আজকের দেশব্রতী : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ (অনলাইন সংখ্যা)

16 september deshabrati

27th of September India Bandh

৭৫ বছরের স্বাধীন ভারতবর্ষ নজীরবিহীন এক ঘটনার স্বাক্ষর রাখতে চলেছে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর।

এই প্রথম কৃষকদের ডাকে, তাঁদের নেতৃত্বে সংগঠিত হতে চলেছে ভারত বনধ্। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কৃষক আন্দোলন কেন্দ্রের ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে গত দশ মাসেরও অধিক সময় ধরে যে হার-না-মানা অদম্য মনোবল নিয়ে দাঁত কামড়ে লড়াই জারি রেখেছে, তা আজ নতুন এক রাজনৈতিক উচ্চতায় প্রবেশ করছে। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ডাকে ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধকে সক্রিয় সমর্থন করতে, তাঁদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মোদীর বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছেন ভারতবর্ষের শ্রমিকশ্রেণি, ছাত্র-যুব ও নারী সমাজ, সর্বস্তরের আম জনতা, বিজেপি বিরোধী প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল।

গোটা দেশ ও দেশবাসী যখন কোভিড অতিমারিতে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, তখন এই মোদী সরকার জাতি ও জনগণের গভীর দুঃসময়ে ফায়দা তুলতে মাঠে নেমে পড়ে। সংসদে বর্বর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আস্তিন গুটিয়ে জবরদস্তি পাস করিয়ে নেয় নতুন কোম্পানিরাজের স্বার্থবাহী তিনটি কৃষি বিল, শ্রমিকদের নতুন করে দাসে পরিণত করতে চারটি শ্রম কোড, চরম জনবিরোধী বিদ্যুৎ আইন (সংশোধনী), কর্পোরেটদের স্বার্থে নয়া শিক্ষা বিল। সংসদীয় রীতিনীতিকে তামাশায় পরিণত করে কোনো ধরনের আলাপ আলোচনা ছাড়াই ঝড়ের গতিতে পাস করালো ওই সমস্ত বিল — কাঠপুতুল রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সই করিয়ে যা আজ আইনে পরিণত। সংসদের অধিবেশন শেষ হতে না হতেই দেশবিক্রির নতুন প্রকল্প ন্যাশানাল মানিটাইজেশন পাইপলাইন ঘোষণা করা হল। গোটা কৃষক সমাজ যে কৃষি আইনকে কর্পোরেটমুখী কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসকারী হিসাবে আখ্যা দিয়েছে, মোদী সরকার তাকেই কৃষি ও কৃষক স্বার্থবাহী বলে মেনে নেওয়ার জন্য গা-জোয়ারি করছে। একদিকে, নিজের কর্পোরেট দোস্তদের দরাজ হাতে দিয়েছে বিপুল কর ছাড়, আর অন্যদিকে গত একবছরে সাধারণ মানুষদের জন্য বরাদ্দ রান্নার গ্যাসে যে ভর্তুকি ছিল সেই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা গায়েব করে সরকার নিজের কোষাগারে ভরেছে। মাত্র একবছরে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ল ৫২ শতাংশ। পেট্রোপণ্য সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসের দাম হল আকাশ ছোঁয়া। তার সাথে আছে কাজ হারা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি। গত ৭০ বছর ধরে স্বাধীন ভারত আমার আপনার শ্রম, মেধা ও করের টাকায় যে সরকারি সম্পত্তি তিলে তিলে গড়েছিল, আজ মোদী সেই সমস্ত কিছু জলের দরে বেচে দিচ্ছে কর্পোরেটদের ভোগ করতে। আগামী প্রজন্মের অধিকার ও প্রয়োজনগুলিকে বন্ধক রেখে দেশের সম্পদকে তুলে দেওয়া হচ্ছে মোদী মিত্রদের হাতে। বিনিময়ে বিজেপির নির্বাচনী তহবিল ফুলে ফেঁপে ওঠা।

ঝুঠা জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুলে গোটা দেশটাকেই কর্পোরেটদের কাছে বেচে দেওয়ার মরিয়া অভিযানে নেমেছে মোদী সরকার। এরজন্য গণতন্ত্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে তছনছ করে, বুনিয়াদি সাংবিধানিক নাগরিক অধিকারগুলোকে শিকেয় তুলে কায়েম করেছে এক ফ্যাসিস্ট রাজ। কর্পোরেটদের দাপটে সংসদে তৈরি হচ্ছে চরম জনবিরোধী সব আইন। প্রতিবাদ করলে ইউএপিএ নতুবা দেশদ্রোহ আইনে কারাবন্দী। পেগাসাসের গোয়েন্দাগিরি। আছে বিভাজনের রাজনীতি।

তাই, রাস্তাই আজ একমাত্র রাস্তা। জনতার দুর্বার গণসংগ্রামের গর্ভেই আবার জন্ম নেবে নতুন আইন। আর, স্বাধীনতার ৭৫ বছরে দেশ ও গণতন্ত্র বাঁচাতে মোদী জমানাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেই অবসান ঘটাতে হবে এই ফ্যাসিবাদী রাজত্ব। সেই লক্ষ্যেই আসুন আমরা সকলে মিলে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্কে সর্বাত্মকভাবে সফল করে তুলি। আমাদের দাবি হল,
    • তিনটি কৃষি আইন বাতিল কর।
    • চারটি শ্রম কোড ফিরিয়ে নাও।
    • বাতিল কর নয়া বিদ্যুৎ আইন।
    • জাতীয় মানিটাইজেশন পাইপলাইন প্রকল্প বন্ধ কর।
    • ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্ সফল কর।

সংগ্রামী অভিনন্দন সহ,
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী) লিবারেশন,
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি

standstill on the 27th of September

সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার দুর্বার আহ্বান ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্! মোর্চা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, আন্দোলন ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষ দেখে ছাড়বে। সারা ভারত কৃষক সংগ্রাম সমন্বয় কমিটিও একই লক্ষ্যে অবিচল। গত দশ মাস সমান তেজে অব্যাহত উত্তর পশ্চিম ভারতের কিষাণ জাগরণ, মোদী সরকারের সঙ্গে যার সম্মুখ সমরের কেন্দ্রভূমি এখন দিল্লীর সিংঘু সীমান্ত বরাবর। সরকারের তরফে সীমান্ত রেখা টেনে দেওয়ার অর্থ দেশবাসী কৃষক জনতাকে নিজভূমে পরবাসী করে রাখা। কেন্দ্রীয় সরকারের সামগ্রিক আচরণ ঔপনিবেশিক কায়েমী স্বার্থের মতোই। অসংখ্য কৃষক জনতার এই অবস্থান আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই অভূতপূর্ব। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এর কোনও পূর্ব নজীর নেই। ইস্যু, দাবি, জেদ, তেজ ও গতিপ্রবাহে উত্তাল হচ্ছে বেশ কয়েকটি রাজ্য। সমগ্র পাঞ্জাব, হরিয়ানা তো বটেই, তার সাথে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, রাজস্থানের এক বড় অংশে গড়ে উঠছে আন্দোলনের ভৌগলিক অখন্ডতা, তার প্রান্তরসব সম্প্রসারিত হয়ে চলছে প্রতিনিয়ত। এই লড়াই প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে আন্দোলনের চারপাশে সমর্থন সংহতির ভারতজোড়া বলয়ও গড়ে ওঠার দাবি রাখে। আর তা সংগঠিত করার দায়িত্ব ভারতের সংগ্রামী শক্তি, সংগঠন সমূহ তথা শ্রেণী, সম্প্রদায়, জাত,ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ, অঞ্চল নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের।

অতিমারীর পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে অতিমারী আইনের ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা হয়েছে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে। কিন্তু কৃষককে আবদ্ধ করে রাখা যায়নি। কৃষক বাধ্য হয়েছে জীবন-জীবিকার হিসাব বুঝে নিতে আন্দোলনের পথে নামতে। কৃষক জনতা রাস্তায় নেমেছে চাষের উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ সহায়ক দাম নির্ধারণের দাবিতে, সরকারকেই সরাসরি ফসল কেনার প্রধান দায়বদ্ধতায় বাধ্য রাখতে, সরকারি সংগ্রহের মান্ডি আরও নিকটবর্তী করা এবং পরিমাণ আরও বাড়ানোর দাবিতে। মোদী সরকার এই ন্যায্য দাবিগুচ্ছ বানচাল করতে ন্যূনতম সংসদীয় আলোচনা এড়িয়ে স্রেফ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যতার জোরে জবরদস্তি চাপালো তিন আইনের মারপ্যাঁচ। যার উদ্দেশ্য হল, একদিকে উৎপাদন ব্যয়ের ও বিনিময় মূল্যের সংকট থেকে সুরক্ষার দেওয়ার সরকারের দায়দায়িত্ব অঘোষিত ভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া, অন্যদিকে কৃষি ও কৃষককে কর্পোরেটের গোলামী করতে বাধ্য করা। হুকুমের চুক্তি চাষ, দৈত্যাকার মান্ডি হাউস, সীমাহীন মজুতদারি, আর দামে মারার নির্দেশিত ব্যবস্থা চাপাতে মরীয়া মোদী সরকার। এই তথাকথিত আইনের শেকল পরাতে না দিতেই আজ কৃষক জনতা আন্দোলনের পথে নাছোড়বান্দা।

আসুন, কৃষি বাঁচাতে আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমরা কৃষকের পাশে দাঁড়াই। অন্নদাতা কৃষকের লড়াইয়ের সাথী হই। খাদ্যশস্যের সরকারি খাদ্যগুদাম স্বয়ংভর রাখতে, গণবন্টণ ব্যবস্থা বাঁচানোর স্বার্থে আমরা একজোট থাকি। এই লক্ষ্যে সাতাশে সেপ্টেম্বর সারা বাংলা সারা ভারত প্রতিবাদে প্রতিরোধে স্তব্ধ হোক!

BJP's attack in Tripura

গত ৮ সেপ্টেম্বর ত্রিপুরায় ফ্যাসিস্ট বিজেপি-আরএসএস’এর গুন্ডাদের সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সহ বামপন্থী নেতৃত্বকে আক্রমণ, বাম পার্টি অফিসগুলিতে আগুন লাগানো, শ্রমিক সংগঠনের অফিস ভাঙচুর, তদুপরি পিবি-২৪ বৈদ্যুতিন মাধ্যম এবং প্রতিবাদী কলম পত্রিকার অফিসে হামলা চালিয়ে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতে নগ্ন বর্বরোচিত সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১০ সেপ্টেম্বর সিপিআই(এমএল) লিবারেশন দার্জিলিং জেলা কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ কর্মসূচী সংগঠিত হয়। পোড়ানো হয় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের কুশপুতুল। নেতৃত্ব দেন জেলা সম্পাদক পবিত্র সিংহ, মোজাম্মেল হক, শরৎ সিংহ, মীরা চতুর্বেদী, মুক্তি সরকার, শাশ্বতী সেনগুপ্ত, গীতাদি, সপে সিংহ প্রমুখ। ৭০ জন পার্টি সদস্য ও নেতৃত্বের মিছিল থেকে আওয়াজ ওঠে, বামেদের ওপর ফ্যাসিস্ট আক্রমণের দায় নিয়ে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে, ফ্যাসিস্ট মোদী সরকার নিপাত যাক, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্ সফল করুন। উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার।

violence in Tripura

পিবি-২৪ ও প্রতিবাদী কলম সংবাদ মাধ্যমের কার্যালয়ে রাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথম এই ধরনের অভূতপূর্ব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে সম্পূর্ণ ঘটনার রেকর্ড ও সমস্ত তথ্যপ্রমাণ এখন রাজ্য পুলিশের তদন্তকারী সংস্থা ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে। কিন্তু ছয়দিন অতিক্রান্ত। একজন অপরাধীকেও এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়নি। ঐদিন এই দুটি সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক ও কর্ণধার শ্রী অনল রায় চৌধুরীর ব্যক্তিগত গাড়ি, সংবাদ কর্মীদের কয়েকটি মোটরবাইক পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ভয়ঙ্কর তান্ডবের সাক্ষী পোড়া গাড়ি ও মোটর বাইকের কঙ্কালগুলি পড়ে আছে। কার্যালয়ে ভাঙচুর অবস্থায় কাজকর্ম চলছে। ৮ সেপ্টেম্বর চারটি সংবাদ মাধ্যমের কার্যালয়ে বিজেপি’র দুস্কৃতিরা পরিকল্পিতভাবে হামলা করে ও তছনছ করে। উদয়পুরে দুরন্ত টিভি নামে একটি বৈদ্যুতিন সংস্থাকে ভাঙচুর করে ও সমস্ত মূল্যবান যন্ত্রপাতি গুড়িয়ে দেয় দুস্কৃতিরা। টিভি-২৪ সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিক বন্ধু শ্রীযুক্ত প্রসেনজিৎ দাসের মাথায় আঘাত করার ফলে তিনি মারাত্মকভাবে জখম হন, নয়টি সেলাই লাগে। ডেইলী দেশের কথা কার্যালয়ের বাইরের অংশে ভাঙচুর করে ও পেট্রোল বোমা দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। দিনরাত চ্যানেল নামের একটি বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমের কার্যালয় ভাঙচুর করে।

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব উপস্থিত থেকে ও তাদের নির্দেশে মিছিল থেকে পরিকল্পিতভাবে সিপিএমের রাজ্য কার্যালয় দশরথ দেব ভবনে ভয়ঙ্কর হামলা করা হয় এবং পেট্রোল বোমা মেরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কার্যালয়ের প্রবেশ পথে স্থাপিত বাম আন্দোলনের অবিসংবাদিত জননেতা দশরথ দেবের মূর্তি ভাঙ্গে ফ্যাসিস্ট বিজেপি গুন্ডারা। বাম আন্দোলন জাতি-উপজাতি মৈত্রীর সোপান দশরথ দেববর্মাকে মুছে ফেলতে চায় বিজেপি। ২০১৮ সালের ১০ মার্চ বিলোনীয়াতে লেনিনের মূর্তি বুলডোজার দিয়ে উপরে ফেলা, ৫ মে উদয়পুরে কার্ল মার্কসের জন্মদিনে সিপিআই(এমএল)-এর মিছিলে হামলা, ২০১৯এ কৈলাশহরে বাম আন্দোলনে আদর্শবান জননেতা বৈদ্যনাথ মজুমদারের মূর্তি ভাঙ্গা — একের পর এক মূর্তি ভেঙ্গে প্রমাণ করছে, নব্য ফ্যাসিস্ট দল বিজেপি দেশে ও রাজ্যে প্রগতিশীল বাম আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা ও জনগণের সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চায়। যার বিরুদ্ধে সারা ত্রিপুরায় বিক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে।

বিজেপি জোট রাজত্বে গত একচল্লিশ মাসে মোট বিশ জনের মতো বামপন্থী নেতা কর্মী খুন হন। এবার লংতরাইভ্যালী মহকুমার মনুঘাটের জামিরছড়া গ্রামে এসএফআই মহকুমা সম্পাদক আশিষ দাসের বাড়িতে হামলা করে দুস্কৃতিরা। ভয়ঙ্কর হিংসার তান্ডবে তার বাবা অমলেশ দাশ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এটি একটি হত্যাকান্ড এবং এটা নিয়ে মোট খুনের সংখ্যা ২১ হল।

১১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর প্ররোচনায় বিজেপির মিছিল সোনামুড়াতে প্রচণ্ড উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে। সিপিএমের পার্টি অফিস ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে বিজেপি আশ্রিত দুর্ত্তবৃত্তরা। পুলিশ বাধা দেয়। কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। দিনটি ছিল সাপ্তাহিক হাটবারের। খুব বড় হাট বসে। কিন্তু ক্রেতা বিক্রেতারা ভয়ে মুহূর্তে ঘরমুখী হন, পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। ৬ সেপ্টেম্বর ধনপুর কাঠালিয়া ব্লকে সিপিএমের গণডেপুটেশন কর্মসূচিতে বিরোধী দলনেতা মানিক সরকারকে তাঁর নিজ বিধানসভা কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বিজেপি বাধা দেয়। কিন্তু জনগণের প্রতিরোধের মুখে তা ব্যর্থ হয়। উভয়পক্ষের বেশ কয়জন আহত হয়। পুলিশ ও বিজেপি দুর্বৃত্তদের বাধা ভেঙ্গে ফেলে পার্টি কর্মী ও জনগণের ব্লক গণডেপুটেশন কর্মসূচি হয়। ধনপুরে এই প্রতিরোধের বার্তা সারা রাজ্যে সংগ্রামী জনগণের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। প্রায় একচল্লিশ মাস পরে বিরোধী দলনেতা এই প্রথম তাঁর কেন্দ্রে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারলেন। অন্যদিকে, বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিজেপি তখন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। কারণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতিমা ভৌমিক মহোদয়ার বাড়ি এই ধনপুরে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নেতৃত্বে এই সন্ত্রাসের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়। ধনপুরের ঘটনায় একতরফাভাবে কয়েকডজন সিপিএমের কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশকে মামলা নিতে ও গ্রেপ্তার করতে বাধ্য করে। কিন্তু বিজেপির দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে পুলিশ একটি মামলাও নেয়নি। ৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ধনপুর ও সোনামুড়াতে সন্ত্রাস অব্যাহত আছে।

কাঠালিয়া-ধনপুরে প্রতিরোধের পাল্টা বদলা নিতে বিজেপি পরিকল্পিতভাবে ৮ সেপ্টেম্বর উদয়পুরে কাজের দাবিতে সিপিএমের যুব মিছিল রুখতে আগের দিন রাতে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস সংঘটিত করে। শালগড়াতে সিপিএমের কর্মী আইনজীবী রনবীর দেবনাথের বাড়িতে হামলা করে। স্বামীকে বাঁচাতে তাঁর স্ত্রী পেশায় পুলিশ কর্মী আপ্রাণ চেষ্টা করেন। দুস্কৃতিরা স্ত্রী মিনতী দেবনাথের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাঁর শরীরের ষাট শতাংশ পুড়ে যায়। তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য কলকাতার ডিসান হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৮ সেপ্টেম্বরের অপারেশনের পরেও ৯ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর প্রতিটা দিন উদয়পুর মহকুমা জুড়ে সন্ত্রাস চলে। টেপানিয়া, গঙ্গাছড়া, হদ্রা, তূলামুড়া, মির্জা, জামজুরি, মুড়াপাড়া, পালাটানা, মহারানী ও বাগমাতে বাড়িঘরে ভাঙচুর, শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন এমন কর্মী সমর্থকদের দোকানপাট, ক্ষুদ্র চাষ, ব্যবসা সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাজারবাগ মুসলিম পাড়া থেকে মিছিলে অংশ নেওয়া কর্মী সমর্থকদের বিজেপি দলে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। জাজুড়িতে এসএফআই সভাপতি প্রিতম শীলের বাড়ি, টেপানিয়াতে তপশীল জাতি নেতা সঞ্জিব দাসের বাড়িঘর সম্পৃর্ণভাবে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। শালগড়া অঞ্চল সম্পাদক বাবুল নাহা’র ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। উদয়পুরে ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিপিএমের আড়াইশো জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে। এখনো পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। শহরে ও গ্রামেগঞ্জে পরিকল্পিতভাবে বিজেপির বাইক বাহিনীর দুর্বৃত্তরা তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ৮ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি কেন আগের দিন স্থগিত করা বা বাতিল করা হলনা? বিজেপির লক্ষ্য হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ বামপন্থীদের মিছিল মিটিংয়ে আসতে সাহস না পায়। ৯ সেপ্টেম্বর মুড়াপাড়া গ্রামে অনুপ দাসের বাড়িতে হামলার ঘটনায় তার স্ত্রী শংকরী মজুমদারের মাথা ও হাত জখম হয়, মাথায় নয়টি সেলাই লেগেছে। গোমতী জেলার অমরপুরে রাংকাং ভিলেজে হাকিম মিঞা আহত অবস্থায় জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়। অপরাধ তার পিতা সহ পরিবারের সদস্যরা তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছে। এরআগে তারা বিজেপিতে ছিল। তাছাড়া নতুনবাজার, যতনবাড়ি, মালবাসা ও অমরপুরে সন্ত্রাস অব্যাহত আছে।

পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জিরানিয়া, রানীরবাজার, খয়েরপুর, পুরাতন আগরতলাতে সন্ত্রাস চালায় দুস্কৃতিরা। সিপাহীজলা জেলার বিশালগড়ে কাঞ্চনমালাতে বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। বিলোনীয়ার ঋষ্যমুখ, নলুয়া, হরিপুর, বড়পাথরিতে হামলার ঘটনা ঘটে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

১২ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমে মুখ্যমন্ত্রী মেলার মাঠে জনসভা করে ফিরে আসার পরে গভীর রাতে বিজেপির দুস্কৃতিরা সিপিএমের মহকুমা অফিস ও সিটু অফিস ভাঙচুর করে। শ্রীনগরে আক্রমণ ও ভাঙচুর করা হয় প্রাক্তন বিচারপতি বাবুল মজুমদারের বাড়ি। মহকুমা পার্টি সদস্য কমরেড চিত্তরঞ্জন বসাকের বাড়িতে হামলা করে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতিরা।

৮ সেপ্টেম্বর অধিক রাতে গোমতী জেলার উদয়পুর মহকুমার রাজারবাগ মোটরস্ট্যান্ডে অবস্থিত সিপিআই(এমএল) লিবারেশন-এর কার্যালয় আক্রমণ করে বিজেপি-আরএসএস সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রথমে তালা ভেঙ্গে অফিসে ঢুকে সমস্ত জিনিসপত্র ভাঙচুর ও গুড়িয়ে দেয়। কিছু আসবাবপত্র টেনে হিচড়ে জাতীয় সড়কের পাশে ফুটপাতে ফেলে রাখে এবং তারপর আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুন দেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয় এবং সাথে সাথে তারা ফায়ার সার্ভিস ডাকেন। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস এসে বিজেপি-আরএসএস আশ্রিত সন্ত্রাসীদের বাধার মুখে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তারপর পুলিশ এসকর্ট করে ফায়ার সার্ভিসকে নিয়ে আসে এবং আগুন নেভানো হয়। এবার ফ্যাসিস্ট তান্ডবলীলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্ত জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হচ্ছে বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্বৃত্তরা দাঁড়িয়ে থেকে তান্ডব চালাচ্ছে। আর পুলিশ দূরে দাঁড়িয়ে থেকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। একই কায়দায় পার্টির সমস্ত জিনিসপত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরআগে ২০১৮ এবং ২০১৯এ দু’বার এই পার্টি অফিসটি আক্রান্ত হয়েছিল। তখন কিছু জিনিসপত্র অবশিষ্ট পাওয়া গিয়েছিল। এবার কিছুই অবশিষ্ট নেই।

এই অরাজক পরিস্থিতিতে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন তার ক্ষুদ্র শক্তি নিয়েও সমস্ত বামপন্থীদের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে। সবকটি বাম দলের সাথে পরিস্থিতির বাস্তবতা নিয়ে একপ্রস্থ আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমত, আক্রান্ত সহকর্মীদের আইনী সুরক্ষা সহ চিকিৎসা ও আর্থিক মদত দেওয়া। লিগ্যাল টিম মারফত সমস্ত সন্ত্রাসের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত, বিপন্ন ত্রিপুরায় ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসের সমস্ত ঘটনাবলী জাতীয় জীবনে সর্বোচ্চস্তরে প্রচারে নিয়ে যাওয়া, উপর থেকে হস্তক্ষেপ ও যৌথ উদ্যোগ বাড়িয়ে তোলা। তৃতীয়ত, ফ্যাসিস্ট বিজেপির হাতে অবরুদ্ধ সংবিধান ও গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে, সামগ্রিকভাবে ত্রিপুরা রাজ্যকে রক্ষা করতে, অন্যান্য বিরোধী দল যেমন তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসের সাথে সদর্থক অর্থে কথা বলা আজ পরিস্থিতির দাবি বলে সিপিআই(এমএল) মনে করে। কারণ একা বামপন্থীরা ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে মোকাবিলা করতে পেরে উঠবে না। ফ্যাসিস্ট বিজেপির বিরুদ্ধে যতটাসম্ভব বৃহত্তর যৌথ রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এই প্রশ্নে বামপন্থীদের বড় মনের পরিচয় দিতে হবে। ২৫ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে বিরক্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ শ্রমজীবী জনগণ যারা বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এতদিন বিজেপিকে শক্তিশালী করেছেন, আজ তারাও বিজেপির অপশাসনের হাত থেকে বাঁচতে চাইছেন। তাই এখন তাদের জয় করে আনতে হবে। যাতে ফ্যাসিস্ট বিজেপির সন্ত্রাসে ভীত সন্ত্রস্ত সমস্ত বামপন্থী ও অন্যান্য বিরোধী দলের কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ জনগণের মনে খুব দ্রুত পুনরায় আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা যায় এবং সাহসের সাথে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তোলা যায়।

- পার্থ কর্মকার

in support of India Bandh

সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার আহ্বানে ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলায় ভারত বনধ্ সফল করতে কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হলে এক গণকনভেনশন সংগঠিত হয়। কনভেনশন সংগঠিত করে ‘অখিল ভারতীয় কিষাণ সংঘর্ষ সমন্বয় সমিতি’ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখা। কনভেনশনে দিল্লীর কৃষক আন্দোলনের শহীদ ও হরিয়ানার কারনালের শহীদ সুশীল কাজলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। কনভেনশনে বাংলার সমস্ত সংগ্রামী শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র-যুব-মহিলা এবং অন্যান্য ধরনের গণসংগঠনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কনভেনশনে অংশগ্রহণ করে সিআইটিইউ, এআইটিইউসি, এআইসিসিটিইউ, ইউটিইউসি, টিইউসিসি প্রভৃতি শ্রমিক সংগঠনের রাজ্য নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য সংগঠনের রাজ্য নেতৃত্ব।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার রাজ্য সম্পাদক কার্তিক পাল ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্ সম্পর্কে প্রস্তাব রাখেন। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা মোদী সরকারের কর্পোরেট স্বার্থবাহী কৃষি নীতির বিরুদ্ধে এবং তিন কালা আইন বাতিল ও ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্যের আইনি নিশ্চয়তার দাবি করে এবং ২০২০ বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাহারের দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্ সফল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এই প্রস্তাবের উপর সমস্ত বক্তারা বক্তব্য রাখেন এবং একমত হন। সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব কনভেনশনে পাশ হয়। সভায় সাতজনের (হরিপদ বিশ্বাস, অভিক সাহা, প্রদীপ সিং ঠাকুর, সুশান্ত ঝা, তুষার ঘোষ, অজিত মুখার্জি, সঞ্জয় পুতুতন্ডু) সভাপতিমণ্ডলী গঠিত হয় এবং সভাপতিত্ব করেন সঞ্জয় পুতুতন্ডু।

বাংলার সমস্ত স্তরের জনগণের কাছে বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-যুব-মহিলা এবং সমস্ত প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, গণতান্ত্রিক সংগঠনের কাছে আবেদন দেশের অন্নদাতাদের আহ্বানে এই ঐতিহাসিক বনধে্ সামিল হন এবং বনধ্ সফল করে তুলুন।

সাথে সাথে বাংলার রাজ্য সরকারের কাছেও কনভেনশনের আবেদন কৃষক জনগণের ডাকা এই বনধে কোনোরকম বাধাদান থেকে বিরত হোন।

lalnishanthe rise of a strong left

গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ দুই দলের সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিবৃতিতে এই ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, গণতন্ত্র, জীবন ও জীবিকা এবং সংবিধানের ওপর তীব্র আক্রমণের মুখে রয়েছে ভারত। স্বাধীনতা পরবর্তী পর্বে সমগ্র অস্তিত্বের ওপর এরকম আক্রমণ আর কখনও আসেনি। একদিকে বিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিপুল বেকারত্বের সংকট, ভেঙে পড়া জনস্বাস্থ‍্য ও গণশিক্ষা, দেশের সব অমূল‍্য সম্পদ বেবাক বেচে দেওয়া, কর্পোরেট কোম্পানিগুলির লুঠতরাজ, আর অন‍্যদিকে মুসলমানদের ওপর নিত‍্যদিন মব-হামলা, নারীর অধিকারের ওপর নতুন নতুন আক্রমণ, নিপীড়িত জাত ও আদিবাসীদের ওপর নিরন্তর হামলা, বিরোধী নেতা, বিচারক ও সাংবাদিকদের জীবনে আড়ি পাতা এবং বিভিন্ন দমন আইন ব‍্যবহার করে ও বাইরে থেকে সাজানো তথ্য আরোপ করে আন্দোলন কর্মীদের জেলে পোরা — এ সবই বর্তমান বিপদের গভীরতা প্রকাশ করে।

কৃষক শ্রমিক দলিত আদিবাসী নারী ছাত্রছাত্রী ও যুব আন্দোলন অবশ‍্য ফ‍্যাসিস্ট শক্তিকে চ‍্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। বামপন্থীদের প্রধান কর্তব‍্য হল এই সমস্ত আন্দোলনকে শক্তিশালী করা, এবং সেইলক্ষ‍্যে লাল নিশান পার্টি ও সিপিআই(এমএল) লিবারেশন পুণা শহরের ‘শ্রমিক ভবনে’ এক বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে অংশ নেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ও এলএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ভীমরাও বনসোড় ও সভাপতি সুভাষ কাকুশ্তে সহ সিপিআই(এমএল) পলিটব‍্যুরোর দুই সদস‍্য প্রভাত কুমার ও কবিতা কৃষ্ণান, এলএনপি’র অন‍্যান‍্যদের মধ‍্যে উদয় ভাট, বিজয় কুলকার্নি, অতুল দিঘে, রাজেন্দ্র বাওয়াকে, মেধা থাটে, বিকাশ আলওয়ানি, জীবন শুরুড়ে ও পালেকর এবং সিপিআই(এমএল)’এর মহারাষ্ট্র শাখার শ‍্যাম গোহিল ও অজিত পাটিল।

উভয় দলের নেতারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, মহারাষ্ট্র ও সারা দেশে চলমান গণআন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং ফ‍্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিরোধ হিসেবে বামপন্থী উত্থান ও ব‍্যাপক বিস্তৃত গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির মধ‍্যে ক্রমবর্ধমান সংযোগ ঘটাতে দুই দল ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করবে।

কৃষক আন্দোলনের ডাকা ২৭ সেপ্টেম্বরের ভারত বনধ্কে এলএনপি ও সিপিআই(এমএল) পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে এবং এই বনধ্কে সর্বাত্মক করতে জনগণের মাঝে প্রচারাভিযান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

RPF's tyranny over railway hawkers

অতিমারী করোনার দ্বিতীয় পর্বে দীর্ঘদিন ধরে রেল চলাচল বন্ধ থাকার পর, বেশ কিছুদিন ধরে পুনরায় রেল চালু হওয়ায় রেল হকাররা আনন্দিত হয় এই ভেবে যে আবার তারা নিজেদের পেশাগত জায়গায় ফিরে যেতে পারবে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে পুনরায় রেল প্রশাসনের বাধার কারণে হকাররা তাদের পেশায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। এই অবস্থায় এআইসিসিটিইউ অনুমোদিত ব্যান্ডেল কাটোয়া শাখা সংগ্রামী হকার্স ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাদের কাজ করার অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য আন্দোলন ছাড়া কোনো পথ নেই।

সেইমতো ১২ সেপ্টেম্বর নবদ্বীপ রেল স্টেশনের সামনে সংগ্রামী হকার্স ইউনিয়ন বিক্ষোভসভার আয়োজন করে। বিক্ষোভসভায় ছিলেন এআইসিসিটিইউ’র নদিয়া জেলা সম্পাদক জীবন কবিরাজ, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নবদ্বীপ শাখা সম্পাদক পরিক্ষিৎ পাল, তপন ভট্টচার্য সহ অগ্রদীপের অশোক চৌধুরী; ছিলেন সিআইটিইউ’র হুগলী জেলা নেতা সুবল বৈরাগী ও কাটোয়া কোর্টের আইনজীবী মাননীয় অশোক দাঁ।

বিভিন্ন বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশের কেন্দ্রের শাসক মোদী সরকার যখন বেকারদের কাজ দিতে পারছেনা, তখন উপরন্তু অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ব্যাঙ্ক, বীম, রেল সহ কৃষি ক্ষেত্রগুলি বেসরকারি পুঁজিপতিদের কাছে ‘লীজে’ দেওয়ার নামে কার্যত বিক্রী করে দিচ্ছে।

এই সময়ে দেশের বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের সংগ্রামী মোর্চা ও সমন্বয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ বিরোধী তিন আইন প্রত্যাহারর দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত জুড়ে বনধ্ সংঘটিত হবে। সেই বনধ্কে সমর্থন জানিয়েছে শ্রমিক কর্মচারীদের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন। এই বনধ্কে সফল করে তুলতে সর্বস্তরের মানুষের কাছে আহ্বান জানানো হয়।

Construction Workers Conference

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের দুটো ট‍্যাগ আছে যেমন এরা খুব পরিশ্রমী ও দক্ষ। তাই সারা ভারতবর্ষে এখানকার নির্মাণ শ্রমিকরা ছড়িয়ে আছে। দেশ বিদেশের বড় পুঁজি মুনাফার স্বার্থে সরকারকে সাথে নিয়ে যতটা সংগঠিত, কৃষির পর সবচেয়ে বৃহৎ শ্রমশক্তি নির্মাণ শিল্পে যুক্ত আর এই নির্মাণ শ্রমিকরা ততটাই অসংগঠিত। নির্মাণ শ্রমিকদের বহু লড়াই করার মধ‍্য দিয়ে নিজেদের সুরক্ষা ও সংগঠিত হওয়ার জন‍্য ১৯৯৬ সালে একটি কেন্দ্রীয় আইন পাস হয়। কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার ৪টি লেবার কোড মারফত নির্মাণ শ্রমিকদের সমস্ত অধিকার হরণের লক্ষ‍্যে নীলনকশা রচনা করেছে। এমতাবস্থায় মুর্শিদাবাদ জেলার নির্মাণ কর্মী ও সংগঠকদের লাগাতার প্রচেষ্টায় শ্রমিকরা নিজেদের সুরক্ষা ও সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায় গত ১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ গৃহ ও অন্যান‍্য নির্মাণ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের ১ম মুর্শিদিবাদ জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। ইউনিয়নের রাজ‍্য সাধারণ সম্পাদক কিশোর সরকার বর্তমান পরিস্থিতিতে ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধে্র গুরুত্ব তুলে ধরেন। সভাপতি প্রবীর দাস নির্মাণ শ্রমিকদের নথিভুক্তিকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং সংগঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সাথী আবুল কাশেম আজকের শ্রমিক আন্দোলনে অসংগঠিত শ্রমিকদের ক্ষমতা কতটা তা তুলে ধরেন। উদ্বোধনী বক্তব‍্য সহ সমগ্র সম্মেলনটি সুষ্টভাবে পরিচালনা করেন অপূর্ব লাহিড়ী। সম্মেলনের মধ‍্য দিয়ে ১৭ জনের কার্যকরি কমিটি তৈরি হয়। সর্বসম্মতিতে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন অপূর্ব লাহিড়ী, সহ-সভাপতি রবিউল হোসেন, সম্পাদক আনাই সেখ, সহ-সম্পাদক আবুল কাশেম, বাবু সেখ ও কার্তিক দাস। কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন রবি মন্ডল।

peasant movement karnal

কৃষক আন্দোলনের চাপে অবশেষে নত হতে হল হরিয়ানার মনোহর লাল খট্টরের বিজেপি সরকারকে। কৃষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিন দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় এবং কৃষক আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলতে থাকায় চতুর্থ দফার আলোচনায় সরকার কৃষকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হল। সরকার ঘোষণা করেছে, যে আইএএস অফিসার গত ২৮ আগস্ট কারনালে বস্তারা টোল প্লাজায় কৃষকদের আন্দোলন দমনে তাদের ‘মাথা ভাঙ্গার’ নির্দেশ পুলিশদের দিয়েছিলেন, সেই অফিসার আয়ুশ সিনহার অপরাধের অভিযোগের তদন্ত করবেন হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত কমিশন। তদন্ত এক মাসের মধ্যে শেষ করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। যতদিন তদন্ত চলবে এবং কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা না দেবে, ততদিন আয়ুশ সিনহাকে ছুটিতে পাঠানো হবে বলে সরকার ঘোষণা করেছে। কৃষক প্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর অতিরিক্ত সচিব আইএস অফিসার দেবেন্দর সিং বলেছেন, “যে সমস্ত দাবি তোলা হয়েছিল, সেগুলোর সবকটি সম্পর্কে আমরা একটা সম্মানজনক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধানে পৌঁছতে পেরেছি”। সরকারের ভাষায় যেটা ‘ছুটিতে পাঠানো’, কৃষকদের কাছে সেটাই আইএএস অফিসারের সাসপেনশন। নরেন্দ্র মোদী সরকারের তৈরি করা তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা। কারনালে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিরোধ আন্দোলনেও তাদের নেতৃত্বকারী ভূমিকা রয়েছে। সরকার কৃষকদের দাবি মেনে নেওয়ার পর সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে,

“খট্টর সরকার আয়ুশ সিনহাকে সাসপেণ্ড করতে সম্মত হয়েছে। … হরিয়ানা কিষাণ ইউনিয়নগুলো এবং প্রশাসনের মধ্যে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির অধীনে বিচারবিভাগীয় একটা তদন্তের চুক্তিও হয়েছে। তিনি পুলিশী হিংসায় আয়ুশ সিনহার ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করবেন, যে হিংসার ফলে একজন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন। তদন্ত এক মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে।

সরকার শহীদ সুশীল কাজলের (নিহত কৃষক) পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে ও সাহায্য করতে সম্মত হয়েছে। পরিবারের দু’জনকে চাকরি দেওয়া হবে। পুলিশী হিংসায় আহত কৃষকদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।”

সরকারের সঙ্গে এই ফয়সালার পর কৃষকরা কারনালের মিনি সচিবালয় ঘেরাও তুলে নেন।

যে আন্দোলনের চাপের কাছে খট্টর সরকারকে নতি স্বীকার করতে হল, তার পটভূমিতে রয়েছে কৃষকদের ২৮ আগস্টের প্রতিবাদ কর্মসূচি। কৃষকরা সেদিন সমবেত হয়েছিলেন জাতীয় সড়কের ওপর কারনালের বস্তারা টোল প্লাজায়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে ১৫ কিমি দূরে প্রেম প্লাজা হোটেলে অনুষ্ঠিত বিজেপির বৈঠকে প্রতিবাদ জানানো। সেদিন পুলিশদের যারা পরিচালিত করছিলেন তারমধ্যে ছিলেন কারনালের মহকুমা শাসক আইএএস অফিসার আয়ুশ সিনহা। তিনি পুলিশদের নির্দেশ দিলেন, কোনো কৃষক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙ্গার চেষ্টা করলে তার ‘মাথা ভেঙ্গে’ দিতে হবে। আর পুলিশরা আইএএস অফিসারের নির্দেশ মেনে কৃষকদের মাথা ফাটিয়ে দিল, তাদের মাথা থেকে রক্ত ঝড়ে পড়তে লাগল, জামা রক্তে ভিজে গেল। অন্তত দশজন কৃষককে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হল। সুশীল কাজল নামে এক কৃষক গুরুতর আহত হয়ে বাড়িতেই ছিলেন এবং রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

সরকার এবং পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ অফিসাররা ভেবেছিলেন যে, পুলিশের মারকে ভয় পেয়ে কৃষকরা গুটিয়ে যাবে। কিন্তু কৃষক আন্দোলনের বিস্তার ঘটে এবং আন্দোলন তীব্রতা লাভ করে। পুলিশি নিপীড়নের পরপরই বিভিন্ন টোলপ্লাজা ও সড়ক অবরোধের কর্মসূচি নেওয়া হয়। কৃষকরা প্রথমে ‘মাথা ভাঙ্গার’ নির্দেশ দেওয়া অফিসার আয়ুশ সিনহার বরখাস্তের দাবি তোলেন। তাঁরা দাবি পূরণের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার কারনালে মহাপঞ্চায়েতের ডাক দেন যাতে হাজার-হাজার কৃষক অংশ নেন। সরকার কৃষকদের দাবি মানতে অস্বীকার করায়, সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা কারনালের মিনি সচিবালয় ঘেরাওয়ের আহ্বান জানায়। উল্লেখ্য, খট্টর সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী জেজেপি নেতা দুশ্যন্ত চৌতালা অভিযুক্ত আইএএস অফিসারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললেও মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টর ঐ আইএএস অফিসারের সমর্থনে দাঁড়ান। তিনি বলেন, আইএএস অফিসার দু’একটা বেফাঁস কথা বললেও তিনি যেভাবে কৃষক বিক্ষোভের মোকাবিলা করেছেন তার প্রয়োজন ছিল। অর্থাৎ, যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন তাঁর সরকার চালিয়েছে তা কৃষকদের প্রাপ্য ছিল। কৃষকরা কিন্তু মিনি সচিবালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকেন। কৃষকদের অবস্থানকে কঠিন করে তুলতে, গাছের একটু ছায়া লাভ থেকে তাদের বঞ্চিত করতে সচিবালয় সংলগ্ন গাছের ডালপালা সরকার কেটে দেয় বলে সংবাদ বেরিয়েছে। তবে, কৃষকদের আন্দোলন ও অবস্থান ব্যাপকতর সমর্থন লাভ করে। তাঁরা রবি দাহিয়া, বজরং পুনিয়া, সুমিত বাল্মীকির মত অলিম্পিক পদক জয়ীদের সম্মান জানানোর প্রস্তাব দিলে তাঁরা সেখানে উপস্থিত হন এবং সেটা কৃষক আন্দোলনের প্রতি তাঁদের সমর্থন রূপেই দেখা দেয়। অবশ্য, সরকারের সঙ্গে আগের তিন দফা আলোচনায় কৃষক প্রতিনিধিরা আইএএস অফিসারের বরখাস্তের দাবির স্থানে তাঁর সাসপেনশনের দাবিকে নিয়ে আসেন। কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে যে আন্দোলন দশ মাস ধরে অবিচলভাবে চলছে, কারনালেও সেই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের জন্য তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। খট্টর সরকারের অবশেষে বোধদয় হল যে, কারনালকে আর একটা সিঙ্ঘু, টিকরি বা গাজিপুর সীমানার মতো কৃষক আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে দিলে শুধু খট্টর সরকারেরই নয়, মোদী সরকারের বিপন্নতাও বাড়বে। আর তাই কৃষকদের দাবির কাছে নতিস্বীকার ছাড়া খট্টর সরকারের কাছে অন্য কোনো পথ ছিল না।

কৃষকরা আজ সারা দেশের কাছে এক পরাক্রমী শক্তি হিসাবে, ভরসার এক দৃঢ় আধার হয়ে দেখা দিচ্ছেন। তাঁরা মোদী সরকারের তৈরি তিন কৃষক স্বার্থ বিরোধী আইন প্রত্যাহারের আন্দোলনকে দশ মাস ধরে অব্যাহত রেখেছেন, মুজাফ্ফরনগরে মহাপঞ্চায়েত অনুষ্ঠিত করে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছেন, মেরুকরণের উপায় হিসাবে বিজেপির সাম্প্রদায়িকতার কৌশলকেও ধাক্কা দিয়েছেন। শুধু কৃষক স্বার্থ নয়, জনগণের অন্যান্য অংশের দাবির পক্ষেও মুখর হয়েছেন। বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করেছেন, শ্রমিকদের দাবির সমর্থনে সোচ্চার হয়েছেন। মনোহর লাল খট্টর সরকারকে যেভাবে নতি স্বীকারে তাঁরা বাধ্য করলেন, তারজন্য হরিয়ানার কৃষকদের অবশ্যই অভিনন্দন জানাতে হবে। কৃষক আন্দোলনের কারনাল অধ্যায় ফ্যাসি-বিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রেরণার এক উৎস হয়েই দেখা দেবে।

- জয়দীপ মিত্র 

unemployment crisis

করোনা কালের রিপোর্টে প্রকাশিত বিহারে অসংগঠিত ক্ষেত্রে ১৪.২৫ লক্ষ এবং সংগঠিত ক্ষেত্রে ৬০,০০০ ব্যক্তি কর্মহীন হয়েছেন। বিগত এক বৎসর ধরে বেসরকারি স্কুল বন্ধ হওয়ায় ছ’লক্ষ শিক্ষক রাস্তায় নেমেছেন এবং তাদের পরিবার অনাহারের মুখে। তথ্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে সংকট কতটা গভীর। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের বিহার রাজ্য সম্পাদক কুণাল গত ৩১ আগস্ট এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেখিয়েছেন করোনা ও লকডাউনের জন্য বিহারে বেরোজগারী চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও সংকট তীব্র। ভ্রমণ ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও অবস্থা সংকটজনক। সিএমআইই’র সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে এপ্রিল-মে ২০২০তে কর্মহীনতার হার পৌঁছেছিল ৪৬ শতাংশে। জুন ২০২১এ এই হার ১০.৫০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

লকডাউনের প্রভাব ব্যাঙ্ক আমানতের ওপরেও দেখা যাচ্ছে। বহু মানুষ তাদের ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙ্গাতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ জীবিকাহারা ও কর্মহীনতার জন্য। ২,০০০ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প করোনার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে বহু লোক কর্মহীন হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু উপরোক্ত তথ্যই প্রমাণ করছে এই লক্ষ্যে কিছুই করা হয়নি। বেড়েই চলেছে কর্মহীনতা, জনগণ দু’বেলা অন্ন জোটাতে জেরবার হচ্ছেন, অথচ রাজ্য সরকার নির্বাক দর্শকমাত্র। এখন যখন অবস্থা একটু একটু স্বাভাবিক হচ্ছে তখন সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সরকারকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

নির্বাচনের সময় বিজেপি-জেডিইউ ১৯ লক্ষ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদি তারা তা পালন করতেন তাহলে আজ অবস্থা এতটা সংকটজনক হত না। তথাকথিত ডবল-ইঞ্জিনের সরকার বিহারকে বহু বছর পিছনে ঠেলে দিয়েছে।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দাবি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকার ১৯ লক্ষ কাজের যোগান নিশ্চিত করুক। বিহারে যখন এরথেকে অনেক বেশি পদ খালি রয়েছে, তখন ১৯ লক্ষ লোককে বহাল করতে অসুবিধা কোথায়? আমরা মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিটি পরিবারকে দশ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি করেছি, কিন্তু সরকার বধির। অর্থনীতিকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে মনরেগা প্রকল্পে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আজ বিহারের কোথাও এই প্রকল্পে কোনও কাজ নেই। শহরেও মনরেগার মত প্রকল্পে কর্মসংস্থান করা দরকার।

একদিকে যখন করোনা-লকডাউনে জনগণ বিপর্যস্ত তখন বন্যার প্রতিঘাতে তাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে। দিল্লী-পাটনার সরকার বন্যা-বিধ্বস্ত, পীড়িতদের ত্রাণ দিতে ব্যর্থ। সরকারের উচিত শস্যহানির জন্য একর প্রতি ২৫,০০০ টাকা কৃষকদের দেওয়া।

Dalit oppression and death in custody

বিহারের বিজেপি-জেডিইউ সরকার কি দলিত পীড়ন এবং হেফাজতে মৃত্যুর সরকারে পরিণত হয়েছে? কিছুদিন আগে হেফাজতে নৃশংসভাবে খুন হলেন গোবিন্দ মাঁজি, আর এখন ২৬ বছরের দলিত যুবক বিনোদ কুমার দাস ভাগলপুরের কহলগাঁও-এ পুলিশের পাশবিকতায় খুন হলেন। এটাও সুস্পষ্টভাবে হেফাজতে খুন। একদিকে দানবীয় ‘পুলিশ আইন’এর জন্য পুলিশ হয়েছে লাগাম ছাড়া, অন্যদিকে সামন্তবাহিনী দলিত ও দরিদ্রদের ওপর তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। ৪ সেপ্টেম্বর তিনজন দলিত যুবক ভোজপুর জেলার গজরাজগঞ্জের বড়কাগাঁও-এ একটি মন্দিরে প্রসাদ নিতে গিয়েছিলেন, তাদের রাইফেলের কুঁদো, রড ও লাঠি দিয়ে নৃশংসভাবে আঘাত করা হয়। ফলে চৌকিপুর গ্রামের রবি রঞ্জন পাসওয়ানের মাথার খুলি ফেটে যায়।

২০ জুলাই, ২৬ বছরের দলিত যুবক বিনোদ কুমার দাস কহলগাঁও থানার পুলিশের বিভৎস অত্যাচারে মায়াগঞ্জ হাসপাতালে মারা যায়। মৃতের গ্রাম বাঁকা জেলার চকসাফিয়া (রাজায়ুঁ)-তে সিপিআই(এমএল)-এর একটি টীম ৩১ আগস্ট পরিদর্শনে যায়। ঘটনার খুঁটিনাটি জানতে তাঁরা মৃতের পিতা মনোজ কুমার দাস সহ স্থানীয় বহু মহিলা ও পুরুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। জানা গেছে বিনোদ একজন সাধারণ স্পষ্টবাদী সৎ যুবক এবং হালকা যানের চালক ছিলেন এবং মাঝে মাঝে রং’এর কাজও করতেন।

৭ জুলাই রাত ৮ টায় কহলগাঁও থানার পুলিশবাহিনী চকমাফিয়ায় আসে, বিনোদের বাড়ির তল্লাশি চালায়। কিছুই না পেয়ে তারা বিনোদকে নিয়ে তার মামাশ্বশুরের বাড়ি তাড়াহি (অমরপুর) যায় এবং সেখানেও তল্লাশি চালায় (সেখানে বিনোদের স্ত্রী অরুণা দেবী বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন)। সেখানেও কিছুই না পেয়ে পুলিশ বিনোদকে কহলগাঁও থানায় নিয়ে যায়। এরমধ্যে শম্ভুগঞ্জ থানার পুলিশ বিনোদের শ্বশুরবাড়ি কুমারডি গ্রামে যায় তল্লাশি নিতে কিন্তু কিছুই পায়নি।

১১ জুলাই কহলগাঁও পুলিশ বিনোদের বাবা মনোজকে একটি কাগজে সই করিয়ে বিনোদকে বাড়িতে নিয়ে যেতে দেয়। আসলে ৭ থেকে ১১ জুলাই পুলিশ বিনোদকে পাশবিকভাবে পেটায়। বাবা মনোজকে ১০ জুলাইয়ের আগে ছেলে বিনোদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। একজন গ্রামবাসী সন্তোষ দাস বলেন থানা থেকে বাড়ি ফেরার পর বিনোদ হাঁটতে পর্যন্ত পারছিলেন না। অমরপুরের একজন চিকিৎসক ডঃ বি কে তেওয়ারী তার চিকিৎসা করা সত্ত্বেও অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় তাকে ভাগলপুরের মায়াগঞ্জ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে ২০ জুলাই বিনোদের মৃত্যু হয়।

সিপিআই(এমএল) টীম রাজায়ুঁ থানায় তথ্য সংগ্রহে গেলে থানা ইনচার্জের দেখা পাওয়া যায়নি। গ্রামবাসীরা ২১ জুলাইয়ের ঘটনার প্রতিবাদে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। রাজায়ুঁ থানা এরফলে মনোজ দাসের আবেদনের ভিত্তিতে এফআইআর গ্রহণ করে।

পরবর্তীতে সিপিআই(এমএল) নেতা মুকেশ মুক্ত বিনোদের স্ত্রী অরুণা দেবী ও তার তিন বছরের পুত্রের সাথে ও অরুণা দেবীর ভাইয়ের সাথে দেখা করেন। অরুণা বলেন তাঁর চকসাফিয়ার শ্বশুরবাড়িতে ১২ জুলাই বিনোদকে দেখেন অত্যন্ত জখম অবস্থায়। বিনোদ বলেন তাকে পুলিশ বিনাদোষে পাশবিক ভাবে মেরেছে। তার শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্নও দেখা যায় এবং সে ২০ জুলাই মায়াগঞ্জ হাসপাতালে মারা যায়।

তদন্তকারী টীমের নিরীক্ষা

চকসাফিয়াবাসী ২৬ বছরের যুবক বিনোদ কুমার দাসের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের নির্মম মারে। ৭ জুলাই রাত (যখন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে) থেকে ১১ জুলাই (যেদিন পুলিশ তাকে তার বাবার হাতে তুলে দেয়) পুলিশ বিনোদের হাত-পা বেঁধে নির্দয় ও অমানবিকভাবে মারে। যখন সে অর্ধমৃতপ্রায় এবং কোনও কিছুই তার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে না পেরে তার দেহ হাতে তুলে দেয়। রাজায়ুঁ থানার বড় অফিসার ও অন্যান্য পুলিশকর্মীরা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী। তার বাবা মনোজ দাসকে পুলিশ ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছে। এটি একটি পরিষ্কার খুনের ঘটনা।

উত্তরবিহীন প্রশ্ন

কহলগাঁও থানায় (চুরির অভিযোগে) এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তাহলে পুলিশ ৬০ কিমি দূরে চকসাফিয়া গ্রামের দলিত যুবক বিনোদ কুমার দাসের নাম কীভাবে পেল? পুলিশের কাছে কি কোনও গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ছিল? কিভাবেই বা পুলিশ তিনটি আলাদা ব্লকের (ভাগলপুরের কহলগাঁও, বাঁকার রাজায়ুঁ ও শুভগঞ্জ) তিনটি জায়গায় একই দিনে ৭ জুলাই হানা দেয়, তল্লাশি চালায়! তিনটি জায়গা হল মৃতের বাড়ি চকসাফিয়া, তার মামাশ্বশুরের বাড়ি তাড়দি ও তার শ্বশুরবাড়ি কুমারডি। কার হুকুমে পুলিশ এই পরাক্রম দেখালো? কোন উচ্চপদাসীন পুলিশ আধিকারিক এই কর্মকান্ডের আয়োজক ছিলেন?

সিপিআই(এমএল) দাবি তুলেছে

  • কহলগাঁও থানার ইনচার্জসহ অন্যান্য দোষী পুলিশ কর্মীদের বরখাস্ত, গ্রেপ্তার এবং বিচার চাই। রাজায়ুঁ থানার ইনচার্জসহ অন্যান্য দোষী পুলিশ কর্মীদের বরখাস্ত কর এবং তাদের দুষ্কর্ম্মের তদন্ত চাই।
  • বিনোদ দাসের স্ত্রী অরুণা দেবীর সরকারি চাকরি ও তাঁর পরিবারের পঞ্চাশ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ চাই।
  • ভাগলপুর ও বাঁকা জেলার জেলাশাসক ও এসপি’কে এই ঘটনার জন্য দায়ী করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

Violence against women

গত বছরের তুলনায় দেশে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। মঙ্গলবার এই বছরের প্রথম আট মাস, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে আগস্টের পরিসংখ্যান দিয়ে জাতীয় মহিলা কমিশন জানিয়েছে, এই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মোট ১৯,৯৯৫৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। গত বছর যা ছিল ১৩,৬১৮। গত ৬ বছরে এই বারের পরিসংখ্যানই সর্বোচ্চ।

এরমধ্যে প্রত্যাশিতভাবেই মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধে শীর্ষ স্থানে আছে উত্তরপ্রদেশ। কমিশন জানিয়েছে, যোগীর রাজ্য থেকে মোট ১০,০৪৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরপরেই রয়েছে দিল্লী, সেখানে জমা পড়েছে মোট ২,১৪৭টি অভিযোগ। হরিয়ানায় জমা পড়েছে ৯৯৫টি অভিযোগ ও মহারাষ্ট্রে জমা পড়েছে ৯৭৪টি অভিযোগ।

উত্তরপ্রদেশ গত বছরের এনসিআরবি’র পরিসংখ্যানেও নারী নিগ্রহে শীর্ষস্থানে ছিল। তার কোনও পরিবর্তন হয়নি এবারেও। এই বছরের এনসিআরবি রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু মহিলা কমিশনের রিপোর্টই জানিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি বদলায়নি। বিরোধীরা মহিলাদের অবস্থা নিয়ে যোগীকে বিঁধলেও, তিনি সব কিছুই অস্বীকার করেন। কিন্তু তা যে সত্য নয়, তা ফের একবার স্পষ্ট করে দিল কমিশনের রিপোর্ট।

এমনিতেই লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর জন্য গার্হস্থ্য হিংসা বাড়তে পারে বলে সমাজকর্মীরা সতর্ক করেছিলেন। দেখা যাচ্ছে, সে কথাই মিলে গেছে। করোনা কালে মহিলাদের উপর অত্যাচার গত কয়েক বছরের মধ্যে শীর্ষে। ৪৬ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই আশঙ্কিত।

মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে মহিলা কমিশনের প্রধান শর্মা জানিয়েছেন, সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার ফলেই এই পরিসংখ্যানে বদল ধরা পড়েছে। মহিলারা এগিয়ে এসে অভিযোগ জমা দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন “কমিশনের পক্ষ থেকে ২৪ ঘন্টার হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। সেখানে মহিলারা অভিযোগ দায়ের করতে পারছেন। এছাড়া একাধিক নতুন কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে যাতে মহিলারা এগিয়ে আসেন”। এর পাশাপাশি তিনি বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থার কথাও বলেছেন।

যা অভিযোগ জমা পড়েছে, তারমধ্যে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার নিয়ে অভিযোগ করেছেন ৭ হাজারের বেশি মহিলা। গার্হস্থ্য হিংসা নিয়ে সরব হয়েছেন ৪ হাজারের বেশি মহিলা, পণ ও বৈবাহিক জীবে অত্যাচারের শিকার হওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে ১ হাজারের কিছু বেশি। ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ জমা পড়েছে ৫৮৫টি।

- এই সময়, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

fire to the kitchen

মোদী সরকার এই অতিমারী সময়কে কাজে লাগিয়ে সবথেকে প্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাসের মূল্য বার বার বৃদ্ধি করে এবং ভর্তুকি তুলে দিয়ে মোট ২০ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে।

  • ১ সেপ্টেম্বর রান্নার গ্যাসের মূল্য ২৫ টাকা বেড়ে দেশের রাজধানীতে হয় প্রতি ১৪.২ কেজিতে ৮৮৫ টাকা, পশ্চিমবঙ্গে দাম ৯৩৬ টাকা।
  • মে ২০২০ থেকে সারাদেশে এলপিজি’র দাম ৩০০ টাকার বেশি বেড়েছে।
  • এতদিন, ভারত সরকারের ভর্তুকি পাচ্ছিল গ্রাহকেরা। রান্নার গ্যাসের উপরে কয়েক দশক ধরে বহাল ছিল এই ভর্তুকি। মোদী সেই ভর্তুকির তহবিল চুরি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঢুকিয়েছেন।
  • মে ২০২০ থেকে ২৯ কোটি এলপিজি গ্রাহক কোন ভর্তুকি পায়নি।
  • অতিমারীর পর্যায়ে মোদী সরকার গ্যাসের দামও কমায়নি, উপরন্তু সমস্ত জিনিসের দাম অগ্নিমূল্য করে দিয়েছে। অতিমারী অগুন্তি মানুষের রোজগার কেড়ে নিয়ে চরম দারিদ্রে নিক্ষিপ্ত করলেও মোদী সরকারের কোনও হেলদোল নেই। সমস্ত জিনিষের দাম এই আমলে এখন আকাশছোঁয়া।
  • গ্যাসের বাজার দর যখন ছিল ৮৮৫ টাকা, তখন ভর্তুকি মিলছিল ২৩৫ টাকা।
  • এই সময়ে মোদী সরকার বিনামূল্যে ১৪ কোটি ১০ লাখ দরিদ্রতম মানুষকে এলপিজি সিলিন্ডার দিয়েছিল। এই খাতে সরকারের খরচ হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তারপর ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়।

ভারতবর্ষে মোট ২৯ কোটি এলপিজি গ্রাহকদের মধ্যে, কেন্দ্রীয় সরকারের হিসেবে ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’য় ৮ কোটি দরিদ্রতম মানুষকে এই প্রকল্পের আওতায় এনেছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই চরম দরিদ্র মানুষগুলি আর ভর্তুকি পাচ্ছেন না। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ আবার রান্নার জন্য কাঠ, কয়লায় ফিরে গেছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পেট্রোপণ্যের দাম কম থাকলেও এলপিজি’র দাম কমল না। কেন্দ্রীয় সরকার আলু, পেঁয়াজ, ডাল, ভোজ্য তেল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পর সমস্ত জিনিসপত্রের দাম হু-হু করে বাড়ছে। কিছুদিন আগে রাজ্যসভায় পেশ করা এক রিপোর্টে জানা গেল যে, গত একবছরে ভোজ্য তেলের দাম ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মোদী তার হাতেগোনা কর্পোরেট বন্ধুদের বিপুল কর ছাড় দিচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের উপরে নামিয়ে এনেছে বিরাট হামলা।

আসন্ন ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বনধ্ সফল করে এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যোগ্য জবাব দিতে হবে।

(তথ্যসূত্রঃ বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)

- স্বপ্না চক্রবর্তী 

Women's Association Conference

৮ সেপ্টেম্বর সারাভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির এক আলোচনা সভা আয়োজিত হয় বজবজে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা অফিসে। বিষয় ছিল ‘স্বাধীনতার ৭৫ বছর ও মহিলাদের অবস্থা’। উপস্থিত ছিলেন সমিতির রাজ‍্য সম্পাদিকা ইন্দ্রানী দত্ত, আইসার জেলা সম্পাদিকা অনিন্দিতা মালিক, লিবারেশনের বজবজ গ্রামীণ লোকাল কমিটির সম্পাদক ইন্দ্রজিৎ দত্ত। আলোচনাসভায় সবাই বক্তব্য রাখেন। পরিচালনা করেন সমিতির জেলা সম্পাদিকা কাজল দত্ত। বিভিন্ন রকম সমস্যার মধ্যে থেকেও মহিলারা সমাবেশিত হন, অনেক পুরুষ সাথীও উপস্থিত ছিলেন। ইন্দ্রানী দত্ত সহজ সরল ভাষায় মহিলাদের অবস্থান সমাজে কেমন ও মনুবাদের দর্শন এবং মহিলাদের উপর নিপীড়নের দিক ব্যাখ্যা করেন। অনিন্দিতা মালিক বলেন স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও মহিলারা যে এখনো স্বাধীন হয়নি তার প্রমাণ দিতে হয়। মহিলারা যে পুরুষদের থেকে কম নয় এই লড়াই এই সমাজ ব্যবস্থায় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। মহিলাদের উপর ফ্যাসিবাদী আক্রমণ, ১০০ দিনের কাজ বন্ধ, মজুরি সংকোচন, রেশনের অব্যবস্থা, নয়া কৃষি আইন ও বিদ্যুৎ বিল বাতিল, দেশ বেচার পাইপলাইন বন্ধ করা ও শ্রম কোড প্রত্যাহারের দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বরের সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ডাকে ভারত বনধ্ সফল করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জেলা সম্পাদিকা সভার কাজ শেষ করেন।

want loyalty

বহু ঢক্কানিনাদিত ‘দুয়ারে সরকার’-এর শিবির চলছিল রাজারহাট থানার চাঁদপুর হাইস্কুল প্রাঙ্গণে। তার দুয়ারেই ঘটল এই কাণ্ড। রেশন কার্ড চাইতে এসে, না পেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছিল লোকটি। সে নাকি তখন ‘নেশাগ্রস্ত’ ছিল। তাই সকলের চোখের সামনেই মারতে মারতে তাকে টহলদারি পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। পরদিন ভোরে তার বাড়ির লোক জানতে পারে ‘হৃদরোগে’ আক্রান্ত হয়ে তার ‘মৃত্যু’ হয়েছে!

রাজারহাটের মোবারকপুরের বাসিন্দা সঞ্জয় হলপাত্র। বয়স ৩৮। পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। কর্মস্থল বড়বাজার। স্ত্রী বাড়িতে কলম তৈরি করেন। বাড়িতে আছে আরও দু'জন। বৃদ্ধা মা ও সপ্তমশ্রেণির ছাত্রী একমাত্র কন্যা।

কী অপরাধ ছিল তার? মদ্যপান? তাহলে সরকার এত মদের দোকানকে ঢালাও লাইসেন্স দিয়েছে কেন? বেকার যুবকদের উপার্জনের সুযোগ করে দেওয়া? সহজ পথে রাজস্ব আদায়?

মদ্যপান ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য শুধু নয়, সমাজের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকারক। সরকার জানে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের মহিলাদের জন্য ‘মদ’ এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ, তাও সরকারের অজানা নয়। তবু মদ বিক্রির লাইসেন্স দেওয়া বাড়বে বৈ কমবে না!

তাহলে অপরাধটা কী? মাতলামি? অভব্য আচরণ? সরকারি কাজে ব্যাঘাত ঘটানো?

সেটা অপরাধ বটে। কিন্তু তার জন্যে মারতে মারতে গাড়িতে তুলতে হবে কেন? স্বল্প শিক্ষিত একজন শ্রমজীবী মানুষ, কিন্তু সে তো এক নাগরিক! তার নাগরিক অধিকার নিয়েই তো ‘দুয়ারে সরকার’-এর দ্বারস্থ হয়েছিল। ‘সবক’ শেখানোর জন্যে বেধড়ক মারা যায় এক ছা-পোষা নাগরিককে, এক স্ত্রী’র স্বামীকে, এক মায়ের সন্তানকে, এক স্কুলছাত্রী সন্তানের পিতাকে! চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, রাহাজানি, ছিনতাই, খুন যারা করে, তাদেরও তো মারতে মারতে পুলিশের গাড়িতে তোলা যায় না। তার গ্রেফতারের জন্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাই, তারপর তো আছে বিচারপ্রক্রিয়া। তাহলে?

কয়েক মাস আগে, চাকরি চাইতে এসে পুলিশের লাঠির ঘায়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন মইদুল ইসলাম। তখন মুখ্যমন্ত্রী সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, হয়তো কোনও রোগ ছিল, তাতেই মারা গেছে যুবকটি। এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাই! ময়নাতদন্তের ‘প্রাথমিক রিপোর্টে’র ভিত্তিতে প্রশাসন কর্তৃপক্ষ প্রাণপণে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন ‘হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার’ গল্পকে। ‘মৃত্যু’ মানেই তো হৃদযন্ত্রের স্পন্দন থেমে যাওয়া। কিন্তু পুলিশি হেফাজতে হঠাৎ কেন সেটা ঘটল? থানায় পুলিশের ‘'জামাই আদর'’ হাড়ে হাড়ে জানা আছে মানুষের। সঞ্জয়ের পরিবারের লোকজন তাকে সেইদিন রাতে থানা লক-আপের মেঝেতে বমি করে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। পুলিশের সাফাই — ‘অতিরিক্ত মদ্যপানের’ জন্যেই নাকি ঐ অসুস্থতা! পরদিন ভোরে মৃতের কানের পাশে রক্ত জমাট বাঁধার চিহ্ন দেখেন আত্মীয়রা। তারা দাবি করেছেন, রাজারহাট থানায় পুলিশী নির্যাতনেই মৃত্যু হয়েছে সঞ্জয়ের। কিন্তু প্রশাসন ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এলে তদন্তের আশ্বাস দিলেও থানায় মারধরের কথা বেমালুম অস্বীকার করেছে। ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। জনতা দিনভর রাজারহাট থানা ও রাস্তা অবরোধ করে রাখে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার পরই ‘পরিবারের পাশে’ দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং তদনুযায়ী স্থানীয় বিধায়ক মৃতের স্ত্রীকে মাসিক দশ হাজার টাকার মাসোহারার আশ্বাস দিলে সঞ্জয়ের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনসহ স্থানীয় জনতা দীর্ঘক্ষণের অবরোধ তুলে নেন।

‘সবক’ শেখানোর এই ধরনটা সমাজেও ছড়াচ্ছে। মালদহের হরিশচন্দ্রপুরে হাতে দড়ি ও পায়ে শেকল বেঁধে চব্বিশ বছরের এক তরুণকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। ছেলেটি নাগপুরে কাজ করতো, কিছু দিনের ছুটি কাটিয়ে আবারও সেখানে ফেরার কথা ছিল। মানিকতলা মেন রোডের বসাক পাড়ায় আরেকটি তরুণকে মোবাইল চুরির অভিযোগে (প্রমাণ ছাড়াই) ১৪ জন মিলে রাত ১২টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পিটিয়ে, মৃতদেহ একটা অটোয় ফেলে যায়। মূল অভিযুক্ত একজন সিভিক পুলিশ। কর্ণাটকে এক মহিলাকে নগ্ন করে বেধড়ক পেটানোর এক ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানেও ‘সবক’ শেখানোর অভিযোগ, এক সিভিক পুলিশের বিরুদ্ধে। এই সিভিক পুলিশদের সম্প্রতি এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ দুর্বলের ওপর বা একা মানুষের ওপর সবলের বা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ ও মেরে ফেলাটা প্রায় বিনোদনের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। কে রুখবে এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা পুলিশ নিজেই যখন অত্যাচারী, খুনী!

‘দুয়ারে সরকার’-এর উদ্দেশ্য সরকারের এক জনদরদী কল্যাণকর রূপ তুলে ধরা। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পগুলি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ যাতে অবহিত হতে পারেন, সুযোগ নিতে পারেন তার জন্য পঞ্চায়েত বা পৌরসভার মাধ্যমে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে গেছে প্রশাসন। কিন্তু সেই সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষক প্রশাসনের হাত কেন নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হবে? তাহলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন, দাঙ্গায় মদত দেওয়া দিল্লী পুলিশ বা সুশীল কাজলের হত্যাকারী হরিয়ানা পুলিশের থেকে তাদের কীভাবে ফারাক করা যাবে? বিশেষ করে তাদের অপরাধ ঢাকতে রাজনৈতিক নেতারা যখন ‘হৃদরোগের’ তত্ত্ব সামনে আনেন, তখন সরকারের ‘জনদরদী’ রূপটা যে ঝাপসা হয়ে যায়! সরকারের উদ্দেশ্য যদি যথার্থই সদর্থক হয়, তাহলে প্রশাসনকেও সেই অভিমুখে চালিত করতে হবে। না হলে যে ‘ষোলোআনাই ফাঁকি’!

আসলে হতভাগ্য সঞ্জয়ের অপরাধ ছিল প্রশাসনের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া, ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্ন করা। প্রশাসন চায় কৃতাঞ্জলিপুটে ‘দান’ গ্রহণকারী অনুগৃহীত প্রজার আনুগত্য, অধিকার সচেতন নাগরিকের ঔদ্ধত্য নয়!

এবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক কয়েকটি পরিসংখ্যানে, তাহলে বোঝা যাবে কতটা উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে হেফাজতে হত্যার ঘটনা গোটা দেশেই। ১২ আগস্ট, ২০২১-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন বছরে সারা দেশে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে মোট ৫২২১ জনের, পুলিশি হেফাজতে ৩৪৮ জনের। বিচার বিভাগীয় হেফাজত-মৃত্যুর ঘটনায় শীর্ষে আছে উত্তরপ্রদেশ-১২৯৫; তারপর মধ্যপ্রদেশ- ৪৪১; পশ্চিমবঙ্গ তৃতীয় স্থানে -৪০৭ এবং বিহার- ৩৭৫; পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা: গুজরাট-৪২, মধ্য প্রদেশ- ৩৪, মহারাষ্ট্র-২৭, উত্তর প্রদেশ-২৩ (রাজ্য সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পেশ করা তথ্য)।

ইন্ডিয়াস্পেন্ড-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর মোট ঘটনা ১০০৪, তার মধ্যে ৪০ শতাংশ মৃত্যুর নথিবদ্ধ কারণ — ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অসুস্থতা’; ২৯ শতাংশ ‘আত্মহত্যা’, এতগুলো মৃত্যুর ঘটনায় সাজা হয়েছে মাত্র ৪ জন পুলিশ কর্মীর। ২০১০এ-১ জন, ২০১৩তে-৩ জন।

২০২০-র ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সংসদে পেশ করা তথ্যে জানা যাচ্ছে — ২০১৯-২০২০-তে ভারতে গড়ে দৈনিক ৫টি হেফাজত-মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

এই প্রসঙ্গে ভারতের প্রধান বিচারপতি এন ভি রামানা পুলিশি হেফাজতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন “দি থ্রেট টু হিউম্যান রাইটস্ এ্যান্ড বডিলি ইনটিগ্রিটি আর দি হাইয়েস্ট ইন পুলিশ স্টেশনস্”। এরপর আর কিছু বলার থাকে!

- জয়ন্তী দাশগুপ্ত 

tribal women in the war

পঁচাত্তরতম স্বাধীনতা দিবস নিঃসন্দেহে সেইসব বীরদের স্মরণ করার দিন যাঁরা ইংরেজ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে রক্ত-ঘাম ঝরিয়েছেন। অথচ ‘বীর’ নামক বিশেষণ বা ‘বীরত্ব’ নামক বিশেষ্যটি শুনলে মানসপটে কোনো না কোনো পুরুষের ছবিই ভেসে ওঠে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আজ আরএসএস-বিজেপি পুনর্লিখন করছে বটে, তারা মুছে দিচ্ছে সেলুলার জেলে বন্দী বিপ্লবীদের নাম। কিন্তু লক্ষণীয়, এর আগেও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রচলিত মূলধারার ইতিহাস থেকে বাদ পড়ে গেছেন দলিত আদিবাসীরা। তার উপর সেই দলিত-আদিবাসী বিপ্লবীরা যদি নারী হন? লিঙ্গগত প্রান্তিকতার সঙ্গে জাতি-বর্ণগত বা শ্রেণিগত প্রান্তিকতাও এঁদের রেখেছে অন্ধকারে। এই নিবন্ধ না হয় সেইসব অবলুপ্ত নামেদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে থাক।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দলিত নারীর সংগ্রামের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় অষ্টাদশ শতকের নারী যোদ্ধা কুইলি’র কথা, নবারুণের বেবি-কে’র মতো যিনি মানবীবোমা হয়ে উঠেছিলেন। কুইলি ছিলেন বর্তমান তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গাইয়ের রানি ভেলু নাছিয়ারের সেনাধ্যক্ষা। কিন্তু রানি ভেলু নাছিয়ারকেও কি পাঠক চেনেন? এই রানিই প্রথম ভারতীয় শাসক, যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহের প্রায় ৭৭ বছর আগে, ১৭৮০ সালে এই যুদ্ধ হয়। যে রণকৌশল তাঁকে জিততে সাহায্য করেছিল, তা তাঁর প্রধান সেনাধ্যক্ষা কুইলি’র মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল। আজও তামিল ভাষায় কুইলি’কে কেউ ‘বীরথালাপ্যাথি’ (সাহসী সমরনায়িকা) বলেন, কেউ বা বলেন ‘বীরামঙ্গাই’ (সাহসী নারী)। তিনি অরুণথিয়ার তফসিলি জাতিভুক্ত ছিলেন। কুইলি’র জন্ম হয়েছিল পেরিয়ামুথান এবং রাকু নামের কিষাণ-কিষাণীর ঘরে। মা রাকু বন্য ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ফসল বাঁচাতে গিয়ে। বিধ্বস্ত পেরিয়ামুথান তখন কুইলি’র সাথে শিবগঙ্গাইয়ে চলে যান। সেখানে তিনি মুচির কাজ করতেন। কুইলি তাঁর মায়ের সাহসিকতার গল্প বাবার কাছে শুনে বড় হন। বাবা শীঘ্রই রানি ভেলু নাছিয়ারের গুপ্তচর নিযুক্ত হন। যুদ্ধের সময় তিনিও তাঁর মেয়ে এবং রানির পাশাপাশি যুদ্ধ করেছিলেন। বাবার কাজের প্রকৃতির ফলেই কুইলি রানি ভেলু নাছিয়ারের ঘনিষ্ঠ হলেন। একাধিকবার রানির জীবন রক্ষা করেছিলেন কুইলি। তাই রানি কুইলিকে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী করে নেন। যখন ব্রিটিশরা ভেলু নাছিয়ারের পরিকল্পনা জানার জন্য কুইলিকে চাপ দেয়, তখনও তিনি মাথা নোয়াননি। ফলে দলিত বস্তিতে অত্যাচার ঘনিয়ে আসে। পরে কুইলি সর্বময় কর্ত্রী হয়ে ওঠেন সেনাবাহিনীর। মারুথু পান্ডিয়ার্স, হায়দার আলি এবং টিপু সুলতানের সাথে সফলভাবে জোট গঠন করে, রানি ভেলু নাছিয়ার তাঁর রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তাঁদের সেনাবাহিনী সু-প্রশিক্ষিত ছিল এবং কয়েকটি যুদ্ধে তাঁরা জিতেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উন্নত অস্ত্রের কারণে তাঁরা শেষ পর্যন্ত হেরে যান।

এই সময় কুইলি শেষ কৌশল প্রয়োগ করেন। শিবগঙ্গাই কোট্টাই (দুর্গ)-এ নবরাত্রির দশম দিনে, রাজরাজেশ্বরী আম্মানের মন্দিরে বিজয়া দশমী উৎসব। সেই উপলক্ষে মহিলাদের দুর্গে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া গেছিল। কুইলি এই সুযোগকে কাজে লাগালেন। ফুল এবং ফলের ঝুড়ির ভিতরে অস্ত্র লুকিয়ে, মহিলারা দুর্গে প্রবেশ করল এবং রানির ইঙ্গিতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করল। অন্যদিকে সৈন্যরা সাধারণ পোশাকে দুর্গের চারদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কুইলি ইতিমধ্যেই ব্রিটিশদের অস্ত্রাগারের অবস্থান জেনে নিয়েছিলেন। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে তিনি সৈন্যদের বলেন, প্রদীপ জ্বালানোর ঘি ও তেল তাঁর উপরেই ঢালতে। তারপর তিনি ব্রিটিশদের অস্ত্রাগারে গিয়ে নিজেকে জ্বালিয়ে সমস্ত অস্ত্র ধ্বংস করলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অস্ত্র হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ল। তামিলনাড়ু সরকার, প্রায় এক দশক ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর, অবশেষে কুইলি’র একটি স্মারক তৈরি করেছে শিবগঙ্গা জেলায়।

women in the war of independence

 

আবার রানি লক্ষ্মীবাই-এর সহচরী ঝালকারি বাই-এর কথাই ধরা যাক। ঝাঁসির ‘দুর্গা দল’ বা মহিলা ব্রিগেডের দুঁদে নেত্রী তিনি। তাঁর বরও ঝাঁসির সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক ছিলেন। ঝালকারি তীরন্দাজি আর তলোয়ার চালানোয় প্রশিক্ষিত ছিলেন। লক্ষ্মীবাইয়ের সাথে তাঁর চেহারায় মিলের কারণে তিনি নিজেকে প্রায়শই রানির ‘ডাবল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন, ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দেওয়ার সামরিক কৌশল হিসেবে। ঝালকারি রানির মতো সাজে সজ্জিত হয়ে ঝাঁসি সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি লক্ষ্মীবাইকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। কিংবদন্তী অনুসারে, যখন ব্রিটিশরা তাঁর আসল পরিচয় জানতে পারে, তখন তারা তাঁকে ছেড়ে দেয় এবং তিনি ১৮৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ জীবনযাপন করেন। ঝাঁসির এই ‘দুর্গা দল’ ছিল আরও অনেক নারীর সংগ্রামের সাক্ষী। মান্দার, সুন্দরী বৌ, মুন্ডারি বাই, মতি বাই — এঁরা কেউ কারও চেয়ে কম যেতেন না। এঁরা অকুতোভয় চিত্তে স্বামীদের যুদ্ধে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি। অলসভাবে বৈধব্য গ্রহণ করতে ছিল এঁদের অনীহা। ‘চুড়ি ফরওয়াই কে নেওতা, সিন্দুর পোছওয়াই কে নেওতা’ (চুড়ি ভাঙার আমন্ত্রণ, সিঁদুর মুছে ফেলার আমন্ত্রণ) স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে, তাঁরা নিজেরাও লড়াই-এ ঝাঁপিয়ে পড়েন।

১৮৫৭ সালের নভেম্বরে সিপাহী বিদ্রোহের কালে সিকান্দারবাগের লক্ষ্ণৌয়ে এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। সিকান্দারবাগে বিদ্রোহীদের হাতে অবরুদ্ধ ইউরোপীয়দের উদ্ধার করতে আসেন কমান্ডার কলিন ক্যাম্পবেল। সেসময় কোনো এক সিপাহী একটি গাছের উপর থেকে গুলি চালিয়ে একের পর এক ইংরেজ সৈন্যদের মারছিল। যখন ইংরেজরা গাছটি কেটে ফেলল, তখন তারা আবিষ্কার করেছিল যে, গুলি চালানো ব্যক্তি কোনো পুরুষ সিপাহী নয়, পার্সি সম্প্রদায়ের এক নারী, যিনি উদা দেবী নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মূর্তি আজ লক্ষ্ণৌর সিকান্দারবাগে শোভা পায়।

ফোর্বস-মিচেল মহাবিদ্রোহের স্মৃতিচারণে উদা দেবীর সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি একজোড়া পুরাতন প্যাটার্ন-এর অশ্বারোহী পিস্তলে সজ্জিত ছিলেন। তাঁর বেল্টে তখনও একটি পিস্তল ছিল, তাঁর থলি তখনও অর্ধেক ভরা ছিল গোলাবারুদে। তিনি গাছের মধ্যে তার আশ্রয়স্থল থেকে (সেই আশ্রয়স্থল আক্রমণের আগে অতি যত্নে প্রস্তুত করা হয়েছিল) অন্য পিস্তলটি দিয়ে আধ ডজনেরও বেশি লোককে হত্যা করেছিলেন।”

কিত্তুরের রানি চেন্নাম্মাকে তো কর্ণাটক রাজ্য ‘লোকনায়ক’ হিসেবে মেনেছে। পঞ্চমশালী লিঙ্গায়েত (বর্তমানে ওবিসি) জাতির এই রানি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর সংঘাত বাধে, কারণ তিনি স্বত্ববিলোপ নীতি অমান্য করেন। রানি চেন্নাম্মার বিয়ে হয়েছিল কিত্তুরের রাজা মল্লসরজা দেশাইয়ের সাথে, তাঁদের এক পুত্রসন্তান ছিল। ১৮১৬ সালে তার স্বামীর মৃত্যুর পর, তাঁর পুত্রও ১৮২৪ সালে মারা যান। সিংহাসনের কোন উত্তরাধিকারী না থাকায়, কিট্টুর চেন্নাম্মা শিবলিঙ্গপ্পা নামে এক দত্তকপুত্রকে গ্রহণ করেন, যা ব্রিটিশদের পছন্দ হয়নি। রানি বলেছিলেন তিনি ইংরেজদের রাজ্য সমর্পণ করবেন না। অগত্যা যুদ্ধ।

ব্রিটিশরা কিত্তুরের রানির কাছে পরাস্ত হয়ে, আর কোন যুদ্ধ হবেনা বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে, রানিকে ঠকায়। দ্বিতীয়বার আরও বেশি বাহিনী নিয়ে তারা প্রতিশোধ নেয়। বারো দিনের যুদ্ধের পর, নিজের লোকদের প্রতারণার কারণে, রানি চেন্নাম্মা পরাজিত ও বন্দী হন। তিনি আজীবন কারাবাস করেন। যদিও তিনি শেষ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে তার প্রথম বিজয় এখনও কিত্তুরে প্রতি বছর ‘কিত্তুর উৎসব’এর সময় উদযাপিত হয়। ২০০৭ সালে অবশ্য ভারতের পার্লামেন্টের কমপাউন্ডে তাঁর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। চেন্নাম্মাকে আজ ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট’ করতে উদগ্রীব আরএসএস। এই প্রয়াস বন্ধ করা আশু প্রয়োজন।

মহাবিদ্রোহের বৈশিষ্ট্যই ছিল, শুধু উচ্চবর্ণ নয়, শুধু পুরুষ নয়, অবদমিত জাতি তথা শ্রেণীর নারীদেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

আরেক দলিত বীরাঙ্গনা ছিলেন মুজাফ্ফরনগর জেলার মুন্ডভার গ্রামের মহাবীরী দেবী। মহাবীরী বাইশজন নারীর একটি দল গঠন করেছিলেন, যাঁরা ১৮৫৭ সালে একসঙ্গে অনেক ব্রিটিশ সৈন্যকে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করে হত্যা করেছিল।

dalit women savitri bai

 

এঁদেরই উত্তরসূরী ছিলেন দলিত নারী সাবিত্রীবাই ফুলে, যিনি নিজে অসমসাহসী সমাজ সংস্কারক ও ভারতের প্রথম নারী-স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯২০’র দশকে দলিত নারীরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণ-বিরোধী এবং অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৩০’র দশকে তারা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সুলোচনাবাই ডংরেকে কি আমরা চিনি? ১৯৪২ সালের ২০ জুলাই ঐতিহাসিক ‘সর্বভারতীয় বঞ্চিত শ্রেণীর মহিলা সম্মেলনে’ সভাপতিত্ব করতে গিয়ে তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে, নারীর শরীরে নারীরই অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেন। এই ‘অল ইন্ডিয়া ডিপ্রেসড ক্লাস উইমেনস কংগ্রেস’ দলিত নারীবাদের একটি নতুন তরঙ্গের সূচনা করে। রামাবাই আম্বেদকর বা সুলোচনাবাই ডংরেরা তো আগে ‘অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কংগ্রেস’এর সদস্য ছিলেন। কিন্তু তাঁরা সম্মেলন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বর্ণবৈষম্যের কারণে। যেমন ১৯৩৭ সালে এআইডব্লিউসি সম্মেলনে, শিক্ষাবিদ জয়বাই চৌধুরি দলিত নারীদের খাদ্যগ্রহণের আলাদা আসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। মতাদর্শগতভাবেও, দলিত নারীদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং উচ্চবর্ণের মহিলাদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল। পরেরটিতে হিন্দু ঐতিহ্য ঘিরে যে মুগ্ধতা ছিল, যে শোধনবাদ ছিল, তা সুলোচনাবাইদের লড়াইতে ছিলনা। তাঁরা লিঙ্গভিত্তিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বর্ণভিত্তিক — সব রকম নির্যাতনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাই শুরু থেকেই শুধু দেশের স্বাধীনতা নয়, তাঁরা জোর দিয়েছিলেন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর, নারীশিক্ষার উপর, শরীরের স্ব-শাসনের উপর। তাঁদের বিরোধিতা ছিল দেশীয় নারী-পুরুষদের দ্বারা বর্ণগত ও জাতিগত শোষণের প্রতিও। নাগপুরের ১৯৪২ সালের ওই সম্মেলন ২৫,০০০ দলিত নারীর কাছে তার বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছিল।

ড: জয়শ্রী সিং এবং গার্গী বশিষ্ঠ তাঁদের গবেষণাপত্রে (এ ক্রিটিকাল ইনসাইট অন স্টেটাস অফ দলিত উওমেন ইন ইন্ডিয়া ২০১৮) লিখেছেন, “ভারতে দলিত নারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে বসবাস করছে। তাদের নিজের শরীর, উপার্জন এবং জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা দরিদ্র, নিরক্ষর, যৌন হয়রানি, বর্ণগত হিংসার শিকার এবং শোষিত।” একই কারণে, স্বাধীনতা সংগ্রামেই হোক বা নারীবাদী সংগ্রামে, এই দলিত নারীদের অবদান মনে রাখা হয়নি। সে ইতিহাস পুনরুদ্ধার করার সময় এসেছে।

আদিবাসী নারীদের কথাই বা মনে রেখেছে ক’জন? স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে সাঁওতাল-কোল-মুন্ডাদের বিদ্রোহ ছোট ছোট অধ্যায়ে যদি বা লেখা থাকে, জনজাতিগুলির নারী-নেত্রীদের কথা লেখা থাকে কৈ?

phulo-jhano murmu

 

ফুলো মুর্মু এবং ঝানো মুর্মু কোনভাবেই সিধু কানু চাঁদ ভৈরবের মতো বিখ্যাত হননি। আজ বেঁচে থাকলে তাঁদের হয়ত ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে সম্বোধন করা হোত। ফুলো এবং ঝানো পূর্ব ভারতের সাঁওতাল উপজাতির মুর্মু উপগোষ্ঠীর মেয়ে। তাঁদের বসতভূমি আজকের ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত। ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশদের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে, তা ছিল শোষক ব্যবসায়ী এবং মহাজনদের বিরুদ্ধেও বটে। সাঁওতালরা নিজস্ব দেশ ‘দামিন-ই কোহ’ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। ১৭৮০’র দশক থেকে তাঁরা রাজমহল পাহাড় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। ব্রিটিশরা প্রাথমিকভাবে বন পরিষ্কার করে কৃষিকার্যে এবং গবাদি পশু চরানোর কাজে তাঁদের উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু তারা মহাজন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও এই এলাকায় প্রবেশ করতে উৎসাহ দিয়েছিল বেশি রাজস্বের লোভে। তারপর মহাজন, ব্যবসায়ী ও ব্রিটিশরা মিলে আদিবাসীদের জমি দখল করতে শুরু করে। কর-খেলাপিদের জমি নিলামে তোলা হয়। জমিদারির বিকাশ ঘটে। সুদূর ভাগলপুরের আদালত ব্যবস্থা কোন স্বস্তি দেয়নি। পুলিশ-প্রশাসনের নিম্নস্তরের কর্মীদের দুর্নীতি সাঁওতালদের বঞ্চিত করে। সেই সময় ঝাড়খণ্ডের বারহাইটের কাছে বোগনাদিহে মুর্মু পরিবারের বড়ভাই সিধু দাবি করেন, ঈশ্বর দর্শন দিয়ে তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন যে শোষণের থেকে মুক্তি কেবল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই সম্ভব। মুর্মুরা দিকে দিকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে শালগাছের শাখা সহ দূত পাঠায়। সে বার্তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পঞ্চকাটিয়া অঞ্চলে জড়ো হওয়ার জন্য একটি দিন ধার্য করা হয়। সিধুর বক্তৃতায় জনতা উদ্দীপিত হয়। দিগগিহ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ দেন। তাঁকে খুন করে জনজাতি ঘোষণা করে ‘ডেলাবন’! (আমাদের যেতে দিন!) ধনুক-তীর, বর্শা, কুড়ুল এবং অন্যান্য শিকারের অস্ত্র নিয়ে তাঁরা জমিদার, মহাজন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শস্যাগার লুট করেন বা আগুন ধরিয়ে দেন। দলটি কলকাতায় ব্রিটিশ সদর দপ্তরে পৌঁছাতে চেয়েছিল। কিন্তু বরহাইট থেকে সত্তর কিলোমিটার দূরে মহেশপুর ছাড়িয়ে তাঁরা আর এগোতে পারেননি। সিধু এবং কানহুকে গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। দশ হাজারেরও বেশি সাঁওতাল নারী-পুরুষ জীবন দিয়েছিলেন। শোনা যায়, ফুলো এবং ঝানো সৈন্যদের শিবিরে ছুটে যান। অন্ধকারে কুড়ুল চালিয়ে একুশ জন ব্রিটিশ সৈন্যকে নির্মূল করেছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বে উপজাতীয় নারীদল পুরুষদের সঙ্গে মিশে যুদ্ধ করেছিলেন, প্রাণ দিয়েছিলেন।

ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুরের গবেষক বাসবী কিরো তাঁর বই ‘উলগুলান কি আওরতেঁ’ (বিপ্লবের নারী) বইতে আদিবাসী আন্দোলনের আরও অনেক নারীর কথা বলেছেন। সাঁওতাল বিদ্রোহে যেমন ছিলেন ফুলো এবং ঝানো মুর্মু, ১৮৯০-১৯০০ সালের বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা বিদ্রোহে তেমন ছিলেন মাকি, থিগি, নাগি, লেম্বু, সালি এবং চম্পি। ছিলেন বীরকান মুন্ডা, মাঞ্জিয়া মুন্ডা এবং দুন্দাং মুন্ডাদের স্ত্রীরা। তানা আন্দোলনে (১৯১৪) ছিলেন দেবমণি ওরফে বন্দানি। রোহতাসগড় প্রতিরোধে ছিলেন সিঙ্গি দাই এবং কাইলি দাই। ওরাঁও মহিলারা পুরুষদের পোশাক পরে শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, জনজাতির তরুণতর প্রজন্ম ছাড়া আর কেউ সেসব ইতিহাস খোঁড়ার চেষ্টা করছে না আজও।

আবার বিংশ শতকে মণিপুর এবং নাগাল্যান্ড থেকে ঔপনিবেশিক শাসকদের তাড়ানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আদিবাসী রানি গাইদিনলিউ, জওহরলাল নেহরু যাঁকে ‘নাগের রানি’ নামে ডাকতেন। রানি গাইদিনলিউ কিশোরী বয়সে উত্তর-পূর্ব ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন। তিনি জেলিয়াগরং উপজাতির রংমেই গোষ্ঠীর রানি। দশ বছর বয়সে তিনি তাঁর খুড়তুতো ভাই হাইপো জাদোনাং-এর প্রভাবে ‘হেরাকা’ (যার অর্থ ‘বিশুদ্ধ’) নামে একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, যার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের তাড়িয়ে উপজাতির অধিকার ও সংস্কৃতি ফিরে পাওয়া। জাদোনাংয়ের মৃত্যুর পর গাইদিনলিউ নিজেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। জেলিয়াগরং উপজাতিকে তিনি ইংরেজদের কর না দিতে বলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তার পক্ষে ছিল। ব্রিটিশরা গাইদিনলিউকে গ্রেপ্তার করে এবং মাত্র ষোলো বছর বয়সে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে তিনি মুক্তি পান। তিনি আজীবন নিজের জনগোষ্ঠীর উন্নতির জন্য কাজ চালিয়ে যান, তিনি নাগাদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করার বিরোধী ছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালে তাম্রপাত্র মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার, ১৯৮২ সালে পদ্মভূষণ এবং ১৯৮৩ সালে বিবেকানন্দ সেবা পুরস্কারে ভূষিত হন। মরণোত্তর বিরসা মুন্ডা পুরস্কারেও ভূষিত হন তিনি। একে আদিবাসী, তায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নারী, গাইদিনলিউকে ইতিহাসের মূলস্রোত তাই ভুলে গেছে।

ইতিহাসের পুনর্লিখন যদি হতেই হয় তাহলে যেন সামনের সারিতে উঠে আসেন এই নারীরা।

- শতাব্দী দাশ 

government assets

দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ‘ন্যাশনাল মনেটাইজেশন পাইপলাইন’ ঘোষণা করেছেন। এনিয়ে নানা দিকে সোরগোল উঠেছে। এমনকি সংঘ পরিবারের ট্রেড ইউনিয়ন ‘বিএমএস’ পর্যন্ত এই প্রকল্পে আপত্তি জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আগামী চার বছরে সত্যিই কি সরকারের ৬ লক্ষ কোটি টাকা আয়ের সংস্থান করার জন্য এমনতর প্রকল্পের ঘোষণা? এর পিছনে কি সুদূরপ্রসারী অন্য কোনও উদ্দেশ্য বা বাধ্যবাধকতা নেই? অন্যভাবে বললে, অর্থনীতির কোন ইশারায় এমন এক বিপজ্জনক খেলায় নামল মোদী সরকার?

গত সাত বছরে মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখলে এই পদক্ষেপের পিছনে রাজনৈতিক-অর্থনীতির এক নতুন ও গোপন খেলা রয়েছে বলে মালুম হবে। কারণ, অর্থনীতির আঙ্গিক আজ আমূল বদলের পথে। অবশ্য, সে বদল অনুধাবন করার আগে অর্থনীতির কতকগুলি অবধারিত পরিবর্তনের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে।

প্রথমত, গত চার-পাঁচ বছরে সারা বিশ্ব জুড়েই অর্থনীতির আঙ্গিকে এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অর্থনীতির সিংহভাগ জুড়ে গত ৫০-৬০ বছরে পরিষেবা ক্ষেত্রের যে রমরমা ও আধিপত্য ছিল তা এক নতুন মাত্রা ও পরিসরে প্রবেশ করেছে। সেই পরিসর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্বয়ংক্রিয় এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা যেখানে শ্রম ও প্রযুক্তির চরিত্র আমূল বদলে গিয়ে এক নতুন জগতের জন্ম দিয়েছে। এই নতুন জগতের কর্মপ্রক্রিয়া পরিমাণগত ও গুণগতভাবে যন্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ উপায়ে নির্ভরশীল। আর এই যন্ত্রব্যবস্থা এতটাই আধুনিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল যে স্থায়ী চরিত্রের শ্রমিক বা কর্মচারী নিয়োগের কোনও প্রয়োজন আর নেই। কর্মপদ্ধতি ও শ্রমের চরিত্র যখন এতটাই অনিশ্চিত, তখন স্বভাবতই এক কর্ম থেকে অপর কর্মে রূপান্তর এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। তাই, স্বাভাবিক ভাবেই নির্দিষ্ট কর্মে পুঁজির বিনিয়োগ ও প্রত্যাহার অতীব নমনীয় রূপ ধারণ করেছে। যে কারণে আমরা কোম্পানির দ্রুত হাতবদল অথবা তাদের দেউলিয়া কিংবা স্ফীতকায় হয়ে ওঠা ঘন ঘন পরিলক্ষিত করি। যদিও প্রথম সারির গুটিকয়েক অতিবৃহৎ কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে এমনতর হাতবদল বা ক্ষয়ক্ষতি অথবা লাভালাভের প্রক্রিয়াটা অতটা প্রকটভাবে বা ঘন ঘন ঘটবেনা। কারণ, তাদের কাজের পরিধিটাই বিশাল ও ব্যাপ্ত। কিন্তু, মাঝারি ও ছোট উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে তা হচ্ছে। কিন্তু এই ধরনের হাতবদল গত কয়েক বছরে এতটাই বেড়ে গেছে এবং দেখা যাচ্ছে, কোনও কোনও কোম্পানি বা তাদের কর্মপ্রক্রিয়া এতটাই ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত যে এই ধরনের কেনাবেচায় লাভালাভ সুনিশ্চিত বলাটা ক্রমেই বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে, বহুলাংশে কোম্পানিগুলি আজকাল মালিকানার সম্পূর্ণ দায় নিতে অস্বীকার করছে। তারা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ লিজ বা ভাড়া নিয়ে কাজ করতে। তাতে তাদের দায়ভার অনেক কম থাকে। যেমন, এক্ষেত্রে এয়ারবিএনবি ধরনের মডেলের উল্লেখ করা যেতে পারে যা অর্থনীতির স্বাভাবিক আঙ্গিক হয়ে উঠতে চাইছে।

দ্বিতীয়ত, মোদী সরকারের সংস্কার কর্মসূচির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বড় উদ্যোগ ছিল ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দিয়ে রাজকোষে অর্থ ভরা। এই দুটিই চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, তারা প্রথমটির ক্ষেত্রে চীনের মডেল অনুসরণ করতে গিয়েছিল, যা আসলে দেশের মজুর ও পরিকাঠামোকে সস্তায় পুঁজির হাতে তুলে দিয়ে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের বিকাশ ঘটানো। কিন্তু তারা এটা বোঝেনি না যে চীনের মডেলটি গত শতকের নব্বই দশকের ভাবনা যখন আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের কিছুটা রমরমা ছিল ও জিডিপি’তে তার একটা বড় অনুপাত থাকত। চীন যখন সেই মডেলটি বাতিল করে এই শতকের দ্বিতীয় দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদীয়মান শিল্পের দিকে ঝুঁকলো, তখন মোদী সরকার ভাবল যে ওই মডেলটিকে এবার এখানে লাগু করলে চীনের থেকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাবগুলি পটাপট ভারতে চলে আসবে। এখানেই লুকিয়ে ছিল চিন্তার চূড়ান্ত দেউলিয়াপনা। কারণ, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে ব্যাপক অটোমেশন ও রোবটিক্স’এর প্রয়োগের ফলে তা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে স্বাধীন ইউনিট-পরিমাপে এতটাই কমে এল যে নতুন করে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প প্রতিষ্ঠার খুব একটা আর প্রয়োজন থাকল না।

পাশাপাশি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলি হয়ে উঠল সাদা হাতি পোষার মতো। তার এত দায়ভার যে সেই শিল্পগুলিকে কেউ ক্রয় করতেও এগিয়ে এল না। তার ওপর এইসব সংস্থায় যারা কাজ করেন, তাঁদের স্বেচ্ছা-অবসর প্রকল্পে প্রচুর অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন হয়, যে খরচটিও আর কোনও কর্পোরেট সংস্থা করতে রাজী নয়। শুধু এয়ার ইন্ডিয়া নয়, বিভিন্ন রেল স্টেশন অথবা অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকে বেচে দেওয়ার ঘোষণা করা হলেও সে সব কেনার খদ্দের পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই আর কোনও উপায়ন্তর না পেয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এবার রাষ্ট্রায়ত্ব সম্পদকে লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা নিল, যার গালভরা নাম ‘ন্যাশনাল মনেটাইজেশন পাইপলাইন’। এই লিজ ২৫, ৩০ কি ৪০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এ হল সরকারের তরফে কতিপয় কর্পোরেট কোম্পানিকে দেওয়া সব থেকে দামী তোফা। প্রায় বিনা খরচে সরকারি সম্পদের ঘাড়ের ওপর চেপে মুনাফা কামানোর এমন সহজ উপায় অতীতে কখনও দেখা যায়নি। যদি মুনাফা আশাতীত না হয়, তাহলে খুব সহজেই সেগুলিকে পরিত্যাগ করে কোম্পানিকুল চলে যাবে। তাতে তাদের বিশেষ কোনও ক্ষতি নেই। আর লাভ হলে, তা হবে স্বল্প বিনিয়োগেই (সংস্থা কেনার বিশাল খরচ সেখানে লাগছে না)। বিনিময়ে শাসক দলের ভাণ্ডারে ঢুকবে ইলেক্টোরাল বন্ড (মুনাফার অংশ হিসেবে), যার উৎস থাকবে গোপন। অঙ্কটা খুব পরিষ্কার।

প্রশ্ন হল, এমন একটা মডেলের দিকে কেন্দ্রীয় সরকার অগ্রসর হল কেন? প্রধানত এর কারণ দুটি।

এক, অর্থনীতিগতভাবে দেশ এক চরম সংকটের মুখে। কর্মহীন, অর্থহীন, সর্বতোভাবে বিধ্বস্ত মানুষ কোনওভাবে দিন গুজরান করছেন। কোভিড পরিস্থিতি এই অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। সেনসেক্স’এর সূচিমুখ যতই উর্ধ্বমুখি হোক না কেন, আমজনতার এক বৃহৎ অংশের সঙ্গে তার কোনও অর্থনৈতিক সংযোগ নেই। কারণ, সেনসেক্স’এর গতিপথ নির্ধারিত হয় প্রথম ১০-১৫টি সংস্থার কার্যপ্রণালীর ওপর, আর তার সবগুলিই প্রায় ভার্চুয়াল কোম্পানি যারা এই সময়ে অত্যধিক হারে মুনাফা সংগ্রহ করেছে। ব্যাপক সংখ্যক মানুষের এই দুরবস্থায় বেশ কিছু রাজ্য সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চেষ্টা করেছে নানারকম সাহায্য সাধারণজনের কাছে পৌঁছে দিতে। তার ওপর ভিত্তি করে কিছুটা কষ্ট হয়তো লাঘব করা গেছে। অসহনীয় পরিস্থিতির এই সুযোগে কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে, নিজেদের বশংবদ কর্পোরেট সংস্থার হাতে সরকারি সম্পদকে লিজে তুলে দিয়ে একদিকে সরকারের আয়ের পথকে বর্ধিত করা (যা অশ্বডিম্ব বই আর কিছু নয়), অন্যদিকে এইসব কর্পোরেট সংস্থাকে ফুলে-ফেঁপে উঠতে সাহায্য করা।

দুই, কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি যেহেতু দেশজুড়ে এখন অনেকটাই কোণঠাসা এবং আগামী উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের সম্ভাবনাও প্রবল, তাই, তাদের এখন দলের জন্য প্রভূত পরিমাণে অর্থের সংস্থান করতে হবে যা দিয়ে তারা তরী পার হওয়ার চেষ্টা করবে। আর সেই অর্থের বিপুল সংস্থান হতে পারে ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে যা আসবে বন্ধু কর্পোরেট সংস্থার কাছ থেকে (আম্বানি-আদানি ইত্যাদি)। যদি ‘ন্যাশনাল মনেটাইজেশন পাইপলাইন’এর মাধ্যমে স্বল্প খরচে কর্পোরেটরা সরকারি সম্পদের ঘাড়ে চেপে বিশাল মুনাফা করতে পারে, তাহলে তার একটা অংশ ইলেক্টোরাল বন্ড হিসেবে বিজেপি’র ঘরে ঢোকাটা প্রায় নিশ্চিত। মনে করে দেখুন, ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ২০১৬ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকার রাতারাতি বিমুদ্রাকরণ নীতির ঘোষণা করে বিরোধী দলের হাতে যে বিপুল পরিমাণে নগদ কালো টাকা সংগৃহীত ছিল নির্বাচনে লাগানোর জন্য, তাকে অকেজো করে দিয়ে বাজিমাত করেছিল। কারণ, এই নীতি ঘোষণার আগে বিজেপির কাছে গচ্ছিত নগদ কালো টাকাকে তারা নানাভাবে সরিয়ে ফেলে বা তাদের ১০০ ও ৫০ টাকার নোটে রূপান্তরিত করে নিজেদের অর্থের জোরকে অটুট রেখেছিল।

আবারও উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন আসছে। এই নির্বাচনে বিজেপি’কে যেনতেন প্রকারেণ জিততেই হবে। নচেৎ, ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে তাদের পরাজয় সুনিশ্চিত। পশ্চিমবঙ্গে জোর ধাক্কা খেয়ে তাদের মাজা ভেঙ্গে গেছে। তাই আগেভাগে তারা প্রস্তুতি সেরে রাখছে। লাগাতার উত্তাল কৃষক আন্দোলন ও মুজাফ্ফরনগরে ৫ সেপ্টেম্বর কৃষক মহাপঞ্চায়েত ইতিমধ্যে বিজেপি’র রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কাতেই এখন তারা নামতে চাইছে অর্থের এক সুবিশাল থলি নিয়ে। কারণ, তাদের বিভাজনের রাজনীতি আর কোনও কাজে আসছেনা। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাদের আইটি সেল মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাদের আশা, কর্পোরেট মুনাফার অংশই এখন তাদের বাঁচাতে পারে। আর সে লক্ষ্যেই তাদের যাবতীয় সাম্প্রতিক ক্রিয়াকাণ্ড।

- অনিন্দ্য ভট্টাচার্য 

The demand is the same

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মাথায় রাখতে হবে, ২০২০ সালের ১৬ মার্চ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় সহ এই দেশের অধিকাংশ শিক্ষাক্ষেত্র বন্ধ হয়ে আছে। এক অপরিকল্পিত লকডাউন যা দেশের মানুষের জন্য মহামারীর থেকেও ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে এনেছে তাতে আমরা দেখেছি সবথেকে দুর্যোগের মুখে পড়েছে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। পরিবারের সাথে হাজার হাজার মাইল পায়ে হেঁটে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ছবি আমাদের সকলের কাছে স্পষ্ট। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকার যার দায় এড়িয়ে গেছে প্রথম থেকেই। এই লকডাউনের বিপর্যয় থেকে বাদ পড়েনি দেশের পড়ুয়ারাও। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন শিক্ষাক্ষেত্রে এই অব্যবস্থা লকডাউন নয়, আদতে রাষ্ট্রীয় মদতে চলা ‘লকআউট’। লকডাউনের হাত ধরে নিউ নর্মালে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা, যা এদেশের শিক্ষাক্ষেত্র এবং শিক্ষার্থীদের কোমরে সজোরে বাড়ি মেরেছে।

সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ২০২১’র মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী ফর্মই ভরেনি। তাদের নাম নথিভুক্ত হয়েছে স্কুলছুটের খাতায়। গ্রামীণ ভারতের ৭০ শতাংশ মানুষ এখনও সরাসরি ইন্টারনেটের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ এলাকায় গত এক মাসে ৬০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী নিজেদের শিক্ষকদের মুখই দেখেনি। তাহলে এই অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা কার সুবিধার্থে প্রণীত তা বলাই বাহুল্য!

২০১৮ সালের ছবিটা যদি একটু মনে করা হয়, তাহলে দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলছুটের হার ৩.৩ শতাংশ ছিল। ঠিক একই সময়ে দেশের পরিসংখ্যান বলছে স্কুলছুটের হার ছিল ৪ শতাংশ। যেটা ২০২০ সালে বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৫ শতাংশ। এর দায় কার? উপর থেকে আমাদের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নয়া শিক্ষানীতি, যে শিক্ষানীতি পিছিয়ে পড়া বর্গের পড়ুয়াদের শিক্ষার মৌলিক অধিকারকে সুনিশ্চিত করেনা। বরঞ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করে বৈষম্যমূলক পরিবেশ। আর ফলে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সাফল্যের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় ৫০ লক্ষেরও বেশি দলিত পড়ুয়া।

সমাজের একাংশের মানুষ লকডাউনের ফলে বিগত দু’বছর ধরে কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন! গণপরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ রাখার কারণে শহরের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন। কেন্দ্র ও রাজ্যে বসে থাকা সরকার যারা মানুষের দু’বেলা খাদ্য সুরক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতে অক্ষম, তারাই আবার অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ করে রেখেছে দিনের পর দিন। নয়া শিক্ষানীতিকে হাতিয়ার বানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এখন কায়দা করে ৬০:৪০ ব্লেন্ডেড মোডের শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ভারতের মতো দেশে যেখানে অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যার কাছে এখনও ইন্টারনেটের সুবিধা নেই, সেখানে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা শিক্ষার্থীদের পক্ষে সুবিধাজনক, এই নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে চলতে হবে!

একটু চারপাশটা চোখ রাখলেই বোঝা যাবে আমাদের মধ্যে এমন অনেক বন্ধুরাই আছে যাদের কাছে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ফোন এবং পর্যাপ্ত ডেটাপ্যাক নেই। পরিবারের ৬ থেকে ৭ জন সদস্যের জন্য থাকার জায়গা হয়তো একটা ঘর। সেক্ষেত্রে পড়াশোনা করার জন্য যে সুষ্ঠ পরিবেশ প্রয়োজন তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক অংশের এরকম বহু ছাত্রছাত্রী। তাই এরকম এক অবস্থায় যখন তৃতীয় ঢেউ দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন যদি কোভিড বিধি মেনে ক্যাম্পাস খোলার কথা না বলা হয়, তাহলে বিগত দু’বছরের মতো আবারও বৈষম্যের দিকে ঝুঁকবে লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী।

তাই আইসা (এআইএসএ) মনে করে ছাত্রছাত্রীদের মৌলিক শিক্ষার অধিকারকে সুনিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে সমস্ত করোনা বিধি মেনে হোস্টেল খুলতে হবে। হোস্টেলের ইন্টারনেট (ওয়াই-ফাই) ও সপ্তাহে পাঁচ দিনের জন্য লাইব্রেরী খোলার ব্যবস্থা ছাত্রদের পড়াশুনার সুযোগকে সহজ ও সুনিশ্চিত করবে। পাশাপশি যত দ্রুত সম্ভব ক্যাম্পাস খোলার সমস্ত সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার দিকে উদ্যোগ নিতে কর্তৃপক্ষকে তৎপর হতে হবে।

ক্যাম্পাস খোলার দাবিতে গোটা দেশজুড়ে ছাত্রছাত্রীরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ব্যাপারে বিচ্ছিন্ন নয়, আইসা সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং মঞ্চ, ক্যাম্পাস খোলার দাবিতে তাদের স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছে বিগত দিনগুলিতে। চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কয়েকটি কথা আরও স্পষ্ট করে এই সময়ে বলা উচিত — যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এযাবৎকাল ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের রাস্তাকে প্রশস্ত করার বার্তা দিয়ে এসেছে সমাজের কাছে। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তির একত্রিত হওয়া ও আন্দোলনের রাস্তাকে আরও প্রশস্ত করাই এই সময়ের দাবি। এই ঐক্যের ভিত্তি হোক বহুমাত্রিকতা। এমন এক অবস্থায় যখন বিজেপির মতো ফ্যাসিস্ট সরকার দাঁত নখ বার করে থাবা বসিয়েছে এদেশের শ্রমিক, কৃষক ও শিক্ষার্থীদের উপর; তখন গণতন্ত্র রক্ষার রসদ হয়ে উঠুক বহুমাত্রিকতা। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে যাদবপুর আইসা শাখার আহবান — ক্যাম্পাস খোলার দাবিতে আন্দোলনে শামিল হয়ে আন্দোলনকে আরও জোরালো আকার দেওয়ার জন্য।

দাবি,
    • অবিলম্বে কোভিড বিধি মেনে হোস্টেল খুলতে হবে।
    • অবিলম্বে লাইব্রেরী সপ্তাহে ৫ দিন খুলতে হবে।
    • সমস্ত ল্যাব খুলতে হবে।
    • ক্যাম্পাস খুলতে হবে।

 

== সমাপ্ত ==

খণ্ড-28
সংখ্যা-33
16-09-2021