রাষ্ট্রীয় পরিবহণ শিল্প আজ ধ্বংসের পথে: কর্মীরা তাঁদের অধিকার, মর্যাদার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন

রাষ্ট্রীয় পরিবহণ শিল্প নিয়ে একদিন পশ্চিমবাংলার মানুষের গর্ব ছিল। উত্তরবঙ্গ দক্ষিণবঙ্গের শহর তথা রাজ্যের প্রত্যন্ত শহরতলির মানুষের ভরসা ছিল রাষ্ট্রীয় পরিবহণ। আজ আর সেই ভরসা নেই। একসময় এই শিল্পের কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা, আইনি অধিকার বা শিল্পের বিস্তারের যে বিষয়গুলি ছিল আজ তার কোনোটাই নেই। এই শিল্পকে রুগ্ন করা এবং রাজ্যে প্রাইভেট পরিবহণ মালিকদের রমরমা ব্যবসার সুবিধা করে দেওয়ার সূচনা হয়েছিল বামফ্রন্টের আমল থেকেই, স্থায়ী কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে অস্থায়ী, কন্ট্রাক্ট প্রথা চালু করা। কম পয়সায় স্থায়ী কর্মীদের মতো খাটিয়ে নেওয়া। আইন অনুযায়ী মজুরি, ওভারটাইম, গ্র্যাচুইটি, বোনাস, ছুটি না দেওয়ার শুরু সেই সময় থেকেই। রুট ফ্রাঞ্চাইজির মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকদের হাতে লাভজনক রুট তুলে দেওয়া। প্রাইভেট বাসের মালিকদের লাভ করানোর জন্য লাভজনক রুট থেকে রাষ্ট্রীয় পরিবহনের বাস বন্ধ করে দেওয়া, ইত্যাদি।

কফিনের শেষ পেরেকটা পুঁতে দিল মা-মাটি-মানুষের সরকার। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু হল ঠিকা প্রথার মাধ্যমে লাগামহীন শ্রমিক নিয়োগ। সরকারী সংস্থায় চাকরি দেওয়ার নামে গ্রামগঞ্জ থেকে মুলত পূর্বমেদিনীপুর থেকে গরিব কৃষক ঘরের বেকার যুবকদের (শোনা যায় মোটা টাকার বিনিময়ে) ঠিকাদারের (ফ্রাঞ্চাইজি) অধিনে নিয়োগ করা শুরু হল। শোনা যায় এইসব ঠিকাদাররা সরকারি আমলা এবং শাসক দলের ঘনিষ্ট। বর্তমানে এই সংস্থায় স্থায়ী শ্রমিকের চাইতে অস্থায়ী, কন্ট্রাক্ট ঠিকা শ্রমিকেরা সংখ্যায় বেশি। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বহু মূল্যবান জমি বেচে দেওয়া হল জলের দরে। প্রায় সাড়ে চারশো কাঠা জমি বেচে দেওয়া হল মাত্র আড়াই হাজার কোটি টাকায়। জমি বেচার সময় বলা হয়েছিল পরিবহন শিল্প রুগ্নতায় ভুগছে তাই জমি বেচার টাকা শিল্পের পুনর্গঠনের কাজে ব্যায় করা হবে। আমরা দেখলাম এই টাকা শিল্পের পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হল না। এই টাকা কোন খাতে ব্যায় হল তাও জানা গেল না। ধীরে ধীরে পাঁচটি সংস্থাকে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি সংস্থাকে (সিটিসি, সিএসটিসি, ডবলুবিএসটিসি বা ভুতল) একত্র করে ডবলুবিটিসি (ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন) নামে নিগম বানানো হয়েছে। স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ। অস্থায়ী ঠিকা শ্রমিকদের চাকরি তথা সামাজিক নিরাপত্তা বলে কিছুই নেই। সীমাহীন শোষণের সাথে প্রয়োজন মতো নিয়োগ, প্রয়োজন মত ছাঁটাই চলছে। পরিবেশ দূষণের অজুহাতে টাটা কম্পানির সাথে গোপন চুক্তিতে প্রায় তিন শতাধিক ব্যাটারি চালিত বাস আনা হয়েছে। জানা যাচ্ছে আগামীদিনে এই বাসগুলি চালানোর জন্য টাটা কোম্পানির অধিনে ঠিকাদার মারফৎ শ্রমিকরা কাজ করবেন, সংস্থা এরপর থেকে আর কোনও শ্রমিকের দায়িত্ব নেবে না। এক কথায় এই শিল্পকে ধ্বংস করার এক বিশাল ষড়যন্ত্র চলছে।

২০০১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের এবং সিআইটিইউ নেতৃত্বের ভ্রান্ত নীতির কারণে আজ প্রায় সহস্রাধিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা পেনসনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অবসরপ্রাপ্ত বহু শ্রমিক ‘শ্রমিক সমবায়ে’ তাঁদের নিজেদের গচ্ছিত টাকা ফেরত পাননি। বহু শ্রমিক বামফ্রন্ট আমলে ১০/১৫ বছর লাগাতার অস্থায়ী শ্রমিক হিসাবে স্থায়ী শ্রমিকদের ন্যায় কাজ করেছিলেন, পরবর্তীতে এআইসিসিটিইউ’র নেতৃত্বে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে ১০২৪ জন স্থায়ী শ্রমিক হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩/৪ বছর পর যারা অবসর নিয়েছেন তাঁরা কেউ গ্র্যাচুইটির টাকা পাননি। ২০১৯ সালে এআইসিসিটিইউ’র নেতৃত্বে কন্ট্রাক্ট, ঠিকা শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে ২ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি এবং ১,৬০০ টাকা বোনাস আদায় করা সম্ভব হয়েছিল।

২০২০-২১ করোনাকাল এবং ম্যানেজমেন্ট ও শাসক দলের সন্ত্রাসের কারণে ইউনিয়ন কার্যকলাপ প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শাসক দল তৃণমূল ইউনিয়নের সদস্যরা বিভিন্ন দাবিতে সিটিসি (ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি) সংস্থায় কর্মবিরতি শুরু করেছিলেন। দু’দিনের মাথায় তৃণমূলের গুন্ডা দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে আন্দোলন ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং ১৪ জনকে ছাঁটাই করা হয়। এই ছাঁটাই শ্রমিকদের নিয়ে এআইসিসিটিইউ’র পক্ষ থেকে শ্রম দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করা হয়। ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয় শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু আজও ম্যানেজমেন্ট এবং শাসক দলের মর্যাদা রক্ষার তাগিদে ১৪ জনকে কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। যা নিয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চালু আছে। গত দুর্গা পুজোর আগে এসবিএসটিসি’র (সাউথ বেঙ্গল ষ্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন) তৃণমূল ইউনিয়নের সদস্যরা তৃণমূলের ঝাণ্ডা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ছবি গলায় ঝুলিয়ে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। এবারও সেই একই ঘটনার সাক্ষী হলেন পশ্চিমবাংলার শ্রমিকরা। হলদিয়া, দুর্গাপুর, দিঘা, মেদিনীপুর ডিপোর আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর তৃণমূলের গুণ্ডারা হামলা চালালো আর রাজ্য সরকারের পুলিস বেধড়ক লাঠি চার্জ করে দিঘা ডিপোর চারজন তৃণমূল ইউনিয়নের নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলা (হত্যার উদ্দ্যেশে পুলিশকে আক্রমণ) দিয়ে ১৪ দিনের জন্য জেলে পাঠিয়ে দিল। জামিন নিয়ে জেলের বাইরে আসার পর আজও সেই মামলা চলছে। চারজনকেই অন্য ডিপোয় বদলি করা হয়েছে। কর্মীরা সন্ত্রস্ত।

ইতিমধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা যাঁরা এতদিন সিপিএম এবং তৃণমূলের ইউনিয়নের সাথে ছিলেন তাঁরা তাঁদের পেনশন এবং শ্রমিক সমবায়ের টাকা ফেরতের দাবিতে সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। বিগত দিনে এআইসিসিটিইউ’র নেতৃত্বে শ্রমিকদের আন্দোলনের ইতিহাস তাঁরা জানেন। তাই তাঁরা যোগাযোগ করার পর এআইসিসিটিইউ’র নেতৃত্বে ‘ডবলুবিটিসি নন পেনশনার্স এন্ড পেনশনার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ ব্যানারের তলায় প্রায় তিন শতাধিক কর্মীকে সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছে। এই এসোসিয়েশন এবং সংস্থার এআইসিসিটিইউ’র রেজিস্টার্ড শ্রমিক ইউনিয়ন যৌথভাবে কর্মসূচি চালাচ্ছে। পরিবহণ মন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন কর্মসূচি এবং সিটিসি’র নোনাপুকুর ওয়ার্কশপ গেটে জঙ্গি বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দাবিগুলিকে সামনে আনা গেছে। সংস্থার কর্তৃপক্ষ, সরকারের কাছে বিষয়টিকে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। পরিবহণ শিল্পের কর্মীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করা গেছে। এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন ‘বেঙ্গল চটকল মজদুর ফোরাম’, ‘অল ইন্ডিয়াল’ইয়ার্স এসোসিয়েশন ফর জাস্টিস’, ‘পিইউসিএল’, ‘পশ্চিমবঙ্গ গণসংস্কৃতি পরিষদ’, পশ্চিমবঙ্গ সংগ্রামী রন্ধন কর্মী ইউনিয়ন ইত্যাদি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

কর্মরত স্থায়ী, কন্ট্রাক্ট ও ঠিকা শ্রমিকদের সাথে নতুন করে যোগাযোগ গড়ে উঠছে। যে সকল দাবিগুলিকে সামনে আনা হচ্ছে তা নিম্নরূপ।

১) অবসরপ্রাপ্ত সকল কর্মীকে পেনশন দিতে হবে।
২) অবসরপ্রাপ্ত সকল শ্রমিকের ‘শ্রমিক সমবায়ে’ নিজেদের গচ্ছিত টাকা ফেরত দিতে হবে।
৩) ‘শ্রমিক সমবায়’ থেকে প্রতি বছর ডিভিডেন্ট দিতে হবে। যা বিগত ৩/৪ বছর যাবত বন্ধ রয়েছে।
৪) শ্রমিকদের বকেয়া ডিএ দিতে হবে।
৫) চুক্তিপ্রথা বাতিল করে ওড়িশা সরকারের ন্যায় সকল কন্ট্রাক্ট, ঠিকা শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ করতে হবে।
৬) সংস্থার জমি বিক্রির টাকার হিসাব দিতে হবে। আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করতে হবে।
৭) ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী ১৪ জন ছাঁটাই শ্রমিককে কাজে পুনর্বহাল করতে হবে।
৮) করোনাকালে যে শ্রমিকরা কাজ করেছিলেন তাঁদের ছাঁটাই প্রত্যাহার করতে হবে।
৯) রাষ্ট্রীয় পরিবহণ শিল্পকে বেসরকারিকরণ করা চলবে না।
১০) শ্রমিকদের উপর কাজের বোঝা চাপানো চলবে না।
১১) আইন অনুযায়ী ওভারটাইমের পয়সা দিতে হবে। শ্রমিকদের সুচিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে।
১২) বেআইনি বদলি বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকের বাড়ির কাছের ডিপোয় কাজ দিতে হবে।
১৩) দুর্নীতিগ্রস্ত ম্যানেজমেন্টের শাস্তি চাই।
১৪) কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমকোড লাগু করা চলবে না।

এই সমস্ত দাবিকে সামনে রেখে রাজ্যের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার কর্মীদের মধ্যে প্রচারকে ব্যাপক মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছে। আগামীদিনে রাজ্য ভিত্তিক প্রচারের মধ্য দিয়ে সকল কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বকে নিয়ে কনভেনশন করা, পরিবহণ দপ্তর, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর নবান্ন অভিযান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিধিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ শ্রমিকদের দাবিগুলি আজ যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেমন এই রাজ্যে অবসরের পর পেনসন না পাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা (পরিবহণ শিল্পের বাইরেও) বহু সহস্রাধিক। পেনশনের সুবিধা না পাওয়ায় অনেক কর্মী অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, এমনকি সুচিকিৎসা ও পথ্যের অভাবে অনেকে মারাও গেছেন।

তাই আসুন, পরিবহণ শিল্পকে বাঁচাতে এবং শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় পশ্চিমবাংলার মাটিতে আগামী নতুন বছরে এক নয়া ইতিহাসের সূচনা করি।।

- দিবাকর ভট্টাচার্য

খণ্ড-29
সংখ্যা-50