হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ?

সম্প্রতি ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি, জয়েন্ট এন্ট্রান্স (মেন) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইংরাজি, হিন্দি ও গুজরাটি এই তিনটি ভাষায় করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইংরাজি এবং হিন্দিতে প্রশ্নপত্র আগে থেকেই ছিল। কিন্তু হঠাৎ এই গুজরাটি সংযোজন কেন? প্রশ্নটি এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের দেশের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই সমস্ত ভাষাতে জয়েন্টের পরীক্ষা গ্রহণ করার দাবি যুক্তিসঙ্গত। তার মধ্যে তামিল, তেলেগু, বাংলা, মারাঠি, পাঞ্জাবি ও কন্নড় অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা এবং এই সব ভাষায় জয়েন্টের পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। সে সব বাদ দিয়ে জয়েন্টে গুজরাটি প্রশ্নপত্রর কারণ হল, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই মোদী হলেন গুজরাটি। সত্যি কথা বলতে কি — করা হবে নাই বা কেন? আমাদের দেশের শাসক পার্টির সভাপতি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হলেন গুজরাটি। আমাদের পিএমওর ৯৯ শতাংশ অফিসার গুজরাটি, সরকারি ব্যাঙ্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ন্যূনাধিক দশ লক্ষ কোটি টাকা মেরে সরকারি সহযোগিতায় বিদেশে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ৪০ জনের দলের বেশিটাই গুজরাটি। রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং জনগণ ঠকিয়ে সুলভে পাওয়া অর্থের যোগান অবধারিতভাবে এক ক্ষমতা-দম্ভর বাতাবরণ প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সমাজজীবনে বিদ্যা-বুদ্ধি-প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব, ক্ষমতা-দম্ভর বাতাবরণ প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হয়ে ওঠে। এই বাস্তব ফারাককে কমিয়ে আনার জন্যই, তুলনামূলকভাবে অন্যান্য প্রদেশের মানুষের থেকে গুজরাটকে কিছু বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেয়ার জন্যই মূলত এই দৃষ্টিকটু বৈষম্যমূলক স্বার্থান্ধ আয়োজন। এছাড়া নরেন্দ্র মোদীর অতি সাধের বহু বিজ্ঞাপিত ‘গুজরাট মডেল’ মিথ অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। যে ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ মায়াঅঞ্জন লাগিয়ে গুজরাটি জনতাকে নরেন্দ্র মোদী এতকাল বোকা বানিয়ে আসছিলেন — রুটি-রুজির ক্যানভাসে সে মোহাঞ্জন অনেকটাই বিবর্ণ। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বেরোজগার যুবকদের মধ্যে এই দ্রুত মলিন হয়ে যাওয়া বিবর্ণতা কাটাতেই জয়েন্ট প্রশ্নপত্রে গুজরাটি অনুপ্রবেশ। কিন্তু শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকা যাবে? না এভাবে ঠিক হয় না।

ভারতবর্ষের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গের একজন নাগরিক হিসাবে আমাদের অবশ্যই এই সর্বভারতীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। না হয়ে উপায় নেই। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা এবং অযোধ্যায় রামমন্দির সংক্রান্ত উচ্চ ন্যায়ালয়ের অদ্ভুত, যুক্তির পরম্পরা বিবর্জিত রায় আমাদের ঘাড় ধরে একটা জিনিস বুঝিয়ে ছেড়েছে যে ঘনায়মান ফ্যাসিবাদের হাত কতটা লম্বা। মানুষ এখন কাঁদছে, আর ভিতর ভিতর ফুঁসছে। জনগণের এই চাপা ফোঁসফোঁসানিই আমাদের হাতিয়ার। সত্যি কথা বলতে কি বাংলাকে এই প্রশ্নে প্রতিবাদকে সামনের সারিতে নিয়ে আসতে হবে এবং সর্বভারতীয় স্তরে নেতৃত্ব দিতে হবে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কারণ কি? কিছুদিন আগে ২০১৯ এর অক্টোবরের ১ তারিখে কোলকাতায় বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ বলছেন — একসময় বাংলা ধর্মীয়, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চিন্তার উন্নয়নের সামনের সারিতে ছিল। কিন্তু এখন সে কোথায়? তার দাবি অনুযায়ী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশে বাঙালী পিছিয়ে পড়ছে, বাঙালী বিজ্ঞানী হাতে গোনা যায়, ঔষধ ও শিল্পজাত পণ্যের উৎপাদনশীলতা দ্রুত নিম্নগামী, ব্যাঙ্ক ব্যবস্থায় আমানত লক্ষ্যণীয় মাত্রায় কম। এমতাবস্থায় বাংলার আপামর জনগণের কাছে ওনার দাবি, “২০২১ বাংলাকে বিজেপির হাতে তুলে দিন, আমরা এনআরসি করে সমস্ত ‘ঘুসপেটিয়া’ তাড়াব, আমরা আবার ‘সোনার বাংলা’ গড়ে দেব”। ভারতে ‘আচ্ছে দিনে’র স্বপ্ন দেখানো মিথ্যার কারবারিরা কিভাবে বাস্তবে ‘সোনার বাংলা’ গড়বে সেটা সঠিক জানা না থাকলেও পণ্ডিত (!) দিলীপ ঘোষের তত্ত্বানুযায়ী দেশি গরুর কুঁজের মধ্যে থাকা সোনা নিষ্কাশন করেই সম্ভবত ওরা ‘সোনার বাংলা’ গড়বে মনে হয়!

যাই হোক বাংলার অর্থনৈতিক সামর্থ্যর প্রশ্নে না গিয়ে বাংলার বৌদ্ধিক সামর্থ্যর গভীরতা সম্পর্কে মহামহিম অমিত শাহ্র প্রশ্নটি কি সঠিক? সাম্প্রতিককালে সর্বভারতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালী বৈজ্ঞানিকদের নামগুলিকে উপেক্ষা করেও এ প্রশ্নে সবচেয়ে সেরা প্রত্যুত্তর এসেছে কয়েকদিনের মধ্যেই অর্থনীতিতে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল পাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই মুহূর্তে শাসক বিজেপি-আরএসএসের মূল টার্গেট হল ‘বাংলা ও বাঙালী’। বাঙালী জাতিসত্ত্বাকে উত্তরের গো-বলয়ের ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্রেমে খাপে খাপে সাঁটিয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বিজেপি-আরএসএসের উপনিষদ পন্থী ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে মেনে নেয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে যে “বাঙালী মূলত বর্ণসংকর, ব্রাহ্মণ্য উপাদান, বৌদ্ধ উপাদান, ইসলামের উপাদান যা কিছু এখানে এসেছে কিছুই মূলের শুদ্ধতা বজায় রাখতে পারে নি। বরং এখানকার আদি জনবৃত্তের ধ্যানধারণার আনুগত্য মেনে নিয়েছে”। [হরপ্রসাদ রচনাবলী, ২য় খণ্ড] বাংলার এই অনার্য সম্পৃক্ত মিশ্র উপাদান ও সংস্কৃতি বিজেপি-আরএসএসের “এক দেশ, এক নায়ক, এক বিধান,” শ্লোগানের প্রধান অন্তরায়। সেইজন্যই ২৭শে জুলাই, ২০১৯-এর গুজরাটের আমেদাবাদের নির্বাচনী বিজয় মিছিলে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ গুজরাটি জনসাধারণের কাছে আহ্বান রাখলেন “ভাই, তোমরা আমাদের পি এম মোদীজির পক্ষে জয়ধ্বনির গর্জন এত জোরে তুলুন, যাতে তা বাংলা পর্যন্ত পৌছয়”। অস্যার্থ, গুজরাটি রণহুংকার দিয়েই মোদী-অমিত শাহ জুটি বঙ্গবিজয় সম্পূর্ণ করতে চায়। জয়েন্টে গুজরাটি প্রশ্নপত্রর স্বার্থান্ধ অপচেষ্টা এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে না দেখলে আমরা পরবর্ত্তীতে এনআরসি বিরোধী মূল লড়াইটা কখনও সঠিকভাবে লড়তেই পারব না। এনআরসি মূলত সর্বভারতীয় স্তরে মুসলমান বহিষ্কারের জন্য, আর বাঙালী হিন্দু-মুসলমানকে একইভাবে দেশ ছাড়া করার জন্য। বিজেপি-আরএসএস ৪৭-এ “হিন্দুভারত ও মুসলমান পাকিস্তান”-এর না করতে পারা এজেন্ডাকে ২০২৫-এর মধ্যেই সম্পূর্ণ করতে চায়। আমাদের লক্ষ হওয়া উচিত, আসাম থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রক্রিয়াকে রুখে দেওয়া। জয়েন্টে গুজরাটি প্রশ্নপত্রর বিরুদ্ধে লড়াই — এই বৃহত্তর লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রসদ যোগাবে। তাই সাধু সাবধান।বাংলায় আবার আওয়াজ উঠুক “নো পাসারন”।

খণ্ড-26
সংখ্যা-37
21-11-2019