ধারাভাষ্য
commentary_0

“কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা হোক বা কচ্ছ থেকে কোহিমা, আন্দোলনের প্রশ্নে বিজেপি বিরোধী সব শক্তির সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত”।

(বিমান বসু, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৭ জুলাই ২০২১)

তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তৃণমূলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লড়তেও প্রস্তুত? বিমান বাবুর জবাব, “বিজেপি ছাড়া যে কোনও দলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত”। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে, বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা কমরেড বিমান বসু দলের যুক্তমোর্চা নীতি জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন। যদিও একটা তাৎক্ষণিক বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা গেল। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অতিপরিচিত কমরেড সুজন চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, “তৃণমূল কংগ্রেস কোনদিন বিজেপির বিরোধিতা করেনি। তাই রাজ্যে তৃণমূল বিরোধিতার নীতির কোন বদল হচ্ছে না”। (প্রতিদিন, ২৭ জুলাই ২০২১)

সিপিআই(এম) দলের কোনও কোনও মহল থেকে বিমানবাবুর কথা নিয়ে বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যমের মিথ্যাচারকে গালাগালি করা শুরু হয়েছে। আমরা বরং বিমানবাবুর কথাটাকে একটু যাচাই করে নিই — বক্তব্যটির দুটো অংশ আছে। প্রথম অংশটা একটু সাদামাটা। যেখানে তিনি বলেছেন, “সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এটা বহুবার ঘটেছে।... আন্দোলনের প্রশ্নে বিজেপি বিরোধী সব শক্তির সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত”। এজন্যই সাদামাটা যে, এর কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা লাগছে না। অনেকগুলো ফাঁকফোকর আছে। “কবে, কখন, কোথায়, কোন প্রশ্নে সর্বভারতীয় স্তরে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপি বিরোধী আন্দোলন করেছেন” এর কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই। এতদিন তো বলে গেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস আঞ্চলিক দল, রাজ্যের বাইরে এর কোনও অস্তিত্বই নেই। ফলে এরসঙ্গে সর্বভারতীয় স্তরে কোনও যৌথ কার্যকলাপ করার প্রশ্নই নেই। এর থেকেও বড় কথা, যেটা সুজনবাবু বলেছেন, “তৃণমূল কখনই বিজেপির বিরোধিতা করেনি”। যে দল কখনই বিজেপির বিরোধিতা করেনি, তার সঙ্গে বিজেপি বিরোধী আন্দোলন হবে কি করে? কিন্তু বিমানবাবুর গতকালের বিবৃতির দ্বিতীয় অংশ অনেক বেশি নির্দিষ্ট। সাংবাদিক বন্ধুর প্রশ্ন ছিল সুনির্দিষ্ট, “তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কোন যৌথ কার্যকলাপের/কর্মসূচির সম্ভাবনা আছে কিনা?” বিমানবাবুর উত্তরও ছিল স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট। “বিজেপি ছাড়া যে কোনও দলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত”। বিমানবাবুর বক্তব্য নিশ্চয় গীতার কোন উদ্ধৃতি নয় যে বহু ব্যাখ্যার অবকাশ থাকবে। তবে তাঁদের দল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কিনা সেটা সিপিএমের নেতৃবৃন্দই স্পষ্ট করতে পারবেন। তবে বিমান বসু এবং সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে দল এই প্রশ্নে স্পষ্টতই বিভক্ত। কতভাগে বিভক্ত তা এখনও পরিস্কার নয়। বিমানবাবুর গতকালের বিবৃতির পর একটা তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল নিচেরতলার কর্মীদের মধ্যে। একজন লিখেছেন, “... পুনশ্চ: যে সমস্ত পরিবার থেকে ধারাবাহিকভাবে শহীদ হয়েছেন, তারা এই সমঝোতা মেনে নিয়েছেন তো?” কেউ বলেছেন, “কফিনে শেষ পেরেক পোঁতা হল”। কেউ কেউ ৮১ বছর বয়স্ক বিমানবাবুকে অবসর নিতে বলেছেন, অন্য কথাগুলো না হয় বাদ দেওয়াই গেল।

দলের রাজ্য কমিটির সদস্য ও উত্তর ২৪ পরগণা জেলা সম্পাদক মৃণাল চক্রবর্তী অবশ্য একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “সর্বভারতীয় স্তরে সিপিএমের বলিষ্ঠ (!) নেতৃত্বে বিজেপি বিরোধী যে লড়াই চলছে, তা চলবে, কিন্তু এরাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে কোন জোট হচ্ছেনা।” একথাটাই আর একজন কমরেড ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে,‌ “তৃণমূল আছে এই যুক্তিতে যদি আমরা সর্বভারতীয় যৌথ উদ্যোগ থেকে সরে থাকি তবে তাতে তৃণমূলেরই লাভ হবে এই প্রচার করার যে সিপিআই(এম) তলায় তলায় বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।” তবে এই ব্যাখ্যা দিয়ে কমরেড নিজেই সন্তুষ্ট নন। তাই লিখছেন, “বিজেপি বিরোধী সর্বভারতীয় জোটে তৃণমূলকে পাঠিয়েছে বিজেপির পরিচালক আরএসএস’ই। এব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে”। এধরনের বহু ব্যাখ্যা হাজির হচ্ছে, শুধু তাই নয়, সাঁইথিয়া, সিউড়ি সহ বেশকিছু কলেজে/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসএফআই’র ছাত্রছাত্রীরা নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সিপিআই(এম) যদি তৃণমূলের সাথে কোনও বোঝাপড়া করে তবে তারা সংগঠন ছেড়ে দেবেন (যদিও এই তথ্যের কোন বিশ্বাসযোগ্যতা আছে কিনা জানা নেই)। তাহলে সিপিএমের সমস্যাটা ঠিক কোথায়? দেশ ও রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নতুন কী কী দিক বিকাশ লাভ করেছে তার সুস্পষ্ট কোন বিশ্লেষণ ও একে মোকাবিলা করার স্পষ্ট দিকনির্দেশ ও পদক্ষেপ সম্পর্কে অস্পষ্টতা এই বিভ্রান্তি ও দিশাহীনতার কারণ বলে অনেকে মনে করেন। যে দল আগ বাড়িয়ে ৫০ বছর আগে ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধা ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস ও আধা ফ্যাসিস্ট শক্তিকে চিহ্নিত করে ফেলেছিল, আজ‌ সেই দলই ভারতের বুকে ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান, বিকাশ ও আগ্রাসনকে দেখতে পাচ্ছে না। এর কারণ ঐ দলের নেতৃবৃন্দই বলতে পারবেন। দ্বিতীয়ত ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর থেকে এই দলটি শক্তিশালী বিরোধীপক্ষের রাজনীতি অনুশীলন করার পরিবর্তে কত দ্রুত রাজ্যের ক্ষমতায় ফিরে আসা যায়, তার অনুশীলন করতে ব্যস্ত থেকেছে। এই ‘ব্যস্ততা’ দলটিকে নিয়ে গেছে অনীতিনিষ্ঠ সমঝোতায়। সবই ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে।

এরাজ্যে ১৭/১৮ দলের ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে নির্বাচনী বোঝাপড়া/জোট গড়ে তোলা হল। এমনকি অন্য একটি ভ্রাতৃপ্রতীম বামপন্থী দল যারা ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তারা যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রশ্নে কিছু বিষয় তুলে ধরছে, তখন তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার পরিবর্তে কুৎসার অভিযানকে উৎসাহিত করা হল। নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তাকে নিন্দা করা ও বন্ধ করার বিন্দুমাত্র উদ্যোগ কারও নজরে পড়লো না। এইভাবে এই রাজ্যে ঐক্যবদ্ধ বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও প্রচারাভিযানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হল। এতে শত্রুপক্ষ যে উৎসাহিত ও লাভবান হচ্ছে, সেটুকু ভাবতে পর্যন্ত সিপিআই(এম) নেতৃত্ব রাজি নন। কর্মীবাহিনীর রাজনৈতিক মান যে তলানিতে পৌঁছচ্ছে, সেটা পর্যন্ত ভাবার অবকাশ নেই নেতৃত্বের। আজ সিপিআই(এম) যখন তার কর্মনীতি ও কর্মকৌশলের ভুলগুলি শুধরে নিতে চেষ্টা করছে, তখন দলেরই একটি স্বার্থান্বেষী অংশ তাকে বাধা দিতে শুরু করেছে। এখন দেখার, এই বাধা দল ও দলের নেতৃত্ব অতিক্রম করতে পারে কিনা।

- পার্থ ঘোষ 

খণ্ড-28
সংখ্যা-28