পাট চাষিরা চরম সংকটে

jute

গ্রাম বাংলায় পাট চাষিরা আজ ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম সংকটে। উৎসবের মরসুমে এই “সোনালী তন্তু”র ফলন চাষির জীবনে, গ্রামের আকাশে বাতাসে কোনো আনন্দ নিয়ে আসছে না! সম্প্রতি হুগলী জেলায় বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকল থেকে খবর পাওয়া গেলো যে, একজন পাটকল শ্রমিক অভাবের কারণে, দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ পাট চাষ থেকে পাটকলঅঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এই দুটি ক্ষেত্র এবং তার সাথে যুক্ত লক্ষ লক্ষ কৃষক ও শ্রমিকের জীবন-জীবিকা আজ বিপন্ন। কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একদিকে ফড়ে-মহাজন-পুঁজিপতি নির্ভর কৃষি উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা,অপরদিকে ফাটকাবাজ চটকল মালিকদের অতিমুনাফা, এই দু’য়ের স্বার্থরক্ষা করে চলেছে। অথচ এই পাট-তন্তুজাত পণ্য উৎপাদন আজকের দিনে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব রূপে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত।

অন্যদিকে প্লাস্টিক আমাদের সামাজিক জীবনে চরম ক্ষতিকারক বলে প্রমাণিত। প্লাস্টিক তথা সিন্থেটিক ক্যারিব্যাগের বহুল ব্যবহার যে একটা ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে তা নিয়ে চারিদিকে এতো হৈচৈ চলছে, ঢাকঢোল সহকারে প্রচার করা হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সত্বেও এর ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না। সেখানে বিকল্প হিসাবে সমগ্র প্যাকেজিং শিল্পে পাটজাত ব্যাগের একটা বড় জায়গা নেওয়ার কথা। কিন্তু সরকার সেই দিশায় কোনো নীতি বা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে না। প্রতিবেশী বাংলাদেশে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ে নানাবিধ গবেষণা চলছে। পাটের তৈরি নতুন নতুন জিনিসের বর্ধিত মাত্রায় ব্যবহার শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে খাদ্য দ্রব্যের পরিবহন থেকে শুরু করে সমগ্র পণ্যের প্যাকেজিং আইন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাকে কাজে লাগিয়ে সিন্থেটিক লবি তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে চলেছে। পাটচাষ-পাটশিল্প চরম সংকটের মধ্যে রয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে শপিং মলের রমরমা বাজার, তাহলে জুটের তৈরি ক্যারিব্যাগের বাজার বাড়ছেনা কেন?

এ বছর পাট চাষিরা তাঁদের রক্ত জল করা শ্রমে তৈরি ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমের দাম পেলেন না। যদি প্রশ্ন ওঠে এক্ষেত্রে সরকার কি করবে? তাহলে বলতে হয় “কৃষক বন্ধু”, “কৃষক সম্মান” এসব রকমারি নামে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যে তথাকথিত “চাষি সহায়তা প্রকল্প” ঘোষণা করেছে তার প্রয়োজন হল কেন? চাষি যদি ফসলের সঠিক দাম, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ন্যয্য ক্ষতিপূরণ পেতেন, তাহলে এসব যৎসামান্য খয়রাতি সাহায্যের আদৌ কোনো উপযোগিতা আছে কি? একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে সরকার আসলে এক হাতে চাষির ন্যায্য পাওনা কেড়ে নিচ্ছে অন্য হাতে ছিটে ফোঁটা “দান” করে কৃষকের পরিত্রাতা বা দরদীর মুখোশ পড়ছে! রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, “কৃষক বন্ধু” প্রকল্পে এক একরে একটি সিজনে এক জন চাষিকে দেওয়া হবে আড়াই হাজার টাকা! পরের সিজনে আরও আড়াই হাজার! অর্থাৎ সিজনে বিঘা পিছু এক হাজার টাকারও কম! অথচ এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করা চাষিকে তার পাওনা প্রায় ১০/১১ হাজার টাকা সরকার বঞ্চিত করছে। অঙ্কের হিসাবটা বিচার করে দেখা যেতে পারে।

jute dry

 

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া সরাসরি চাষিদের থেকে পাট কেনার কথা, তারা পাট কিনতে শুরুই করলো না। প্রয়োজনীয় কর্মচারী, আধিকারিক না থাকায় জেসিআই ধুঁকছে। সংস্থাটিকে চরম রুগ্ন করে তোলা হয়েছে। নদীয়া-মুর্শিদাবাদ-দিনাজপুর-২৪ পরগণার চাষিরা ইতিমধ্যেই পাট বিক্রি করতে শুরু করে দিয়েছে। বিশেষত ছোট মাঝারি চাষিরা ফসল ধরে রাখতে পারেনা, যাদের ধার-দেনা মেটাতে, দৈনন্দিন সাংসারিক অভাবের তাড়নায় দ্রুত ফসল বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। সেই পাটের বাজার তথা দাম নিয়ন্ত্রণ করছে ফড়ে-দালাল-মহাজন তথা বড় ব্যবসায়ীরা। আর ‘‘অভাবী বিক্রি” হয়ে দাঁড়িয়েছে ছোট চাষিদের যেন এক চিরস্থায়ী ভবিতব্য! অথচ এদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই তো সরকারের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে পাট কিনতে নামার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সহায়ক মূল্য তথা পাটের সরকারী দর নির্ধারণ করা এবং সরকারের পাট কেনার বিষয়টা পরিণত হয়েছে এক করুণ রসিকতায়! কুইন্টাল পিছু সরকারী দর ঘোষিত হয়েছে মাত্র ৩৯০০ টাকা! অপর দিকে এই মুহূর্তে মাঝারি মানের পাটের বাজার দর গড়ে ৩২০০-৩৫০০ টাকা। ভালো কোয়ালিটির পাটের দাম তার থেকে বেশি ৪০০০-৪২০০ টাকা! অথচ সুপ্রীম কোর্টের রায় বা সরকার নিযুক্ত কৃষি কমিশন স্বামীনাথন কমিশনের রায় ছিলো, উৎপাদন খরচের দেড়গুণ দামে সরকারকে ফসল কিনতে হবে। সেই হিসাবে এক কুইন্টাল পাটের সরকারী দাম হওয়া উচিত কমপক্ষে ৬০০০ টাকা!

নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ, নাকাশীপাড়া, ধুবুলিয়ার চাষিদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এক বিঘা পরিমাণ জমিতে পাট চাষের খরচ প্রায় ১২ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি গড়ে ৩/সাড়ে ৩ কুইন্টাল উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ চাষি পাটের দর পেলো গড়ে ১১ হাজার টাকা, খরচ ও নিজের শ্রমের দামটুকুও পাওয়া গেলো না। অথচ পাওয়ার কথা ছিলো অন্তত ২০ হাজার টাকা। এ বছর খরা অনাবৃষ্টির কারণে ফলন যথেষ্ট কমে গেছে। পাট ভেজানোর জন্য প্রয়োজনীয় জলের তীব্র সংকটে পাটের গুণমানও হ্রাস পেয়েছে, সোনালী রংটাই আসেনি। নিরুপায় হয়ে চাষের জমিতেই জলাধার বানিয়ে তার মধ্যে পাম্পের জল ঢুকিয়ে সেখানে পাট ভেজাতে হয়েছে। এ কারণে পাটের গুনমাণ কমে গেছে। এ অবস্থায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে পঞ্চায়েত চাষিদের জল সরবরাহ করতে পারতো। কিন্তু সরকার সেই আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করলো না। তাহলে সরকারের লম্বাচওড়া “কৃষকদরদী” কথাবার্তার মানে কি? দেখা গেলো স্বল্পসংখ্যক চাষি যারা নদী, খাল বিলের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাস করেন কেবলমাত্র তারাই পরিস্কার জলে পাট ভেজাতে পেরেছে, একটু বেশি দাম পেয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে চরম লোকসানের মুখে চাষীরা কোনরকম ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পায়নি। “বাংলার শস্যবীমা প্রকল্প” নিয়ে নানারকম সরকারী প্রচার শোনা গেলো, কিন্তু বিভিন্ন সরকারী নিয়মবিধির আবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ চাষির কাছে সেটা শূন্যই থেকে গেলো। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এক দিকে পাটের সরকারী দাম নির্ধারণে চাষিদের প্রতারণা করেছে, অপরদিকে সঠিক সময়ে পাট কিনতে না নেমে চাষিদের ঠেলে দিয়েছে বঞ্চনার মধ্যে। তৃণমূল দূর্দিনে চাষিদের পাশে না দাঁড়িয়ে স্রেফ ধোঁকা দিয়ে চলেছে।

পাট চাষে লাভ লোকসান : একনজরে

কালীগঞ্জ ব্লকের বন পলাশী গ্রামের পাট চাষি জাহাঙ্গীর শেখ, ১ বিঘা জমিতে পাট চাষের খরচ ও আয়ের হিসাব। (চৈত্র মাসে বোনা আর ভাদ্র মাসে কাটা, গড়ে ৪ মাস ১৫ দিন)

(১) লাঙ্গল (ট্রাক্টর) ৪ বার, প্রতিবারে ২০০ টাকা —মোট ৮০০ টাকা,

(২) বীজ ১ কেজি — ৭০ টাকা,

(৩) সার দুই বার — ডিএপি (১৫ কেজি) — মোট ৪২০ টাকা, ইউরিয়া (৩০ কেজি) — ১৮০ টাকা, ১০২৬ (২০ কেজি) — ৫৪০ টাকা,

(৪) প্রথমবার ৬ ঘন্টা — ৬০০ টাকা, দ্বিতীয়বার ৩ ঘন্টা — ৩০০ টাকা, তৃতীয়বার ৩ ঘন্টা — ৩০০ টাকা,

(৫) মজুরি, সেচ দিতে (৩ জন) — ৬০০ টাকা, নিড়ানি দিতে প্রথমে (৮ জন) — ১৬০০ টাকা, দ্বিতীয়বার (১০ জন) — ২০০০ টাকা, তৃতীয়বার বাছ দিতে (৪ জন) — ৮০০ টাকা, পাট কাটা (৪ জন) — ১০০০ টাকা, গাড়িতে বহন খরচ — ১৪০০ টাকা, পাট মাড় দেওয়া (২ জন) — ৫০০ টাকা, পাট ছাড়ানো (৮ জন) — ২০০০ টাকা, শুকানোর জন্য (২ জন) — ৫০০ টাকা, পাট কাঠি তোলা (২জন) — ৫০০ টাকা, কীটনাশকের দাম (২বার) —৬০০ টাকা, কীটনাশক স্প্রে (২ জন) —৫০০ টাকা, মোট খরচ — ১৫২১০ টাকা। পাট উৎপাদন ৩ কুইন্টাল, কুইন্টাল প্রতি ৩৪০০ টাকা —মোট দাম — ১০২০০ টাকা, পাটকাঠির দাম — ১২০০টাকা, মোট আয় — ১১৪০০ টাকা, কৃষকের লোকসান — ৩৮১০ টাকা। ৬০০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল দাম হলে ওই পাটের মূল্য হবে — ১৮০০০ টাকা, এক্ষেত্রে কৃষকের লাভ হবে — ২৮০০ টাকা।

- কৃষ্ণ প্রামাণিক

খণ্ড-26
সংখ্যা-30
26-09-2019