অযোধ্যা রায় কেন গ্রহণযোগ্য নয় তা বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে

suprem
- রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক

সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যা মামলায় যে রায় দিয়েছে তা নিয়ে নানাস্তরে ক্ষোভ ও অনেক প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। প্রমাণের চেয়ে বিশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েছে এই রায়, এরকম মনে করেছেন অনেকেই। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায় রায় প্রকাশের দিনই এই সংক্রান্ত তাঁর অভিমত প্রকাশ করে লেখেন –

“চারশো-পাঁচশো বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেওয়া হল বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, ওখানে এবার মন্দির হবে।

সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের উপর থেকে কারও ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হল, সেই রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এই রকম কাণ্ড আরও ঘটানো হবে না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন? শুধু অযোধ্যায় নয়, মথুরা এবং কাশীতেও একই ঘটনা ঘটবে — এ কথা আগেই বলা হত। যাঁরা গুন্ডামি করে বাবরি মসজিদ ভেঙেছিলেন, তাঁরাই বলতেন। এখন আবার সেই কথা বলা শুরু হচ্ছে। যদি সত্যিই মথুরা বা কাশীতে কোনও অঘটন ঘটানো হয় এবং তার পরে মামলা-মোকদ্দমা শুরু হয়, তা হলে কী হবে? সেখানেও তো এই রায়কেই তুলে ধরে দাবি করা হবে যে, মন্দিরের পক্ষেই রায় দিতে হবে বা বিশ্বাসের পক্ষেই রায় দিতে হবে।

অযোধ্যা মামলা এর আগেও সুপ্রিম কোর্টে উঠেছে। তখনই আদালত স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বিতর্কিত জমিতে মসজিদ ছিল। যেখানে বছরের পর বছর ধরে নামাজ পড়া হচ্ছে, সেই স্থানকে মসজিদ হিসেবে মান্যতা দেওয়া উচিত, এ কথা আদালত মেনে নিয়েছিল। তা হলে আজ এই নির্দেশ এল কী ভাবে? যেখানে একটা মসজিদ ছিল বলে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই মেনেছে, সেখানে আজ মন্দির বানানোর নির্দেশ সেই সুপ্রিম কোর্টই দিচ্ছে কোন যুক্তিতে?

ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (এএসআই) জানিয়েছিল, ওই মসজিদের তলায় একটি প্রাচীনতর কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সেই প্রাচীনতর কাঠামো যে মন্দিরই ছিল, এমন কোনও প্রমাণ তো মেলেনি। সুপ্রীম কোর্টনিজেও মেনে নিয়েছে যে, পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের রিপোর্টে কোনওভাবেই প্রমাণ হচ্ছে না যে, একটা মন্দিরকে ভেঙে ওখানে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল।

তা হলে কিসের ভিত্তিতে আজ মন্দির তৈরির নির্দেশ? বিশ্বাসের ভিত্তিতে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, অনেক হিন্দুর বিশ্বাস যে, ওখানে রামের জন্ম হয়েছিল। বিশ্বাস বা আস্থার মর্যাদা রাখতে ওই বিতর্কিত জমি রামলালা বিরাজমানের নামে দিয়ে দেওয়া হল। এটা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত হল? রামচন্দ্র আদৌ ছিলেন কি না, কোথায় জন্মেছিলেন, সে সবের কোনও প্রামাণ্য নথি কি রয়েছে? নেই। রাম শুধু মহাকাব্যে রয়েছেন। সেই সূত্রে অনেক মানুষের মনে একটা বিশ্বাসও রয়েছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের বলে একটা মসজিদের জমি মন্দিরের নামে হয়ে যেতে পারে না। কালকে যদি আমি বলি, আপনার বাড়ির নীচে আমার একটা বাড়ি রয়েছে, এটা আমার বিশ্বাস, তা হলে কি আপনার বাড়িটা ভেঙে জমিটা আমাকে দিয়ে দেওয়া হবে?

ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করা তো আদালতের কাজ নয়। আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছয় অকাট্য প্রমাণ এবং প্রামাণ্য নথিপত্রের ভিত্তিতে। বাবরি মসজিদ যেখানে ছিল, সেই জমিতে মন্দির তৈরির নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টকোন অকাট্য প্রমাণ ও প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে দিল, সেটা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়েছে। বাবরি মসজিদ যে ওখানে ছিল, পাঁচ শতাব্দী ধরে ছিল, সে আমরা সবাই জানি। বাবরি মসজিদ যে গুন্ডামি করে ভেঙে দেওয়া হল, সেটাও আমরা দেখেছি। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট এ দিনের রায়েও মেনে নিয়েছে যে, অন্যায়ভাবে মসজিদটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৫২৮ সালের আগে ওখানে রাম মন্দির ছিল কি না, আমরা কেউ কি নিশ্চিত ভাবে জানি? রাম মন্দির ভেঙেই বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল, এমন কোনও অকাট্য প্রমাণ কি কেউ দাখিল করতে পেরেছিলেন? পারেননি। তা সত্ত্বেও যে নির্দেশটা শীর্ষ আদালত থেকে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক নয় কি ?”

অযোধ্যা রায় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ এই রায়ে তুলে ধরেছে। তারা বলেছে ভেঙে দেওয়া মসজিদের নীচে অ-ইসলামিক কাঠামো পাওয়া গেছে। এই কাঠামো মন্দিরের বা অন্য কিছুর কিনা তাই নিয়ে নিশ্চিত কোনও প্রমাণ তাদের কাছে নেই, এ কথাও রায়ে আদালত জানিয়েছে। এই কাঠামো কেউ ধ্বংস করে দিয়েছিল না কালের নিয়মে ধ্বংস হয়ে যায়, তাও বোঝা যাচ্ছে না বলে এই রায় জানিয়েছে। কিন্তু পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের যে পর্যবেক্ষণটিকে সামনে রেখে ভেঙে দেওয়া মসজিদের নিচের কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে সেই পুরাতাত্ত্বিক খনন ও তার বিশ্লেষণগুলি নিয়েই মৌলিক আপত্তি তুলেছেন অনেক ইতিহাসবিদ ও পুরাতাত্ত্বিক। সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডতাদের তরফে নিয়োগ করেছিল দুই প্রত্নতত্ত্ববিদ সুপ্রিয়া বর্মা ও জয়া মেননকে। ওই দুই অধ্যাপক এএসআই-এর রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে বলেছিলেন, এএসআই-তত্ত্বের মূল ভিত্তি হল ৫০টি স্তম্ভ। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, স্তম্ভের গোড়াগুলি ভাঙা এবং স্তম্ভের ভিতরে কাদা-মাটি ছাড়া কিছু নেই। রিপোর্টে পশ্চিম দিকের একটি দেওয়ালের উল্লেখ করা হয়েছে। মেননদের বক্তব্য, এই ধাঁচের দেওয়াল মসজিদেরই বৈশিষ্ট্য। প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনের ঐতিহাসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওই দু’জন। তাঁদের মতে, ওই নির্দশনগুলি আসলে ধ্বংসস্তূপ থেকেই উদ্ধার হয়েছে, মাটির তলা থেকে নয়। খননকার্যের সময়ে অযোধ্যায় গিয়েছিলেন রোমিলা থাপার, রামশরণ শর্মা, ডি এন ঝা-র মতো ইতিহাসবিদরা। তাঁরাও এএসআই-এর দাবি নিয়ে সন্দিহান। ডি এন ঝা সরাসরি অভিযোগ করেন, এএসআই রিপোর্ট ত্রুটিযুক্ত। যে সব নিদর্শনের ভিত্তিতে এএসআই যে ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তার মধ্যেই গলদ রয়েছে। নিদর্শনগুলির কালনির্ণয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে তাঁর। তিনি লিখেছেন – “অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় হতাশাজনক। যে যুক্তির ওপরে এই রায় সাজানো হয়েছে, তার অনেক কিছুই প্রশ্নযোগ্য। একটি অংশ হলো ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের ২০০৩-র রিপোর্টের উল্লেখ। শীর্ষ আদালত সেখান থেকে কিছু সিদ্ধান্ত টেনেছে। ওই রিপোর্ট সবদিক থেকেই ভ্রান্ত, নির্ভরযোগ্য নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে ওই খনন করা হয়নি। আদালতের রায়ে ওই খননকার্য চালানো হলেও প্রথম থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল তলায় একটি হিন্দু মন্দির রয়েছে। এই ধারণাকে প্রমাণ করার জন্য যা যা বলতে হয় বলেছে। যে যে প্রমাণ এই পূর্বনির্ধারিত ধারণার সঙ্গে মেলে না তা গোপন করা হয়েছে। যেমন পশুর হাড়, চিত্রিত পাত্র, গ্লেজড টাইলস পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু তা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি। ওই রিপোর্টে ইটের তৈরি স্তম্ভ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই খনন দেখছিলেন এমন প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেকে তখনই অভিযোগ করেছিলেন এধার-ওধার থেকে পাওয়া ইট এক জায়গায় জড়ো করে স্তম্ভের তত্ত্ব খাড়া করা হচ্ছে। সেই স্তম্ভও কোনও ভারবাহী স্তম্ভ নয়।

মজার কথা হলো গোটা রিপোর্টে মন্দিরের অস্তিত্বের কোনও উল্লেখ নেই কিন্তু ‘রিপোর্টের সংক্ষিপ্তসার’ পরিচ্ছেদে হঠাৎ মন্দিরের উল্লেখ করা হয়। এই অংশটির লেখক কে, তা বলা নেই। বোঝাই যায় এ বিকৃত রিপোর্ট। ইতিহাসবিদরা ওই রিপোর্টকে আগেই খারিজ করে দিয়েছেন। এর আগে চার ইতিহাসবিদ — সূরয ভান, আথার আলি, রামশরণ শর্মা ও আমি — সমস্ত পুরাতাত্ত্বিক ও পাঠ্য নিদর্শন খতিয়ে দেখেছিলাম। আমাদের উপসংহার ছিল মসজিদের নিচে কোনও হিন্দু-মন্দিরের অস্তিত্ব নেই। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, অ-ঐস্লামিক কাঠামো পাওয়া গেছে বলে এএসআই বলেছে। তা কী, স্পষ্ট নয়। এই নিয়েও পুরানো বিতর্ক রয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল সেখানে হিন্দু পক্ষের বিশ্বাস অন্য যুক্তির ওপরে প্রাধান্য পেয়েছিল। ঐতিহাসিক প্রমাণকে অস্বীকার করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত রিপোর্টকেই উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে মুসলিম শাসকরা হিন্দুদের মন্দির ভেঙেছেন। কিন্তু হিন্দু শাসকরা এর থেকে বেশি মন্দির বা ধর্মস্থান ভেঙেছে। জৈন এবং বৌদ্ধদের অসংখ্য ধর্মস্থান তারা ভেঙে দিয়েছে। কে কত ধর্মস্থান ভেঙেছে, তা নিয়ে গবেষণা চলতেই পারে। মধ্যযুগের ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের তেমন ইতিহাস না থাকলেও অযোধ্যায় ১৮৫৫-তে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত হয়েছিল। অওধের নবাব সেই সংঘাতের মীমাংসায় মসজিদের বাইরে মূর্তি বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন, ওই জায়গাই পরে সীতা কা রোসই নামে পরিচিত। ওয়াকফ বা ট্রাস্টও তিনি তৈরি করেছিলেন। ১৮৮৫-তে আইনগতভাবেই ঠিক হয় মসজিদে মুসলিমের অধিকার থাকবে, সীতা কা রোসই হিন্দুদের হবে। এই প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক অভিযান নতুন করে শুরু হয় ১৯৪৯-র ডিসেম্বরে মসজিদের অভ্যন্তরে চুপিসারে মূর্তি বসিয়ে দেবার পর থেকে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তৈরি হবার পরে এবং বাবরি মসজিদের জায়গাতেই রামমন্দির বানাতে হবে এই শ্লোগান তোলার পরে সাম্প্রদায়িকতা চড়া মাত্রা পায়। তারপরে কীভাবে রামমন্দির নির্মাণের অভিযান চালানো হয়েছে তা আমরা সকলেই দেখেছি। আমার মনে হয়, বিচারবিভাগের উচিত ছিল আগেই ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার। তাঁদের অভিমত নেওয়া যেতে পারত। এমনকি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারত। কোনও একটি রিপোর্টের হঠাৎ এবং বিচ্ছিন্ন উল্লেখ করে কোনও বিশ্বাসের ধারণাকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস ভালো লাগেনি। পেশাদার ইতিহাসবিদ আমি বলতে পারি রাম ওই ২.৭৭ একরেই জন্মেছিলেন তা কোনোদিনই প্রমাণ করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বাসের পিছনে যুক্তি নেই। বিশ্বাসের ভিত্তিতে যুক্তিকে পিছনে ঠেলে দেওয়া সমাজের পক্ষে কল্যাণকর নয়”।

অযোধ্যা রায় কেন একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় তা বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই রায় নিয়ে রিভিউ পিটিশনের সুযোগ ভারতীয় আইনি ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে। রয়েছে রিভিউ পিটিশনের মাধ্যমে রায়ের ভুলভ্রান্তিকে বদলে নেওয়ার সুযোগও। দেশের মুসলিম জনমানস, যাদের মোট সংখ্যা কুড়ি কোটির কাছাকাছি, এই রায়ের মধ্যে দিয়ে যে বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছেন এবং এই রায় ভারতের বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক স্তরে যে সংশয়ের জন্ম দিয়েছে, তার নিরসনের সমস্ত সুযোগ গ্রহণ করা দরকার।

খণ্ড-26
সংখ্যা-37
21-11-2019