বিবৃতি
রাজ্য রাজনীতি প্রসঙ্গে লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষের বিবৃতি :

বাংলায় ঘোড়া কেনা বেচার ঘৃণ্য রাজনীতিতে নেমে পড়লেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি

এনআরসি-র নামে বাংলার জনগণকে বিতাড়ণের ঘৃণ্য রাজনীতি ফেরি অমিত শাহ’র।

অমিত শাহ এলেন কলকাতায়। সভা করলেন দলের কর্মকর্তাদের নিয়ে। গোটা দেশের অর্থনীতি কেন মুখ থুবড়ে পড়লো, বেকারত্ব কেন সর্বোচ্চ সীমায় , তার কোনো উত্তর দিলেন না, ব্যাংকের টাকা লুঠ করে অপরাধীরা কিভাবে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তাতে ভূমিকা কী? এসব নিয়ে তার কোনো উচ্চবাচ্য নেই।

তিনি এলেন ঘোড়া কেনা বেচার সেই ঘৃণ্য রাজনীতি আরও জোরদার করতে। সারদা বা নারদ কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতিতে যারা যুক্ত তারা এক দুর্নীতিগ্রস্ত দল থেকে আরো বড় দুর্নীতিতে যুক্ত দলে যাতায়াত করছিল কখনও মুকুল রায় বা দিলীপ ঘোষের হাত ধরে। এবার ঘোড়া কেনা বেচায় যুক্ত হলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশ কোন্ অন্ধকারে যাচ্ছে, তার আভাস দিলেন অমিত শাহ।

আসামে ব্যর্থ অভিযানের পর বিজেপির এনআরসি নিয়ে চক্রান্ত আজ দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট। ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জন এনআরসি-র তালিকার বাইরে শুধু “অনুপ্রবেশকারী মুসলিমরাই” নয়, লাখো লাখো হিন্দু -- বাঙালি, হিন্দিভাষী, গোর্খা, আদিবাসী, কোচ বংশের মানুষজন রয়েছেন। আসাম বিজেপির নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মারা এখন নিজেরাই এনআরসি-র বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা বলছে। এনআরসি-র নামে বাংলায় আগুন নিয়ে খেলতে এসেছেন অমিত শাহ। ১৯০৫ সালে বা়ংলা ভাগ রুখে দিয়েছিল অবিভক্ত বাংলার জনগণ। আরও একবার এনআরসি-র নামে বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্র করছে আরএসএস এবং বিজেপি। জীবন দিয়ে এই ষড়যন্ত্র রুখবে বাংলা।

ফ্যাসিস্টরা গোটা দেশটাকেই কারাগার বানাতে চায়

ভীমা কোরেগাঁও ঘটনায় “আরবান নকশাল” আবিষ্কার ও কারাবন্দী করার পর এবার ৪৯জন “দেশদ্রোহী” কে খুঁজে বার করেছে বিজেপি ও সংঘ পরিবারের আইনজীবী। মুজফ্ফরপুরের ঐ সংঘ শিক্ষায় শিক্ষিত আইনজীবী দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ৭০০ মামলা করেছেন। আর ৭০১ নম্বর মামলা করেছেন “দেশদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে। এই দেশদ্রোহীদের তালিকায় রয়েছেন, অপর্ণা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, আদুর গোপালকৃষ্ণন, শুভা মুদগাল, শ্যাম বেনেগাল সহ অন্যান্যরা। তাঁদের “অপরাধ” তাঁরা দেশজুড়ে সংখ্যালঘু ও দলিত মানুষদের উপর ধারাবাহিক দমন নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ভিড় সন্ত্রাসের (mob lynching) ঘটনায় বহু মানুষের আহত এমনকি মৃত্যুর ঘটনার নিন্দা করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে একথাও উল্লেখ করেছেন যে, জয় শ্রীরাম যেন ওয়ার ক্রাই বা যুদ্ধ-শ্লোগান হয়ে উঠেছে। দু’মাস আগে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বিগ্ন সহ নাগরিকরা চিঠি পাঠালেও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তার কোনো জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি। বিপরীতে ন্যায়ালয়ের মহামান্য বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন, চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে মামলা করতে হবে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর কর্মপ্রচেষ্টাকে হেয় করার লক্ষ্যেই স্বাক্ষরকারীরা খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। কাশ্মীর কেন অবরুদ্ধ, কাশ্মীরের জনগণের ন্যূনতম গণতন্ত্র কেন ধর্ষিত তা নিয়ে মামলা শোনার সময় নেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের, আর অন্যদিকে, দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মামলা শুনতে ও নির্দেশ দিতে অতি তৎপর “ন্যায়ালয়” ।

দেশের একের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি ইতিমধ্যেই কব্জা করে নিয়েছে বা অন্তর্ঘাত করেছে ফ্যাসিস্টরা। অনেক সংবাদমাধ্যম ইতিমধ্যেই আত্মসমর্পণ করেছে। বিচার বিভাগ‌ও একচ্ছত্র ক্ষমতার শাসনের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে তৎপর।

একমাত্র এবং একমাত্র জনগণকেই রাস্তার লড়াইয়ে ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি সেরে ফেলতে হবে।

কার্নিভালের নামে অপচয়, অপচয়, অশ্লীল অপচয়

বছর কয়েক ধরেই এই অশ্লীল অপচয় শুরু হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সরকারী টাকায় “পূজা কার্নিভাল” এর নামে উৎকট প্রদর্শনী করে চলেছেন। কত টাকা এর জন্য খরচ হল, কোন খাতের টাকা এজন্য ব্যয় হল, এর জবাবদিহির দায় মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্য প্রশাসনের কোন কর্তাব্যক্তির নেই। ধর্মীয় আচার আচরণ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। যে কোনো ব্যক্তি তার পছন্দ ও বিশ্বাস অনুযায়ী যে কোনো ধর্মেবিশ্বাসী হতে পারেন, এমনকি ধর্মে অবিশ্বাসী বা নাস্তিকও হতে পারেন। কিন্তু আজকের তীব্র ধর্মীয় উত্তেজনা ও অসহিষ্ণুতার পরিবেশে, যখন “জয় শ্রীরাম” ধ্বনির নামে এমনকি মানুষ খুন হয়ে যাচ্ছে, তখন একটি বিশেষ ধর্মের (এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের) ধর্মীয় উৎসবে মন্ত্রীরা “ফিটন গাড়ি” চড়ে পূজা উৎসবে যুক্ত হচ্ছেন, দিন-রাত এক করে মন্ত্রী আমলারা জনগণের করের টাকায় ধর্মের উৎসব উৎযাপন করে যাচ্ছেন। এপথেই তাঁরা নাকি বিজেপির ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করবেন! এই উৎকট প্রতিযোগিতা রাজ্যকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কার্নিভাল-এর নামে ধর্ম-ব্যাপারীদের এই উৎকট, অশ্লীল প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক। রাজ্যবাসীকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

জিয়াগঞ্জ : বিজেপি ও আরএসএস-এর ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি; রাজ্যপালও তাতে যুক্ত হলেন

মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক প্রকাশ পাল এবং তার স্ত্রী ও পুত্রকে নৃশংসভাবে খুন করেছে পেশাদার খুনিরা। ভাষায় বর্ণনার অতীত সেই দৃশ্য। এই দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সমস্ত অপরাধীর কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছে রাজ্যের গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের ৪ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল ঐ এলাকার মানুষজনের সাথে কথাবার্তা বলেন এবং সকলেই অপরাধীদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে নিয়ে কুৎসিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে নেমেছে বিজেপি ও আরএসএস। ঘটনার অব্যবহিত পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্য জানালেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”র জন্য এই ঘটনা ঘটেছে। কিছুক্ষণ পরেই, বিজেপির রাজ্য সভাপতি জানালেন, মৃত ব্যক্তি আরএসএস নেতা। এরপরই আসরে নামলেন রাজ্যপাল ধনখড়। আরএসএস সূত্রে “খবর সংগ্রহ” করে তিনি বিবৃতি দেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। এরপরে সমস্ত সীমা অতিক্রম করে তিনি ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিলেন। এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

মৃত শিক্ষকের ভাই প্রকাশ্যে হাত জোড় করে সকলের কাছে আবেদন করছেন, দাদা কোনোদিন কোনো রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না, এই দুঃখজনক মৃত্যুকে নিয়ে রাজনীতি করবেন না।

এনআরসি নিয়ে ধাক্কার পর এই মৃত্যু নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে নেমেছে বিজেপি ও আরএসএস। সতর্ক হোন, সোচ্চার হোন। জিয়াগঞ্জ হত্যাকাণ্ডে যুক্ত অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দূর হটো।

খণ্ড-26
সংখ্যা-32