বিজেপির “জয় শ্রীরাম” নৃশংসতা ও সন্ত্রাসের ধ্বনি হয়ে উঠেছে -- মালদায় সানাউল শেখকে পিটিয়ে হত্যা করল আরএসএস ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী

ক্যানিং লোকালে শাহরুফ হালদারের ওপর অত্যাচার যে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছিল তাকে সত্যি করেই যেন ঘটে গেল মালদা জেলার বৈষ্ণবনগরের ভিড় হত্যা। আরএসএস-বিজেপি রীতিমত অভিযান শুরু করেছে। ২০ জুন শেয়ালদামুখী ক্যানিং লোকালের বেশ কয়েকটি ডিব্বাতে মুসলমান সহযাত্রীদের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার করেছিল ‘হিন্দুসংহতি’ নামক ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। শাহরুফ হালদার নামে একজন শিক্ষক গুরুতর আহত হয়েছিলেন। কয়েকজন মৌখিক প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু তার বেশি কেউ এগোননি।

মালদার বৈষ্ণবনগরে ইঁটভাঁটার শ্রমিক সানাউল খানকেও দীর্ঘক্ষণ ধরে পেটানো হয়। ঝাড়খন্ডের তাবরেজ আনসারিকে যেমন বেঁধে রেখে আঠারো ঘন্টা ধরে পেটানো হয়, খানিকটা সেরকমই। এক্ষেত্রেও হামলাকারীরা আরএসএস/বিজেপি/বজরং দলের লোক। গত ২৬ জুন সানাউলকে তাঁর চক শেহের্দি গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় কিলোমিটার খানেক দূরে বৈষ্ণবনগর বাজারের মন্দিরের সামনে। সেখানে তাকে ঘিরে ধরে নৃশংসভাবে মারতে থাকে বাপ্পা ঘোষের নেতৃত্বে আরএসএস-এর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। অন্ডকোষ থেঁতলে দেয় সানাউলের। ভিডিও তোলে। সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। কয়েকঘন্টা ধরে চলে অত্যাচার। পুলিশ এসে সানাউলকেই ধরে নিয়ে যায়। তিন ঘন্টা থানায় আটকে রাখে, এই সময় পরিবারের লোকজনকেও তাঁর সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সানাউলের শারিরীক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে দেখে সম্বিৎ ফিরে পায় থানার অফিসার। তড়িঘড়ি মালদা হাসপাতালে পাঠান হয়, সেখান থেকে কোলকাতায় পিজি হাসপাতেলে। পিজিতেই পরদিন মৃত্যু হয় সানাউলের।

‘বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ’-র একটি তথ্যানুসন্ধানী দল স্থানীয় মানুষের সাথে কথাবার্তা বলে এসে জানিয়েছেন যে এই মবলিঞ্চারদের মধ্যে প্রদীপ চৌধুরি, পার্থ সারথি দাস, মিঠুন চৌধুরিরাও ভিএইচপি ও বজরং দলের সদস্য। ৩০ জুন প্রকাশিত ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় একজন পুলিশ অফিসারকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে : “সানাউলকে একটি বাইকে স্টার্টদিতে বলা হয় যাতে করে দেখানো যায় যে সে ওই বাইকটা চুরি করে পালাচ্ছিল। এরপর পাঁচ-ছজন মিলে ওকে পেটাতে থাকে। ভিডিও দেখে লোকগুলোকে চিহ্নিত করা যাবে”। পার্টির মালদা জেলা সম্পাদক কমরেড ইব্রাহিম শেখের নেতৃত্বে লুৎফর রহমান, কয়েশ শেখ, রুদ্র প্রভাকর দাস ও অঙ্কুর বাগ ২জুলাই সানাউলের পরিবারের সাথে দেখা করে ও গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে। তাঁরাও একইরকম তথ্য দিয়েছেন। সুপরিকল্পিতভাবেই এই সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে। পার্টির তথ্যানুসন্ধানী দল আরেকটি ঘটনাকে সামনে এনেছে। সানাউলের মৃত্যুকে ঘিরে উত্তেজনার মাঝেই বাপ্পা ঘোষের পাড়ার এক তরুণী রাস্তার এক মোড়ের দোকানদারদের কাছে অভিযোগ করেন যে ‘সানাউলদের পাড়ার কাছে একজন মুসলমান যুবক মেয়েটির বাইক থামিয়ে উত্যক্ত করেছে’। গ্রামবাসীরা তুরন্ত সেই স্পটে যায়। কিন্তু কেউ সেরকম কোনও ঘটনা দেখেনি বলে। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে সে কার বাইকে ছিল। সে তার দেবরের কথা বলে। কিন্তু দেবরের কাছে যাওয়া হলে সে হতবাক হয়ে বলে যে সেরকম কোনও ঘটনাট ঘটেনি! সন্দিগ্ধ দোকানদারেরা পুলিশ ডাকে। পুলিশ মেয়েটিকে আটক করে ও বেশ কয়েকঘন্টা জেরা করে। পুলিশ কি জানতে পেরেছে তা এখনও জানা যায়নি। ৩ জুলাই পার্টির প্রতিনিধিদল বৈষ্ণবনগর থানায় ডেপুটেশন মিট করার পর আরও বিস্তারিত জানা যাবে। তবে একথা স্পষ্ট বোঝা যায় যে আরএসএস-বিজেপি সমাজের গভীরে এক অন্ধ সংখ্যালঘু-বিদ্বেষ ও জিঘাংসা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ক্যানিং লোকালের সাম্প্রদায়িক হামলার পর কয়েকটি সামাজিক সংগঠন চাপ তৈরি করায় পুলিশ দ্রুতই চারজনকে গ্রেপ্তার করে। ‘সহমন’ ও ‘বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ’ মিলে প্রথমে বালিগঞ্জ জিআরপি ও পরবর্তীতে শেয়ালদা স্টেশনে জিআরপির সোনারপুর সার্কেলের ইনচার্জের সাথে দেখা করে কথা বলে (উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিনিধিদলে কমরেড অমিত দাশগুপ্ত ও মলয় তেওয়ারী ছিলেন। এছাড়াও ছিলেন মিলন দত্ত, সুদেষ্ণা দত্ত, মহাশ্বেতা সমাজদার, চন্দ্রাস্মিতা চৌধুরি সহ কয়েকজন)। সার্কেল ইনচার্জ জানান যে নির্দিষ্ট ইনফর্মেশনের ভিত্তিতেই চারজনকে গ্রেপ্তার করেছেন তাঁরা এবং আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তিনি একথাও জানান যে ২০ জুনের ক্যানিং লোকালের ঘটনাটিতে শাহরুফ হালদার ছাড়াও আরও দুইজন আক্রান্তের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। ‘হিন্দু সংহতির নেতারা তো এই হামলাগুলির উস্কানিদাতা। তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছেনা?’ এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন যে ‘কারা উস্কানি দিচ্ছে তাও খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ নেওয়া হবে’।

সানাউলের হত্যাকারীদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মূল পান্ডা বাপ্পা ঘোষ এখনও ফেরার। তাবরেজ আনসারির মতো সানাউল্লার ক্ষেত্রেও পুলিশের নিষ্ঠুর অবজ্ঞার মনোভাব সামনে এসেছে। প্রথমেই হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করার বদলে সানাউলকেই থানায় আটকে রাখা হয় হাসপাতালে না পাঠিয়ে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে এঁরা দুজনই হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেন। ইঁটভাটার শ্রমিক সানাউল্লা, তাবরেজও দিনমজুর। গরীব মজুরদের প্রতি পুলিশের এই অবজ্ঞাও কি অপরাধের মধ্যে পড়েনা? থানার আইসিরও কি এই হত্যায় শাস্তি প্রাপ্য নয়?

পুলিশের নিস্ক্রিয়তা ও সংখ্যাগুরু-তোষণের ফলে ভিড়-হত্যার প্রবণতা তোল্লাই পাচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ রুখে না দাঁড়ালে বাংলার মাটিতে নেমে আসা এই দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবেনা। এই ধরনের যে কোনও হামলা দেখলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তা আটকানোর চেষ্টা করতে হবে বিপ্লবী কর্মীদের।

খণ্ড-26
সংখ্যা-19
04-07-2019