আজকের দেশব্রতী : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ (অনলাইন সংখ্যা)
aaj

প্রত্যেকটি লেখার আলাদা আলাদ ফাইল দেখার জন্য উপরের লাইনে ক্লিক করুন
হেডিং-এ ক্লিক করলে সেই লেখাটি ওয়েব সাইটে খুলবে

 

mued

‘ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতি কোনও বৈষম্য করা হয় না, এখানে মুসলিমরা স্বস্তি ও শান্তিতেই রয়েছে।’ এ মন্তব্য দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর। কী উপলক্ষ্যে? ইরানের ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে ভারতে বহুত্বের সুস্থিতি চেনাতে। প্রমাণ হিসাবে তিনি তুলে ধরলেন খোদ তাঁর লক্ষ্ণৌ লোকসভা নির্বাচনী কেন্দ্রের নজির, যেখান থেকে বিজয়ী হওয়ার পিছনে শিয়া মুসলিমদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। শুধু তাই নয়, মনে করেন তাঁর আগে প্রয়াত অটল বিহারী বাজপেয়ীও অনুরূপ সমর্থন পেতেন। রাজনাথজী লক্ষ্ণৌ থেকে ইরাক যাত্রার বিমান ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন শিয়া তীর্থযাত্রীদের জন্য। ভাবখানা এমন যেন, আর কি চাই? উপযাচক হয়ে এইসব জানিয়ে ইরানী প্রতিনিধি জেনারেলকে কি বোঝাতে পেরেছেন সেটা বড় কথা নয়। বৈদেশিক কূটনীতিতে অনেক কথা বলতে হয় শুনতেও হয়। কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর এই বার্তা প্রকৃত তথ্যের নিরীখে সত্যের অপলাপ তথা মিথ্যার বেসাতি ছাড়া অন্য কিছু বলে গণ্য হতে পারে না।

সংবাদজগত যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ভারতে মোদী জমানায় মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে খুবই নিরাপত্তাবিহীনতায়। এখানে উত্থান ঘটছে এমন এক রাজনৈতিক শক্তির যার মতাদর্শ হল হিন্দুত্ব, হিন্দু রাষ্ট্রবাদ। এদের ক্ষমতায় আসার এবং ক্ষমতার জোরে কাজ করার বিধ্বংসী পথ একই। প্রকৃত তথ্যের দিকে ফিরে তাকানো যাক। লড়াই কেবল ঘটনা ও রটনার মধ্যে নয়, লড়াই সত্য-অর্ধ সত্যের মধ্যে, সত্য-মিথ্যার মধ্যে। ভূয়োর স্বরূপ উন্মোচনে আসলকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করে প্রথমবার সাম্প্রদায়িক হিংসা সংঘটিত হয় ১৯৯২ সালে, মোদীর গুজরাটে ক্ষমতায় আাসার এক দশক আগে। দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক হিংসার অভিযানটি চলে গুজরাটের বুকেই ২০০২ সালে, কেন্দ্রের ক্ষমতায় মোদীর আসার এক দশকের কিছু বেশী সময় আগে। মুম্বাই হিংসায় নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় এক সহস্র, আহতের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। গুজরাট হিংসা পরিণত হয় ব্যাপক গণহত্যায়, নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় দুই সহস্রাধিক, আহতের সংখ্যা কয়েক সহস্র। এছাড়া উত্তরপ্রদেশে যোগী সরকার ক্ষমতায় আসার পশ্চাৎপটে সংঘটিত হয়েছিল মুসলিম নির্মূলীকরণের মুজফ্ফরনগর অভিযান। যার পরিণামে নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় পঞ্চাশ, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হন পঞ্চাশ হাজার। আর, ২০২০ সালে আরও একবার সংগঠিত করা হল সাম্প্রদায়িক হিংসা, খোদ দিল্লীর বুকে, সিএএ বিরোধী শাহীনবাগ আন্দোলনকে চূর্ণ করতে। নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় পঞ্চাশ, আহতের সংখ্যা দাঁড়ায় দুই শতাধিক। এইসব হিংসার নারকীয়তায় আবালবৃদ্ধবনিতা কারও মেলেনি ছাড়। আক্রমণের ৫২ শতাংশ ঘটানো হয়েছে রটনা রটিয়ে। হত্যার ৮৬ শতাংশ উপলক্ষ ছিল গো-হত্যা, গো-মাংস ভক্ষণ, গো-মাংস বা গোরু পাচারের সম্পর্ক জড়িয়ে। ৫০ শতাংশ আক্রমণ সংঘটিত হয় বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। সবচেয়ে জঘন্য সময়টা গেছে ২০১৭ সালে। মোদীর দ্বিতীয়বার ক্ষমতাসীন হওয়ার বছর না ঘুরতে যা দিল্লীতে ঘটানো হল তা কম নারকীয় নয়। অপরাধ সেখানেই থেমে থাকেনি। ‘মিনি পাকিস্তান’ বা ‘ইসলামোফোবিয়া’র জিগির তুলে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জামিয়া মিলিয়া, কাফিল খান থেকে সাফুরা জাগরার, পাইকারি হারে চালানো হয়ে আসছে দমনপীড়ন, মিথ্যা মামলায় বিনা বিচারে কারান্ধকারে বন্দী করে রাখাই হয়ে দাঁড়িয়েছে চল। হয় হিন্দুত্বের বশ্যতা স্বীকার করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকো, নয়ত শত্রু প্রতিপন্ন হও, উচ্ছেদ হও, বিতাড়িত হও! এই উদ্দেশ্যেই ফের কেন্দ্রের কুর্শি হাসিলের পরপরই নামিয়ে আনা হয়েছে দু-দুটি বজ্রাঘাত। একদিকে মুসলিম জনসংখ্যাপ্রধান কাশ্মীরের স্বশাসিত রাজ্যের বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। তারপরও চলছে কাশ্মীরের অন্তরাত্মাকে ক্রমাগত বিধ্বস্ত করে দেওয়ার ফ্যাসিবাদী হস্তক্ষেপ। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়কে দাবিয়ে রাখার জন্যই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে সিএএ-এনপিআর-এনআরসি’র জোয়াল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বলেই রেখেছেন, এনআরসি হবে গোটা দেশে। যাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার তা নেওয়া হবে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগেই। নাগরিকত্ব প্রদানের এই নয়া আইনগত সংশোধনীর মূল নিশানা মুসলিম জনগণ।

সিএএ প্রবর্তনের প্রয়াসের মধ্যে ঘোর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল। বিজেপি জমানায় মুসলিমরা মোটেই ভালো নেই।

তবে কোনোকিছুই একতরফা পার পেয়ে যাচ্ছে না। উত্থান ঘটছে পাল্টা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধেরও।

carcc

গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ কেন্দ্রীয় কমিটির একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দিনটি ছিল আমাদের প্রিয় কমরেড স্বপন মুখার্জীর চতুর্থ প্রয়াণ দিবস, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে সভার সূচনা হয়। এরপর, কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বশেষ বৈঠকের পর থেকে আমরা আমাদের যে সব কমরেড, শুভার্থী ও বিশিষ্ট প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বদের (কবি রাহাত ইন্দোরি, নারীবাদী শিক্ষাবিদ ইলিনা সেন, প্রশাসক মনোজ শ্রীবাস্তব, কমরেড বসির আহমেদ, ভগবান দাস (ঝাড়খণ্ড), কমরেড সিডি ডিমরি (দিল্লি), কমরেড অমরীক সিং সামাওন এবং সরবজিৎ কাউর (মানসা, পাঞ্জাব), কমরেড রহিম শেখ, রাণু দাশগুপ্ত ও আনু মিত্র (পশ্চিমবঙ্গ), কমরেড মোতি মাহাতো, বাবন পাশোয়ান, মহাবীর রাম, কালেশ্বর রাম, মন্টু মানঝি, নাথুনি রাবনি ও জগদীশ রাম (বিহার), কমরেড সূর্য (আইসা কর্মী, হায়দ্রাবাদ) এবং অন্যান্য) হারিয়েছি তাঁদের উদ্দেশে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শোকজ্ঞাপন করা হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলী

এক মাস আগে, কেন্দ্রীয় কমিটির বিগত বৈঠকের পর থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখের মধ্য দিয়ে বৈঠক শুরু হয়। লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা অতিমারি এবং অর্থনীতির ধারাবাহিক পতন – দু’টিকেই মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। গোটা বিশ্বে কোভিড-আক্রান্ত দেশগুলির মধ্যে ভারত এখন দু’নম্বরে, যেখানে সংক্রমিতের সংখ্যা ৪০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে, আর নথিভুক্ত কোভিড মৃত্যুসংখ্যার নিরিখে ভারতের অবস্থান এই মুহূর্তে তৃতীয়, মৃতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান আর্থিক বছরের ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন ২০২০) জিডিপি’র ধ্বস – লক ডাউন আর তার সঙ্গে অর্থনীতির পতনের দীর্ঘকালীন প্রবণতার বিধ্বংসী প্রভাবকেই তুলে ধরেছে। সরকার এটাকে ‘দৈব দুর্বিপাক’ বলে চালানোর চেষ্টা করছে এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণের চাহিদা ও ব্যয়বৃদ্ধির জন্য মানুষের আয়হীনতার ক্ষতিপূরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতেও অস্বীকার করছে। ফলে আসন্ন দিনগুলিতে, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনজীবিকার ক্ষেত্রে এক অশুভ সংকেত ঘনিয়ে উঠছে। সরকার এই পরিস্থিতিকে ‘আত্মনির্ভরশীল ভারতের’ বিজ্ঞাপনী চমকসর্বস্ব প্রচার, এবং চিনা অ্যাপগুলির পর্যায়ক্রমিক নিষিদ্ধকরণ ও তীব্র রাষ্ট্রীয় পীড়ন দিয়ে মোকাবিলার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর শক্তিশালী মিডিয়া, এই ‘গোপন করার’ খেলায়, অক্লান্ত প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তি, ঘৃণা উন্মাদনা উগড়ে চলেছে – আর এইভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত আর বিভাজিত করার চেষ্টায় এই শয়তানির সাথে সঙ্গত করে যাচ্ছে।

এই দৃশ্যপটের বিপরীতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ, যা বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আদালত-অবমাননার বিচারের বিরুদ্ধে প্রশান্তভূষণের প্রতি দেশজোড়া সংহতিজ্ঞাপনে, আর এই উন্মত্ত অতিমারির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার বিরুদ্ধে বারংবার ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ এবং চাকরির জন্য যুবসমাজের জোরালো দাবি ঘোষণার মধ্যে। বেশ কয়েকটি জ্বলন্ত প্রশ্নে শ্রমিক, কৃষক ও মহিলাদের আন্দোলনও দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রতিবাদ ও আন্দোলন:

এই ঘটনাপ্রবাহের প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখেছে এবং এক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ বাড়িয়ে তোলার জন্য ধারাবাহিক সংগঠিত প্রয়াসের আহ্বান রেখেছে।

(১) আইসা, ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রদের কাছে যাওয়া, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং প্রতিবাদ কর্মসূচীর উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য  দিয়ে ছাত্র এবং যুব প্রশ্নে কার্যকরী হস্তক্ষেপ ঘটিয়েছে। আরওয়াইএ বেকারত্বের বিরুদ্ধে যুববিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। চাকরির দাবি ক্রমশ বিস্ফোরক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে এবং এই ক্ষেত্রে কার্যকরী উদ্যোগ আরওয়াইএ-কে বলিষ্ঠতর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করবে। আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-বিচলিত ছাত্র যুবদের গণতান্ত্রিক দিশার অভিমুখী করতে ও ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রযুবদের সঙ্গে আমাদের সংযোগ সুদৃঢ় করতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই লক্ষ্যে, সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের দাবিতে ছাত্রযুবদের ব্যাপকতম অংশের অংশগ্রহণের জন্য যাবতীয় প্রয়াস নিয়ে, ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ‘ভগৎ সিং জন্মদিবস’ উদযাপনের আহ্বান রাখতে পারে।

(২) মহিলাদের, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলির উৎপীড়ন ও হুমকির বিরুদ্ধে এবং ঋণমুক্তির দাবিতে বিশাল প্রতিবাদ আন্দোলনে ধারাবাহিক অংশগ্রহণও যথেষ্ট উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। এই প্রতিবাদের ফলে, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার দালালরা এই অতিমারী পরিস্থিতিতে ঋণগ্রহিতাদের হেনস্থা করার কৌশল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। যেসব অঞ্চলে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত আছেন, সেখানে মহিলাদের প্রতিবাদগুলি পঞ্চায়েতগুলিকে দিয়ে, যতক্ষণ না বেকারত্বের সংকট কাটছে, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলির দালালদের গ্রামে না ঢোকার নির্দেশ জারি করাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলি এখন মহিলাদের হুমকি দিতে শুরু করেছে যে আন্দোলন চালিয়ে গেলে ভবিষ্যতে আর তাদের ঋণ দেওয়া হবে না।ঋণগ্রহীতাদের জন্য অবিলম্বে ত্রাণ ও ঋণমুক্তি নিশ্চিত করার এবং বর্তমানে ও ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এটাই আমাদের প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদী দাবি থাকবে – মহিলা এবং দরিদ্রদের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কগুলি থেকে বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা। এই প্রশ্নে আমাদের শেষ দেশজোড়া প্রতিবাদে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। আমাদের আসন্ন সংসদ অধিবেশনের সময়ে, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ঋণমুক্তি ও ঋণ-ত্রাণের দাবিতে আরেকটি দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচীর পরিকল্পনা নিতে হবে।

(৩) গত মাসে কৃষকদের বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো প্রতিবাদ ও বিভিন্ন অংশের শ্রমিকদের ধর্মঘট পালিত হয়েছে। কৃষক সংগঠনগুলির ঐক্যবদ্ধ মঞ্চে (এআইকেএসএসসি) ১৪ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এআইসিসিটিইউ-ও আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর দেশজোড়া প্রতিবাদে নামছে। আর তার পরেই ২৩ সেপ্টেম্বর রয়েছে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির ঐক্যবদ্ধ মঞ্চের যৌথ প্রতিবাদ কর্মসূচী। রেল, প্রতিরক্ষা কারখানার শ্রমিক, এবং চা ও অন্যান্য শিল্পের কর্মীরাও ধর্মঘট সহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন। আন্দোলনের এই সমস্ত আহ্বানেই আমাদের সক্রিয় সমর্থন থাকবে।

(৪) আমাদের কমরেডদের উদ্যোগে অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস (এআইএলএজে) সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে লাগাতার বিবৃতি প্রকাশ, প্রতিবাদ কর্মসূচি ও ওয়েবিনারের মাধ্যমে উৎসাহ জাগানো আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছ। আদালত অবমাননা আইনকে কাজে লাগিয়ে প্রশান্তভূষণকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ, পাশাপাশি কেন্দ্র ও কয়েকটি রাজ্যের প্রতিহিংসাপরায়ণ বিজেপি সরকারের, কর্মী সংগঠক আইনজীবী, চিকিৎসক ও ছাত্রদের নিশানা করা ও হেনস্থা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ এবং উৎসাহব্যঞ্জক। এইসব প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে অর্জিত ছোট মাপের সাফল্যগুলি (প্রশান্তভূষণের আদালত অবমাননা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নিজের অবস্থান থেকে নেমে আসা, কাফিল খানের মুক্তি, দেবাঙ্গনা কলিতার, যাঁর ক্ষেত্রেও অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি ছিল না, জামিন-আদেশ, তবলিঘি জামাত এবং কোভিড১৯-এর নামে মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক নিশানা করাকে নাকচ করে বম্বে হাইকোর্টের রায় তার কিছু দৃষ্টান্ত) লক্ষ্য করা ও স্বাগত জানানোর পাশাপাশি, আমরা বিচারব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক চেতনার সামগ্রিক ও ধারাবাহিক ক্ষয় এবং কার্যনির্বাহী প্রশাসনকে সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ করার পরিবর্তে প্রশাসনের শীলমোহর হয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেও আমরা লক্ষ্য করছি। কেন্দ্রীয় কমিটি, ভীমা কোরেগাঁও এবং দিল্লি হিংসা মামলায় তদন্তের নামে সংগঠক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের লাগাতার নিশানা করা ও কারারুদ্ধ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছে।

(৫) বাঘজান তৈলক্ষেত্রের অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়ে সর্বস্ব খোওয়ানো, বাস্তুহারা মানুষদের দুর্দশা লাগাতার স্থানীয় প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার তাদের কষ্টের প্রতি চরম উদাসীন। বাঘজানের শিকার অসহায় মানুষদের জন্য আসাম ও তার বাইরে আমাদের বৃহত্তর সংহতি গড়ে তুলতে হবে। ইআই-বিজ্ঞপ্তি এবং নয়া শিক্ষানীতি ২০২০-র বিরুদ্ধেও আমাদের প্রতিবাদকে তীব্রতর করতে হবে।

বিধানসভা নির্বাচন:

খুব শীঘ্রই বিহার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, অতিমারী আর লকডাউননের এই বিশেষ সংকটের মধ্যেই। কেন্দ্রীয় কমিটি আমাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং বিহারে বাম ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা সংক্রান্ত প্রতিবেদন শুনেছে। এনডিএ প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে রুখে দিতে ও ব্যাহত করতে মরিয়া। বড় বড় মিছিল এবং জনসভা যখন করা যাবে না, আমাদের তৃণমূল স্তরে নিবিড় প্রচারের শক্তিকে যথাসাধ্য কাজে লাগাতে হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি সমস্ত রাজ্য ইউনিট, গণসংগঠন এবং কমরেডদের কাছে বিহার নির্বাচন প্রয়াসে মুক্ত হস্তে দানের আবেদন জানাচ্ছে। কেন্দ্রীয় কমিটি তামিলনাড়ু কমিটিকে পার্টির বিহার নির্বাচনী প্রচারে ৫০,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ জানায়। কেন্দ্রীয় কমিটি আগামী বছরের প্রথমদিকে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম (কার্বি আঙলঙ সহ) এবং তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিতব্য বিধানসভা নির্বাচন সম্পর্কে তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনও শুনেছে।

- প্রভাত কুমার, কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে   

saastatre

গত ৩ সেপ্টেম্বর সিপিআই(এমএল) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির (ভার্চুয়াল) বৈঠক হয়। ঐ বৈঠকে বর্তমান জাতীয় ও রাজ্য পরিস্থিতি এবং সংগঠনের কাজকর্ম ও অভিজ্ঞতা বিষয়ে গভীর প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। আর, বেশ কিছু সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়।

বৈঠকের শুরুতে এই সময়ে যেসকল পার্টি কমরেড, গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামী সাথী ও ব্যক্তিত্ব যারা প্রয়াত হয়েছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরা হলেন কমরেড রঞ্জিত সরকার (আলিপুরদুয়ার), শান্তনু বক্সী (পূর্ব বর্ধমান), তরুণ প্রকাশ কুন্ডু (বাঁকুড়া), প্রদীপ ব্যানার্জী (শিলিগুড়ি), কমল মান্ডি (বাঁকুড়া), রহিম সেখ (নদীয়া), আনু মিত্র (কলকাতা), শ্রদ্ধেয়া রানু দাশগুপ্ত (দমদম), বিমল পাড়ুই (হাওড়া), জহর মুখার্জি (বালি), সুশান্ত রায় (বজবজ), সিপআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য কমরেড শ্যামল চক্রবর্তী, অধ্যাপক হরি বাসুদেবন, অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্যকর্মী উষা গাঙ্গুলি, সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী রায়া দেবনাথ, পিডিএস নেতা কমরেড নটবর বাগদি প্রমুখ।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পার্টির  সাধারণ সম্পাদক কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। তিনি জাতীয় পরিস্থিতির কয়েকটি মূল মূল বৈশিষ্ট্য এবং সেই সমস্ত প্রশ্নগুলিতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা কর্মনীতি তুলে ধরেন। জাতীয় পরিস্থিতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠির কথা তিনি বলেন। প্রথমত কোভিড তথা জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়, দ্বিতীয়ত তীব্র আর্থিক সংকট, তৃতীয়ত ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী প্রবণতা তথা গণতন্ত্রের উপর হামলা। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, দেশজুড়ে জনগণের প্রতিবাদ প্রতিরোধগুলিও গড়ে উঠছে। যথা শ্রমিকদের বিভিন্ন সেক্টরে ধর্মঘট (সফল কয়লা ধর্মঘট), অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিক্ষোভ, ঋণমুক্তি আন্দোলন, ছাত্রদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ আন্দোলন, প্রশান্তভূষণের প্রশ্নে দেশজুড়ে বড় মাত্রায় প্রতিবাদ গড়ে ওঠা ইত্যাদি। এছাড়া দেশের আর্থিক সংকট তীব্রতর হয়ে উঠেছে, যেখানে জিডিপির ২৪ শতাংশ সংকোচন এই প্রথম লক্ষ্য করা গেল। এসমস্ত কিছু আমাদের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা ও দিশা নির্দেশ করছে। ওদিকে দিল্লির দাঙ্গার ঘটনাগুলিকে ভীমা কোরেগাঁওএর মতো করে সাজানো হচ্ছে। সমগ্র সিএএ বিরোধী আন্দোলন বা শাহিনবাগকে দেশবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত বলে ওরা তুলে ধরতে চাইছে। আমাদের ছাত্র সংগঠন ও অন্যান্য আন্দোলনকারী শক্তিগুলিকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মোদী নিজের ভাবমূর্তিকে কিছুটা আলাদা করে জনপ্রিয় রূপে তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছেন। একটি সংবাদ মাধ্যম জনমত সমীক্ষার এ জাতীয় জনপ্রিয়তার সাফল্যর খবর প্রকাশ করেছে। অতীতে বিভিন্ন দেশে এ জাতীয় বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে, যেখানে পতনের আগে পর্যন্ত এক ধরনের জনপ্রিয়তা ফ্যাসিস্ট “নায়ক”দের জন্য লক্ষ্য করা যায়। যদিও আগামীতে দেশজুড়ে প্রতিবাদের মুখে মোদীর এই জনপ্রিয়তা জোড়ালো ধাক্কা খেতে বাধ্য।

লকডাউনকে আমরা অপরিকল্পিত, বিশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত, দমন-পীড়ন মূলক এবং সংক্রমন প্রতিরোধে ব্যর্থ এক পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করেছি। কিন্তু লকডাউন মানছি না, মানব না – এটা বলা আমাদের পক্ষে যুক্তিযুক্ত হোত না। এটা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার একটা প্রশ্ন। এছাড়া শাসকেরা আমাদের ভূল ভাবে চিহ্নিত করতো, কিংবা আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার সুযোগ পেতো। যদিও লকডাউনের মধ্যেও আমরা যতটা সম্ভব বিভিন্ন কর্মসূচী সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছি।

বিগত দিনগুলোতে ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কর্মসূচিতে রাজ্যের প্রায় সমস্ত জেলাতেই ধারাবাহিক ভাবে কমরেডরা প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। জনগণের বিভিন্ন অংশের থেকে ভালো সাড়াও পেয়েছেন। এজন্য রাজ্য কমিটি পার্টির সমস্ত জেলা কমিটি ও পার্টি কমরেড, সমর্থক ও দরদীদের অভিনন্দন জানাচ্ছে। ত্রাণকার্য চালাতে গিয়ে দেখা গেল, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মোকাবিলা করার জন্য সরকারের প্রস্তুতি ভীষণ, ভীষণ দুর্বল। বাংলার গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ বাড়ি কাঁচা, মাটির বাড়ি। প্রাণহানির একটা বড় কারণ এটাই। নদী বাঁধ সংস্কার, মাস্টার প্ল্যানগুলির নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রূপায়ণ, সর্বোপরি সুন্দরবন বাঁচাও পরিকল্পনা কার্যকরী করার দাবিতে আমাদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে আমাদের কাজের এলাকার কয়েকটি ব্লকে আবাস যোজনার দাবিতে পার্টি কমিটি ও গণসংগঠনগুলির একপ্রস্থ কার্যক্রম হাতে নেওয়া উচিত। এবারের নির্বাচনে আমফান বিপর্যয়, ত্রাণ দুর্নীতি ও আবাস যোজনা বড় ইস্যু হয়ে উঠবে।

৯ আগস্ট এবং ১৩ আগস্ট দেশজুড়ে ঋণমুক্তি ও কাজের দাবিতে কর্মসূচী এরাজ্যেও যথেষ্ট গুরুত্বসহ সংগঠিত হয়েছে। আমাদের সমস্ত গণসংগঠন ও পার্টি ব্যবস্থা আন্তরিকভাবে এই কর্মসূচীগুলি সফল করার চেষ্টা চালিয়েছে। ১৫ আগস্ট কর্মসূচী বিশেষত জাতীয় পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চর্চা চলেছে। ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের মুখে জাতীয়তাবাদের হিন্দুত্ববাদী সংজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার বিপরীতে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে জনগণের প্রগতিশীল ভাবনা তুলে ধরার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে।

বর্তমান পর্যায়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এমন কিছু পদক্ষেপ আমাদের নিতে হচ্ছে যা আমাদের পুরানো ভাবনার সাথে মিলছে না। এ বিষয়টা আমাদের আত্মস্থ করতে হবে যে, পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে ফ্যাসিবাদের সাথে লড়াইয়ের বিভাজনরেখা বা পার্থক্যরেখাগুলি সরে সরে যেতে থাকবে। কিন্তু সেগুলি পাল্টে যাবে না। নতুন নতুন প্রশ্নে বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে সাবলীল ভাবে বুঝতে পারলেই আমাদের বিভিন্ন উদ্যোগগুলি বিকাশ করতে শুরু করবে।

আগামী বিধানসভা নির্বাচন ও আমাদের ভূমিকা

পশ্চিমবঙ্গের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে আমাদের সম্ভবতঃ একক ভাবেই লড়তে হবে। কারণ কার্যকরী বাম ঐক্যের পরিবর্তে ২০১৬ সালের মতো কংগ্রেস-সিপিএম বোঝাপড়ার সম্ভাবনা প্রবল ভাবে দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে নির্বাচনী আসন বোঝাপড়ায় আমাদের জায়গাটাও তেমনভাবে নেই। এ রাজ্যেও আমাদের প্রধান জোর দিতে হবে বিজেপিকে পরাস্ত ও প্রতিহত করার উপর। অন্যদিকে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসও এক স্বৈরাচারী শক্তি। বিজেপিকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করে সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করব এমন জায়গায় আমরা নেই। প্রধানত শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যেই আমরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। বিজেপি বিরোধী গণআন্দোলন ও নির্বাচন এই দুটো দিকই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো নেতিবাচক বা পরাজয়বাদী মনোভাব থেকে আমরা আন্দোলনগুলিকে দেখি না। যেমন নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলনে সর্বোচ্চ যৌথ কার্যক্রম আমরা করেছি। আন্দোলনে জয়লাভ করা গেলো কি না, কেবল সেটাই নয়, কিংবা তার পরিধি-মাত্রা যাই হোক না কেন, আমাদের ফোকাস থাকবে আন্দোলনের উপর, যার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। সেটাকে কতটা নির্বাচনে প্রতিফলিত করা যায় আমাদের সেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিজেপিকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে টিএমসিকে চাপের মধ্যে রাখতে হবে। এখানে টিএমসি বনাম বিজেপির যে লড়াই হতে চলেছে তাতে কংগ্রেসকে বিরোধী দল হিসাবেই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।

আমাদের এককভাবেই লড়াই করার প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হবে। তবে আসন বোঝাপড়ার কোনো প্রস্তাব এলে আমরা অবশ্যই কথা বলব, কিন্তু সেটা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলি রক্ষা করেই।

ঋণ মুক্তি আন্দোলন

রাজ্যের কয়েকটি জেলায় প্রধানত স্বনির্ভরগোষ্ঠী ও গরিব মানুষদের মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। হুগলী, বর্ধমান, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাটে, দার্জিলিং জেলার দু’একটা পকেটে বিক্ষোভ আন্দোলনে নতুন নতুন শক্তিকে সমাবেশিত করার উদ্যোগ খুবই আশাপ্রদ ও ইতিবাচক। তৃণমূল ও বিজেপির চাপ সত্বেও বহু সংখ্যক মানুষ এতে সামিল হচ্ছেন। এটা দেখায় যে, সংকট যথেষ্ট গভীরে রয়েছে। ইস্যুটা যে দাঁড়িয়ে গেছে এটাই আমাদের প্রথম সাফল্য। যদিও কৃষকদের এই ইস্যুতে যুক্ত করা যায়নি। ফসলের ন্যায্য মূল্য ও ঋণমুক্তির লড়াই কীভাবে যুক্ত করা যায়, তার জন্য আগামীতে আমাদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

আমাদের মূল মূল কাজের বেশ কিছু জেলা ঋণমুক্তি নিয়ে তেমন উদ্যোগ নিতে পারেনি। সেই জেলাগুলিতে আলাপ আলোচনা করা প্রয়োজন যে সমস্যাগুলি কী থাকছে বা কিভাবে উদ্যোগ বাড়ানো যায়। মিড-ডে-মিল ইউনিয়নকেও এই উদ্যোগে যুক্ত করা যেতে পারে। ঋণমুক্তি আন্দোলন গড়ে ওঠার একটা বড় কারণ গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংকট, এবং নয়া মহাজনী শোষণ, লকডাউনের সময়কালে যা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলনের সাথে কাজের দাবি ও গরিব মানুষদের স্বার্থে নানাবিধ সরকারী প্রকল্পে হস্তক্ষেপকে যুক্ত করা দরকার। মূলত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবীরা ও ভাগে বা চুক্তিতে যারা চাষাবাদ করেন সেই ঋণগ্রস্ত  দরিদ্র মানুষেরা এই আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। আয়ারলা এ কাজের কেন্দ্রে রয়েছে। রাজ্য স্তরে আয়ারলা, এ্যাপোয়া, মিড-ডে-মিল ও পার্টির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা সমন্বয়ধর্মী বডি গঠন করা হবে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর রাজ্য জুড়ে জেলা বা মহকুমা স্তরে ঋণমুক্তির দাবিতে যে গণজমায়েত কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে তা সফল করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। তারপর একটি বৈঠকের মাধ্যমে এই বডি গঠিত হবে। আশু দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে অন্তত দু’বছর মোরেটরিয়াম, সুদ মকুব, ঋণ আদায়ে অন্যায় জুলুম বন্ধ, মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলির উপর সরকারী নিয়ন্ত্রণ জারি করা, সুদের অত্যধিক হার ও চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বন্ধ করা। রাজ্য ও কেন্দ্রীয়, দুই সরকারের বিরুদ্ধেই আমাদের দাবিগুলি তুলে ধরতে হবে। রাজ্য সরকারের কাছে মন্ত্রী পর্যায়ে ডেপুটেশনের কর্মসূচী নিতে হবে। করোনা আবহ একটু অনুকূলে আসলে আগামীতে রাজ্য জমায়েতের কথাও ভাবা যেতে পারে।

নয়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে

দেশজুড়ে নয়া শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ছাত্র বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও আন্দোলনগুলি গড়ে উঠেছে। এনআরসি, সিএএ বিরোধী আন্দোলনের মতই বামপন্থী ছাত্র সমাজ এবং আমাদের ছাত্র সংগঠন আইসা, যুব সংগঠন আরওয়াইএ যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে। এই আন্দোলনে গতি প্রদানের জন্য আমাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলিতে উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া বা শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ভালোই বিতর্ক চলছে। ভোকেশনাল বা জাতিগত ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া নিয়েও প্রতিবাদ জোড়ালো হচ্ছে। এতে ছাত্র-যুব উদ্যোগ সমন্বয় প্রয়োজন। এরাজ্যে আইসার বিকাশ খুবই ইতিবাচক, তবে সার্বিক রাজনৈতিক বিষয়গুলি নজরে রাখতে হবে।

ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন প্রসঙ্গে

করোনা লকডাউন পর্যায়ে বকেয়া মজুরির প্রশ্নটি অত্যন্ত জরুরী হয়ে রয়েছে। আমাদের ট্রেড ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ২১ সেপ্টেম্বর রাজ্যের সমস্ত চটকলে বকেয়া মজুরি নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচী সংগঠিত হবে। ২৮ সেপ্টেম্বর রাজ্য জুড়ে লেবার কোডের প্রতিলিপি পোড়ানোর কর্মসূচী সংগঠিত হবে। ১২ অক্টোবর প্রতিরক্ষা সেক্টরের ধর্মঘট হওয়ার দিন সারা ভারত সাধারণ ধর্মঘট ডাকা যায় কিনা কেন্দ্রীয় টিইউগুলির তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে নিবিড় তথ্যানুসন্ধান করা, তাদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার কাজ দ্রুত করতে হবে। অনেকেরই মোবাইল স্মার্ট ফোন আছে। তাদের হোয়াটসএ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করা, গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগকে আরও কার্যকরী করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। একাজে পার্টির জেলা কমিটিগুলিকেও পরিকল্পনা নিতে হবে।

গণস্বাস্থ্য উদ্যোগ

করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় রাজ্যের বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বেসরকারী হাসপাতালগুলির অমানবিক আচরণ, মুনাফাবাজি ইত্যাদি বর্তমানে রাজ্য রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতি অপরদিকে রাজ্য সরকারের অপদার্থতা-অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে আমাদের এলাকাস্তরে জনস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। সম্প্রতি এবিষয়ে কয়েকটি এলাকায় কিছু উদ্যোগ যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক ও শিক্ষণীয়। যাকে উপর থেকে সচেতন পরিকল্পনায় সংগঠিত করার সুযোগ রয়েছে। বৃহত্তর কলকাতা ও অন্যত্র যেভাবে আমরা ত্রাণ উদ্যোগ নিয়েছিলাম সেভাবেই জনস্বাস্থ্য উদ্যোগও নেওয়া যায়। গণসচেতনতা ও স্বেচ্ছাসেবা মূলক কর্মসূচীর সাথে সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনমুখী উদ্যোগ – এ দুয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য আন্দোলন বিভিন্ন রূপে গড়ে উঠছে। “পিপলস হেলথ”-কে সামনে রেখে আইসা, আরওয়াইএ সহ যেখানে যেমনভাবে সম্ভব গণসংগঠনগুলিকে যুক্ত করা এবং তাতে চিকিৎসকদের ও অন্যান্য শক্তিকে সামিল করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য রাজ্য স্তরে একটা পার্টি টিম গঠন করা হবে। বিভিন্ন সংক্রমক রোগ প্রতিরোধে একটা জনমুখী নীতি তৈরি করার লক্ষ্যে এগোনো যেতে পারে।

দেশব্রতী

লকডাউন পর্বে দেশব্রতীর ডিজিটাল সংখ্যাগুলি যথেষ্ট আকর্ষণীয়ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন মহলে সমাদৃত হচ্ছে। নতুন নতুন পাঠকবর্গের কাছে পত্রিকা পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু মুদ্রণ সংখ্যা প্রকাশনার মতো অবস্থা এখনও সৃষ্টি হয়নি। বিভিন্ন জেলা থেকে পত্রিকা নিয়ে যাওয়া বা ক্যুরিয়ারে পাঠানোর মতো সুযোগ এখনও হয়নি। তাই আগামীতে রেল চলাচল শুরু হলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

set15se


রাজনৈতিক কাজে লকডাউন ঝেড়ে ফেলুন, গ্রামে গ্রামে প্রচার অভিযান জোরদার করুন

তৃণমূলের অপদার্থতা, দুর্নীতি, দলবাজি, সন্ত্রাস ও স্বৈরাচারকে হাতিয়ার করে বিজেপি সাধারণ মানুষের জীবন বাজি রেখে পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখলের স্বপ্ন দেখছে। তাই রাজ্যে খুন-সন্ত্রাস বেড়ে চলেছে। মানুষের জীবন জীবিকার সংগ্রামকে পিছনে ফেলে দিতে চাইছেন। সারা ভারত কৃষি ও গ্রামীণ মজুর সমিতি, সারা ভারত কৃষক মহাসভা, আদিবাসী অধিকার ও বিকাশ মঞ্চ ও ঋণ মুক্তি কমিটির নেতৃত্বে লকডাউনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। চলছে ঋণ মুক্তির আন্দোলন, পরিযায়ী শ্রমিকদের আন্দোলন। আদিবাসীদের জমির অধিকারের লড়াই, আমফান ঝড়ের ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিতে সংগ্রাম, ১০০ দিনের কাজের লড়াই। লকডাউনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলোর বিস্তার ও অগ্রগতির জন্যই একমাস ব্যাপি গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে প্রচার অভিযান। রাজ্যের জেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের প্রচার চলছে। গ্রাম বৈঠকের সাথে সাথে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন ব্লকে ৭০টি, হুগলী জেলায় ৫০টি, দার্জিলিং জেলার ১৫টি, জলপাইগুড়ি জেলার ১০টি গ্রাম ও মালদহ জেলার কালিয়াচক, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাট, দক্ষিণ ২৪ পরগণা ও নদীয়ার গ্রামাঞ্চলে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান চলছে। মুর্শিদাবাদ জেলার জেলাশাসক দপ্তরে ডেপুটেশনের প্রস্তুতি চলছে। জেলা, মহকুমা ও ব্লক ডেপুটেশনের প্রস্তুতি চলছে। অনেক জেলায় লিফলেট প্রচার হচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গার প্রচারের দুর্বলতা নজরে আসছে। দ্রুতই প্রচার অভিযান জোরদার করতে হবে। প্রচারে বিজেপির মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। কেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে সে জবাব বিজেপিকেই দিতে হবে, ১০০ দিনের কাজের বরাদ্দ কেন বাড়ানো হচ্ছে না, গরিব মানুষের জন্য লকডাউন ভাতা কেন দেওয়া হচ্ছে না, ঋণ মুক্তির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকার নীরব কেন, কৃষক সম্মান যোজনা থেকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষককে বঞ্চিত করা হচ্ছে কেন, সার্বজনীন রেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার চক্রান্ত করা হচ্ছে কেন, সরকারী সম্পত্তির বিলগ্নীকরণ ও বেসরকারীকরণ কেন, কৃষি বাণিজ্য অর্ডিন্যান্স, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য-আইনের সংশোধন কেন, বিভাজনের রাজনীতি কার স্বার্থে – এইসব বিজেপিকেই জবাব দিতে হবে। আসুন গ্রামে গ্রামে প্রচার অভিযান জোরদার করার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করি।

tartar

সিপিআই(এমএল) লিবারেশান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষে সম্পাদক পার্থ ঘোষ ৭ সেপ্টেম্বর এক প্রেস বিবৃতিতে বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর গোটা দেশ যখন যথোচিত মর্যাদায় শিক্ষক দিবস উদযাপন করছে, সেই দিনই জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা হানা দিল এরাজ্যের কল্যাণীতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এডুকেশন এন্ড রিসার্চ (আইআইএসইআর)-এ। কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সমস্ত সুরক্ষা বিধি ভেঙে ঐ আধিকারিকরা সরাসরি ইনস্টিটিউটের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মলিকুলার বায়োলজির খ্যাতনামা তরুণ বিজ্ঞানী অধ্যাপক পার্থসারথি রায়কে সমন ধরাতে হাজির হয়ে যায়। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ভীমা কোঁরেগাও-এলগার পরিষদ মামলায় সাক্ষ্যপ্রদানের জন্য অধ্যাপক পার্থসারথিকে এনআইএ-র মুম্বাই অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিআরপিসি-র ১৬০নং ধারা বলে এই আদেশনামা জারি করা হয়েছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ইনস্টিটিউটে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ অনুযায়ী বাইরের মানুষের হাত থেকে ঐ সমন গ্রহণ করেননি অধ্যাপক পার্থসারথি।

পরাধীন ভারতে, ব্রিটিশ শাসকরা শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের অধিকার, বিশেষত পূর্ণ স্বরাজের অধিকারকে দমন করতে একের পর এক তথাকথিত ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করেছিল। কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা, বিশেষ করে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা এর অন্যতম। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯-৩৩)-য় তৎকালীন ভারতের সামনের সারির  শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সমস্ত নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে বিচারের নাটক ও প্রহসন চালিয়েছিল।

স্বাধীন ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের উত্তরসুরী ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকার ভীমা কোরেগাঁও-এলগার পরিষদ মামলাকে ঐ লক্ষ্যেই নিয়ে যেতে চাইছে। গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করে দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সহ সমাজের নিপীড়িত জনগণের বেঁচে থাকার, কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলেই রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশবিরোধী। অধ্যাপক পার্থসারথি যেহেতু ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে বিশ্বাসী একজন সচেতন নাগরিক, তাই তাঁকে ভয় দেখাতে ঐ সমন। শুধু  অধ্যাপক পার্থসারথিই নয়, একই সময়ে হায়দ্রাবাদের ইএফএল বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত অধ্যাপক সত্যনারায়ণের কোয়ার্টারেও হানা দেয় এনআইএ-র আধিকারিকরা। হাতে তাদের সমন। ৯ সেপ্টেম্বর এনআইএ-র মুম্বাই অফিসে হাজির হতে হবে। অধ্যাপক সত্যনারায়ণ ভীমা কোরেগাঁও মামলায় জেলবন্দী কবি ভারাভারা রাওয়ের জামাতা, এটাই তাঁর অপরাধ!

এনআরসি, এনপিআর, সিএএ বিরোধী শাহিনবাগ আন্দোলনকে আটকাতে যারা দিল্লিতে দাঙ্গা করল, তারা সুপ্রিম কোর্টের নাকের ডগায় অবাধে ঘুরে বেড়ায়, মবলিঞ্চিং-এর খলনায়করা এনআইএ-র সদর দপ্তরের আশেপাশেই থাকে, প্রতিনিয়ত ঘৃণার রাজনীতি ছড়ায়। আর যারাই এর প্রতিবাদে সোচ্চার তাদের‌ই মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চক্রান্ত চলছে। বিচিত্র গণতন্ত্র !

মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার নয়া সংস্করণ ভীমা কোঁরেগাও-এলগার পরিষদ মামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করার ফ্যাসিস্ট ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১০ সেপ্টেম্বর প্রতিবাদ কর্মসূচী সংগঠিত করুন।

teario

( সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর ঘটনায় যাবতীয় দোষ চাপানো হচ্ছে রিয়া চক্রবর্তীর ঘাড়ে। মিডিয়া তার “বিচার” সেরে ফেলে সুশান্তর আত্মহত্যার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। লাগাতার জেরার পর নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো তাকে গ্ৰেপ্তার করেছে। এর মধ্যে নারী বিদ্বেষ প্রকট হয়ে ফুটে উঠছে। এর প্রতিবাদে আইপোয়া একটা বিবৃতি দিয়েছে। সেটির ভাষান্তর আমরা এখানে রাখছি।)

সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু সমস্ত সংবেদনশীল মানুষকেই ব্যথিত করেছে। বিহার এবং তার সাথে সারা দেশের জনগণ চান- সুশান্ত ও তার পরিবার যেন ন্যায় বিচার পায়। কিন্তু তার মৃত্যুর জন্য রিয়া চক্রবর্তী দায়ী কিনা সেটা আদালতকেই নির্ধারণ করতে দিতে হবে। মিডিয়া যেভাবে রিয়াকে আক্রমণ করে কালিমা লিপ্ত করছে তা এক ঘৃণ্য ও লজ্জাকর ব্যাপার। মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন যেভাবে রিয়ার গায়ে হাত দিয়ে তাকে ধাক্কাধাক্কি করেছে তাকে ধিক্কার জানানোর ভাষা নেই। যারা এই কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে।

আইপোয়া মিডিয়ার কাছে আবেদন জানাচ্ছে, তারা আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ বন্ধ করুক, এটা করে তারা সুশান্ত সিং রাজপুতের স্মৃতি সহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অবিচার করছে।

আইপোয়া জনগণের কাছেও আবেদন জানাচ্ছে, তাঁরা মিডিয়ার একটা অংশের অভিপ্রায় সম্পর্কেও সচেতন হন যারা সরকারের প্রচারক হিসাবে কাজ করছে। সুশান্ত সিং রাজপুতের ইস্যুকে ধরে সরকার দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মতো ইস্যুগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে; আসন্ন বিহার বিধানসভার নির্বাচনকে ধরে যে ইস্যুগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করার প্রয়োজন সরকারের কাছে জরুরি হয়ে উঠেছে সেগুলো হল: বিহারের পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্গতি, কৃষকদের চরম দুরবস্থা, বিহারে দুর্বৃত্তদের মনোবল ও সাহস বেড়ে চলা এবং বিহারে ও সারা ভারতে নারী ধর্ষণ ও নারী-বিরোধী হিংসার ঘটনাগুলো ক্রমেই বেড়ে চলা।

এই বিষয়টার উল্লেখও জরুরি যে, বিহারে বিজেপির সাংস্কৃতিক সেল ঘোষণা করেছে যে তারা বিহার বিধানসভা নির্বাচনে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর ইস্যুটাকে কাজে লাগাবে। এটাও বুঝতে হবে যে, পদ্মাবতী সিনেমাকে কেন্দ্র করে কারনি সেনার হামলার সময় যারা সুশান্ত সিং-এর প্রতি বৈরিতা দেখিয়েছিল, আজ তারা সুশান্ত সিং রাজপুতের শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না। আসল সত্যিটা হল, সুশান্ত সিং-এর মৃত্যুকে নিংড়ে ওরা রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে। তদন্তের পরে যদি দেখা যায় যে এই ঘটনায় কোনো মহিলা অপরাধে জড়িয়ে আছেন, সে ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে তার বক্তব্য পেশ করতে দিতে হবে, এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোকেও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। মিডিয়া চালিত বিচার পরিস্থিতিটার এতটাই বিকার ঘটিয়েছে যে তদন্তকারী সংস্থাগুলো এবং এমনকি আদালতের পক্ষেও অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আমরা  আদালত, জাতীয় নারী কমিশন এবং সংবাদ সম্প্রচার স্ট্যাণ্ডার্ড কর্ত্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি – এই ঘটনায় দৃঢ় হস্তক্ষেপ করে রিয়াকে কালিমালিপ্ত করার মিডিয়ার উদ্যোগে রাশ টানুন। ওরা নারী বিদ্বেষী ভাষা ও মতাদর্শের প্রয়োগে একটুও কার্পণ্য করছে না।

সুশান্ত একজন সংবেদনশীল ও প্রগতিশীল মানসিকতার যুবক ছিলেন। জীবিত থাকলে তিনি কখনই তাঁর নাম নিয়ে জনসমক্ষে এক মহিলার এই ধরনের অবমাননায় অনুমতি দিতেন না। আমরা তাই সুশান্তকে সম্মান করেন এমন সমস্ত মানুষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, সুশান্তর মৃত্যুর ঘটনায় মিডিয়া যে ধরনের সক্রিয়তা দেখাচ্ছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

স্বাক্ষর   
রতি রাও, সভাপতি   
মীনা তেওয়ারি, সাধারণ সম্পাদিকা,   
কবিতা কৃষ্ণাণ, সম্পাদিকা, আইপোয়া   

kafkafil

বর্তমান ভারতে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তির হাতে যাঁরা চরম উৎপীড়নের শিকার হয়েছেন ডাক্তার কাফিল খান তাঁদের অন্যতম। প্রতিহিংসা তাড়িত হয়ে তদন্তকে প্রহসনে পরিণত করে মিথ্যা অভিযোগ এনে কী কেন্দ্রের, কী বিভিন্ন রাজ্যের গেরুয়া সরকার তাদের সমালোচক বিভিন্ন ব্যক্তির কন্ঠকে স্তব্ধ করতে জেলে আটক রাখার পথকেই অস্ত্র করেছে। আবার এঁদের মুক্তির দাবিতেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন জনআন্দোলন। জনসমাবেশের মাধ্যমে মুক্তির সোচ্চার দাবি ওঠানো এবং তার সাথে আদালতে জনস্বার্থ মামলা সহ ব্যক্তিগত স্তরে বিভিন্ন আইনি উদ্যোগও সক্রিয় হয়েছে। কাফিল খানের মুক্তির দাবিতে একদিকে গণতান্ত্রিক উদ্যোগ সচল হয়েছিল, অন্যদিকে তাঁর পরিবারের সদস্যরা (বিশেষভাবে তাঁর মা) হন্যে হয়ে ছুটোছুটি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট থেকে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। অবশেষে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ১ সেপ্টেম্বর মাঝরাতে মথুরা জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেলেন জাতীয় সুরক্ষা আইনে আটক ডাক্তার কাফিল খান।

আদালত তাদের রায়ে কি বলেছে? এককথায়, যোগী আদিত্যনাথ সরকার যে অভিযোগে ডাক্তার কাফিল খানকে গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ করেছিল, আদালত তাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করেছে। ডাক্তার কাফিল খানের বিরুদ্ধে যোগী সরকারের অভিযোগ ছিল – আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএএ-বিরোধী বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে তিনি “ধর্মীয় ভাবাবেগকে উস্কিয়ে তুলেছিলেন”, এবং চেষ্টা করেছিলেন “ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিবাদ উস্কিয়ে তুলতে” যাতে “বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান সম্প্রীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলা যায়”। এবং আরও অভিযোগ ছিল, তিনি আলিগড় শহরের শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিলেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি গোবিন্দ মাথুর ও বিচারপতি সৌমিত্র দয়াল সিং-এর বেঞ্চ তাঁদের রায়ে জানালেন, “সম্পূর্ণ বক্তৃতাটা পাঠ করলে আপাত দৃষ্টিতে তা ঘৃণা বা হিংসা ছড়ানোর কোনো উদ্দেশ্যকে দেখায় না। বক্তৃতা কোথাও আলিগড় শহরের শান্তি ও সুস্থিতিকে বিপর্যস্ত করার উপক্রম করেনি। বক্তৃতা নাগরিকদের মধ্যে জাতীয় সংহতি ও ঐক্যের আহ্বানই জানিয়েছে। বক্তৃতা কোথাও হিংসায় অনুমোদন দেয়নি”।

তাহলে আলিগড়ের জেলাশাসক কিসের ভিত্তিতে হিংসা, বিদ্বেষ উস্কিয়ে তোলার অভিযোগ এনেছিলেন? আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর সিএএ-বিরোধী গোটা বক্তৃতাটা বিশ্লেষণ করার পর বিচারপতিদের সুচিন্তিত অভিমত হল, “জেলাশাসক বক্তৃতাটার প্রকৃত অভীষ্টকে উপেক্ষা করে তার ইচ্ছেমাফিক অধ্যয়ন করেছেন এবং বাছাই করা গুটিকয়েক বাক্যাংশের উল্লেখ করেছেন”। গেরুয়া ফ্যাসিস্তরা তাদের দুরভিসন্ধির বাস্তবায়নে, প্রতিহিংসার চরিতার্থতায় কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, কেমন বেশরম হয়ে উঠে গণতন্ত্রের সামান্য আব্রুটুকুকেও অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলছে, বিচারপতিদের রায়ে তা পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে গেছে। বিচারপতিরা অকপটে বলে দিয়েছেন, “এ কথা বলতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই যে, জাতীয় সুরক্ষা আইনে কাফিল খানকে বন্দী করে রাখা ও তাঁর বন্দী দশার সময়সীমা বাড়ানো – আইনের চোখে এর কোনোটাই সংগতিপূর্ণ নয়”।

কাফিল খানের বিরুদ্ধে যোগী সরকারের বিদ্বেষের উৎস সন্ধানে আমাদের স্মরণে আনতে হবে ২০১৭ সালে গোরখপুরের বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল কলেজে ৬৩টি শিশুমৃত্যুর মর্মন্তুদ ঘটনাকে। শিশুরা মারা গিয়েছিল অক্সিজেনের অভাবে। অক্সিজেন সরবরাহকারী সংস্থা বারবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও তাদের পাওনা মেটানো না হওয়ায় তারা অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। ডাক্তার কাফিল খানই শিশুদের বাঁচাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার আনিয়ে শিশুদের শ্বাস সচল রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অথচ, এই ডাক্তার কাফিল খানকেই যোগী সরকার চিকিৎসায় অবহেলা, দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রথমে সাসপেন্ড ও পরে ২০১৭’র ১ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করে। কিন্তু কেন? কাফিল খান একটা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “আমাকে জেলে পোরা হয়েছিল কারণ আমি ৭০টা শিশুর ঘাতক ব্যবস্থাকে উন্মোচিত করেছিলাম বলে এবং অন্য কোনো কারণে নয়”। যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা শিশুদের প্রাণবায়ু সচল রাখাকে উপেক্ষা করার মতো নির্মম হয়, শিশুদের বাঁচাতে অক্সিজেন সরবরাহকে অব্যাহত রাখায় কোনো গুরুত্ব দেয় না, সেই ব্যবস্থার সমালোচনা গেরুয়া প্রশাসন সহ্য না করতেই অভ্যস্ত। কাফিল খান আরও জানিয়েছেন, যোগী আদিত্যনাথ ২০১৭ সালে তাঁকে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে দেখে নেব”। সেবারও এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি ২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল মুক্তি পান। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে রাজ্য সরকার এক সদস্যের এক তদন্ত কমিটি বসায়। মুখ্য সচিব হিমাংশু কুমারের সেই তদন্ত কমিটি তাঁকে সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “অসংগতিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন”। ওই তদন্ত রিপোর্টে তাঁর কাজের প্রশংসাও করা হয়। কাফিল খান কিন্তু উত্তরপ্রদেশ ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সমালোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন। সিএএ-বিরোধী সমাবেশগুলোতে অংশ নিয়ে নিজের বক্তব্য রাখা থেকে বিরত হন না।

প্রতিশোধলিপ্সু যোগী সরকারের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স তাঁকে ফের গ্ৰেপ্তার করে মুম্বই বিমান বন্দর থেকে এবছরের ২৯ জানুয়ারী। কয়েক দিন পর ১০ ফেব্রুয়ারী তাঁর জামিন মঞ্জুর হলেও মুক্তি না দিয়ে তাঁকে আটকে রাখা হল। আলিগড়ের জেলা শাসক তাঁর ভাষণের বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করায় তাঁর ওপর জাতীয় সুরক্ষা আইন প্রয়োগ করা হল, যে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধেই এল এলাহাবাদ হাইকোর্টের আলোচ্য রায়।

কাফিল খান জানিয়েছেন গ্রেপ্তারের পর তাঁর ওপর দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাঁকে যেমন পা ওপর মাথা নীচু করে ঝুলিয়ে প্রহার করা হয়, তেমনি গ্ৰেপ্তারের পর ৭২ ঘণ্টা জল ও পাঁচ দিন কিছু খেতে দেওয়া হয়নি। তাঁকে এই উদ্ভট প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তিনি এমন কোনো পাউডার তৈরি করেছেন কিনা যা দিয়ে মানুষকে হত্যা করা যায় এবং যোগী সরকারের পতন ঘটানোর জন্য জাপান গিয়েছিলেন কিনা। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি যোগী শাসনের আওতার বাইরে থাকতে চলে গেছেন জয়পুর, কংগ্ৰেস শাসিত রাজস্থানে। তিনি শ্লেষাত্মক ঢঙে উত্তরপ্রদেশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বিকাশ দুবের মতো ভুয়ো সংঘর্ষে তাঁকে হত্যা না করার জন্য। আজ গণতন্ত্রের ওপর হামলা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। মোদী সরকার যখন কোনো ধরনের সমালোচনা ও বিরোধিতা সহ্য না করে সরকারের সমালোচকদের নির্বিচারে জেলে পুরছে, সেই সময় গণতন্ত্রের সুরক্ষায় আদালতের জোরালো ইতিবাচক ভূমিকাই জনগণের কাছে আকাঙ্খিত।

কিন্তু আদালতের অভিমুখ প্রশাসনের সুরে সুর মেলানোর দিকেই প্রবলভাবে ঝোঁকা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় আটকদের মুক্তিকে আটকানোর সরকারের অভিপ্রায় আদালতের সমর্থন পাচ্ছে। এই মামলায় আরও কিছু ব্যক্তিকে জড়িত করে গ্রেপ্তার করার দুরভিসন্ধি সচল রয়েছে। দিল্লী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তদন্তকে ভীমা-কোরেগাঁও-এর ধারায় চালিত করে দাঙ্গার প্রকৃত সংঘটকদের আড়াল করে নিরপরাধ সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভকারী ও সেই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো সমর্থকদের অভিযুক্ত করার ষড়যন্ত্র সুস্পষ্ট আকার নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে গুরুতর অপরাধ বলার পরও তার জমি মন্দির নির্মাণের জন্য তুলে দিয়েছে মসজিদ ধ্বংসের সংঘটকদের হাতেই। এমনকি প্রশান্ত ভূষণ টুইট মামলাতেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সংকেত হল – আদালতের এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনাকে সে অভিপ্রেত বলে মনে করছে না। যে সমালোচনার অধিকার গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত, সেই অধিকারের প্রতি অনীহা দেখালে তা স্বৈরাচারী শক্তির কাছে মদত হয়েই ওঠে। এই রকম এক তমসাচ্ছন্ন পরিমণ্ডলে এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায় আশার এক আলোকবিন্দুর মতো। কিন্তু এর দীপ্তিতে এমন ঔজ্জ্বল্য নেই যা তরঙ্গায়িত হয়ে ঘন তিমিরকে ভেদ করতে পারে। কেননা, বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে আজ শাসনতন্ত্রের অনুগামী হওয়া, প্রশাসনকে না চটানোর প্রবণতা যথেষ্ট প্রবল বলেই প্রতিপন্ন হচ্ছে। শাসকের অনাচারকে তিরস্কার করে শাসককে গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ করার রায় থেকে বিচ্ছুরিত আলোক রেখাকে শুষে নিচ্ছে শীর্ষের তিমির। অতএব, কাফিল খানের মুক্তির নির্দেশ দেওয়া এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় বা তাবলিগি জমায়েত সম্পর্কে প্রশাসনের দুরভিসন্ধিকে উন্মোচিত করা বোম্বে হাইকোর্টের রায়ের মতো ইতিবাচক রায়গুলোকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার শীর্ষকে গণতন্ত্রমুখী, জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি দায়বদ্ধ করার লড়াইকেও অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

aeegae

সারা ভারত কিষাণ মহাসভা (এআইকেএম)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ভার্চুয়াল মিটিং অনুষ্ঠিত হয় গত ৫ সেপ্টেম্বর। সমস্ত জেলা থেকে রাজ্য কমিটি সদস্যরা মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতি ও আশু কাজ সম্পর্কে আলোচনা হয় এবং তার ভিত্তিতে কিছু কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে।

১) গ্রামাঞ্চলে ঘরে ঘরে যাওয়া ও প্রচার কর্মসূচী : আয়ারলা ও আদিবাসী সংগঠনের সাথে যৌথভাবে বিভিন্ন জেলায় ঘরে ঘরে যাওয়ার কর্মসূচী শুরু করতে হবে। লকডাউনে চাপিয়ে দেওয়া চরম সংকটের এই সময়কালে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কৃষক বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে এবং কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পগুলি, যা অনেকটাই কাগজে কলমে রয়েছে, কার্যকরী করার দাবিগুলি তুলে ধরা হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি ও কৃষক বিরোধী নীতিগুলি আড়াল করে এ রাজ্যে বিজেপির ‘কৃষক দরদী’ বা ‘বিরোধী দলে’র মুখোশ খুলে দিতে হবে। একইসাথে শাসক টিএমসি-র অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে তাকে জনগণের প্রতিবাদ প্রতিরোধের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিশেষত গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ও উদ্যোগী কৃষিজীবী, যারা সবচেয়ে বঞ্চিত সেই অনথিভূক্ত ভাগচাষি, চুক্তিচাষি সহ গরিব চাষিদের দাবিগুলির উপর জোর দিতে হবে। এদের কৃষিঋণ তথা কেসিসি কার্ড দেওয়া ও  ফসলবীমা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ঋণ মুক্তি সহ অন্যান্য জরুরি দাবিগুলিও তুলে ধরতে হবে। এটা সরকারের কর্পোরেটমুখী কৃষিনীতির পাল্টা কর্মনীতির প্রশ্ন, গ্রামাঞ্চলে বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে। পাশাপাশি কৃষকদের কাছ থেকে উঠে আসা বিভিন্ন জ্বলন্ত দাবি ও বিষয়গুলি জানা বোঝার লক্ষ্যে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ঘরে ঘরে যাওয়ার কর্মসূচী সফল করে তুলতে হবে।

২) এলাকা স্তরে কর্মসূচী : বর্তমান লকডাউনের পরিস্থিতিতে উপরিস্তরে সম্ভব না হলেও নীচু তলায় এলাকা স্তরে আলোড়নমুখী কর্মসূচী গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। ইস্যুগুলি নিয়ে নিবিড় ভাবে ও লেগেপড়ে থেকে চেষ্টা চালালে এ প্রশ্নে সফলতাও পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য জনগণের প্রকৃত দাবিগুলি নির্দিষ্ট করতে হবে। যথা আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতি, আমফান ঘুর্ণিঝড়ে কৃষি ক্ষতিপূরণ না দেওয়া, ব্যপক দুর্নীতি-দলবাজি সহ বিভিন্ন দাবি, ফসলের লাভজনক দাম, ডিজেল-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, জমির প্রশ্ন সহ গ্রামোন্নয়নের নানান দাবি প্রভৃতি। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বিভিন্ন এলাকায় রাজ্যের শাসক দলের আধিপত্যর বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর উঠে আসছে। একে তুলে ধরে প্রতিরোধ সংগঠিত করার দিশায় এগিয়ে যেতে হবে। কৃষিঋণ সম্পর্কে সার্বিকভাবে এক অনুসন্ধান কর্মসূচী হাতে নিতে হবে।

৩) আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ঋণমুক্তির দাবিতে কর্মসূচী এবং ৫ অক্টোবর ব্লক কৃষি দপ্তরে বিক্ষোভ ডেপুটেশন কৃষকদের দাবিগুলি নিয়ে আগামী ৫ অক্টোবর ব্লকের কৃষি দপ্তরে (এডিও) বিক্ষোভ ডেপুটেশন কর্মসূচী সংগঠিত করতে হবে। এজন্য সাধারণ দাবিগুলি নিয়ে একটা প্রচারপত্র তৈরি করা হবে, যার সাথে জেলা বা এলাকার নির্দিষ্ট দাবি যুক্ত করা হবে। ১৫ সেপ্টেম্বর কৃষিঋণ মুক্তির দাবিতে জেলা বা মহকুমা স্তরে বিক্ষোভ ডেপুটেশনে আয়ারলার সাথে এআইকেএম যুক্ত থাকবে। এজন্যও যৌথ প্রচারপত্র প্রকাশ করতে হবে। কেন্দ্রীয় অর্ডিন্যান্স নিয়ে একটি সহজবোধ্য প্রচারপত্র / পুস্তিকা দ্রুতই প্রকাশ করা হবে।

করোনা সংক্রমনের কারণে এআইকেএম-এর রাজ্য সম্মেলনের প্রস্তুতি ও সদস্য সংগ্রহ স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে ঘরে ঘরে যাওয়ার সাথে সদস্য সংগ্রহ পুনরায় শুরু হবে। এ বিষয়ে জেলাগুলি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেবে।

৪) আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হবে, ঐ দিন দিল্লির বুকে এক কিষাণ সমাবেশের ডাক দিয়েছে এআইকেএসসিসি
দাবি – কৃষক বিরোধী অর্ডিন্যান্স প্রত্যাহার কর! সারা দেশ জুড়ে ঐ দিন প্রতিবাদ দিবস পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। জেলা স্তরে যৌথ বা নিজস্ব ব্যানারে এ নিয়ে কর্মসূচী গ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

areqpur

৯ সেপ্টেম্বর পুর্বস্থলী ২নং ব্লক অফিসে গণডেপুটেশন সংগঠিত করা হল। গত ১ সেপ্টেম্বর ডেপুটেশন স্থগিত থাকার ফলেই এদিনের ডেপুটেশন। ব্লকের ৫টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ৩০০ শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ ডেপুটেশনে অংশগ্রহণ করেন। মহিলাদের উপস্থিতির পরিমাণ ছিল সংখ্যাধিক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মহিলাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। পরিযায়ী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। আয়ারলার জেলা কমিটির সদস্য শিবু সাঁতরার নেতৃত্বে ২ জন মহিলা সহ ৫ জনের প্রতিনিধি দল জয়েন্ট বিডিওকে ডেপুটেশন জমা দেন। অন্যান্য দাবির সাথে ঋণ ও ১০০ দিনের কাজের উপর জোর দেওয়া হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন অশোক চৌধুরী ও শিবু সাঁতরা। তারপর মিছিল করে গিয়ে পাটুলী বন্ধন ব্যাংকের শাখার সামনে বিক্ষোভ দেখানো হল। শাখা ম্যানেজার মারফত বন্ধন ব্যাংক জেনারেল ম্যানেজারের কাছে স্মারকলিপি পাঠানো হল। সমগ্র কর্মসূচি সংগঠিত হয় সারা ভারত কৃষি ও গ্রামীণ মজুর সমিতি, ঋণমুক্তি কমিটি ও সারা ভারত কৃষক মহাসভার পরিচলনায়। ডেপুটেশন এলাকার মানুষের মধ্যে ভাল উৎসাহ সৃষ্টি করে।

পঞ্চায়েতে যৌথ ডেপুটেশন

গত ৮ সেপ্টেম্বর মেড়তলাগ্রাম পঞ্চায়েতে সিপিআই(এম) ও সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের উদ্যোগে গনডেপুটেশন সংগঠিত করা হল। শিবু সাঁতরার নেতৃত্বে এলাকার কমরেডদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়। সিপিএমের বিধায়কও ডেপুটেশনে উপস্থিত ছিলেন।

পূর্ব বর্ধমান জেলায় খাদ্য আন্দোলন দিবস

(গত সংখ্যায় রাজ্যের অন্যান্য জেলার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে)

১৯৫৯ সালের ৩১ আগষ্ট কলকাতায় লক্ষ লক্ষ ভুখা মানুষের খাদ্যের দাবির মিছিলে মার্কিন  সাম্রাজ্যবাদের অঙ্গুলি হেলনে তৎকালীন শাসক দলের নির্দেশে শান্তিপূর্ণ জনতার উপর পুলিশের লাঠি-বেয়নেট ৮০ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তার পরের ইতিহাস হল বাংলার বাম-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্থানের ইতিহাস। সেই সময় ফসল ওঠার মরসুমে সস্তা দরে ধান ক্রয় করে অথবা মহাজনী সুদের দায়ে কৃষকদের থেকে সমস্ত ধান মজুতদার মহাজনরা হস্তগত করে মুনাফার জন্য শহরে পাচার করত। ফলে তৈরি হয় আকাল। কৃষকদের ফলানো খাদ্যের অভাই গ্রামের মানুষের অনাহার-অর্ধাহার অখাদ্য কুখাদ্য নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। গরিব মানুষের ঘটিবাটি মহাজনের কাছে বন্ধক চলে গিয়েছিল। জমি হারিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ শহরের ফুটপাত বাসিন্দা হতে হয়েছ। বাম-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চাপেই শাসকদের পিছু হঠতে হয়েছিল। অনেক কিছুই পাল্টাতে হয়েছ। বহু কিছু জাতীয়করণ করতে হয়েছে। ভুমিসংস্কার পদক্ষেপ। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ, মজুতদারী নিয়ন্ত্রণ, অত্যাবশ্যক পণ্যের নিয়ন্ত্রণ, রেশন ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া। আজকের ফ্যাসিস্ট শাসক দল জাতীয় সম্পত্তির বিলগ্নীকরণ বেসরকারীকরণ করছে। কৃষিকে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে, মজুতদারীকে উৎসাহিত করতে চাইছে। রেশন ব্যবস্থা তুলে দিতে চাইছেন। কর্পোরেটদের হাতে কৃষকদের জমিও তুলে দিতে চাইছেন। মহাজনী সংস্থার ঋণ ফাঁদ গ্রামীণ মজুরের শ্রম লুঠ করছে। তাই আজকের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন দিবসে শহীদদের স্মরণে শপথ নিতে হবে। কর্পোরেট হঠাও কৃষক বাঁচাও। সংবিধান বাঁচাও, স্বাধীনতা বাঁচাও, গনতন্ত্র বাঁচাও। শ্রমিক কৃষক মেহনতী জনগণের জীবন-জীবিকার দায়িত্ব সরকাকে নিতে হবে। ফ্যাসিস্ট রাজ ধ্বংস হোক। ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলনের অমর শহীদের লাল সেলাম।

কালনা ২নং ব্লকের অকালপোষ অঞ্চলের আগ্রাদহ বাস স্ট্যান্ডে, পুর্বস্থলী ১নং ব্লকের নাদনঘাট পঞ্চায়েতের ইসলামপুর গ্রামের চৌরাস্তায়, বর্ধমান সদর ১নং ব্লকের বন্ডুল বাজারে কর্মসূচী সংগঠিত হয়। এছাড়া মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের জেলা অফিসে কর্মসূচী সংগঠিত হয়।

eeeaar

৬টি বামপন্থী মহিলা সংগঠনের আহ্বানে গত ২৮ আগস্ট  সারা দেশ জুড়ে মহিলারা জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে সোচ্চার হন এবং বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন জেলায় সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি (এআইপিডব্লিউএ), এআইডিডব্লিউএ, এনএআইডব্লিউ, এনবিএমএস, এআইএএমএস এবং এআইএমএসএস – এই ছ’টি বামপন্থী মহিলা সংগঠনের পক্ষ থেকে যুক্তভাবে প্রতিবাদ সভা, মিছিল, বিক্ষোভ ইত্যাদি কর্মসূচী রূপায়ণ করা হয়।

কলকাতায় হাজরা মোড়ে যৌথ উদ্যোগে পথসভা, হাওড়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে আইপোয়া স্বাধীন ভাবে সভা, উত্তর ২৪ পরগণা জেলা সদর বারাসাতে যৌথ মিছিল ও আশোকনগর মোড়ে আইপোয়া-র নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিবাদ কর্মসূচী, দক্ষিণ ২৪ পরগণা আইপোয়ার উদ্যোগে বজবজে চড়িয়াল ও কালীপুর মোড়ে সভা, হুগলি জেলায় চুঁচুড়া পিপুালপাতির মোড়ে যৌথ সভা, পশ্চিম বর্ধমান জেলার বার্নপুর বাজার সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডে আইপয়া ও আইডোয়া’র যৌথ কর্মসূচী, কুচবিহারের ঘাসবাজারে সংগঠনগুলির উদ্যোগে যৌথ মিছিল ও সভা, শিলিগুড়ি হাসমিচকে আইপোয়া সহ ছয়টি বামপন্থী মহিলা সংগঠন মিলে বিক্ষোভ কর্মসূচী সংগঠিত হয়।

করোনা বিপর্যয়ের এই বিশেষ পরিস্থিতিতেও রাজ্য জুড়ে হাজার হাজার মহিলা স্বতস্ফূর্তভাবে এই যৌথ প্রতিবাদ কর্মসূচীতে অংশ নেন। এই কর্মসূচী থেকে খাদ্য সুরক্ষা সহ সমস্ত মহিলাদের কর্মসংস্থান, সকলের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রতিটি পঞ্চায়েতে ও পৌরসভায় সুব্যবস্থাসম্পন্ন সরকারী হাসপাতাল, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের ঋণ মকুব, নারীর উপর হিংসা বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক বন্দী ও নারী আন্দোলনের কর্মীদের মুক্তির দাবিতে রাজ্য জুড়েই নারী-কণ্ঠ সোচ্চার হয়ে ওঠে। আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, পরিচারিকা প্রভৃতি স্কিম ওয়ার্কারদের সরকারী কর্মচারি ও শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান ও নিয়মিত ভাতা প্রদান, নূন্যতম ১০ হাজার টাকা বেতন/ভাতা ও ঋণমুক্তি সহ মহিলাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে এই বিক্ষোভ কর্মসূচী চলে। এই জমায়েতগুলিতে আইপোয়া’র রাজ্য জেলা ও স্থানীয় নেত্রী ও কর্মীদের উপস্থিতি যথেষ্ট ভালো মাত্রায় ছিল।

– ইন্দ্রানী দত্ত   

migwrw

আলোচনা : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজর্ষি দাশগুপ্ত

‘সমাজ ও চিন্তা’ নামের একটি উদ্যোগের পক্ষ থেকে গত তিন দশক যাবৎ সমাজতত্ত্ব ও সমাজ-আন্দোলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। কোভিড সংক্রমণের পরিস্থিতিতে মুখোমুখি আলোচনার পরিসর ছেড়ে এই প্রথম গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০তে এই আলোচনা হল গুগল মিট-এর মাধ্যমে, অনলাইন পরিসরে। এদিনের আলোচক ছিলেন দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাজর্ষি দাশগুপ্ত। রাজর্ষি দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন, সমীক্ষা চালাচ্ছেন, লিখছেন নগরায়ণের নতুন নতুন দিকগুলি নিয়ে। এইসূত্রে তাঁর লেখালেখিতে খুব বেশি করে উঠে আসে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রসঙ্গ। কারণ এই নতুন নগরায়ণের সঙ্গে তাদের বিরাট যোগ। এই লকডাউন পর্বে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্কটের দিকটি সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশিভাবে সামনে এসেছে। এই আলোচনায় রাজর্ষি মূলত ভারতের পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের বাসস্থান, কাজের ধরন ও সংশ্লিষ্ট দিকগুলি নিয়ে কথা বলেছেন। সেই কথা শুনতে শুনতেই আমরা কিছু নোট নিয়েছিলাম। পরে সেটি রাজর্ষির কাছে পাঠানো হয় এবং সেটি তিনি অনুমোদন করেন। সেই নোটটিই পয়েন্ট আকারে আমরা পাঠকের সামনে তুলে দিচ্ছি।

‘পাড়া থেকে পাড়া গাঁ – গরিবের ঠিকানা ও মহানগরের চরিত্র’ এই শিরোনামকে সামনে রেখে দক্ষিণ এশিয়ায় নগরায়নের সাম্প্রতিক প্যাটার্ন নিয়ে এই আলোচনায় রাজর্ষি দাশগুপ্ত বললেন,

গ্রাম শহরের পারস্পরিক সমীকরণের পুনর্বিন্যাস ঘটছে। নয়া উদারনীতিবাদের সময় নগরায়ণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

আমরা সাধারণভাবে দেখি গ্রাম ধীরে ধীরে শহরকে তার জায়গা ছেড়ে দেয়।

এখন আমরা দেখছি শহরের তলায় আধা গ্রাম। এমন মানুষদের দেখি পথই যাদের ঠিকানা, পথেই তাদের বাস। বাঁচার জন্য তাদের বার বার ফিরতে হয় গ্রামে।

রাহি মাসুম রাজা লিখেছিলেন আধা গাঁও। এটা একটা ছোট কবিতা দিয়ে শুরু হচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরে কীভাবে লোকে যায়, গ্রামকে পেছনে ফেলে যায়, সেটাই আমাদের ভাবনার কাঠামো।

১৯৪৯ সালে এটা লেখা। কোলকাতায় তখন অনেক চটকল। সেখানে গ্রাম থেকে আসা মানুষদের ভিড়। কলকাতা, মুম্বাই, ঢাকা, কানপুরের কথা আসছে এই আখ্যানে।

এখান থেকে আমরা চলে আসতে পারি বর্তমান সময়ে। এই সময় আমরা দেখলাম পরিযায়ী শ্রমিকদের বাস্তব। আজিজ প্রেমজী বিশ্ববিদ্যালয় ৫,০০০ পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে এই পর্বে এক সমীক্ষা করে। সেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবিকার ভয়ানক সঙ্কট ও অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর কথা উঠে এসেছে। চাষিরা ফসল বেচতে পারেননি, বা বেচলেও অনেক কম দামে বেচতে হয়েছে। খারিফ শস্য মার খেয়েছে, বীজ, সার কেনায় সমস্যা হয়েছে। জমানো টাকায় টান পড়েছে। দশ জনের মধ্যে আটজন ভয়ানক সমস্যায় পড়েছেন। শহরে বসবাসকারী শ্রমিকদের অবস্থা হয়েছে সবচেয়ে খারাপ।

বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে জিডিপি প্রায় ১২ শতাংশ কমতে চলেছে। অর্থনীতি ও চাকরির বাজার আরো সংকুচিত হচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণির ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে চলেছে।

আজকে ভারতের শ্রমিক শ্রেণির ৯০ শতাংশের বেশি আছেন অসংগঠিত ক্ষেত্রে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, উত্তরপ্রদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করতে যান দিল্লি, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কেরালার শহরগুলোতে।

কীভাবে থাকেন পরিযায়ী শ্রমিকেরা? মহারাষ্ট্রের ধারাভির কথা ধরা যাক। এখানে ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার পিছু একটি করে শৌচাগার। প্রায় সাত লক্ষ লোক এভাবে থাকেন এখানে।

ন্যাশানাল ক্যাপিটাল রিজিয়ন-এ বিহার থেকে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে করা এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে তারা প্রায় দু’মাস রোজগার বিহীন ছিলেন। এরপর ৩২ লক্ষ শ্রমিক বিহার সরকারের থেকে আশ্বাস পেয়ে রাজ্যে ফিরে আসেন। কিন্তু ফিরে এসেও তারা কাজকর্ম তেমন কিছু পাননি।

গবেষক ঋতজ্যোতি মোহালির জগৎপুর নামে এক গ্রামের কথা বলেছেন। এ ধরনের গ্রাম টায়ার টু শহরের পাশে বা মধ্যে অনেক আছে। তারা কীভাবে মহানগরের কাজে লাগে সেটা দেখার। এই গ্রাম গড়ে উঠেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে। বড় বড় শহরের মধ্যে এরকম অনেক লেবার কলোনি গড়ে উঠেছে। এরা লকডাউন শুরু হবার পর পায়ে হেঁটে নিজেদের গ্রামে ফিরতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রেই তা বারোশো থেকে পনেরোশো কিলোমিটার দূরে।

খোড়া কলোনি এনসিআর অঞ্চলে। এটা এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পরিযায়ী শ্রমিকদের কলোনি। মূলত বিহার, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক লক্ষ মানুষ এখানে এসে থাকেন। ইউটিউবে রাভিশ কুমারের এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও আছে। খোড়া কলোনির পরিযায়ী শ্রমিকদের বিরাট ভূমিকা আছে নয়ডার আর্থিক বিকাশে। কিন্তু তাদের অবদান প্রায় হিসেবের বাইরে থেকে যায়।

বামপন্থী রাজনীতি কারখানা পরিসর নিয়ে যতটা কাজ করেছে, বাসস্থান ও মহল্লার মধ্যে বেঁচে থাকা, বাসস্থানের অধিকার নিয়ে ততটা করেনি – এটা রাজর্ষি মনে করে করেছেন তাঁর আলোচনায়। সেইসঙ্গে তিনি এও মনে করেছেন বাম রাজনীতির ঘুরে দাঁড়ানো, শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে তাদের জনভিত্তিকে ফিরে পাবার জন্য কারখানা বা কাজের পরিসরের বাইরে বাসস্থান বা মহল্লার মধ্যে কাজের পরিসর বাড়ানো দরকার। মহল্লার ও বাসস্থানের অবস্থার উন্নতিকে দাবিদাওয়া আন্দোলনের মধ্যে আরো বেশি করে নিয়ে আসার দরকার।

দক্ষিণ এশিয়ার বড় বড় শহরে অরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে যারা কাজ করেছেন তারা জানিয়েছেন পরিযায়ীরা মূলত ভাড়াটে হিসেবে এই “আর্বান ভিলেজ”গুলোতে থাকেন। এশিয়ায় কম খরচের ভাড়াবাড়িতে যারা থাকেন তাদের ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক। এগুলির অনেকগুলিই বেআইনি লেবার কলোনি। গবেষক মুক্তা নায়েকের এই সংক্রান্ত কাজ আছে গুরগাঁও নিয়ে। দেবীলাল কলোনি সহ আরো কিছু গ্রাম নিয়ে তিনি কাজ করে দেখিয়েছেন সরকারী আবাস দেবার যোজনাগুলি কেন এরা পাচ্ছে না। এই যোজনাগুলি পাবার শর্ত আছে। বাড়ির মালিকেরাই এগুলি পাবার অধিকারী। ভাড়াটে পরিযায়ীরা এগুলি পাবার অধিকারী নন। পরিযায়ীদের মধ্যে অনেকে বেআইনি লিজ-এ থাকে। অনেকে ভাড়া দেয়। অনেকে ভাড়া দেয়না, নানা রকম ফাই ফরমাস খেটে দেয়।

এশিয়ায় বাড়ি ভাড়ার আশি শতাংশ এমন বাড়ি যেখানে নিম্নবিত্তরা নিজেদের বাসগৃহকে বাড়িয়ে বাড়া দেন। এই ভাড়াটাই তাদের আয়ের একমাত্র পথ।

ভারতের নানা লেবার কলোনি, যেমন ব্যাঙ্গালোরে আগেই ভাড়ার টাকা অগ্রিম দিতে হয়। একটি বড় হলে ডর্মিটারি ধরনে ভাড়া দেওয়া হয়।

আশি বছর আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন “মমতাদি” নামের উপন্যাস। ১৯৪৬ সাল নাগাদ আখ্যানটা লেখা হয়। ‘জীবনময় লেন’ নামটা একটা ঠাট্টা হয়ে ওঠে। আর একটি লেখা “শহরবাসের ইতিকথা”। এই আখ্যানগুলি আজকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়।

- প্রতিবেদক, সৌভিক ঘোষাল  

veedt

বিগত ২৯ জুলাই সরকারিভাবে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত হওয়ার পরে এই বিষয়ে আলোচনা এবং বিতর্ক চলছেই। মোদি সরকারের সমস্ত নীতির ক্ষেত্রেই এই উলট-পুরান চলে – আলোচনা সবসময়ে নীতি ঘোষণার পরে হয়, আগে নয় কারণ গণসংগঠন থেকে আরম্ভ করে সংসদ পর্যন্ত পর্যালোচনার সমস্ত পরিসর থেকেই নীতিগুলিকে সযত্নে দূরে সরিয়ে রাখা হয় যতদিন না আকাশবাণী বা বজ্রাঘাতের মতো সেগুলি নাগরিকদের ঘাড়ে এসে পড়ে। এবারেও লক ডাউনের কারণে যখন মার্চ মাস থেকে সংসদের কাজকর্ম বন্ধ, রাজ্য সরকারগুলি করোনার সংক্রমণ নিয়ে এবং দেশের সাধারণ মানুষ চরম আর্থিক সংকটে জর্জরিত সেই সময়ে প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরোর মাধ্যমে কয়েকটি পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড জারি করে জানানো হয় যে নতুন শিক্ষানীতি মন্ত্রীমণ্ডলের অনুমোদন পেয়েছে। সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী এই সম্পর্কে একটি  উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছেন (‘কী ভাবব, না শিখিয়ে কী ভাবে ভাবব, শেখাতে চায় শিক্ষানীতিঃ নতুন পথ, নতুন চিন্তা’, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ শে অগাস্ট ২০২০)।

অধ্যাপক চক্রবর্তীর মতে এই শিক্ষানীতির মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারীকরণের রাস্তা খুলে দেওয়া হচ্ছে এই ভয় অমূলক। এই আশ্বাসের পিছনে একমাত্র অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন শিক্ষাখাতে ৬% জিডিপি বরাদ্দের সুপারিশ। সুপারিশ সরকারি অঙ্গীকার নয়, এবং সুপারিশটিও নতুন নয়। ১৯৬৬ সালে কোঠারি কমিশনও একই সুপারিশ করেছিল, ১৯৬৮ সালে দেশের প্রথম শিক্ষানীতিতে এর উল্লেখ ছিল, ১৯৮৬ সালের শিক্ষানীতিতে সেই সুপারিশের পুনরাবৃত্তি হয়। অথচ ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে জিডিপির মাত্র ৪.৪৩% শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি ধরে নিলে প্রকৃত ব্যয় আরো কম। শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আর্থিক দায়ের গোটাটাই জিডিপি ভিত্তিক হওয়ার মানে প্রকৃত খরচের পরিমাণ জিডিপির উত্থানপতনের সঙ্গে জড়িয়ে সবসময় অনিশ্চিত থেকে যায়। ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি যেখানে প্রায় ২৪% কমে গেছে সেখানে জিডিপির ৬%-এর চর্বিতচর্বন অর্থহীন।

অধ্যাপক চক্রবর্তী বলেছেন শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারী আর্থিক সাহায্য এই দেশে নতুন নয়, অনেক বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবেই গড়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে জানিয়েছেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে মদনমোহন মালব্য এবং বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠাকালে রবীন্দ্রনাথ বেসরকারী আর্থিক সাহায্য নিয়েছিলেন। যুক্তিটি অদ্ভুত। কারণ যে উদাহরণগুলি তিনি দিয়েছেন তার প্রতিটিই ঔপনিবেশিক শিক্ষাপ্রণালীর বিপ্রতীপে শিক্ষার অন্য মডেল তৈরির জন্য নেওয়া ব্যক্তিগত এবং বেসরকারী উদ্যোগ। এর সঙ্গে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং খাতায়কলমে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভূমিকার কোনো তুলনা চলে না। একইসঙ্গে উনি বরাভয় দিয়েছেন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই খর্ব হবে না, চার ধরনের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে বেশ শক্তপোক্ত বন্দোবস্ত করা আছে।

নিয়ন্ত্রণ আর সার্বভৌমত্বের এই সমীকরণ অতিসরলীকৃত। নয়া শিক্ষানীতিতে একদিকে ‘হালকা অথচ আটোসাটো’ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা আছে; অন্যদিকে এক এমন নিয়ন্ত্রকতন্ত্র তৈরির ব্যবস্থা করা আছে যার নিজের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নেই। নীতিনির্ধারন, গুণমান নির্ণয়, গবেষণায় আর্থিক অনুদান এবং পঠনপাঠনের দিশানির্দেশ – উচ্চশিক্ষার এই চারটি প্রধান দিক একটিই নিয়ামক সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। স্বভাবতই এই সংস্থা অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হবে এবং এর দায়বদ্ধতা সুনিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা নথিতে দেওয়া নেই। শিক্ষানীতির ৬৬ পাতার দস্তাবেজের মধ্যে ৪০ পাতা জুড়েই বহুস্তরীয় আমলাতন্ত্রের সাহায্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা – একেবারে দিল্লি থেকে ব্লক স্তর পর্যন্ত সেই আমলাতন্ত্রের বিস্তার। নথিটি পড়ে মনে হয় না যে সংবিধানে শিক্ষা কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ তালিকার অন্তর্ভুক্ত বিষয় এবং নথিটি একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে।

শিক্ষানীতি কোনো নিরালম্ব, বায়বীয় পদার্থ নয়। তাকে বুঝতে হলে কেবল একটি ৬৬ পাতার নথি যথেষ্ট নয়, নথিটিকে সামগ্রিক নীতি-আবহের পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা দরকার। জুন মাসের ২৪ তারিখ, অতিমারির আবহে, কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি ঋণের চুক্তি অনুমোদন করে। এটি কোনো এককালীন ঋণ নয়, বরং একটি দীর্ঘকালীন কর্মসূচির অন্তর্গত তৃতীয় দফার ঋণ। এই দফার কর্মসূচীর নাম Strengthening Teaching-Learning and Results for States, সংক্ষেপে STARS। এর আগের দু’দফায় ১৯৯৩-২০০২ সাল পর্যন্ত District Primary Education Programme (DPEP) এর মাধ্যমে এবং ২০০২ সাল থেকে সর্ব শিক্ষা অভিযানের মাধ্যমেও একইভাবে ভারতের স্কুলশিক্ষাক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংক প্রভাব বিস্তার করেছে। STARS সমগ্র শিক্ষা অভিযানের অংশ হলেও তার মোট বিনিয়োগের মাত্র ১.৪% এই ঋণের মাধ্যমে আসবে, বাকি পুরোটাই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির পকেট থেকে আসবে। অথচ এই সামান্য বিনিয়োগের বিনিময়ে বিশ্বব্যাংক একেবারে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত  শিক্ষা পদ্ধতি, বিষয়, পঠন-পাঠন, এককথায় স্কুলশিক্ষার সম্পূর্ণ প্রকরণকে প্রভাবিত করতে পারবে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে বিশ্ব ব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বার্থ দেখাই তার কাজ, স্কুলশিক্ষায় তার ভূমিকা কী? ১৯৮০’র দশক থেকেই বিশ্বব্যাংক তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়ে কখনো ‘জনসেবার’ নামে কখনো প্রাইভেট-পাবলিক-পার্টনারশিপের আকারে বেসরকারী পুঁজিকে অগ্রাধিকার দেওয়ানোর চেষ্টা শুরু করে। ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের জবাবদিহি কমে যায় অন্যদিকে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উপর সরকারী নিয়ন্ত্রণও ক্রমশ কমতে থাকে। ২৮ অগাস্ট ‘ফ্রন্টলাইন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে মধু প্রসাদ জানাচ্ছেন বিশ্বব্যাংক প্রণীত DPEP দেশের ১৮টি রাজ্যে এবং মোট জেলার মধ্যে অর্ধেক জেলায় প্রযুক্ত হয়। এর মাধ্যমে স্কুলশিক্ষার প্রসার এবং গুণমান বিষয়ে সরকারী স্কুলগুলিকে ‘স্বল্প মূল্যের উপায়’ বাতলানো হয়। ফল হয় মারাত্মক। সরকারী প্রাথমিক স্কুলগুলির ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা দুটোই কমতে থাকে। ব্যাপক বেসরকারীকরণ শুরু হয়। ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন পাশ হয়। এই আইনকে সার্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি মাইলস্টোন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু এই আইন বিশ্বব্যাংক মডেলকেই অনুসরণ করে। ১৯৬৪-৬৬ সালের শিক্ষা কমিশন জনশিক্ষার জন্য কমন স্কুল সিস্টেমের কথা বলেছিল; বলেছিল নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক স্কুল হবে যেখানে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে এলাকার সমস্ত শিশু পড়বে, যদিও ১৯৬৮ সালের শিক্ষানীতিতে সেই স্কুলের উল্লেখ থাকে না কারণ শিক্ষা শ্রেণিব্যবস্থাকে ধরে রাখার অন্যতম প্রকরণ; তার শ্রেণিচরিত্র আমূল পরিবর্তনে স্বাধীন ভারতের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারই উৎসাহী ছিল না। শিক্ষার অধিকার আইনও শিক্ষাব্যবস্থার মূলগত অসাম্যকে দূর করার বদলে বেসরকারী স্কুলে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের শিশুদের ২৫% সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে একভাবে স্কুলশিক্ষার বেসরকারীকরণে স্বীকৃতির শিলমোহর লাগিয়ে দেয়।

শিক্ষার অধিকারের অতি সীমিত ব্যাখ্যা সত্ত্বেও এই আইন ২০০২ সালে সংযোজিত সংবিধানের ২১(এ) ধারাকে স্বীকৃতি দেয় যাতে আবশ্যিক এবং বিনামূল্যের শিক্ষা ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সমস্ত শিশুর মৌলিক অধিকারের মর্যাদা পায়। শিক্ষানীতির কস্তুরিরঙ্গন কমিটি-কৃত ড্রাফটেও এই কথার স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতিতে কোথাও বলা নেই যে বিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার অধিকার আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক হবে। এ সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ার মানেই এই আইনের শর্তগুলিকে লঙ্ঘন করার সুযোগ করে দেওয়া, যদিও বিনা শিক্ষানীতিতেই বেশিরভাগ বেসরকারী স্কুল এই আইনকে স্বচ্ছন্দে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থাকে।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ২০০৫ সালে ভারত সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) সঙ্গে GATS চুক্তি স্বাক্ষর করে উচ্চশিক্ষাকে ‘বাণিজ্যিক পরিষেবা’র স্বীকৃতি দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রবেশাধিকার দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এই চুক্তি যখন হয় তখন কেন্দ্রে অন্য সরকার ছিল, সেই সরকারের সহযোগী হিসেবে সংসদীয় বামপন্থী দলগুলির অনেকেই ছিলেন। দশটি রাজ্য সরকারের শিক্ষামন্ত্রীরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও চুক্তি সাক্ষর হয়। ২০১৫ সালে মোদি জমানায় সে চুক্তি পাকাপোক্ত হয়। অথচ সারা পৃথিবীর প্রায় ৩ কোটি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী এডুকেশন ইউনিয়ন শিক্ষাকে ‘বাণিজ্যিক পরিষেবা’ হিসেবে দেখার বিরোধিতা করে ২০০৯ সালে বলে, “শিক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে দেখা যাবে না...। GATS একটি বাণিজ্যচুক্তি যার একমাত্র লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের ব্যবসার সুযোগবৃদ্ধি ...” মুনাফাখোরি ছাড়াও শিক্ষাকে ‘বাণিজ্যিক পরিষেবা’ হিসাবে দেখার অন্যতম উদ্দেশ্য হোলো পরিবর্তনশীল এবং উত্তরোত্তর চুক্তিভিত্তিক শ্রমনির্ভর বাজারের উপযোগী কর্মীর অফুরান জোগান। নতুন শিক্ষানীতি বলছে দেশকে ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের’ জন্য প্রস্তুত হতে হবে আর তার জন্য উচ্চশিক্ষার ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি’ হওয়া প্রয়োজন। চুক্তিশ্রমের বাজারও এমন কর্মীই চায় যে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয়; নানান ‘স্কিলসেটের’ অর্থাৎ দক্ষতার সমষ্টি যাতে নিরন্তর কর্মী ছাঁটাইয়ের আবহে একজনকে দিয়ে একাধিকের কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। একের মূল্যে একাধিক কর্মী রাখা যায়।

নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির নথিটি প্রায়শই স্ববিরোধে পূর্ণ; সন্দেহ হয় এই স্ববিরোধ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যাতে ভাব ও ভাষার দ্বন্দ্বের মধ্যে রাজনৈতিক ছায়াচিত্রটি ধোঁয়াটে থেকে যায়। যেমন এই নীতির ঘোষিত উদ্দেশ্য শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ বন্ধ করা। অথচ একই নিশ্বাসে বলা হচ্ছে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে আইনি নিয়ন্ত্রণ কমানো দরকার যাতে বেসরকারী এবং বিদেশি বিনিয়োগ আসে। বিশ্ব ব্যাংকের ফর্মুলা মেনেই যেসব বেসরকারী প্রতিষ্ঠান “মানবকল্যাণ ও জনসেবার উদ্দেশ্য” নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে চায় তাদের উৎসাহ দেওয়া হবে। এহেন ‘মানবকল্যাণকামী’ বেসরকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছেমতো কোর্সের ফি ধার্য করতে পারবে যদি তারা কিছু ফ্রি-শিপ বা স্কলারশিপের ব্যবস্থা রাখে। জনশিক্ষার মূলে যে সমতার ধারণা, সকলের জন্য সমমানের শিক্ষার সমান সুযোগ, তার ফলিত প্রয়োগে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। এখন নীতির জগত থেকেও তাকে নির্বাসন দিয়ে বিদ্যায়তনে শ্রেণিবৈষম্যকে স্থায়িত্ব দেওয়া হোলো। উপরন্তু যে সরকার নিজেই শিক্ষাক্ষেত্রে সবরকম বৃত্তি প্রায় তুলে দেওয়ার মুখে তারা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বৃত্তির নিশ্চয়তা দেবে এই গল্প মহামারীদীর্ণ ভারতে, যেখানে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রবৃত্তি পর্যন্ত বন্ধ থেকেছে, সেখানকার কোনো ছাত্র বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। নয়া শিক্ষানীতিতে অনলাইন শিক্ষার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই অতিমারিতে অনলাইন ক্লাস নেওয়া থেকে অনলাইন পরীক্ষা নেওয়ার মতো একাধিক বিষয়ে সরকারী গা জোয়ারি হয়েছে, এর মাধ্যমে সমাজে এক নতুন অসাম্য জন্ম নিয়েছে, আবার সেই অসাম্য সমাজে স্বীকৃতিও পেয়েছে। ইউজিসি’র কমিটি বলেছে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে লক ডাউনের মধ্যেও ৬০%-৭০% সিলেবাস শেষ করা সম্ভব; কাদের পক্ষে সম্ভব সে বিষয়ে অবশ্য কোনো বক্তব্য রাখেনি। নয়া শিক্ষানীতিও বলছে অনলাইন আর ক্লাসরুম শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। তার জন্য অনলাইন শিক্ষার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, কোর্স তৈরি ইত্যাদির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক সামাজিক মাধ্যমে ‘ভারত পড়ে অনলাইন’ নামক হ্যাশট্যাগ চালিয়ে এ বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের মতামত জানতে চেয়েছে; যদিও সেই মতামত মোদির ভারতের আরো অনেক মতামতের মতই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গেছে। ২০০০ সালের বিড়লা-আম্বানি রিপোর্টেও ওপেন লার্নিংয়ের জয়গান ছিল। ২০১৪ সালে মোদি সরকার আসার পরে স্বয়মের মত প্ল্যাটফর্ম হয় যাতে স্বল্প মূল্যে রেজিস্টার করে বিভিন্ন কোর্স করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে বাজারে আসে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থান যাদের মাধ্যমে নানান বিখ্যাত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন কোর্স করে শংসাপত্র পাওয়া যায়, অবশ্যই মোটা মূল্যের বিনিময়ে।

২০১০-১১ সাল থেকে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন রিপোর্টে ম্যাসিভ অনলাইন ওপেন কোর্স বা ‘MOOC’ প্রসঙ্গ উঠে আসে, বলা হয় উন্নতিশীল বিশ্বে উচ্চশিক্ষার প্রসারে MOOC নাকি বৈপ্লবিক ভূমিকা নিতে পারে। ভারতের মতো দেশ এই জাতীয় প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত – GATS চুক্তির সময়েই বোঝা গিয়েছিল আমেরিকা এবং চীনের পরে ভারতের উচ্চশিক্ষাক্ষেত্র বিশ্বে তৃতীয় সর্ববৃহৎ। এখানে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ অল্পবয়স্ক, যারা উচ্চশিক্ষা পেতে চায়। কিন্তু সামগ্রিক ভর্তির অনুপাত, অর্থাৎ Gross Enrolment Ratio (GER) খুবই কম। ২০০৭ সালে সুখদেও থোরাট কমিটি এই বিপুল বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারকে আরো বেশি সংখ্যক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা বলেন। নয়া শিক্ষানীতি GER’কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে, বলা হয়েছে আগামী পনেরো বছরে GER দ্বিগুণ করা হবে, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর বদলে বর্তমানের ৫২,০০০ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কমিয়ে ১৫,০০০ করা হবে। তাহলে GER-এর মোক্ষ সাধিত হবে কী করে? এখানেই MOOC-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ‘বৈপ্লবিক ভূমিকা’। একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার একটা অংশ অনলাইন করে দিলে অধ্যাপকের বিপুল ঘাটতি পূরণের বদলে শূন্যপদগুলি লোপ করা যাবে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার ক্রমসংকোচন ও বেসরকারীকরণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে দেশের একটা বড় অংশের মানুষের সাধ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে এরফলে তৈরি হওয়া শূন্যতার সুযোগে অনলাইন কোর্স এবং ডিগ্রির বাজার গড়ে তোলা। স্বভাবতই এতে GER বাড়বে, এবং সেই বর্ধিত GER-কেই শিক্ষানীতির চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখানো যাবে, যদিও এরসঙ্গে শিক্ষার মানের কোনো সম্পর্ক নেই। সরকারও জানে যে হার্ভার্ড আর অনলাইন হার্ভার্ডের ডিগ্রির বাজারমূল্য এক নয়। স্বল্পমূল্যের ডিগ্রি বাজারে স্বল্পমূল্যের কর্মীর জোগান দেবে, সঙ্গে বেসরকারী মুনাফার এক বিপুল সম্ভাবনা।

এই শিক্ষানীতি শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের এক দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার সারাৎসার। স্বশাসনের ফাঁপা বুলির পিছনে শিক্ষার প্রশাসনিক কেন্দ্রিকরণ এবং আর্থিক বিকেন্দ্রিকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের খবরদারি আর বাজারের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য সাধনের চেষ্টা।

- শিঞ্জিনী বসু  

ves


বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি চাই।
ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যবিমা করতে হবে।লকডাউনে অনলাইনে পড়ানো সিলেবাসের অংশ থেকে প্রশ্ন করা যাবে না।
একান্তই কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে না পারলে, ফেল করানো যাবে না।

এই উপরিউক্ত দাবিগুলিকে সামনে রেখে পাঁচটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের ডাকে দেশব্যাপী প্রতিবাদ দিবসে সামিল হয়ে ৯ সেপ্টেম্বর হাওড়া জেলার বেলুড়ে সংগঠিত হল যৌথ কর্মসূচী।

আইসার পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন আইসা হাওড়া জেলা সম্পাদক অঙ্কিত মজুমদার ও সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক  নীলাশিস বসু, এসএফআই-এর তরফ থেকে বক্তব্য রাখেন জাতীয় যুগ্ম সম্পাদক দীপ্সিতা ধর ও এআইএসএফ-এর তরফ থেকে বক্তব্য রাখেন সৌরভ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এসএফআই-এর লোকাল সম্পাদক কুমারদীপ মুখার্জি। প্রোগ্রামের শেষে স্লোগান ও প্রতীকী পথ অবরোধের মাধ্যমে কর্মসূচী শেষ হয়।

রিপোর্ট - অঙ্কিত   

sarrgre

পশ্চিমবঙ্গ গণসংস্কৃতি পরিষদের যাদবপুর শাখা “সংযোগ” সাংস্কৃতিক সংস্থার প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হল প্রতাপগড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিষদের সভাপতি দেবাশিস চক্রবর্তী। তিনি কোভিড পরিস্থিতিতে মানুষের যন্ত্রণার কথার সাথে রুখে দাঁড়ানোর কথাও উল্লেখ করেন। গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রণব মুখার্জী ও সুব্রত ভট্টাচার্য। তিনটি শ্রুতি নাটক অনুষ্ঠিত হয়। অভিনয়ে ছিলেন স্বপন চক্রবর্তী, স্বপ্না চক্রবর্তী, সুমিত, জিনিয়া, পূণ্যশ্রী ও শিলা দে সরকার। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন পার্থ ও বীরুন ব্যানার্জী। সভার শেষ লগ্নে সমবেত গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন নীতীশ রায়, রত্না মন্ডল সহ অন্যান্য শিল্পীরা। গৃহবন্দী জীবন থেকে ক্ষণিকের মুক্তির স্বাদ এনে দেয় এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সভাটি সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন সুব্রত ভট্টাচার্য।

খণ্ড-27
সংখ্যা-32