প্রতিবেদন
পশ আইন : কতটা কাজে লাগানো হয়েছে বিগত আট বছরে?
Posh Act

ভারতবর্ষে মহিলা কর্মীদের বিরুদ্ধে যৌন হিংসার ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। একদিকে যেমন কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনই এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো প্রতি মুহূর্তে তাদের আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সে সংগঠিত কর্মক্ষেত্র হোক বা অসংগঠিত। যৌন হেনস্থার কোনও ঘটনায় এই সমাজ নিগৃহীতার প্রতি কতটা সংবেদনশীলতা দেখায় তা আমাদের জানা আছে! অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের এগিয়ে এসে হেনস্তার বিরদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং নিজের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করা এবং তা আদায় করা এককথায় অসাধ্য বলা যেতে পারে।

আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানিকে এক বৃহত্তর সামাজিক ও জাতিগত প্রেক্ষাপটের নিরিখে বোঝার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সার্বিকভাবে গড়ে অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে প্রায় চারলক্ষ অভিযোগ দায়ের করা হয়। যৌনহেনস্থা এমন একটি অপরাধ যা মূলত একটি কাঠামোর ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শক্তি ও হিংসা প্রদর্শন, এক্ষেত্রে জাতি ও ধর্মের পিরামিডের আকারে যদি দেখি নির্যাতিতার সংখ্যা বাড়তে থাকবে যত আমরা পিরামিডের নীচের দিকে তাকাবো।

এছাড়াও প্রায় ৯০ শতাংশ মহিলা শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রে রয়েছেন, যেখানে তাদের কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই, নেই সবেতন ছুটি, নেই কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষা। অর্থাৎ সেক্ষত্রে যৌনহেনস্থার ঘটনায় কোনো কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া এবং অভিযোগকারিনী বা সমস্ত মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে এই সংস্থাগুলি কতটা দুর্বল হতে পারে তা যে কেউ আন্দাজ করতে পারবে।

বিশাখা গাইডলাইন ছিল প্রথম পদক্ষেপ, কর্মক্ষেত্রে চলমান যৌন হিংসার বিরূদ্ধে। ১৯৯২ সালে রাজস্থান রাজ্য সরকারের নারী উন্নয়ন দপ্তরের একজন কর্মী, দলিত সমাজ কর্মী ভানোয়ারী দেবী, এক পরিবারের বাল্যবিবাহে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। রাজ্য সরকারের একজন কর্মী হিসাবে তিনি সেখানে ছিলেন। পরিবারটি ছিল উঁচু জাতির গুর্জ্জর সম্প্রদায়ের। কাজেই এই প্রতিবাদের জবাব নিতে পাঁচজন পুরুষ তাকে গণধর্ষণ করে। এই ঘটনায় ভানোয়ারী দেবী রাজস্থান হাইকোর্ট থেকে কোনো ন্যায়বিচার পাননি এবং অভিযুক্তেরা জামিন পেয়ে যায়। এই ঘটনা সমাজে বিরাট সাড়া জাগায়, বেশকিছু মহিলা সংগঠন এবং এনজিও সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন জমা করে। ভানোয়ারী দেবীর ঘটনার পর মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট, ভার্মা কমিটির বেঞ্চ এই প্রশ্নে ইতিবাচক রায় দেয়। এই গাইডলাইন অনুযায়ী সমস্ত সরকারি এবং বেসরকারি কর্মসংস্থাগুলিকে যৌনহেনস্থা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উদ্দ্যেশ্যে অবশ্যই কিছু নীতি এবং নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করতে হবে। এই নির্দেশিকার গুরুত্ব অনুধাবন করার পর পরবর্তীকালে প্রায় ১৬ বছর পর ২০১৩ সালে ‘দি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অফ উইমেন অ্যাট ওয়ার্ক প্লেস (প্রিভেনশন, প্রহিবিশন অ্যান্ড রিড্রেসাল) অ্যাক্ট’, বা ‘পশ অ্যাক্ট’ হিসাবে গৃহীত হয়।

পশ আইনের অধীনে, যৌন হয়রানিকে নিম্নলিখিত যেকোনো এক বা একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ বা আচরণ দ্বারা (প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে) চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন -

(১) শারীরিক সংযোগ, অথবা
(২) যৌন সুযোগের জন্য দাবি বা অনুরোধ করা, অথবা
(৩) যৌন প্ররোচনামূলক মন্তব্য করা, অথবা
(৪) পর্নোগ্রাফি দেখানো, অথবা
(৫) যৌন প্রকৃতির অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক, মৌখিক বা অমৌখিক আচরণ।

আইনটি সমস্ত সরকারি, বেসরকারি সংস্থাগুলির পাশাপাশি সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে।

পশ আইনে দশজনের বেশি কর্মচারী সহ যে কোনও কোম্পানির একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করতে হবে যার মধ্যে থাকবেন একজন সিনিয়র মহিলা কর্মচারী, কমপক্ষে দুইজন অন্যান্য কর্মচারী এবং যৌন হয়রানির সমস্যাগুলির সাথে পরিচিত একটি বেসরকারি সংস্থার একজন সদস্য। প্রতিটি জেলায় ১০ জনের কম কর্মচারী সংস্থার জন্য এবং গৃহকর্মী, রাস্তার বিক্রেতা, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহস্থালির কর্মী যেমন বুননের সাথে জড়িত, আশা কর্মীসহ সমস্ত অসংগঠিত কর্মীদের কাছ থেকে অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি স্থানীয় অভিযোগ কমিটি গঠন করা উচিত।

তাহলে এইবার দেখা যাক পশ অ্যাক্ট লাগু হওয়ার পর কী ধরনের পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করতে পারছি।

Posh Act: How much has been used

২০১৩ ও ২০১৪-তে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয় কর্মক্ষেত্রে মহিলা পুলিশ কর্মীদের পরিস্থিতি (যৌন হয়রানির ঘটনাও এরমধ্যে অন্তর্ভুক্ত) পরীক্ষা করার জন্য, কিন্ত তাসত্ত্বেও এই বিষয়ে সেরকম তথ্য মেলেনা। এই কমিটির ২০১৩’র রিপোর্ট থেকে জানা যায় — মহিলা পুলিশ কর্মীদের যৌনহেনস্থার অভিযোগগুলির সমাধান হয়েছে কিনা তা জানতে চাওয়া হয় সরকারের কাছে। সরকার থেকে জানানো হয় যৌনহেনস্থার অভিযোগগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হলেও এবিষয়ে তথ্য তাদের কাছে নেই এবং সাথে তারা স্বীকার করে যে তারা এই ধরনের পরিকাঠামো ঠিকমত বানিয়ে উঠতে পারেনি।

২০১৫ সালে, ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ‘ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বারস অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (এফআইসিসিআই) এবং কনসালটেন্সি ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং’এর এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ৩১ শতাংশ কোম্পানি এই পশ আইনকে মানতে নারাজ, ৩৫ শতাংশ সচেতন ছিল না শাস্তি বা জরিমানা সম্পর্কে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ কমিটির সদস্যদের কোনো ট্রেনিং দেওয়াই হয়নি। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ নামক নিউ ইয়র্কের একটি এনজিও ২০২০ সালে একটি রিপোর্টে প্রকাশ করে যে ভারতবর্ষে মহিলা শ্রমিকদের যৌন হয়রানির ঘটনায় প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা দুর্বল এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংস্থাগুলি মহিলার প্রতি তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। এই এনজিও’টি সরকারকে সুপারিশ করে যে প্রতিবছর সরকারের পক্ষ থেকে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এবং কতগুলি ঘটনা স্থানীয় জেলা কমিটি দ্বারা সমাধান হয়েছে, সমস্ত কিছুর তথ্য প্রকাশ করা উচিত এবং গোটা দেশজুড়ে একটি অডিট করা যেখানে এই কমিটিগুলির কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।

২০১৮-তে যখন সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ‘মি-টু’ আন্দোলনের ঝড় উঠেছে, সেই সময় বিভিন্ন তারকা ও বিখাত ব্যক্তিদের কর্মক্ষেত্রে হেনস্থা নিয়ে প্রকাশ্যে বলতে দেখা যায়। প্রিয়া রামানি, এক জার্নালিস্ট প্রাক্তন ইউনিয়ন মন্ত্রী এম জে আকবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। তার কর্মজীবনের একদম গোড়াতে যে সময় এম জে আকবর ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক, ইন্টারভিউয়ের অছিলায় একটি হোটেলে নিজের রুমে ডেকে পাঠান এবং অনভিপ্রেত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।

এই ঘটনা বাইরে আসায়, এম জে আকবর মানহানির মামালা করেন রামানির বিরুদ্ধে। ২০২১ সালে এই মামলার এক দৃষ্টান্তমূলক রায় আসে। বলা হয় “সমাজের খ্যতিমান ব্যক্তিও একজন যৌন হেনস্থাকারী হতে পারে” এবং “যৌন হেনস্থা ব্যক্তির আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাসকে ভেঙ্গে দেয়। তাই খ্যাতিরক্ষার স্বার্থে কারো আত্মসম্মানের বিসর্জন দেওয়া যায়না।” আদালতে, মিঃ আকবরের আইনজীবীরা প্রশ্ন করেছিলেন যে মিসেস রামানি কেন ১৯৯৩ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে আগে অভিযোগ করেননি, কিন্তু বিচারক রায় দেন “একজন মহিলার কয়েক দশক পরেও অভিযোগ উত্থাপন করার অধিকার আছে”।

- সুমন ঘোষ

খণ্ড-29
সংখ্যা-1