যোগীর রাজত্বে দুষ্কৃতীদের হাতে আক্রান্ত দলিত নাবালিকা ও তার পরিবার
miscreants-during-yogi's-reign

উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের এনকাউন্টার রাজ যে দুর্বৃত্তদের অপরাধ সংঘটনের প্রবৃত্তিতে তেমন লাগাম পরাতে পারেনি, একের পর এক ঘটনায় তা প্রকট হচ্ছে। পুলিশি হেফাজতে “জয় শ্রীরাম” বুলি আশ্রয় করা দুর্বৃত্তদের হাতে আতিক আহমেদ ও তার ভাই আশরফের হত্যা যখন উত্তরপ্রদেশে আইনের শাসনের শোচনীয় পরিস্থিতিকে সর্বত্রই এক চর্চার বিষয় করে তুলল, ঠিক তখনই উন্নাও থেকে এল দুষ্কৃতীদের সংঘটিত হাড় হিম করা অপরাধের এক সংবাদ। উন্নাও হলো সেই জেলা যেখানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে ২৩ বছরের এক ধর্ষিতাকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মেরেছিল পাঁচ অভিযুক্ত। উন্নাও সেই জেলা যেখানে বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার এক নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে এবং ধর্ষিতার বাবা ও দুই আত্মীয়কে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। তারপর ঐ ধর্ষিতা কোনো বিচার না পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বাড়ির সামনে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। উন্নাওয়ে এবারের ঘটনাটা ঘটে ১৭ এপ্রিল। সেখানে দলিত নাবালিকার কুঁড়েঘরে আগুন লাগানো হয় এবং তার সাত মাসের শিশু ও দু-বছরের বোনকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দুষ্কৃতীরা। দলিত নাবালিকার মা পুলিশকে জানিয়েছেন, “ওরা মামলাটা তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের চাপ দিচ্ছিল। ওরা আমাদের মারধর করে আর শিশু দুটোকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আমার আর আমার মেয়ের সন্তান আগুনে পুড়ে যায়।” দুটি শিশুই যথেষ্ট মাত্রায় পুড়ে যাওয়ায় এবং অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় তাদের উন্নাও থেকে পাঠানো হয় কানপুরের হাসপাতালে। 

একটু পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে ঘটনার শিকড় রয়েছে ২০২২ সালে দলিত নাবালিকার ধর্ষণের মধ্যে। সে বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ১১ বছরের দলিত নাবালিকাকে গণধর্ষণ করে দুই দুষ্কৃতী। ধর্ষণের ফলে সে বছরের সেপ্টেম্বরে নাবালিকা এক শিশুপুত্রের জন্ম দেয়। ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তারা জামিনও পায়। জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরই তারা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য দলিত পরিবারের ওপর চাপ দিতে থাকে। এবং তার সাথে যুক্ত হয় হুমকি, হামলাবাজি এবং পরিবারের মধ্যেই বিভেদ সৃষ্টির কৌশল। অর্থের বিনিময়ে বা অন্য যে কোনোভাবেই হোক, দুষ্কৃতীরা নাবালিকার দাদু ও কাকাকে হাত করে। যেদিন নাবালিকাদের ঘরে আগুন লাগানো হয় তার চার দিন আগে ১৩ এপ্রিল নাবালিকার দাদু ও কাকা কুড়ুল দিয়ে তার বাবাকে আক্রমণ করে এবং বাবা আহত অবস্থায় এখনও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁর ওপর আক্রমণের পর তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানালেও যোগীর পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

নাবালিকার পরিবারের ওপর আক্রমণের একটা উদ্দেশ্য যদি হয় চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা, অন্য উদ্দেশ্যটা তবে ছিল ধর্ষণের পরিণামে নাবালিকার গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুপুত্রকে নিকেশ করা। ধর্ষণের কোনো চিহ্নকেই জিইয়ে রাখতে রাজি ছিল না দুই ধর্ষক ও তাদের দোসররা। কতটা পৈশাচিক হলে, মনুষ্যত্ববোধ কতটা নিঃশেষিত হলে সাতমাস ও দু-মাসের শিশুকেও আগুনে ছুঁড়ে ফেলা যায়! যোগী জমানা এই ধরনের দুষ্কৃতীদের উত্থানের পথ প্রশস্ত করছে, তাদের স্পর্ধাও জোগাচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশে যোগী জমানায় অপরাধ গৈরিক মাত্রা অর্জন করেছে, ‘জয় শ্রীরাম’ আওয়াজে অপরাধ মান্যতা পাচ্ছে। গৈরিক মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য জাহির করে দুর্বৃত্ত বাহিনী তাদের আধিপত্য চালায় – ধর্ষণ, লুট, তোলাবাজিতে মেতে ওঠে। লাভ জিহাদ ও গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের প্রতি চলে অনাচারের ধারাবাহিক প্রবাহ। ভাষ্যকাররা বলে থাকেন, অপরাধ দমনকে রাজনৈতিক কৌশল করে তোলা হলে পছন্দমত যে কাউকেই অপরাধী বানিয়ে দেওয়া যায়। মুসলিমদের সাথে দলিতরাও তাই গৈরিক মতাদর্শের জমানায় আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে পড়ে। উন্নাওয়ে দলিত নাবালিকার ধর্ষণ ও তার শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হাথরসে দলিত যুবতীর নিষ্ঠুরতম নিপীড়নের ঘটনাকে মনে না পরিয়ে পারে না — যে যুবতীকে ধর্ষণের পর তার জিভ কেটে নেওয়া হয়েছিল, নিপীড়ন যার জীবনকে কেড়ে নিয়েছিল, যার মৃত্যুর পর পরিবারের অনুমতি ছাড়াই পুলিশ তাকে ডিজেল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর ঠাকুর সম্প্রদায়ের অভিযুক্তদের বাঁচানোর অভিযোগ উঠেছিল পুলিশের বিরুদ্ধে। উন্নাওয়ের এই ঘটনাতেও ধর্ষিতা হলেন এক দলিত নাবালিকা এবং তার মা পুলিশের কাছে সেই দুষ্কৃতীদের নামগুলো বলে দিয়েছেন যারা তাদের মারধর করে কুঁড়েঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। যোগীর পুলিশ কি তাদের ধরে আইনি পথে শাস্তি দিতে সক্রিয় হবে? দলিত পরিবার কি ন্যায়বিচার পাবে? আর তা যদি না পায় তবে প্রকৃত বিচারটা গণ-আদালতেই হবে।

খণ্ড-30
সংখ্যা-12