অর্থনীতির হাল এখন - ২
economy-now-2

আমাদের দেশে এখন কাজের জগতে নানা গোলমাল ঘটে চলেছে। অনেকেই এই সমস্যা বুঝতে পারছে। অনেকে বুঝতে পারছে না।

এই লেখাটা সেই বিষয়টাকে না-জানা, না-বোঝাকে যতটা পারা যায় জানানো, বোঝানোর চেষ্টায়।

খুব যে একটা গুছিয়ে খোলসা করে এক, দুই করে বলে যেতে পারবো তা নয়। একটার সাথে আরেকটা জড়িয়ে আছে, জট পাকিয়ে আছে। দেখা যাক জটটা কতটা খোলা যায়।

প্রথমে একটা জরুরি কথা বলে নেওয়া।

আমরা এতদিন ‘কাজ’, ‘কাজ পাওয়া’, ‘কাজ করা’, ‘কাজের জন্য রোজগার’, ‘কাজের অধিকার’, ‘কাজের জায়গায় অধিকার’ — এসব বলতে যা দেখেছি, যা বুঝে এসেছি তা বদলে যাচ্ছে, বদলে দেওয়া হচ্ছে।

১) প্রথমে বলা যাক ‘কাজ না-পাওয়ার’ কথা। ‘কাজ না-পাওয়া’র দলে এখন সবচেয়ে বেশি রয়েছে যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর।

২) এদের মাঝে আবার ছেলেদের থেকে মেয়েদের হাল বেশি খারাপ।

আমাদের দেশে জনসংখ্যায় ১৫ থেকে ২৯ বয়সীদের সংখ্যা সব থেকে বেশি। তাদের কাজ না-পাওয়ার মানে — দেশের উন্নতি ঠিকঠাক না হওয়া।

৩) কাজ না-পাওয়ার দলে যারা লেখাপড়া করেনি তাদের থেকে যারা লেখাপড়া করেছে তাদের সংখ্যা বেশি। এমন একটা অবস্থা তৈরি হচ্ছে — যারা লেখাপড়া করছে তারা কাজ পাচ্ছে কম।

৪) এই বিষয়টাকে আমরা আরেকভাবে দেখতে বা বুঝতে চাইছি — যারা লেখাপড়া করে তারা খানিকটা হলেও ‘কাজের অধিকার’ বিষয়টা জানে, বোঝে। আর এক পা এগোনো যাক। যারা লেখাপড়া করে, বোঝে তারা খানিকটা হলেও জানে, জানতে পারে — ‘কাজের অধিকার’। কাজের অধিকার থেকে ‘কাজের দাবি’। অন্য দিক থেকে ভাবি। যারা ‘অধিকার’ নিয়ে ভাবতে পারে, দাবি করতে পারে, তারাই বেকার, তাদেরকেই বেকার করে রাখা।

৫) তার মানে আবার এটা নয় যে, যারা লেখাপড়া করেনি বা অল্প লেখাপড়া করেছে, তারা সবাই পুরোপুরি (ধরা যাক ৮ ঘণ্টার) কাজ পাচ্ছে, তাদের সুবিধা মতন কাজ পাচ্ছে। তা নয়।

৬) অথচ সরকারের বানানো কাজের হিসেবের মধ্যে তাদের ঢুকিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে — এই তো এদের কাজ আছে। 

কাজের সরকারি হিসেবে কারচুপি।

the-economy-now

৭) এই বিষয়টা — এই যে কাজ না-পাওয়া, ঠিকঠাক কাজ না-পাওয়া — এই বিষয়টাকে একটা বড়ো কথায়, বড়ো জায়গায় নিয়ে গিয়ে এই রকম ভাবে বলা যেতে পারে — ঠিকঠাক দেশ গড়তে গেলে দেশের মানুষকে ঠিকঠাক ভাবে কাজে লাগাতে হয়। আর যেহেতু আমাদের দেশের মানুষকে ঠিকঠাক কাজ দেওয়া হচ্ছে না, অতএব ঠিকঠাক ‘দেশ গড়া’ও হচ্ছে না।

৮) কাজের সাথে দেশগড়ার যোগাযোগের কথাটাকে আরেকভাবে ভাবা যায়। কম লেখাপড়া করে বা না-লেখাপড়া করে যদি কাজ বেশি পাওয়া যায় তাহলে দেশের মানুষ আর লেখাপড়া করতে যাবে না, যাচ্ছে না। লেখাপড়া করা দরকার মনে করবে না। দেশে লেখাপড়া না-করা লোকের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়বে।

৯) লেখাপড়ার সাথেই তো জড়িয়ে থাকে ভাবনা, চেতনা। যার একটা ‘অধিকার চেতনা’। লেখাপড়া না করলে অধিকার নিয়ে ভাবনা কমবে। কাজ পাবার অধিকারের, লেখাপড়া করার, লেখাপড়া করার সুযোগ পাবার ‘অধিকার’এর দাবি কমতে থাকবে।

১০) এর ফলে লাভ হচ্ছে যারা ক্ষমতায় আছে, ক্ষমতায় যেতে চায়, ক্ষমতায় থাকতে চায় তাদের।

১১) সব মিলিয়ে কী দেখা যাচ্ছে?

‘কাজের অধিকার’ — এ যা লেখা আছে — সেই অধিকার পাওয়া দেশবাসীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাদের আয় কমে যাচ্ছে। আমাদের আগের লেখায় বলা হয়েছিল — তলায় রেখে দেওয়া মানুষের আয় যত কমবে, উপরে থেকে যাওয়া, থেকে যেতে চাওয়া লোকেদের আয় ততো বাড়বে। আমাদের দেশে তাই ঘটছে, ঘটে চলেছে।

১২) আমরা বলতে চাইছি — পড়াশোনা করলে  — কাজ পাওয়ার দাবি বিষয়ে সচেতনা বাড়ে — সচেতনা বাড়লে — ঠিকঠাক রাজনীতিক ভাবনা বাড়ে —ঠিকঠাক রাজনীতিক ভাবনা বাড়লে — ঠিকঠাক প্রতিবাদ বাড়ে — এই সম্পর্কটাকে ভেঙ্গে দেওয়া চলছে।

১৩) আগে শ্রমিকদের হয়তো স্কুলের শিক্ষা ছিল না, কিন্তু সচেতনা ছিল। নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার সচেতনা ছিল — এটা এসেছিল শ্রমিক রাজনীতি থেকে। এখন তো সেই রাজনীতিটাও নেই। ফলে এখন অধিকার চেতনা থাকা শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, গেছে।

আসলে তো শ্রমিকদের কাজের স্থায়ী জায়গা, স্থায়ী কাজ, স্থায়ী মজুরি, স্থায়ী অধিকার — এসবই তো ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে, পাল্টে দেওয়া হয়েছে।

১৪) শ্রমিকদের জানা বোঝার আর একটা জায়গা — ঠিকঠাক ট্রেড ইউনিয়ন। সেটাই তো আগের মতো নেই।

১৫) আরেকভাবে শ্রমিকদের কাজের জায়গাটায় বদল আনা হয়েছে। আগে শ্রমিকদের দক্ষতা পাওয়া, দক্ষতা বাড়ানোর জায়গা ছিল সরকারি পলিটেকনিক স্কুলগুলো। এখন সে সব নেই বললেই চলে।

১৬) ফলে দক্ষতা ছাড়া শ্রমিক, জোরদার ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়া শ্রমিক, রাজনীতিক সচেতনা ছাড়া শ্রমিক তার ঠিকঠাক পাওনা দাবি করতে পারে না — তাতে তার আয় কমছে।

১৭) আমাদের দেশে, সরকারি হিসেবে ‘কাজ পাওয়া’, ‘কাজ করা’র মাপ হল — ‘কিছু না কিছু’ করছে। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন, ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন ‘আইএলও’র লিখিত নির্দেশে ‘কাজ’ বলতে বোঝায় — এমন কাজ বা শ্রম, যা কিছু উৎপাদন করে, যে কাজ থেকে ঠিকঠাক বেঁচে থাকার মতো মজুরি পাওয়া যায়, কাজের জায়গায় নানা নিশ্চয়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা পাওয়া যায়।

যদি এই মাপ দিয়ে মাপা যায় — তাহলে ভারতে ‘কাজ’ পাওয়া বা ‘কাজ’ করার হিসেব অনেক নিচে নেমে যাবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ‘আইএলও’র মতে কাজের জায়গায় মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক অধিকারের মান্যতাও দরকার।

১৮) আমাদের দেশে ‘কাজ’ কথাটার ঠিকঠাক ‘মানে’ই বানানো হয়নি। এখানে ‘কাজ’ বলতে বোঝায় — ‘কিছু না কিছু একটা করছে’ — যেদিন সরকার থেকে তথ্য জোগাড় করতে যাওয়া হয়েছিল, সেদিন কিছু না কিছু একটা কাজ করছিল — ফলে কাজ পাওয়া, কাজ করার হিসেবেই গণ্ডগোল।

১৯) এর সাথে যোগ করা যাক ছোটদের কাজ করার হিসেব। সে হিসেব তো সরকার দেয় না, ছোটোদের কাজ করাটা বেআইনি বলে।

২০) আর এক দিক দিয়ে বিষয়টাকে ভাবা যাক, দেখা যাক কম — কাজ পাওয়া + যতটুকু কাজ পাওয়া তাতে কম মজুরি পাওয়া — মানে কম খাওয়া (এর সাথে যোগ করা যাক খাবারের দাম বাড়ছে) — কাজ করা ও কম খাওয়া মানে — শরীর খারাপ হওয়া শরীর খারাপ হলে — ওষুধ খেতে হবে — ওষুধের দাম বেড়েছে — ওষুধ খেতে গেলে বেশি খরচ হবে — খরচ বেড়ে যাবে — আয় কমে যাবে — আয় কমে গেলে — পুষ্টিকর খাবার খাওয়া কমে যাবে — আরও বেশি অসুখ হবে — আরও কাজ করা কমে যাবে — আয় আরও কমে যাবে — এটা যে কোথায় গিয়ে শেষ হবে কে জানে।

২১) কাজের জায়গা বদলাচ্ছে + কাজের ধরন বদলাচ্ছে — নিয়মিত কাজের বদলে অল্প দিনের চুক্তির কাজ + নিজের কাজ নিজেই খুঁজে নিয়ে করা  — এই সব কাজে সরকারের কোনো দায় নেই।

যত এ ধরনের কাজের পরিসর বাড়বে, যা কিনা বাড়ছে  সরকারের দায় তত কমবে।  এই ধরনের কাজে থাকা শ্রমিকদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই + কোনো সুযোগ সুবিধা পাওয়া নেই + কোনো অধিকার নেই।

২২) তাহলে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে এই রকম,
ক) সরকারি সুরক্ষা ব্যবস্থায় কতজন কাজ করে?
খ) কাদের স্থায়ী চাকরির লিখিত চুক্তি আছে?
গ) কতজন নিয়মিত, আগে থেকে ঠিক করা, মজুরি পাচ্ছে?
ঘ) এই ধরনের শ্রমিকদের কি কি অধিকার আছে?

২৩) লেখাটার আপাতত শেষে এসে কয়েকটি কথা অন্য দিক দিয়ে বোঝা দরকার। মজদুরদের সাথে মালিকের কোনো লিখিত চুক্তি নেই — ফলে মালিকের সরকারি আইন মানার দরকার নেই  — ফলে মজদুরদের ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হচ্ছে — একজন মজদুরের ৮ ঘণ্টার বেশি ১ ঘণ্টা কাজ করা মানে আর একজন মজদুরের ১ ঘণ্টা কাজের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হল — মজদুরদের বিপরীতে মজদুরদের, কর্মীদের বিপরীতে কর্মীদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল — শ্রমিকদের ঐক্যের বদলে শ্রমিকদের মধ্যে বিভেদ — লাভ মালিকদের — লাভ পুঁজির — লাভ পুঁজির পাশে থাকা সরকারের।

- বিশ্বজিৎ ধর এবং শুভেন্দু দাশগুপ্ত, নাগরিক মঞ্চ

খণ্ড-31
সংখ্যা-18