তালিবানি উত্থান ও নারী স্বাধীনতার উদ্বেগ
Taliban and women

আফগানিস্তানে তালিবানদের আরেকবার ক্ষমতা দখল বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উদ্বেগের কেন্দ্রে আছে নারী স্বাধীনতার প্রশ্ন। ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সেনা অভিযান চালানোর অন্যতম যুক্তি হিসেবে “নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়াই”-কে সামনে তুলে ধরেছিল। সেই সময়কার আফগান নারীকে তুলে ধরা হয়েছিল অধিকারহীনতার প্রতীক হিসেবে। নিদারুণ বাস্তবতা থেকে আফগান মহিলাদের মুক্ত করার লক্ষ্যে আফগানিস্তানে মার্কিন মিলিটারি আগ্রাসন চালানো এক জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা হয়েছিল। দুই দশক পর, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, তালিবানদের সাথে যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে নারীর অধিকার সুরক্ষিত রাখার প্রশ্ন একটি বারের জন্যও উচ্চারিত হয়নি।

বিগত চার দশক ধরে যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের জনজীবনে দুর্দশার গভীরতম ক্ষত মেয়েদেরই ধারণ করতে হয়েছে। দেশ পুনর্গঠন ও দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাই মেয়েরাই ছিলেন সবচেয়ে আগ্রহী ও উদ্যমী। প্রথম পর্বের তালিবানি শাসন পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই, ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে, বিভিন্ন পৃষ্ঠভূমি থেকে আসা আফগান নারী কর্মীরা ব্রাসেলস শহরে সম্মিলিত হয়ে একটি দাবিপত্র সংকলিত করেছিলেন। ৬২টি দাবি সম্বলিত দাবিপত্রটি জাতিসংঘ, ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে প্রদান করা হয়। এই ‘ব্রাসেলস শোহরত’ চারটি বুনিয়াদি বিষয়কে কেন্দ্র করে সূত্রবদ্ধ হয় : স্বাস্থ্য; শিক্ষা, গণমাধ্যম ও কৃষ্টি; মানবাধিকার ও সংবিধান; এবং শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নারী। এই বুনিয়াদি বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই আফগানিস্তান পুনর্গঠনের লক্ষ্যে লড়েছেন আফগান মহিলারা। তালিবান শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসানের পরও আফগানিস্তানের সমাজজুড়ে তালিবানি প্রভাব নেহাত কম ছিল না এবং মার্কিন অভিভাবকত্বে চলা সরকারও পদে পদে মহিলাদের অগ্রগতি ও অধিকার খর্ব করতে সক্রিয় ছিল। এইসব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়েই প্রবল উদ্যমে শিক্ষায়, বহুবিধ কর্মক্ষেত্রে ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনে সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন আফগান মহিলারা। কিন্তু শান্তি চুক্তির প্রক্রিয়া যখন শুরু হল তখন তাঁদেরই সম্পূর্ণ বাদ রাখা হল। তালিবানদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি বৈঠকে কোনও আফগান মহিলার ঠাঁই হয়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সাথে তালিবানদের ২০টির বেশি শান্তি বৈঠক হয়েছে, কিন্তু তার একটিতেও কোনও মহিলা প্রতিনিধি ছিলেন না। আফগান সরকারের সাথে তালিবানদের যে বৈঠকগুলি হয় তার দুটি ক্ষেত্রে নামমাত্র মহিলা প্রতিনিধি ছিল। বস্তুত, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলিতে যে শান্তি প্রক্রিয়া চলে তার সর্বত্রই এই চিত্র দেখা যায়। একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায় ১৯৯২ থেকে ২০১১ পর্যন্ত যত শান্তিচুক্তি হয়েছে তার স্বাক্ষরকারীদের মাত্র চার শতাংশ মহিলা এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০০ শান্তিচুক্তির মাত্র ১৮টিতে নারীর অধিকার সম্পর্কে কিছু না কিছু উল্লেখ আছে।

জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর একটি রেজলিউশন পাস করেছিলো। ‘রেজলিউশন ১৩২৫’ নামে পরিচিত এই ঘোষণায় সমস্ত পক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শান্তি প্রক্রিয়ায় মেয়েদের সমান অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার এবং সমস্ত শান্তি চুক্তিতে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নকে বিশেষ গুরুত্বে স্থাপন করার। সংঘর্ষ নিরসনে, শান্তি আলোচনায়, শান্তি স্থাপনে, শান্তি রক্ষায়, মানব সংবেদি কার্যক্রমে, সংঘাত পরবর্তী পুনর্গঠনে – সর্বত্র শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহিলাদের পূর্ণ সংযোগ ও সমান অংশগ্রহণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরে এই রেজলিউশন-১৩২৫। জাতিসঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত রাষ্ট্রকেই এই নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ অবমাননা করা হয়। বাদ রাখা হয় মেয়েদের।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ অংশিদারিত্ব থেকে বাদ রাখার এই মুদ্রারই আরেক পিঠ হল তালিবানি ফতোয়া যা জীবনযাপনের সমস্ত প্রকাশ্য ধারা — শিক্ষা শ্রম কৃস্টি রাজনীতি — সমস্ত কিছু থেকেই বাদ দিয়ে দেয় মেয়েদের। ভারতে ক্ষমতাসীন আরএসএস-বিজেপিও নারীর প্রকাশ্য স্বাধীন জীবন নাকচ করে গৃহাভ্যন্তরে নারীকে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। তালিবান বা আরএসএসের এই চরম অবস্থানকে নিরন্তর ইন্ধন যোগায় মেয়েদের পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণের গুরুত্ব ক্রমাগত খর্ব করে চলার স্বাভাবিকতা। অপেক্ষাকৃত অগ্রণী বৃত্তেও সাধারণত এই স্বাভাবিকতা বিরাজ করে।

খণ্ড-28
সংখ্যা-31