চলে গেলেন “মানুষের ডাক্তারবাবু”

 

"human doctor" passed away

এক জন সদাহাস্য মানুষ যিনি খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন যে কোনো মানুষের সাথে। দীর্ঘ দিন পেশাগত ভাবে ডাক্তারি করেও যিনি তথাকথিত ‘এলিট ডক্টর’ হয়ে থেকে যাননি। রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল-প্রচারে অংশ নিতেন ছক-ভাঙা কায়দায়। সাধারণ মানুষের কাছে ন্যূনতম চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াকেই নিজের রাজনৈতিক-সামাজিক কর্তব্য বলে মনে করতেন। তার সাথেই রাজনৈতিক-সামাজিক সচেতনতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতেন। সেই ডাক্তার কমরেড সমীর দাশগুপ্ত ৩১ মে চলে গেলেন।

১৯৫৩ সালের ২১ জুলাই তাঁর জন্ম। ১৩ মে কোভিড পজিটিভ রিপোর্ট আসায় ১৪ তারিখ নিজেই ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। খবর দিয়েছিলেন শুধুমাত্র নিজের খুব কাছের সুহৃদ কমরেড অমলেন্দু ভূষণ চৌধুরীকে। রাজারহাট সিএনসিআই থেকে শুরু করে কলকাতা মেডিকেল কলেজের আইসিইউ পর্যন্ত লড়াই করলেন কমরেড সমীর দাশগুপ্ত, কিন্তু শেষরক্ষা হল না।

বরাবরই নিজের সম্পর্কে উদাসীন এই মানুষটি আরও আগে হয়তো নিজের যথোপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরে সিপিআই(এমএল)-এর যাদবপুর-ঢাকুরিয়া লোকাল কমিটির পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদক, কমরেড অমলেন্দু চৌধুরী ও কমরেড প্রদীপ মন্ডল রামগড় এলাকায় তাঁর পরিবারের সাথে দেখা করেন। সেখানেই এই বিষয় নিয়ে আক্ষেপ করছিলেন কমরেড সমীর দাশগুপ্ত-র বড় মেয়ে অন্বেষা, যিনি নিজেও পেশাগতভাবে দূর্গাপুরে কর্মরত এক জন স্বাস্থ্যকর্মী। সমীর দাশগুপ্তের স্ত্রী ও পুত্র জানান, এই মানুষটি সত্যিই সকলের থেকে আলাদা ছিলেন। অন্বেষা বলেন “বাবা হাসপাতালে যাওয়ার দিন বলে গিয়েছিল ৭ দিনের জন্য বিশ্রাম নিতে যাচ্ছি। তারপর ওখান থেকে উত্তরবঙ্গে একজনের বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে যাব। তাই জামা-কাপড় গুছিয়ে নিয়ে যাচ্ছি”।

সত্যিই কমরেড সমীর দাশগুপ্ত হাসপাতালে যাওয়ার সময়ে একটি বড় ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে ছিল পাটভাঙা পাজামা পাঞ্জাবি। সে সব পরিজনেরা হাসপাতালেই ফেলে রেখে এসেছেন বুকের ব্যথা নিয়ে। পরিবারের চার জন সদস্য কেবল ডাক্তারবাবুকে শেষ বিদায় জানাতে পেরেছেন হাসপাতালে।

তাঁর স্ত্রী বলছিলেন, সংসার সম্পর্কে একটা অদ্ভুত উদাসীনতা কাজ করতো। নিজের বাড়ির দো-তলাটা পর্যন্ত ভালো করে চিনতেন না। একতলায় নিজের ছোট্ট ঘরে বসেই যাবতীয় কাজ করতেন, সময় কাটাতেন। মাঝে মাঝে ঝাড়খন্ডে যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে মাছ রান্না করে নিয়ে যেতেন কমরেডদের জন্য। পুরোনো এমনই অনেক টুকরো টুকরো স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে আসছিল। সম্প্রতি কোভিডের সাথে লড়াই করে সুস্থ হয়ে উঠেছেন প্রয়াত সমীর দাশগুপ্ত-র স্ত্রী ও পুত্র। তাদের চিকিৎসার তদারকি করলেও কেন যে নিজের সংক্রমণ সম্পর্কে এতটা অসচেতন হলেন, সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা। হাসপাতালে ভর্তির সময় থেকে কমরেড সমীর দাশগুপ্তের পরিবারের পাশে ছিল যাদবপুর-ঢাকুরিয়া এলাকার কোভিড টিম। হাসপাতালে ভর্তির আগের দিন পর্যন্তও তিনি যাদবপুরের কোভিড টিমের পক্ষ থেকে টেলি-মেডিসিন পরিষেবা দিয়েছেন সাধারণ রোগীদের। সেই “মানুষের ডাক্তারবাবু”-কে আজ লাল সেলাম দিয়ে বিদায় জানানো হল। তাঁর ফেলে রেখে যাওয়া কাজকে আমাদের সকলকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতেই হবে।

- আকাশ দেশমুখ

***

উনি ডাঃ দেবীপ্রসাদ দাশগুপ্ত। বাঁকুড়া মেডিকেল কলেজে প্যাথোলজি ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকতা করে বেশ কয়েক বছর হল রিটায়ার করেছেন। পার্টির প্রথাগত সাংগঠনিক আধারে না থেকেও একেবারে পার্টিজান মানুষ, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা ব্যক্তিত্ব সমীর নামে পরিচিত ছিলেন। ধুর্জটিদার ঘনিষ্ঠতায় ঝাড়খন্ডের ডাক্তারবাবু থেকে শুরু করে কোথায় দূরে ময়নাগুড়ি চলে যেতেন। যাদবপুর কফি হাউসে চৌধুরীদার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা, কিংবা ক্রিক রোতে দিলদরিয়া মেজাজে সকলের সুপরিচিত সমীরদা। “ঝাড়গ্রামের মাওবাদী কমরেডদেরও পার্টিতে নিয়ে আসতে হবে বুঝলি” কিংবা দিনাজপুরের ইসলামপুরে আদিবাসীদের এআইপিএফ-এ নিয়ে আসতে হবে .... কত কিই না বলতেন, উদ্যোগও নিতেন। বাঁকুড়া থেকেই ওনার সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। অনাবিল “তুই” করে ডাকা। মেডিকেল কলেজে ওনার কোয়ার্টার ছিল আমাদের অনায়াস শেল্টার। পার্থ ঘোষ বাঁকুড়া গেলে বলতেন, “এখানেই চলে আয়”। সমব্যাথী, পাশে থাকার একটা ভরসা। প্রাণবন্ত মানুষটা এভাবে চলে যাবেন ভাবাই যাচ্ছে না। সমীরদাকে জানাই লাল সেলাম।

- জয়তু দেশমুখ

***


কমরেড সমীর দাশগুপ্ত। যিনি শেষ দিকটা ছিলেন বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক। তাঁর নিজস্ব গুনে উনি চিকিৎসক ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। পাটি সদস্য না হয়েও উনি পাটির বিরাট সমর্থক ছিলেন। বাঁকুড়াতে সামান্য একটু আন্দোলন হলে কি খুশি হতেন। গত বছর যখন বনের জমির আন্দোলন বা বিষ্ণুপুরের পৌরসভার কর্মচারীদের আন্দোলন হতে দেখে উনি বিরাট খুশি। আমার বাইকের পিছনে চেপে আদিবাসী গ্রামগুলোতে যেতেন। কিছু বলতেন না চুপচাপ শুনতেন। আদিবাসীদের খুব ভালোবাসতেন। মেডিকেল কলেজে দেখেছি আদিবাসী ডাক্তারদের সাথে বিরাট দহরম। ডেকে ডেকে আমাকে দেখিয়ে বলতেন আমাদের পাটির জেলা সম্পাদক। সদ্য নির্বাচনের পরে বললেন, কদিন পর যাচ্ছি বড় করে কর্মী বৈঠক করতে হবে। উনার আসা আর হল না। ভাবতে পারছি না উনি নেই।

- বাবলু ব্যানার্জী

***

আলিপুরদুয়ারে সমীরদার দিদির বাড়ি থাকার সুবাদে মাঝেমধ্যেই আসতেন। দিদির বাড়ির যে কোনো সময় আলিপুরদুয়ারে এলে ঠিক আগে থেকেই ফোন করতেন এবং এসেই আবার ফোন করতেন। একবারই অন‍্যথা হয়েছিল এবং সেটাই শেষবার। আলিপুরদুয়ারে এসে আবার কোচবিহারে চলে গিয়েছেন। বাবুনদার কাছে খবর পেয়ে আমি ফোন করতে বললেন “ইচ্ছে করেই ফোন করি নাই কারণ কোচবিহারে আসাটা জরুরী আছিল।” পরবর্তীতে ময়নাগুড়ি কেন্দ্রে চলে গেলেন। কোচবিহারে ফিরে তাঁর প্রস্তাব ছিল শীতলকুচিতে গুলিকান্ডের ঘটনায় পার্টির পক্ষ থেকে সরজমিন অনুসন্ধান দল যাওয়া উচিত। মূলত তাঁর উৎসাহেই তড়িঘড়ি একটা টিম গঠন করে (পার্টির রাজ‍্য কমিটির অনুমোদনক্রমে) শীতলকুচি যাওয়া হয়। কিন্তু যাঁর উৎসাহ এত বেশি সেই সমীরদাই যেতে পারলেন না। ঠিক তার আগের দিনই জরুরী প্রয়োজনে তাঁকে কলকাতা ফিরে যেতে হয়েছিল। সেটাই সমীরদার শেষ উত্তরবঙ্গে আসা।

মজার কথা যে আমার সাথে সবসময়ই পূর্ববঙ্গীয় বাংলায় কথা বলতেন।

সমীরদা নেই এটা মেনে নেওয়া খুবই শক্ত। টুকরো টুকরো অজস্র স্মৃতি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সমীরদা লালসেলাম।

– চঞ্চল দাশ 

খণ্ড-28
সংখ্যা-20