অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা “উচ্চবর্ণের” জন্য সংরক্ষণ : মোদীর পথেই হাঁটলেন মমতা

সিপিআই(এমএল) রাজ্য সম্পাদক পার্থঘোষ ৪ জুলাই এক প্রেস বিবৃতিতে বলেন — সংবিধানের ৩৪০ নং ধারায় “সামাজিক ও শিক্ষাগত” দিক থেকে পিছিয়ে থাকা তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি ও ওবিসিদের শিক্ষাক্ষেত্রে এবং সরকারী চাকুরীতে সংরক্ষণ প্রথা চালু করার কথা, তাকে নস্যাৎ করে উচ্চবর্ণের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণ প্রথা চালু করার এই অপচেষ্টা এবারই প্রথম নয়। ১৯৯১ সালে নরসিমা রাও মন্ত্রীসভা “অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ উচ্চবর্ণের” জন্য সরকারী চাকুরিতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণের প্রথা চালুর চেষ্টা করেছিল। সুপ্রীমকোর্টের ন’য় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার এই সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দিয়েছিল, এই যুক্তিতে যে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগণের উন্নতি কখনোই সংরক্ষণ দিয়ে হতে পারেনা। দারিদ্র দূরীকরণের জন্য সরকারের ভিন্ন পথ গ্রহণ করা উচিত। ২০১৯-র জানুয়ারী মাসে লোকসভা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে নরেন্দ্র মোদী সরকার উচ্চবর্ণের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের প্রথা চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাৎসরিক আয় ৮ লাখ টাকার নীচে (মাসিক আয় ৬৬ হাজার ৬৬৬ টাকা ৬৭ পয়সা) এবং ৫ একরের নীচে জমির মালিকানা সম্পন্ন পরিবারকে ‘অর্থনৈতিকভাবে’ পশ্চাৎপদ বলে গণ্য করা হবে। সরকারী চাকুরিতে ১০ লক্ষ শূন্য পদ পূরণ ও বছরে ২ কোটি বেকার যুবকের চাকুরির প্রতিশ্রুতি যখন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, তখন ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ‘জুমলা’ আর একবার ফেরি করা হল। বস্তুত আরএসএস এবং সংঘ পরিবারের পক্ষ থেকে তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি ও ওবিসি-র জন্য সংরক্ষণ প্রথাকেই তুলে দেওয়ার জন্য লাগাতার অপচেষ্টা চলছে। বস্তুত ১০ শতাংশ সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা মাত্র।

১৭ বা ১৮ নম্বর রাজ্য হিসাবে মমতা ব্যানার্জীর সরকার মোদীর দেখানো পথে “অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা” উচ্চবর্ণের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্য সরকারী চাকুরিতে কত শূন্য পদ আছে, শিক্ষক নিয়োগে বিলম্ব এবং দুর্নীতি (কাটমানি), এসএসসি পাশ করার পরেও ছাত্র-ছাত্রীদের ২৯ দিন অনশনে বসতে হয় কেন তার জবাব না দিয়ে ‘নতুন’ চমক দিল মমতা সরকার। এখনও পর্যন্ত কারা এই সুবিধা পাবে তার নিয়ম-কানুন তৈরি হয়নি, তবে “অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা” উচ্চবর্ণের মানুষজনের শংসাপত্র সংগ্রহে কোন অসুবিধা হবে না বলে সরকার জানিয়েছে। সংসদীয় দলগুলিও মমতা সরকারের এই ‘অভিনব’ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। শুধু আবেদন করেছে শংসাপত্র সংগ্রহে যেন কোনো ‘কাটমানির’ প্রচলন না হয় ! বেকার যুবক-যুবতীদের সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এই ‘জুমলা‌‘ বা চমকের অন্তঃসারশূন্যতা কিছুদিনের মধ্যেই উদঘাটিত হয়ে যাবে। বেসরকারি সংস্থায় নিয়োগে বা বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (যেখানে চড়া ফি-তে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয়) এই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে কিনা তার কোনো উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন এই নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় আসবে কিনা সে সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারকেই জানাতে হবে।

খণ্ড-26
সংখ্যা-19
04-07-2019