প্রতিবেদন
অসাম্য বৃদ্ধির কারণে বিধ্বস্ত জনজীবন
Public life

কিছুদিন পূর্বেই ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’ প্রকাশিত হয়েছিল যাতে ভারতের স্থান ছিল ১১৬টি দেশের মধ্যে ১০১। আরও লজ্জাজনক আফগানিস্তান ছাড়া প্রতিবেশি সমস্ত দেশের স্থান ছিল ভারতের থেকে উন্নত। এবার প্রকাশিত হল ‘বিশ্ব অসাম্য সূচক’ (গ্লোবাল ইনিকোয়ালিটি ইনডেক্স) যেটি বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি ও তাঁর সহযোগীদের দ্বারা প্রস্তুত করা হয়েছে। রিপোর্টের মুখবন্ধে গতবছরের দুই নোবেল বিজয়ী অভিজিত ব্যানার্জি এবং এস্থার ডাফলো ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে অসাম্যের দেশগুলির একটি হিসাবে বর্ণনা করছেন। দেখা যাচ্ছে ২০২১’র জাতীয় আয়ের ৫৭ শতাংশের মালিকানা রয়েছে দেশের জনসংখ্যার ১০ শতাংশ লোকের হাতে এবং নিম্নতম ৫০ শতাংশ মানুষ বছরে মাত্র ৫৩,৬১০ টাকা উপার্জন করেন। দেশের মোট সম্পদের ৩৩ শতাংশ রয়েছে অতি ধনী ১ শতাংশের হাতে। জাতীয় আয়ের মাত্র ১৮ শতাংশ থাকে নারীদের ভাগে, যেটা এশিয়ার ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ।

এটা নতুন কিছু নয়। প্রায় একবছর পূর্বে অক্সফ্যাম দ্বারা প্রকাশিত অসাম্য সূচকে দেখা গিয়েছিল যে অতিমারীর সময় একঘন্টায় মুকেশ আম্বানি যত অর্থ উপার্জন করেছেন, একজন অদক্ষ শ্রমিককে তা উপার্জন করতে ১০,০০০ বছর লেগে যাবে; আর আধুনিক যুগের এই কুবের একসেকেন্ডে যা আয় করেছেন তা আয় করতে ঐ অদক্ষ শ্রমিকের ৩ বছর লেগে যাবে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী আদানি, শিব নাদার, উদয় কোটাক, কুমারমঙ্গলম বিড়লা, আজিম প্রেমজিদের মতো অর্বুদপতিদের সম্পদ ২০২০’র মার্চের পর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। অপর দিকে শুধুমাত্র ২০২০’র এপ্রিলে প্রতি ঘন্টায় ১,৭০,০০০ লোক চাকরি হারিয়েছেন। এই রিপোর্ট অতিমারীর সময়ে অর্থ, লিঙ্গ ও শিক্ষায় অসাম্যর কীভাবে উল্লম্ফন ঘটেছে তা উন্মোচিত করেছে। ভারতে লকডাউনের সময়ে বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫ শতাংশ এবং ২০০৯ থেকে তা বেড়েছে ৯০ শতাংশ।

বাস্তবে লকডাউনের সময় থেকে করোনা ছাড়াও আরও একটি ভাইরাস দ্বারা সমাজ বিদীর্ণ হয়েছে, সেটি হল ‘অসাম্যের ভাইরাস’। রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের সবচেয়ে সচ্ছলতম অংশ অতিমারীর এই মারণ কামড় থেকে রক্ষা পেয়েছে, এমনকি সেটার ফায়দা তুলতে পেরেছে কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এর ধাক্কায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এর কারণ সরকার লকডাউনের সময় যাঁরা জীবিকা হারিয়েছেন (১২.২ কোটি, যাঁদের মধ্যে অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যা হচ্ছে ৯.২ কোটি) তাঁদের সাহায্যের জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করেনি।

লকডাউনের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ড্রপ-আউটের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সরকার অনলাইন শিক্ষার ঢক্কানিনাদ শুনিয়েছে। কিন্তু সেটা শুধুই ফাঁপা আওয়াজ। যে দেশের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষের কম্পিউটার আছে এবং ১৫ শতাংশের আছে নেট কানেকশন, সেখানে অনলাইন শিক্ষা একটা নির্মম মজা ছাড়া আর কিছু না। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দরিদ্রতম ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশের মোটামুটি একটা শৌচালয় আছে এবং জনসংখ্যার ৫৯.৬ শতাংশ একটি ঘরে বা সেটার থেকেও কম পরিসরে দিন গুজরান করতে বাধ্য হয়।

growing inequality

তবুও বলতে হয় এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে। দারিদ্র, অসাম্য তো প্রায় ভারতের নিয়তি। আশির দশকে কি ভারতে দারিদ্র ছিল না? দারিদ্র তখনো অবশ্যই প্রকট ছিল, কিন্তু অসাম্য এতো লাগামছাড়া ছিল না। কারণ তখন হাতেগোনা কোটিপতি, মিলিয়োনিয়ার ছিল, বিলিয়োনিয়ার কথাটা তখনো অশ্রুত, কল্পনার ধরাছোঁয়ার বাইরে; মধ্যবিত্ত শ্রেণীও অনেক সংকুচিত ছিল। সেইঅর্থে অভাব অনেক সমবন্টিত ছিল। ১৯৯১য়ে মনমোহন সিংয়ের হাত ধরে আর্থিক সংস্কার সূচিত হওয়ার সাথে সাথে জাতীয় অর্থনীতি এক নির্ণায়ক মোড় নিল। বাজারের গুরুত্ব বাড়ল, অর্থনীতিতে সরকারের অংশগ্রহণ সীমিত করার প্রচেষ্টা শুরু হল। শিল্পপুঁজি ধীরুভাই হয়ে মুকেশ আম্বানির পরিষেবা (মূলত টেলেকম) পুঁজিতে রূপান্তরিত হল। মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলো, অর্বুদপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। তবুও লাগামছাড়া বাজার অর্থনীতি তখনো অধরা। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে, যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে তারা দোলাচলে থেকেছে, অর্থনীতি জনমোহিনী হবে না বাজার আরও উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। প্রায় প্রতিটি বাজেট এই দুটিকে ব্যালান্স করার চেষ্টা করেছে, আর বাজার অর্থনীতির খ্যাতনামা প্রবক্তরা, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ’এর শকুনেরা চিল চিৎকার করেছে যে অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করার জন্য সরকার যথেষ্ট সাহস দেখাতে পারছে না। অবশেষে এলো আর একটি মাইলফলক ‘২০১৪’। এমন একটি সরকার ক্ষমতায় এলো যাঁরা শুধুমাত্র বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে এমনটা নয়, তারা সেটা যেন তেন প্রকারণে প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর।

এরপর থেকে সরকারের মূলমন্ত্র হয়ে গেল মিনিমাম গভর্ণমেন্ট, ম্যাক্সিমাম গভর্ণন্যান্স। বাস্তবে এর পরিণতি হল বাজার অর্থনীতিকে পরিচালিত করবে, যেমন খুশি নিয়ন্ত্রণ করবে, ছাড় দেবে; সরকারের ভূমিকা হবে নগণ্য। সরকার শুধুমাত্র ব্যবসা, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ গড়ে দেবে, এবার তুমি করে খাও। এই পরিস্থিতিতে সচ্ছল মানুষেরা তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে আরও বিত্তশালী হয়ে উঠলো; সমাজের দুর্বল মানুষ এই অসম প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়তে লাগল। দেখা গেছে আর্থিক সংস্কার শুরু হওয়ার পর থেকে অসাম্য বৃদ্ধির হার বেড়েছে, ২০১৪’র পর তা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে, অতিমারীর সময়ে তা লাগামছাড়া হয়ে গেছে।

এই অসাম্য রোধ করতে পিকেটি ধনীদের ওপর সম্পদ কর বসানোর নিদান দিয়েছেন। ভারতে অতীতে এটা হয়েছে। কিন্তু আইনের নানা ফাঁকফোকরের কারণে তাতে সামান্যই কাজ হয়েছে। যে দেশের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি সেখানে কি শুধুমাত্র সম্পদ কর বসিয়ে অসাম্য রোধ করা সম্ভব? সরকার যত বিলগ্নিকরণ, বেসরকারিকরণ করবে, রেল, সড়কপথ, বিমান, ব্যাংক, বিমার মতো অত্যাবশ্যকীয় ক্ষেত্রগুলো আম্বানি-আদানিদের হাতে তুলে দেবে ততো এই অসাম্য বাড়বে। যেখানে সমাজের একটি বিপুল অংশ এখনো দারিদ্রে নিমজ্জিত সেখানে সরকার সমাজ-অর্থনীতি থেকে নিজেকে এভাবে সরিয়ে নিতে পারে না। এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি হয়ে যাওয়া একটা অশনি সংকেত। সাংসদ মালা রায়ের একটি প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রক পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে ৩৫টি রাষ্টায়ত্ত সংস্থা বিলগ্নকরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে স্টিল প্ল্যান্ট, পেট্রোলিয়াম, শিপিং সব আছে। এ যেন চৈত্রের সেল!

করোনার ক্রমাগত ঢেউ, বেসরকারিকরণ-বিলগ্নিকরণ এবং কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ত্রহ্যস্পর্শে সমাজজীবন আরও বিপর্যস্ত হবে। যাঁদের চাকরি চলে গেছে তাঁদের অল্প অংশই চাকরি ফিরে পাবে। এছাড়া আরও বহু লোকের রোজগার প্রতিনিয়ত বিপন্ন হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির কারণে নতুন কাজের উদ্ভব হবে কিন্তু তা পুরানো কাজের শূন্যপূরণ করার জন্য যথেষ্ট হবেনা। সরকারি অনুদান বিশেষ করে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় এখন অপরিহার্য। নাহলে আরও অসাম্য, দারিদ্র, গভীর অর্থনৈতিক সংকট অবশ্যম্ভাবী।

- সোমনাথ গুহ

খণ্ড-28
সংখ্যা-45