নির্লিপ্তি ও অপরাধসম উদাসীনতার বালুরাশিতে মুখ লুকিয়ে মোদী সরকার
government is hiding its face in the sand

নির্লিপ্তি ও অপরাধসম উদাসীনতার বালুরাশিতে মুখ লুকিয়ে মোদী সরকার ভাবছে অর্থনৈতিক মন্দার এই সুনামি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। গত বিত্ত-বর্ষে (২০২০-২১) জাতীয় আয় বা জিডিপির ৭.৩ শতাংশ সংকোচন ঘটল, যা বিগত চল্লিশ বছরের মধ্যে সর্বাধিক! অতল অন্ধকারের গহ্বরে পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বৃদ্ধির অর্থনীতি তলিয়ে যাওয়ার পরও অর্থদপ্তরের নির্লজ্জ বেহায়া প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর বুক চাপড়ে বলেন, “ভারতের অর্থনীতি এখন যথেষ্ট প্রাণবন্ত। ধারাবাহিক সংস্কারে ভর করে তা ঘুরে দাঁড়াবে। নানা ক্ষেত্রে সেই লক্ষণ ও স্পষ্ট”। এদিকে, প্রাক্তন মুখ্য উপদেষ্টা কৌশিক বসু দেখিয়েছেন যে জিডিপির এই পরিসংখ্যানের নিরিখে ১৯৪টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪২-এ। স্বাধীন ভারতে অর্থনীতির এতো গভীর পতন এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

এই নজিরবিহীন আর্থিক সংকোচনের জন্য কোভিডের দিকে যতই অঙ্গুলিনির্দেশ মোদী সরকার করুক না কেন, এটা স্পষ্ট যে কোভিড হানা দেওয়ার ঢের আগেই ভারতীয় অর্থনীতি চরম সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ব্যাপক বেকারত্ব, অত্যন্ত কম মজুরিতে সামাজিক সুরক্ষাবিহীন ঝুঁকি পূর্ণ কাজে ভারতের সিংহভাগ শ্রমশক্তি কাজ করছেন বিভিন্ন ইনফর্মাল ক্ষেত্রে। ক্রমহ্রাসমান ক্রয় ক্ষমতার ফলে চাহিদার ক্ষেত্রে বিরাট এক কালো মেঘ ঘনিয়ে উঠে, তার সমাধানে প্রথিতযশা অর্থশাস্ত্রীরা নানা পরামর্শ দিলেও মোদী সরকার তা চরম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। অর্থনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম কান্ডজ্ঞান বা ধারণা যে তাদের একেবারেই নেই, আমাদের রাষ্ট্রনেতাদের এই বোধটারই বড় অভাব। কথায় বলে, মূর্খের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হল, নিজের অন্ধত্ব সম্পর্কে অজ্ঞানতা।

প্রতিদিন কর্মহীনতা ও অর্থনীতি নিয়ে আতঙ্কজনক তথ্য সামনে আসছে। দিন কয়েক আগে, সিএমইআই-এর কর্ণধার মহেশ ব্যাস জানালেন, প্রথম কোভিড ঝড়ের পর দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ আরও গরিব হয়েছেন। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাঙ্গীণ সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে যে প্রথম লকডাউনের পর ২৩ কোটি ভারতীয় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন আরও দারিদ্রের কবলে। কোভিড সবচেয়ে বেশি আঘাত দিয়েছে মহিলাদের কর্মসংস্থানের উপর। সাধারণ ভাবে, পৃথিবীর মধ্যে শ্রমে অংশ নেওয়া মহিলা শ্রমশক্তির হারের ক্ষেত্রে ভারত সবচেয়ে নীচে। কোভিড এই শেষ তলানিটাকে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। গত একমাসেই লোপাট হয়ে গেল প্রায় দেড় কোটি মানুষের কাজ! ফি মাসে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। ভারতের অর্থনীতিকে আজ গ্রাস করেছে সংকটের ত্রাহস্পর্শ। অত্যন্ত মন্থর আর্থিক বৃদ্ধি, ক্রমে বেড়ে চলা দারিদ্র ও দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসা মধ্যবিত্ত শ্রেণি – এই তিনটি মূর্তিমান বিভীষিকা আজ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতকে কখনই সম্মুখীন হতে হয়নি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের অনুমান, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ৩.২ কোটি পর্যন্ত সংকুচিত হয়ে যাবে আর নতুন করে ৩.৫ মানুষ আরও গরিব হয়ে যাবেন।

এতদিন পর্যন্ত চলে আসা নয়া উদারবাদী অর্থনীতির চরম অন্তঃসারশূন্যতাকে কোভিড নির্দয়ভাবে বে-আব্রু করল। কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভড়ংটাকে বজায় রেখে জনহিতৈষী যে সমস্ত পদক্ষেপ একসময় সরকারগুলো নিত, নয়া উদারবাদ সেখান থেকে নিজেকে সরিয় নেয়। রাষ্ট্র যতই নিজের জায়গা থেকে সরে এসে কর্পোরেটদের জন্য ছেড়ে দিতে থাকল মুনাফা লোটার বিস্তর পরিসর, ততই নাভিশ্বাস উঠল সাধারণ মানুষের। স্বাস্থ্য, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো ব্যক্তিগত মালিকানার কুক্ষিগত হওয়ায় মানুষের স্বার্থর বদলে মুনাফাই হয়ে উঠলো প্রধানতম লক্ষ্য। আজ, কোভিড চরম মুল্য দিয়ে এই সর্বনাশা গতিপথকে শুধরে তোলার বার্তা হাজির করেছে। তাই, নয়া উদারবাদের মক্কা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এখন কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যে ভিন্ন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে কোভিডে তছনছ অর্থনীতিকে মেরামত করতে। খুব সম্প্রতি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বিডেন ২.৩ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার পরিকাঠামো বাবদ বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য - শিক্ষাখাতে অনেক বেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মনিশ্চয়তা খাতে, শিশু কল্যাণে, শ্রমিকদের মজুরিকে সুরক্ষিত করতে, সমাজের দুর্বলতম শ্রেণির জন্য সরাসরি আর্থিক অনুদান প্রভৃতি ঘোষণা করলেন। প্রত্যেক মার্কিনীকে আর্থিক অনুদান ও আছে এই প্রকল্পে। সবচেয়ে বড় কথা, কর্পোরেট ও অতি ধনীদের উপর আরোপ করা হল কর। সরকার ও রাষ্ট্র এবার নিজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ অনেক বাড়ালো। উপর থেকে সম্পদ চুইয়ে পড়ার তত্ত্বের বিপরীতে নীচ থেকে উন্নয়ন স্বীকৃতি পেল। কোভিড ত্রাণে আমেরিকা তার জিডিপির দশ শতাংশের ও বেশি বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কিন্তু, আমাদের মোদীর ভারতে?

দিনকয়েক আগে সিআইআই-এর সভাপতি উদয় কোটাক সরকারকে জানালেন, আরও অনেক বেশি টাকা ছাপিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে, দরিদ্রতম মানুষদের হাতে সরাসরি নগদের জোগান বাড়াতে, গরিব মানুষদের চিকিৎসার যাবতীয় দায় সরকারকে নিতে, ক্ষুদ্র-ছোট-মাঝারি শিল্পগুলোকে সাহায্যের হাত বাড়াতে। এই প্রস্তাবগুলোই নোবেল জয়ী বেশ কিছু অর্থশাস্ত্রীরা অনেকবার বলেছেন।

কিন্তু, ভারত হেঁটে চলেছে ভিন্ন পথ ধরে। অতিমারীর সময়ে আরো বেশি বেসরকারীকরণ, আরো বেশি দেশীয় অর্থনীতিকে কর্পোরেটমুখী করে তোলার এক সর্বনাশা পথে সে এগিয়ে চলেছে। যে কোভিডকে সুযোগে পরিণত করার হাঁক দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী, পরিহাস এটাই, সেই অতিমারীর আর্শিতে দেশের মানুষ দেখলো, হৃদয়হীন, চরম উদ্ধত্য, ভাবলেশহীন এক রাজাধিরাজকে, যার কাছে নেই জীবনের প্রতি মর্যাদা, মৃতের প্রতি সম্ভ্রম। দেশবাসীর জন্য এক বিন্দু সহমর্মিতা। আছে শুধু নিজের ভাবমূর্তিকে পালিশ করার তাগিদ। তাতে যেন একটুও টোল না পড়ে, সে ব্যাপারে আছে চরম সতর্কতা। রাষ্ট্রীয় প্রহরার আয়োজন।

নির্দয় রাষ্ট্রনেতার বিরুদ্ধে আজ দেশবাসী ক্রমেই সোচ্চার হচ্ছেন। মানুষ ফুঁসছে। টিকা প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের কাছে নিত্যদিন তিরষ্কৃত কেন্দ্রীয় সরকার। মোদীর পদত্যাগের দাবি ক্রমেই ভাষা পাচ্ছে। এটাই আশার কথা। নতুন এক উন্মেষের পথে আমাদের দেশ এগিয়ে চলেছে।

খণ্ড-28
সংখ্যা-20