বলিল অশ্বত্থ সেই

বলিল অশ্বত্থ ধীরে : ‘কোন দিকে যাবে বলো’—
তোমরা কোথায় যেতে চাও?—
‘এখানে তোমরা তবু থাকিবে না? যাবে চ’লে তবে কোন পথে?
সেই পথে আরো শান্তি- আরো বুঝি সাধ?
আরো বুঝি জীবনের গভীর আস্বাদ?—
যেখানেই যাও চ’লে, হয় নাকো জীবনের কোন রূপান্তর;
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধূসর
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙ্ক্ষার ঘর!’
বলিল অশ্বত্থ সেই ন’ড়ে ন’ড়ে অন্ধকার মাথার উপর।
(জীবনানন্দ, মহাপৃথিবী)

১৯৩৬-১৯৪৩ কালপর্বে লিখিত ১৯৪৪-এ প্রকাশিত এই কবিতা। ১৯৪৭এর পর তৎকালীন পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তুর ঢল নামার আগেই আজকের এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী পরবর্তী ভারতের অবস্থানকে ভাবুক জীবনানন্দ কাব্যে চিত্রিত করতে পেরছিলেন। কাব্যিক দূরদর্শিতার এক অনন্য উদাহরণ রেখে তিনি লিখতে পেরেছিলেন, ‘পঞ্চাশ বছরও হায় হয়নিকো, এই তো সে-দিন/তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়/ আজও, আহা, তাহাদের কথা মনে হয়! /এখানে মাঠের পারেখোড়ো ঘর তুলে/এই দেশে এই পথে এই সব ঘাস ধান নিম জামরুলে/জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাঙ্ক্ষার বেদনার শুধেছিল ঋণ।

আজ আসামের দিকে তাকালে বোঝা যায় অমানবিক রাষ্ট্রের দ্বারা চিহ্নিত, এনআরসি কবলিত এই উনিশ লক্ষ ছয়হাজার ছয়শ সাতান্ন জন মানুষ আজ চরম অসহায়তার শিকার হয়ে উপর্যুপরি দ্বিতিয়বার বিজেপির ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনৈতিক চক্রান্তে হতে চলেছে ছিন্নমূল। এই ঘন ঘোর বাস্তবতায় ‘চোরের নেই বাটপাড়ের ভয়’ এই প্রবাদবাক্যকে সত্য করে দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি উদ্বাস্তু সেল, আহ্বায়ক মোহিত রায় কর্তৃক ভারতীয় জনতা পার্টি, পশ্চিমবঙ্গ’ ‘আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী তালিকা ও নাগরিকত্ব বিল প্রসঙ্গে’ শিরোনামে, ৪৭ এর বাংলা বিভাজনের মূল হোতা, বৃটিশ পদলেহী শ্যামাপ্রসাদের মুখ সম্বলিত এক লিখিত পরচা প্রকাশ করেছে। করতেই পারে। সেখানে কি আছে, সে প্রসঙ্গে একটু পরে আলোচনা করা যাবে। তার আগে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি উদ্বাস্তু সেল আহ্বায়ক মোহিত রায় সম্বন্ধে সামান্য একটু আলোকপাত করা যাক, কারণ মোহিত রায় পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি লাগু করে মুসলিম বিতাড়ন ও হিন্দু পুনরুত্থানের বিজেপি-ব্লুপ্রিন্টের এই মুহূর্তের অন্যতম উচ্চকিত তাত্ত্বিক মুখ।

খুব বেশি দিন নয়, বাবরি মসজিদ ভাঙার এক বছর আগে, ডিসেম্বর ১৯৯১-এ অনুষ্টুপ প্রকাশনা থেকে ‘প্রসঙ্গঃ পরিবেশ-দর্শন, রাজনীতি, বিজ্ঞান’ এই বইটি ‘মোহিত রায়’ এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল। অত্যন্ত ভালো কাজ। কি ভালো কাজ? আসুন ঐ পুস্তকেই মোহিত রায় লিখিত প্রবন্ধ ‘দূষণ ও দর্শন, একটি পরিক্রমা’ থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক।

“পরিবেশবাদ-জনিত এই (ধর্মীয় পুনর্জাগরণের) বিপদটি এদেশের ক্ষেত্রেও খুব প্রাসঙ্গিক। প্রাচ্যের ধর্মগুলির রোমান্টিক পরিবেশবাদী ছবি পাশ্চাত্যে গুরুত্ব পাবার সাথে সাথে এদেশের কিছু মানুষও পরিবেশবাদে তাদের নিজস্ব ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন। ভারতীয় বিভিন্ন ধর্মীয় শাখাগুলির সম্পর্কে চর্চা, তাদের পরিবেশবাদী “শিক্ষা” ইত্যাদি একটি “অভিজাত” সমাজ-গবেষকদের নতুন নতুন অধ্যয়নের বিষয় হয়ে উঠেছে। এবং এই মতাদর্শের প্রায় পুরো সমর্থন, আর্থিক ও বৌদ্ধিক, রসদ যোগাচ্ছে ‘অভিজাত’ সুবিধাভোগী গবেষক ও সমাজকর্মীরা, যাদের নিজস্ব জীবনচর্যায় এই মতামতের প্রতিফলন ন্যূনতম। পরিবেশ-সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন মতামত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক, কিন্তু বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগের, মানুষের বল্গাহীন লোভের বিরোধিতায় বিজ্ঞান-বিরোধী ধর্মীয় অনুশাসনের পুনরুজ্জীবন আদৌ কাম্য নয়”।

সুধী পাঠক, অনুধাবন করুন। মাত্র ২ দশকের ফারাকে যে ভন্ড মানুষ বৌদ্ধিক চিন্তায়-চর্চায় ও চর্যায় এই ধরণের তাত্ত্বিক ডিগবাজী খেয়ে পরিবেশবাদ থেকে পরিবেশবাদ বিরোধী, বিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞান-বিরোধী ধর্মীয়-ফ্যাসিস্ট ‘মোদী-ট্রাম্প’ ভক্ত বনে যায় — তার অধুনা কথায় মূল্য দেয়া অবান্তর।

যাক গে, আমরা আবার বিষয়ে ফিরে আসি। ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি উদ্বাস্তু সেলে’র প্রচারপত্রের মূল উদ্দেশ্য হল— যে ভাবে হোক প্রচার করা যে বিজেপি সার্বিকভাবে ‘হিন্দু’ ও বিশেষভাবে ‘হিন্দু-বাঙালী’ বিরোধী নয়। এনআরসি হওয়ার ফলে প্রাথমিকভাবে কিছু ‘হিন্দু’ ও ‘হিন্দু-বাঙালী’ তালিকা থেকে বাদ চলে গেলেও অচিরেই তাদের ‘হিন্দু নাগরিকত্ব বিল’ অনুযায়ী ফেরত আনা হবে। বিজেপি মূলত অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের এদেশ থেকে তাড়াতে চায়। কিন্তু আসামে ওদের নেতৃত্বে এনআরসি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রমাণ করে দিয়েছে যে ওদের আশ্বাস সর্বৈব এক মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেটুকু হিসাব পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে ১৯ লাখ এনআরসি-মার্কা দেয়া মানুষের মধ্যে হিন্দু বাঙালী একাই ৬.৯ লাখ, পূর্ব বঙ্গীয় অত্যন্ত গরিব মুসলমান ৪.৮৬ লাখ, বিহার-উত্তরপ্রদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া হিন্দু ৬০ হাজার, গোর্খা সম্প্রদায় ৮৫ হাজার, বাকি কোচ-রাজবংশী, রাভা, কার্বি ইত্যাদি ইত্যাদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ যাদের হিন্দু বৃহত্তর পরিবারের মধ্যেই ধরা যায়। আসলে বিজেপি মনুস্মৃতির কাঠামোয় ভারতীয় জনগণের রাষ্ট্রীয় বিন্যাসকে সাজাতে চায়। সেখানে শুধু মুসলমান নয়; বাউল, বোষ্টম, মতুয়া ইত্যাদি ইত্যাদি সহজিয়া উদার হিন্দুদেরও স্থান নেই। আসাম এনআরসি এটাই দেখিয়ে দিল।

সংগত কারণেই তাই শ্লোগান উঠেছে — “আসাম থেকে শিক্ষা নাও, বাংলায় ‘মোদী-শাহ’র অর্থাৎ ‘সংঘ-বিজেপি’র সাধের এনআরসিকে রুখে দাও”। অন্যদিকে অসমীয়া ভূমিপুত্র; এনআরসি যাঁদের একমাত্র দাবি; তাঁদের কাছেও বিবেচক মানুষ প্রশ্ন রাখছে —এই ১৯ লাখ গরিব প্রান্তিক অ-অসমীয়া মানুষকে ঘাড় ধরে বার করে দিলেই কি আসামে উন্নয়নের জোয়ার আসবে? ৮৫ সালের দাবিকে ২০১৯-এ সমাধান করতে গেলে যে তীব্র অমানবিকতা সৃষ্টি হয় তার অতীন্দ্রিয় বেদনা কি মানুষ হিসাবে তাঁদের আলোড়িত করে না?

যাই হোক, বাংলায় বিজেপির মত বিভেদপন্থী শক্তি মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য এনআরসি লাগু করতে চায়। আমাদের এই উদ্বাস্তু অধ্যুষিত বাংলায় এনআরসির সমর্থক কারা? মূলত পশ্চিমবঙ্গীয় বর্ণহিন্দু ধনী সম্প্রদায়ই এর সমর্থক। স্বাধীনতা পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত ছিন্নমূল স্রোত তাদের যে বেনামী জমি ও সম্পত্তিগুলির দখল নিয়েছিল, সাত দশক পরেও সে বেদনা তাদের উত্তরসূরিরা ভোলেনি। পরিবর্ত পরিস্থিতিতে সুযোগ বুঝে এরা বাংলায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এর সাথে হাত মিলিয়েছে বাংলার শিল্পাঞ্চলে এক সংগঠিত হিন্দিভাষী সম্প্রদায়। বাংলায় বিজেপির ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’-এর সংকীর্ণ শ্লোগানের মাঝে তারা পেয়েছে এক নতুন দেশজ প্রাণের স্পন্দন। এক্ষণে এই দুই শক্তির যুগলবন্দীতে আমাদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। এই অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে লড়তে হবে একসাথে।

তবু শেষের পর্যায়ে এসে একটা প্রশ্ন সততই আলোড়িত করে-এনআরসি সম্বন্ধে প্রগতিশীল অবস্থানটি কি রকম হওয়া উচিত? এর যথার্থ উত্তরের জন্য সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের প্রয়াত সম্পাদক কমরেড বিনোদ মিশ্রর সংগৃহীত রচনাবলী থেকে কিছু সময়োপযোগী উদ্ধৃতির সহযোগিতা নেওয়া যাক। বিনোদ মিশ্রর ভাবনায় – “এখানে (ভারতে) হিন্দুধর্মের অসংখ্য দেবদেবী ও মূর্তি পূজার সঙ্গে ইসলাম সহাবস্থান করে এসেছে বহু শতাব্দী ধরে। ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে দুটি ধর্মের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। অথচ তৃণমূলস্তরে উভয় ধর্মের সাধারণ মানুষ এক অভিন্ন জীবনযাত্রা, আশা-আকাঙ্খা, এমনকি বহু অভিন্ন বিশ্বাসের অংশীদার। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর যে সমস্ত মুসলিম জনগণ ভারতে থেকে গেলেন তাঁদের যে পাকিস্তানের প্রতি একটা দূর্বলতা থাকবে এটা স্বাভাবিক, ঠিক যেমন পাকিস্তানী বা বাংলাদেশী হিন্দুদের ভারতের প্রতি দূর্বলতা থাকা স্বাভাবিক। এখানে একটা কথা স্পষ্ট হওয়া দরকার, “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুস্পষ্ট হিন্দু পক্ষপাতের জন্যই পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল, ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান সম্বন্ধে মোহ। আর আজ সংঘ পরিবারের হিন্দুত্বের আস্ফালনের দরুনই তা টিকে থাকছে, শক্তিশালী হচ্ছে”। (পৃ-৯১, বিনোদ মিশ্র নির্বাচিত রচনা সংগ্রহ) সেই কতদিন আগে বিজেপি যখন ভারতের ক্ষমতার ধারে কাছেও নেই সেই সময় বিনোদ মিশ্র বলেছিলেন, “বিজেপি কিন্তু (এই) মুসলিম পাকিস্তান আর হিন্দু ভারতের (অবশ্য ততটা বিশুদ্ধ নয়) মধ্যে দেশের এই মহাবিভাজনকে মূলধন করেই টিকে আছে। তারা এই বিভাজনকে চরম সীমায় নিয়ে যেতে উদ্যত (আজকের এনআরসি তার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ), তার ফলাফল যত মারাত্মকই হোক না কেন”।

সর্বশেষে ‘আমার স্বপ্নের ভারত’ প্রবন্ধে বিনোদ মিশ্র যখন লেখেন, “আমার স্বপ্নের ভারত এমন এক ঐক্যবদ্ধ ভারত যেখানে কোনও পাকিস্তানি মুসলিমকে তাঁর শিকড়ের সন্ধানে আসতে আগে ভিসার সন্ধানে ছুটতে হয় না। একইভাবে যেখানে একজন ভারতবাসীর কাছে মহান সিন্ধু সভ্যতার ধাত্রীভূমি বিদেশ নয়। যেখানে বাঙালী হিন্দু উদ্বাস্তুর মন থেকে শেষ পর্যন্ত মুছে যাবে ঢাকার তিক্ত দিনগুলির স্মৃতি। একজন বাংলাদেশী মুসলিমকে ভারত থেকে বিদেশী নাগরিক বলে কুকুরের মত তাড়িয়ে দেয়া হবে না”। এই মানবিক উদ্ধৃতিই হওয়া উচিত এনআরসি সম্পর্কে বিজেপি-সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ভারতীয় জনগণের সঠিক প্রত্যুত্তর।

খণ্ড-26
সংখ্যা-31
03-10-2019