‘মোদী ভারতের’ কথা সর্বনাশা সমান

২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি রাষ্ট্রপতি প্রধান মার্কিন সংসদ নির্বাচনের অনুকরণে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেছিল, মোদীই ছিলেন দিশা-লক্ষ্য নির্দ্ধারণের মূখ্য নির্দেশক ও প্রচারক এবং ঘনিষ্ট মসিহা হয়ে উঠেছিলেন বিজেপি-র সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। আর, ‘নয়া ভারত’ নির্মাণের প্রতিশ্রুতির শ্লোগানে মাতন তুলতে তারা অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। যেহেতু বিরোধীপক্ষ ছিল বহুধাবিভক্ত, সেই সুযোগে মাত্র ৩১ শতাংশ ভোট পেলেও বিজেপি মোদী রাজ কায়েমের লক্ষ্য হাসিল করতে পেরেছিল।

২০১৯-র লোকসভা নির্বাচনের মুখেও গেরুয়া পদাতিক বাহিনীর সেনাপতিত্বে কোন বদল নেই, রয়েছেন সেই একই যুগল। তবে পরিস্থিতিতে ঘটে চলেছে অনবরত পরিবর্তন এবং মোদী জমানা তথা বিজেপির ফ্যাসিবাদ এবার নির্ণীত হচ্ছে সার্বিক প্রত্যাঘাত হানার অভিন্ন প্রতিপক্ষ লক্ষ্যবস্তু হিসাবে। বিজ্ঞাপনী প্রচারতরঙ্গে মোদী সরকারের আপন ঢাক বাজানোয় বিরাম নেই, কিন্তু সেই আওয়াজ শোনাচ্ছে বড়ই মৃদুমন্দ। বলাবাহুল্য, একরাশ মিথ্যাচার তো আছেই। কারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। যদিও ‘আবারও নিয়ে আসা দরকার মোদী সরকার’ বলে ভিডিও প্রচার নামিয়েছে বিজেপি-আর এস এস সম্প্রদায়, তবু তার বিশ্লেষণী সাফাই মোটেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না, মানুষের কানে সেভাবে ঢুকছে না। বরং নজীরবিহীন মাত্রায় ভন্ড প্রতারক উৎপীড়ক নিপীড়ক ধ্বংসাত্মক হিসেবেই ধিক্কৃত হয়ে চলছে গেরুয়াতন্ত্র।

এই প্রেক্ষাপটে ও একেবারে খাস পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদী ২০১৯-এর নববর্ষের প্রথম দিনে এক বাছাই করা চ্যানেলে দিলেন এক দীর্ঘ সাক্ষাতকার। মনুবাদী মোদীকুল ধর্ম-রীতিতে পয়লা জানুয়ারীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোন কিছু সম্পাদনের বিরোধী, কিন্তু এবার যেহেতু ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, তাই নরেন্দ্রজী ইংরাজী নববর্ষের পয়লা দিনে মুখ না খুলে থাকতে পারলেন না। কারণ দেশজুড়ে অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে আওয়াজ উঠেছে, মোদী হটাও, দেশ বাঁচাও! বিজেপি-আর এস এস হটাও, গণতন্ত্র-স্বাধীনতা বাঁচাও! যে আওয়াজ তাড়া করছে ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক শক্তিকে। ঠিক এই সময়েই অসংখ্য নারী শক্তির এক ঐতিহাসিক সুবিশাল মানববন্ধনের প্রাচীর নির্মাণ হল, শবরীমালা মন্দিরে অনুপ্রবেশের সমানাধিকারের জন্য লড়াইকে আপসহীনভাবে অব্যাহত রাখা উপলক্ষে, লক্ষ্যটা হল পিতৃতন্ত্রের বুকে শক্তিশেল হানো! অন্যদিকে, দেশজুড়ে চলছে শ্রমজীবী জনতার সাধারণ ধর্মঘটকে সফল করে তোলার চ্যালেঞ্জ।

মোদীর সাক্ষাতকারটি সারা হয়েছে সুচতুর পরিকল্পনাপ্রসূত অর্থে। অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তাই সেসব বিষয়ে মহাশয়কে মুখোমুখি হতে হয়নি। অথবা পরোক্ষ প্রত্যুত্তরে কাজ সেরেছেন। মোদী নিজেকে ‘অ-অভিজাতদের প্রতিনিধি’ দাবি করেছেন। এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কি হতে পারে! মোদী আমলে সবচেয়ে অবাধ ক্ষমতাবান হয়েছে কর্পোরেট শ্রেণী এবং উন্নতি হয়েছে সমাজের অভিজাত ও উচ্চবিত্তশালীদের। মোদী সরকারের তৈরী ভিডিও-তেও গরিমা-মহিমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশে বসবাসরত ভারতীয়রা নাকি খুবই উচ্ছ্বসিত! তাহলে কি প্রমাণ হয়! মোদী দুর্নীতি প্রসঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে বললেন, ‘অব সব সাফাই হো গয়ি হ্যায়’। সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। আর বাস্তবে ধরা পড়েছে, কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করার বুজরুকি দিয়ে নোটবন্দীকরণের তাক লাগানো খেল্ দেখানোর শেষে ৯৯.৩ শতাংশ নোটই ব্যাঙ্কের ঘরে ফিরে এসেছে, উপরন্তু দুবছরের ব্যবধানে মোদী সরকারের বদনাম জড়ানো ফাঁস হয়ে গেছে বিদেশী যুদ্ধবিমান কেনাজনিত দুর্নীতির সাথে, বিশেষত পুঁজির এক রাঘব- বোয়াল আম্বানী গোষ্ঠীকে নেপথ্যে বিরাট দাঁও মারার সুযোগ করে দেওয়ার অপরাধে। অথচ নোটবন্দীর পরিণামে চার লক্ষ ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পোদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়, যেগুলোর ইউনিটপিছু শ্রমজীবীর সংখ্যা পঞ্চাশের বেশী ছিল না। এক লপ্তে কাজ হারান দু’কোটির বেশী মানুষ। সি এম আই-এর হিসেবে কাজ চলে যাওয়ার পরিসংখ্যানটি আরও ভয়াবহ, কাজ খোয়ান প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষ। অল ইন্ডিয়া ম্যানুফ্যাকচারার্স অর্গানাইজেশনের সমীক্ষাও সি এম আই-এর উল্লেখ করা পরিসংখ্যানের সাথে মিলে গেছে। নোটবন্দীকরণের দু’বছর বাদেও কৃষি ও কৃষকের জীবন-মরণ সংকটের কোন সমাধান মেলেনি। ২০১৫- তে প্রায় আট হাজার চাষি আত্মহত্যা করেছিল। আর ২০১৬-র মাঝামাঝি থেকে গ্রামীণ চিত্রটা বদলে যেতে শুরু করে অন্য গতিপথে। উত্তাল হয়েছে কৃষক আন্দোলন, ঋণমুক্তির ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন-ব্যয়ের দেড়গুণ দামের দাবিতে। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকারগুলো লাঠি-গুলি-কৃষক হত্যা চালিয়ে মোকাবিলার দমননীতি নেয়। উল্টে কৃষক আন্দোলন ছড়িয়েছে সারা দেশে। মোদী সাড়ে চার বছরে বিদেশ সফরে গেছেন ৪৮ বার, সফর সেরেছেন ৫৫টি দেশে, তার জন্য বিমান খরচ হয়েছে ২ হাজার ২১ কোটি টাকা, বিনিময়ে কিছুই মেলেনি, কেবল অর্থশ্রাদ্ধ হয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি। বিদ্বেষ-বিভাজনপ্রসূত ঘৃণা ছড়িয়ে ও ক্ষেপিয়ে উন্মত্ত করে তোলা জনতাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকান্ড ঘটানোয় হাতিয়ার করেছে বিজেপি সহ সংঘ শক্তিগুলো, মদত জুগিয়েছে মোদী-যোগী জমানা। শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশী মুসলিম-আদিবাসী ও মহিলা সম্প্রদায়। নারীর সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার গণতান্ত্রিকতার ভিত্তিতে তিন তালাক প্রথার অবসানের দাবির ন্যায্যতার বিপরীতে তিন তালাক বিল চাপিয়ে দেওয়া হল এভাবে যে, অভিযুক্ত মুসলিম পুরুষেরা শাস্তি যোগ্য গণ্য হবে, অর্থাৎ জুড়ে দেওয়া হল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পুরুষদের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদের দৃষ্টিভঙ্গী। নারী সমাজের প্রতি পিতৃতান্ত্রিক অপরাধ বেড়েছে যেখানে ৮২ শতাংশ, শাস্তি হয়েছে মাত্র ১৮.৯ শতাংশ। মোদী জমানা এখন রাষ্ট্রব্যবস্থার চালিকাশক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করার মিঠা বুলিও শোনাচ্ছে, দাঁত-নখও বার করছে। সর্বোপরি নিয়েছে যে কোন বিরোধিতাকে নিকেশ করতে ‘দেশদ্রোহী’ ছাপ্পা লাগিয়ে দেওয়ার লাইন।

তাই ‘মোদী-ভারতের’ অবসানের দাবিতে লেগে থাকাই হোক জাগ্রত জনতার, শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সমস্ত মানুষের দৃঢ় অঙ্গীকার।

খণ্ড-26
সংখ্যা-1
03-01-2019