এআইআরএলএ-র বিহার রাজ্য সম্মেলন

aiarla

আয়ারলার ষষ্ঠ বিহার রাজ্য সম্মেলন ২০১৯- এর ৯-১০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পাটনায়। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, জমি, শিক্ষা এবং কাজের ইস্যুতে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলা হবে এবং আয়ারলার পরবর্তী সম্মেলনের আগে সংগঠনকে সম্প্রসারিত করে গ্ৰামীণ বিহারের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে দিতে হবে। সম্মেলনে প্রায় ১০০০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলন ১৪৫ সদস্যের রাজ্য কাউন্সিল এবং ৪৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী সংস্থা তৈরি করে। সংগঠনের সাম্মানিক সভাপতি হন বিধায়ক সত্যদেব রাম এবং সভাপতি ও সম্পাদক হন যথাক্রমে বীরেন্দ্র প্রসাদ গুপ্ত এবং গোপাল রবিদাস।

সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে আয়ারলা অনুমোদিত সংগঠন এমএনআরইজিএ মজদুর সভা গঠিত হয়। ঐ সংগঠনের সভাপতি এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে পঙ্কজ সিং ও দিলীপ সিং, এবং এমএনআরজিএ মজদুর সভার ৩০ সদস্যের এক রাজ্য কমিটিও গঠিত হয়।

bihar aiarla

 

বিদায়ী কমিটির সম্পাদক আয়ারলা সম্মেলনে খসড়া প্রতিবেদন পেশ করেন এবং বিশদ আলোচনার পর সংশোধনী সহ সেটি গৃহীত হয়। আয়ারলার জাতীয় সহ সভাপতি স্বদেশ ভট্টাচার্য সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে নিম্নলিখিত ১০ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ইস্যুগুলোকে ধরে রাজ্যব্যাপী প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়:

১। সম্মেলন সারা দেশের ওপর এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার বিজেপি-আরএসএস-এর প্রচেষ্টাকে ধিক্বার জানাচ্ছে।
২। ভূমিহীন ও গৃহহীনদের একটি জাতীয় পঞ্জী তৈরি করতে এবং গৃহের অধিকারকে বুনিয়াদি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে।
৩। সম্মেলন অযোধ্যা জমি বিবাদ মামলায় সিপিআই(এম-এল)এর বিবৃতিতে সমর্থন জানাচ্ছে।
৪। জমির অধিকার এবং বন অধিকার আইনের অধীনে বনে বসবাসকারীদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।
৫। সম্মেলন শ্রম আইনে আম্বানি-আদানিপন্থী মোদী সরকারের আনা সংশোধনীগুলিকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং সারা ভারত শ্রমিকদের ডাকা ২০২০-র ৮ জানুয়ারির ধর্মঘটকে সফল করার আহ্বান জানাচ্ছে।
৬। বিকল্প ব্যবস্থা না করে দরিদ্রদের প্রতি জারি করা উচ্ছেদের সমস্ত নোটিস প্রত্যাহারের দাবি সম্মেলন জানাচ্ছে।
৭। নদী, পুকুর এবং অন্যান্য জলাশয়গুলির সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে।
৮। আধার কার্ড এবং পিওএস মেশিনকে কেন্দ্র করে দরিদ্রদের রেশন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অবিলম্বে এটাকে বন্ধ করতে হবে।
৯। বিহারে এমএনআরইজিএ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি চলছে। অফিসার এবং ঠিকাদাররা জব কার্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এই প্রকল্পে লুণ্ঠন চালাচ্ছে। এমএনআরইজিএ-তে দুর্নীতি এবং লুণ্ঠন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
১০। এমএনআরইজিএ প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিকদের ২০০ দিনের কাজ পাওয়া এবং দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা সুনিশ্চিত করতে হবে।

সম্মেলনের প্রথম দিনে এক জনসমাবেশের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পাটনার গারদানিবাগের গেট পাবলিক লাইব্রেরি ময়দানে হাজার-হাজার কৃষি শ্রমিক এবং এমএনআরইজিএ প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক জনসমাবেশে যোগ দেন। সমাবেশে এবং সম্মেলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁরা তাঁদের এই দাবিগুলোকে জোরালোভাবে তুলে ধরেন: ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ কর, কাজ দাও; নারীদের সমান অধিকার দাও; এবং এমএনআরইজিএ প্রকল্পে কম করে ২০০ দিন কাজ দাও এবং ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা কর।

gs db

 

জনসমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন সিপিআই(এম-এল)-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। দীপঙ্কর তাঁর বক্তব্যে বলেন, মোদীর নোটবন্দি, জিএসটি এবং অন্যান্য পুঁজিপতিপন্থী নীতি দেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ মন্থরতা নিয়ে এসেছে। জনগণ অনাহারের কবলে, ছোটখাটো অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র কেনার টাকাও তাঁদের নেই, এবং কাজেরও দেখা মিলছে না। এই মন্দার পিছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নেই, দেশের সরকারই তা সৃষ্টি করেছে। আর জমি, মজুরি এবং কাজের মত জনগণের প্রকৃত ইস্যুগুলি নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে ওরা হিন্দু-মুসলমান এবং মন্দির-মসজিদের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলি দিয়ে জনগণের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে। মোদী সরকার রিজার্ভ ব্যাংকের কাছ থেকে ১৭৬০০০ কোটি টাকা নিয়েছে, কিন্তু ঐ টাকা দিয়ে অর্থনৈতিক সংকটকে কাটানো এবং কাজ ও মজুরি সৃষ্টির পরিবর্তে পুঁজিপতিদের উদ্ধার করতেই তাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।

কমরেড দীপঙ্কর আরো বলেন, আসামের পর বিজেপি সারা দেশেই এনআরসি-কে চাপিয়ে দিতে চাইছে, আর নাগরিক তালিকায় নাম তোলার জন্য ১৯৫১ পূর্ববর্তী পর্যায়ের নথির প্রয়োজন হবে। যেহেতু কেবলমাত্র ১৯৫১ সালের পরই বিহার এবং অন্যান্য রাজ্যে জমিদারি প্রথা বাতিল করা হয় (অন্তত পক্ষে কাগজে-কলমে), অধিকাংশ দরিদ্রদেরই জমির কোনো কাগজপত্র নেই। আমাদের অত্যন্ত জোরালোভাবে এনআরসি-র বিরোধিতা করতে হবে, কেননা তা চালু হলে তাতে দরিদ্র, দলিত, শ্রমিক এবং কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে।

aiarla

 

সুপ্রীম কোর্ট গত ৯ নভেম্বর অযোধ্যা মামলার যে রায় দিয়েছে সে সম্পর্কে কমরেড দীপঙ্কর বলেন, কোর্ট বলেছে যে ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের ধ্বংস ছিল আইনের লঙ্ঘন। কাজেই, যারা মসজিদ ধ্বংস করেছে তাদের শাস্তি দিতে হবে। দীপঙ্কর এই অভিমত প্রকাশ করেন যে, আমাদের মন্দির-মসজিদ বিতর্কে ঢুকলে চলবে না, বরং শিক্ষা, কাজ, জমি, রেশন, মজুরি এবং অন্যান্য ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সম্প্রতি জাহানাবাদে সংখ্যালঘুদের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে এবং মাধেপুরার জেলা শাসক সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেগুলো সম্পর্কে আমাদের সতর্কথাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই এবং সেই নির্বাচনে দরিদ্রদের নিজেদের দাবিগুলোকে জোরের সাথে তুলে ধরতে হবে।

জনসভায় আরো যাঁরা বক্তব্য রাখেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন আয়ারলার সাম্মানিক সভাপতি রামেশ্বর প্রসাদ, সিপিআই(এম-এল) বিধায়ক গোষ্ঠীর নেতা মেহেবুব আলম, বিধায়ক সুদামা প্রসাদ ও সত্যদেব রাম, আশা সংঘের সভাপতি শশি যাদব, মিড-ডে মিল কর্মী সংগঠনের নেতা সরোজ চৌবে, আয়পোয়ার সাধারণ সম্পাদিকা মীনা তেওয়ারি ও অন্যান্যরা। জনসভার শুরুতে সমাবেশে অংশগ্ৰহণকারীদের স্বাগত জানান আয়ারলার জাতীয় সাধারণ সম্পাদক ধীরেন ঝা, জনসভা সঞ্চালনা করেন আয়ারলার রাজ্য সভাপতি বীরেন্দ্র প্রসাদ গুপ্ত এবং রাজ্য সম্পাদক গোপাল রবিদাস। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন স্বদেশ ভট্টাচার্য, কুনাল, কে ডি যাদব ও অন্যান্যরা।

mass

 

খণ্ড-26
সংখ্যা-37
21-11-2019