‘গোলি মারো’র রাজনীতির জবাব দিন’

দেশ কো গদ্দারো কো, গোলি মারো শালো কো’! বিজেপির এই মানুষমারা হুঙ্কার দিল্লীর পর শোনা গেল কলকাতাতেও। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও হিংসার এই উদগিরণ কত নৃশংসতা সংঘটিত করতে পারে তার হাড়হিম ধরানো দৃশ্য প্রত্যক্ষ হল দিল্লীতে। এই জিগির তোলাকে খুনে চেহারা দেওয়ার শুরুর শুরুটা হয়েছে উত্তরপ্রদেশে যোগী রাজত্বে। সংহারক শক্তি চরিত্রে তো ফ্যাসিবাদী। তাই ওদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল একটা উপলক্ষ খোঁজা, সিএএ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে সেই ‘উদ্দেশ্য’টা ওরা তৈরি করে ফেলল। ওদের অজুহাত, আন্দোলনে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করতে দেখলে দরকারে মেরে ফেলা হবে গুলি করে। কিন্তু আন্দোলন সমসময় সূচীকর্ম মেনে চলে না, আন্দোলনে কিছু ভাঙচুরের ঘটনা ঘটা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। আর, দাঙ্গাবাজ বিজেপি অন্যদের কি বলবে! গেরুয়া ধ্বজাধারীরা ভাঙচুর তো বটেই, সব ধরনের ধ্বংসলীলা চালাতে সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষমতার আধিপত্য কায়েম করতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা দিয়ে শুরু করে, ‘গোধরা’কান্ডে’র অজুহাতে গুজরাট গণহত্যা, গোমাংস খাওয়া-গো ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা জারী, ‘লাভ জেহাদ’-এর উন্মাদনা তুলে পিটিয়ে  হত্যা; শুধু সংখ্যালঘু নয় — দলিত হত্যায়ও গেরুয়া ফ্যাসিবাদীরা কুখ্যাত। এছাড়াও ওরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘সামাজিক’ ও উগ্র ‘জাতিয়তা’র আলোড়ন সৃষ্টি করে তথাকথিত  সমীকরণ কষে যে, বেছে নাও হয় কবরিস্তান নয়তো পাকিস্তান, ‘পোশাক দেখে চেনা যায় আন্দোলনকারীদের’, ‘সরকারের সমালোচনা ও বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রের ও দেশের বিরোধিতা’ — ‘দেশদ্রোহীতা’! এই অপপ্রয়াসে ওদের সাম্প্রতিকতম সংযোজন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাশ হয়ে যাওয়া সিএএ-র বিরোধিতার অর্থ আইনের শাসনকে অমান্য করা, এই অমান্যতার অর্থও দেশদ্রোহীতা! মানুষের মস্তিষ্ককে কালা আইনে এইভাবে বিষিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াতেই প্রতিবাদ আর আন্দোলনেকে গুঁড়িয়ে দিতে চালু করা হচ্ছে ‘গোলি মারো’ ধ্বনি। উত্তরপ্রদেশ-দিল্লীতে সোল্লাসে উন্মত্ত হওয়ার ঐ নারকীয় ভাষাটা বাংলার বিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই আমদানি করেছে, তারই প্রতিধ্বনি উঠল অমিত শাহকে আবাহন জানানো পদাতিকের মুখে। এ আর নিছক নিরামিষ নিনাদ নয়।

সামনেই পৌরসভা নির্বাচন, সর্বোপরি পরের বছর বিধানসভা নির্বাচন। পদত্যাগের দাবি উঠেছে অমিত শাহর, কিন্তু তিনি কানে দিয়েছেন তুলো, পিঠে দিয়েছেন কুলো, বিজেপি বিরাজ করতে চাইছে চরম ঔদ্ধত্যের অবস্থানে। তাই শাহ কলকাতায় এসে ‘দুই কৌশল’ নিলেন — একদিকে সংঘটিত দিল্লীকাণ্ড সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থাকা, অন্যদিকে সরব হলেন মমতা রাজত্বের ‘আর অন্যায় নয়’ ধূয়ো তুলে ‘সোনার বাংলা’ গড়তে বিজেপিকে বিকল্প হিসেবে নিয়ে আসার আহ্বানে। বাংলায় তৃণমূল রাজত্বে অনেক অপরাধ সংঘটিত হয়ে চলেছে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজেপি ‘অচ্ছে দিন’ নিয়ে আসার নামে একদিকে দেশ-বেচার তথা দেশের মানুষের রুজি-রোজগার-খাওয়া-পরা-স্বাস্থ্য-শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক সভ্যতা-শান্তি-সম্প্রীতির সমাজনীতির সর্বনাশ ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে খুনে রাজ কায়েম করছে। অমিত শাহ কলকাতা সভায় দম্ভোক্তি করলেন, এতদিন শক্তিমত্তার প্রদর্শনে দুনিয়ায় সবসেরা গণ্য হয়ে এসেছে আমেরিকা আর ইজরায়েল, এখন ভারতও সেই জায়গায় পৌঁছেছে। এইভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প নিসৃত ভারতকে এক যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রেও পরিণত করার জনবিরোধী দেশবিরোধী প্রতিবেশি দেশবিরোধী বিধ্বংসী চেষ্টা চলছে। তাই বিজেপিকে কিছুতেই আর সহ্য করা যায় না। আর ‘সদাশয়’ ছদ্মবেশ ধারণ করার, ‘ভালোমানুষী’ দেখানোর অবকাশ দেওয়া যায় না। সিএএ-কে ওদের ভোট করার তুরুপের তাস হতে দেওয়া যাবে না। সিএএ নাগরিকত্ব দেওয়ার নয়, কেড়ে নেওয়ারই পাতা ফাঁদ। এটা যত উন্মোচিত হচ্ছে ততই বিজেপি ক্ষিপ্ত-উন্মত্ত হচ্ছে, ওদের আসল চেহারাটা চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে। তাই ওদের গোলি মারার হুংকারের জবাবে বাংলায় একদিকে দায়বদ্ধ করে চলতে হবে মমতা সরকারকে যাতে ফ্যাসিবাদী অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপগুলি নিশ্চিত করা হয়, অন্যদিকে তেমনি সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিরোধের উপায় হল সিএএ-এনপিআর-এর উন্মোচন চারগুণ বাড়িয়ে তোলা, তার জন্য সভা-সমাবেশ-জনসংযোগ অভিযান নিরন্তর চালিয়ে যাওয়া। রাজ্যের সমস্ত ধরনের বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তি পথে নামছে, প্রায় প্রতিদিন সংঘটিত হচ্ছে কোনো-না-কোনো শক্তির প্রতিবাদ-প্রতিরোধ মুখর আত্মঘোষণা। তবু এতটুকু নিশ্চিন্তির মানসিকতায় আচ্ছন্ন থাকলে চলবে না। গড়ে তুলতে হবে আরো ব্যাপক জনচেতনা-জনজোয়ার।

খণ্ড-27
সংখ্যা-6