আবেদন
১৮ ডিসেম্বর ২০২১’র শপথ
Pledge of December 18

ইতিহাসের বড় বড় প্রশ্নগুলি রাস্তার গণআন্দোলনেই ফয়সালা হয়। কমরেড বিনোদ মিশ্রের এই কথা আমাদের অভিজ্ঞতায় আরো একবার সত‍্য প্রমাণিত হল। কোভিড মহামারীর সুযোগ নিয়ে মোদী সরকার কৃষি ব‍্যবস্থাকে বড় বড় প্রাইভেট কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল সংসদে জালিয়াতি করে কৃষি আইন চাপিয়ে দিয়ে। কিন্তু পাঞ্জাবের কৃষকেরা মহামারীর মাঝেও এমন এক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে সমর্থ হন যা দেশজুড়ে কৃষকদের উজ্জীবিত করে। সমস্ত অপপ্রচার ও নিষ্ঠুর আক্রমণ মোকাবিলা করে শেষ পর্যন্ত দাম্ভিক মোদী সরকারকে আইনগুলি প্রত্যাহার করতে বাধ‍্য করে নতুন ইতিহাস রচনা করল এ আন্দোলন। কৃষক আন্দোলনকে এভাবে এক শক্তিশালী ফ‍্যাসিবাদ-বিরোধী প্রতিরোধের দুর্গে বিকশিত হতে দেখলে কমরেড বিনোদ মিশ্র সবচেয়ে খুশী হতেন।

মোদী সরকার কৃষক আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি বোঝে। স্পষ্টতই, কর্পোরেট আগ্রাসনকে চ‍্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার শক্তি কৃষক আন্দোলনের আছে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে নিহিত বিস্ফোরক শক্তিকে সর্বত্র ওরা যেভাবে কাজে লাগায় তাকেও কৃষক আন্দোলন অকেজো করে দিতে পারে। আর নিজেদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলনরত সব অংশের মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দিতে পারে। উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবের বিশেষ গুরুত্ববাহী বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আইন তিনটি প্রত‍্যাহার করে নিতে বাধ‍্য হলেও কৃষক আন্দোলনের সাথে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে ফয়সালায় পৌঁছনোর প্রক্রিয়াকে মোদী সরকার তাই অস্বীকার করে চলেছে। কৃষক আন্দোলনের কাছে সরকারের নতিস্বীকারকে দেখাতে চাইছে সরকারের উদারতা বা মহানুভবতা হিসেবে। নতুন কৃষি আইন প্রত্যাহারের যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে স্বাধীনতার পঁচাত্তরতম বার্ষিকীতে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতেই সরকার কৃষকদের এক ছোট অংশের বিরোধিতাকেও মেনে নিল। কিন্তু এই দাম্ভিক ও কপট প্রচার তাদের পরাজয় ও হতাশাকে লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।

লখিমপুর খেরিতে প্রতিবাদরত কৃষকদের ওপর হিংস্র আক্রমণের উস্কানিদাতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনিকে বরখাস্ত করা, আন্দোলনে অংশ নেওয়া সমস্ত কৃষক ও অন‍্যান‍্য কর্মীদের ওপর থেকে সমস্ত মামলা প্রত‍্যাহার করা এবং সমস্ত কৃষকের সমস্ত ফসলের ন‍্যূনতম সহায়ক মূল‍্য নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা সহ বাকি সব মৌলিক দাবিতে দৃঢ় থাকাটা অবশ‍্যই সঠিক পদক্ষেপ। পাঞ্জাব হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকেরা এতদিন তিন কৃষি আইন প্রত‍্যাহারের লড়াইটা সামনের সারিতে থেকে সাফল‍্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে গেছে, এবারে আগামী পর্যায়ের লড়াইটা এগিয়ে নিয়ে যেতে অন‍্য রাজ‍্যের কৃষকদের, বিশেষত যেসব রাজ‍্যে ফসলের সরকারি ক্রয় খুব কম এবং কৃষকেরা এমএসপি’র থেকে অনেক কম দরে ফসল বিক্রয় করতে বাধ‍্য হন সেরকম রাজ‍্যগুলির কৃষকদের, বৃহত্তর ভূমিকা রাখার সময়। কৃষকের ফসলের ন‍্যূনতম সহায়ক মূল‍্য দিতে অস্বীকার করা হচ্ছে, অধিকাংশ শ্রমিককে কঠোর শ্রমের ‍ন্যূনতম মজুরিটাও দেওয়া হচ্ছেনা, অথচ কোম্পানিগুলোকে খুচরো ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান হারে সর্বোচ্চ মূল‍্য আদায় করার খোলাখুলি ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছে। কৃষক আর শ্রমিককে মিনিমাম বা ন্যূনতম মূল্য দিতেও এত আপত্তি, অথচ কোম্পানি মালিকদের জন্য যত বেশি সম্ভব আদায় করে চড়া মুনাফার গ্যারান্টি। এমএসপি’র লড়াইকে তাই জীবনধারণের উপযুক্ত মজুরির লড়াই ও মূল‍্যবৃদ্ধি রোধ করার লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করতে হবে।

আমাদের এ’কথাও বুঝে নিতে হবে যে এই আন্দোলন সফল হয়েছে মাসের পর মাস ধরে সংগঠিতভাবে, নিবিড় ও সুব‍্যবস্থিতভাবে লক্ষ লক্ষ কৃষককে সামিল করানোর মধ‍্যে দিয়ে। কৃষক আন্দোলনের বিজয়ের মধ‍্যে দিয়ে সৃষ্টি হওয়া অনুপ্রেরণাকে কাজে লাগিয়ে এখন ব‍্যাপক বিস্তৃত সংগঠন নির্মাণে এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাবেশে মনোনিবেশ করতে হবে। কৃষি আইন প্রত‍্যাহারের এক সপ্তাহের মধ‍্যে, ভারতের সংবিধান গ্রহণ দিবস ২৬ নভেম্বর দিনটিকেই নরেন্দ্র মোদী বেছে নিলেন সংবিধানের মূলভাব নস‍্যাৎ করার কাজে। সংবিধানকে ভয় পেয়ে, বিশেষত সংবিধানের পূর্বঘোষণায় ঊর্ধ্বে তুলে ধরা মৌলিক অধিকারের যে অঙ্গীকারগুলি, যেগুলি অধিকার রক্ষার জনপ্রিয় আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সেগুলোর ভয়ে, প্রধানমন্ত্রী সংবিধানকে উল্টে দিতে চাইলেন অধিকারকে কর্তব‍্যের অধীনস্থ বানিয়ে। স্মরণে রাখা দরকার যে জরুরি অবস্থা জারি করার সময়কালেই সংবিধান সংশোধন করে নাগরিকের কর্তব‍্যকর্মগুলি সংবিধানে ঢোকানো হয়েছিল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সাংবিধানিক মূল‍্যবোধ ও অঙ্গীকারের ওপর আক্রমণ মোদী সরকার যত তীব্র করবে আমাদের তত কৃষক আন্দোলনের বিজয় থেকে বিভিন্নভাবে অনুপ্রেরণা নিয়ে চলতে হবে ফ‍্যাসিবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কৃষক আন্দোলন নিজে অনুপ্রাণিত হয়েছিল সমান নাগরিকত্বের অভূতপূর্ব আন্দোলন এবং মুসলমান মহিলা ও বিশ্ববিদ‍্যালয়ের ছাত্রীছাত্রদের শক্তিতে ভর করে গড়ে ওঠা শাহীনবাগ মডেলের বীরত্বপূর্ণ উত্থান থেকে।

২০২১ ছিল ভারতীয় জনতার জন‍্য এক নিদারুণ দুঃখ-কষ্টের বছর। রাষ্ট্র দেশবাসীর প্রাণ রক্ষা করার দায়দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে নৃশংস নিপীড়ন আর নিষ্ঠুর জনবিরোধী নীতি চাপিয়ে দিতে এবং সরকারি সম্পদ বেচে দিতেই ব্যস্ত থেকেছে। কিন্তু তবু এই বছরটা আমরা শেষ করছি বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও আত্মত‍্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণের বিজয় অর্জনের এক চমৎকার দৃষ্টান্তের সাক্ষী হয়ে। নতুন বছরটা শুরু হবে উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, গোয়া ও মণিপুরের বিশেষ গুরুত্ববাহী বিধানসভা নির্বাচনগুলির মধ‍্যে দিয়ে। আসুন আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি আর সাধ্যকে সমাবেশিত করে এই নির্বাচনগুলিকে শক্তিশালী গণআন্দোলনের রূপ দিই ফ‍্যাসিবাদী শক্তিকে আরেকটা ধাক্কা দিতে।

আজ আমরা কমরেড বিনোদ মিশ্রের অকাল প্রয়াণের ২৩তম বার্ষিকী পালন করছি। মতাদর্শগত দৃঢ়তা ও সাংগঠনিক শক্তির সাথে জনগণের সাহসী উদ‍্যোগ ও উত্থানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সিপিআই(এমএল)-কে এক শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর জীবনভর সংগ্রাম আমাদের অবশ‍্যই স্মরণ করতে হবে। পার্টিকে শক্তিশালী করাই জনতার বিজয়ী উত্থানের মূল চাবিকাঠি। ক্রমবর্ধমান চ‍্যালেঞ্জের মাঝেও আমরা পার্টির প্রসার ঘটানো ও সর্বাত্মক উদ‍্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণের প্রভূত সম্ভাবনা আজ চারদিকে দেখতে পাচ্ছি। সময়কে শক্ত মুঠোয় ধরে আসুন আমরা ২০২২কে আরও আন্তরিক উদ‍্যম ও ব‍ৃহত্তর বিজয়ের বছরে উন্নীত করি।

- কেন্দ্রীয় কমিটি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশন

খণ্ড-28
সংখ্যা-44