হয়। এই দিন সমস্ত এলাকায় স্থানীয় কমরেডরা, জেলা নেতৃত্ব ও রাজ্য নেতৃত্ব উপস্থিত থাকেন। যাদবপুর এলাকায় রামলাল বাজার, গড়ফা স্কুল, সন্ধ্যা বাজার, পাল বাজার ও গাঙ্গুলি পুকুর পার্টি অফিস ও বাঁশদ্রোনি অঞ্চলে মেট্রো স্টেশনের সামনে, টালিগঞ্জ এলাকার শ্রীকলোনিতে, বেহালার মুচিপাড়া, কালিতলা পার্টি অফিসে ও উত্তর কলকাতার শোভাবাজার, কলেজ স্ট্রিটে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের শহীদ দিবসে যাদবপুরঢাকুরিয়া লোকাল কমিটির পক্ষ থেকে এক পথসভা সংগঠিত হয় যাদবপুর পালবাজার মোড়ে। নকশালবাড়ি-র বীর যোদ্ধাদের স্মরণ করতে গিয়ে উঠে আসে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের মতামত। এই সভার সূচনা হয় প্রণব মুখার্জী ও নীতীশ রায়-এর গণ সঙ্গীতের মাধ্যমে। ‘‘লড়াই করো লড়াই, যত দিন না বিজয়ী হও” ‘‘নকশালবাড়ি-র মা” গানের সুরে সভা-র মূল সুর স্পষ্ট হয়ে যায়। এর পর একে একে বক্তব্য রাখেন নীলাশিষ বোস, আকাশ দেশমুখ ও ইন্দ্রানী দত্ত। এই দিনই বাঁশদ্রোনি অঞ্চলের নাকতলায় ১৫/১৬ জন পার্টি সদস্য ও সমর্থকদের নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় ছিলো নকশালবাড়ির তাৎপর্য ও ফ্যাসিস্ত বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের চ্যালেঞ্জ। বক্তব্য রাখেন অতনু চক্রবর্তী। এরপর কমরেডরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ও আগামী কর্মসূচীর প্রস্তাব রাখেন।

হাওড়া

সারা দেশের সাথে হাওড়া জেলার বালীতে, সিপিআই(এমএল) বালী-বেলুড় লোকাল কমিটির উদ্যোগে নকশালবাড়ি দিবস পালিত হলো। জোড়া অশ্বত্থতলার মোড়ে সকালবেলায় লাল পতাকা উত্তোলন করেন হাওড়া জেলা কমিটির সদস্য রঘুপতি গাঙ্গুলী। উপস্থিত সবাই শহীদ বেদীতে মাল্যদান করেন এবং শহীদদের স্মরণে নীরবতা পালন করেন। উপস্থিত ছিলেন দীর্ঘদিনের পার্টি সংগঠক মোহন হালদার, তপন ঘোষ ও মনোরঞ্জন ব্যানার্জী। উপস্থিত ছিলেন রাজ্য কমিটির সদস্য তপন বটব্যাল, হাওড়া জেলা সম্পাদক দেবব্রত ভক্ত। বক্তব্য রাখেন তপন বটব্যাল, দেবব্রত ভক্ত এবং রাজ্য কমিটির সদস্য ও আইসার রাজ্য সভাপতি নিলাশিস বসু। এছাড়াও হাওড়ার মধ্যহাওড়া ও আরুপাড়াতেও পতাকা উত্তোলন হয়। ২৫ মে ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি দিবস পালিত হল হাওড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায়। মধ্য হাওড়ার হালদার পাড়ায় ওই দিন সকালে পার্টি সদস্যরা লাল পতাকা উত্তলনের মাধ্যমে শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া আড়ুপাড়া অঞ্চলে ২৫ মে-এর কর্মসূচী নেন স্থানীয় কমরেডরা। বালি বেলুড় লোকাল কমিটির উদ্যোগে ওই দিন সকালে জোড়া-অশ্বত্থতলা শহীদবেদীতে ভালো মাত্রায় ছাত্র-যুব সহ পার্টির স্থানীয় ও জেলা নেতৃত্বের উপস্থিতিতে পালিত হয় নকশালবাড়ি দিবস। এলাকা পতাকা চাইনিজ্ দিয়ে সুসজ্জিত করে তোলে আইসার সদস্যরা। শহীদবেদীতে রক্তপতাকা উত্তলন করেন পার্টির বর্ষীয়ান সদস্য রঘুপতি গাঙ্গুলী। শহীদবেদীর কর্মসূচী শেষে সংক্ষিপ্ত পথসভায় বক্তব্য রাখেন রাজ্যকমিটির সদস্য তপন বটব্যাল, নিলাশীস বসু এবং হাওড়া জেলা সম্পাদক দেবব্রত ভক্ত। সভা থেকেই শপথ নেওয়া হয় দেশে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার।

হুগলী

২৫ মে ৫৩ তম নকশালবাড়ি দিবস হুগলী জেলার গ্রাম ও শহরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হল। সাধারণ নির্বাচনে হুগলী লোকসভায় পার্টির প্রার্থী ছিল ফলত একদিন আগে ভোট গণনার দিন পর্যন্ত কমরেডরা সেই সংক্রান্ত নানাবিধ কাজে যথেষ্টই ব্যস্ত ছিলেন এবং নির্বাচনের ফল অভূতপূর্ব ও উদ্বেগজনক ভাবে বিজেপির পক্ষে যাওয়ার ফলে জেলার বিভিন্ন জায়গায় গেরুয়া বাহিনীর বিপজ্জনক উন্মাদনা ও দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। এসব সত্ত্বেও ঐতিহাসিক দিনটি তার বিপ্লবী ঐতিহ্য, আবেগ ও আরো জাঁকিয়ে বসা ফ্যাসিবাদের সামনে আরো বেশি প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হাজির হল। এদিন সকালে বলাগড় ব্লকের গুপ্তিপাড়া বড়বাজারে রক্তপতাকা উত্তোলন করেন ব্রাঞ্চ সম্পাদক কমরেড কৃত্তিবাস বৈদ্য। উপস্থিত অন্যান্য কমরেডরাও শহীদ বেদীতে মাল্যদান করেন এবং নকশালবাড়ির বীর শহীদদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়। পাণ্ডুয়া ব্লকের বৈঁচীতে পার্টি অফিসে পতাকা উত্তোলন ও শহীদ স্মরণের পর কমরেড মুকুল কুমারের নেতৃত্বে দিনটির তাৎপর্যনিয়ে কমরেডরা আলোচনা করেন। বিকালে হুগলী শিল্পাঞ্চলের ভদ্রেশ্বর এঙ্গাস পার্টি ব্রাঞ্চের উদ্যোগে কারখানার ইউনিয়ন অফিসের সামনে পতাকা উত্তোলন করেন কিছুদিন আগেই বামপন্থী শিবিরের অন্য একটি সংগঠন থেকে আগত শ্রমিক নেতা কমরেড সুশান্ত মুখার্জী। উপস্থিত ছিলেন পার্টিতে পুরানো ও নতুন শ্রমিক কমরেডরা, ঝড়, বৃষ্টির মধ্যেই শহীদ স্মরণ হয়। কোন্নগরেও সন্ধ্যা ছ’টায় কর্মসূচী শুরুর কথা ছিল কিন্তু তুমুল ঝড়, বৃষ্টি শুরু হয় আর নির্মাণ শ্রমিক কমরেডরা তার মধ্যেই কাজ সেরে পরিবার পরিজনদের নিয়ে পার্টি অফিসে আসেন, মহিলা কমরেডরাও আসেন, ফলে শুরু হতে সামান্য দেরী হয়। দেশজোড়া গেরুয়া ঝড় ও বিশেষত বামপন্থী শিবিরের ব্যাপক নির্বাচনী বিপর্যয়ের আবহেও নকশালবাড়ির লাল টুকটুকে স্বপ্নের প্রতি এমন হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা আর শ্রদ্ধা মেহনতী মানুষরাই দেখাতে পারেন। শহীদ স্মরণের পরে কমরেডরা সবাই মিলে ঘরের মধ্যে আয়োজন করেন তথ্যচিত্র প্রদর্শনী। আগুনঝরা দিনের শহীদ কমরেড সরোজ দত্তের জীবনের ওপর আধারিত তেভাগা, তেলেঙ্গানা ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের বহু জানা, অজানা ইতিহাস সমৃদ্ধ মিতালি ও কস্তুরী বসু নির্দেশিত তথ্যচিত্র ‘S.D: Saroj Dutta and his times’ দেখানো হয়। উপস্থিত ছিলেন অন্যতম নির্দেশক মিতালি। রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত প্রায় ৩০-৩৫ জন শ্রমজীবি সাথী একসাথে বসে পুরো সিনেমাটি দেখেন ও শেষে নির্দেশকের থেকে আরো কিছু খুঁটিনাটি আলোচনা করে জেনে নেন। এরপরেই এদিনের কর্মসূচী সমাপ্ত হয়।

পূর্ববর্ধমান পুর্ব

বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর ব্লকের কুসুমগ্রামে কর্মীরা জড়ো হয়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন এবং শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

দক্ষিণ ২৪ পরগণা

২৫ মে নকশালবাড়ি দিবস উপলক্ষে দঃ ২৪ পরগণার বাখরাহাট ও বজবজে জেলা পার্টি অফিসের সামনে সকালে নকশালবাড়ির বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয়।বাখরাহাটে বাখরাহাট স্কুল মোড়ের সামনে নকশালবাড়ি আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয়।রক্তপতাকা উত্তোলন করেন জেলা কমিটির সদস্য কমরেড দিলীপ পাল, শহীদবেদীতে মাল্যদান করেন বিষ্ণুপুর-সাতগাছিয়া লোকাল কমিটির সম্পাদক কমরেড নিখিলেশ পাল। সভা পরিচালনা ও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন জেলা কমিটির সদস্য কমরেড শুভদীপ পাল। সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লোকাল কমিটির অন্যতম সদস্যা পূর্ণিমা হালদার, সদস্য সন্দীপ ধাড়া, দিলীপ পাল, আলফাজউদ্দিন ও অন্যান্য সাথীরা।

বজবজে জেলা অফিসের সামনে রক্ত পতাকা উত্তোলন করেন জেলা সম্পাদক কিশোর সরকার। উপস্থিত ছিলেন অঞ্জন ঘোষ, দেবাশিষ মিত্র ,সেখ আবুল মুজতবা, সেখ সাবির, জেলা কমিটির সদস্যা দেবযানী গোস্বামী ও অন্যান্য সাথীরা।

বিকালে জেলা অফিসে এক সাধারণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ২০ জন কমরেড উপস্থিত ছিলেন। জেলা সম্পাদক কিশোর সরকার তার দীর্ঘ বক্তব্যে বলেন — বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে একদিকে ফ্যাসিবাদের উত্থানের ফলে এলাকায় এলাকায় বিভ্রান্তিমূলক প্রচার করে দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। বাম সামাজিক শক্তিকে নিজের অনুকুলে ধরে রাখতে ও গণতান্ত্রিক ভেক তুলে ধরতে তৃণমূল দ্বারা দখল করা বিভিন্ন পার্টি অফিস সেই রাজনৈতিক দলকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ফেরি করছে বিজেপি। এর মধ্য দিয়ে বিজেপিতে আগত সমস্ত, বিশেষ করে সিপিএমের সামাজিক শক্তিকে নিজেদের চিরস্থায়ী সামাজিক শক্তিতে পরিণত করতে চাইছে। বিজেপি উত্থানে সমাজের একটা বড় অংশ বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল দ্বারা আমাদের অফিস দখল করা এবং হামলার বিরুদ্ধে অল্প শক্তি নিয়ে আমাদের পার্টি যেভাবে সাহসের সাথে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের অফিস পুর্নদখল করেছে যা এলাকার ব্যাপক মানুষের মধ্যে সদর্থক প্রভাব ফেলেছে। আগামীদিনে এলাকার আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ ক্রমশ আমাদের উপর ভরসা করবে। বর্তমান পরস্থিতিতে আমাদের সাহসের সাথে লাল ঝান্ডা তুলে ধরতে হবে। তাই এলাকায় এলাকায় আমাদের শক্তিকে সংহত করতে হবে। বিভ্রান্তিমূলক প্রচার রুখতে এবং দাঙ্গার পরিস্থিতি রুখতে ব্রাঞ্চের অধীন সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব নিতে হবে এবং এলাকা জুড়ে বারংবার শতাধিক মানুষকে সামিল করে লালঝান্ডার মিছিল সংগঠিত করতে হবে। একাজে জেলা নেতাদের মূল ভূমিকা নিতে হবে। জয় আমাদের হবেই। সাহসের সাথে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অনুকূল পরিস্থিতিতে পরিণত করাই চারু মজুমদারের পথ নকশালবাড়ি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Nkb 25 May

 

খণ্ড-26
সংখ্যা-14
30-05-2019