রিষড়া ঘটনাক্রম: প্রাথমিক অনুসন্ধান রিপোর্ট
inquiry-report

গত ২ এপ্রিল, ২০২৩ সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের উত্তরপাড়া এলাকা সম্মেলন চলাকালীন সন্ধ্যায় খবর আসে, রিষড়ায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এরপরে ৩ এপ্রিল সকালে পার্টির হুগলি জেলা ও উত্তরপাড়া থানা এরিয়া কমিটির সদস্য সৌরভ, কোন্নগর লোকাল কমিটির সদস্য বিনোদ কুমার সিং (যিনি বর্তমানে রিষড়ার বাসিন্দা) ও পার্টির শুভানুধ্যায়ী সাংবাদিক রূপম চট্টোপাধ্যায় এলাকায় গিয়ে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেন।

জিটি রোড ধরে শ্রীরামপুর অভিমুখে যাওয়ার পথে রিষড়ার ওয়েলিংটন জুটমিলের কাছে সন্ধ্যাবাজার মোড়ে পুলিশ পিকেটিং। এলাকায় জারি রয়েছে ১৪৪ ধারা। সন্ধ্যাবাজার মোড় থেকে বাম দিকে ঢুকছে এনএসরোড, যেখান থেকেই শুরু হয়েছিল গতকালের ‘রামনবমী মিছিল’ রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা ইটের টুকরো। মহল্লাটা অবাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত, রয়েছে রামসীতা মন্দির, যুবক সংঘ ক্লাব। প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের বক্তব্য, মিছিল বেরোনোর আগে থেকেই জড়ো হওয়া লোকজনের নিজেদের মধ্যেই বেশ কিছু ছোটখাটো উত্তেজনা, ঝামেলা চলছিল। এরপরে মিছিল বেরিয়ে জিটি রোড ধরে মাহেশের দিকে এগোনোর পথে পড়ে একটি মসজিদ, যেটি ‘বড় মসজিদ’ নামে পরিচিত। মূল ঘটনা সেখানেই ঘটে। আমাদের তথ্যানুসন্ধানী দল এনএস রোড থেকে মহল্লার মধ্যে দিয়ে পৌঁছায় পার্শ্ববর্তী মুসলিম জনবসতি অধ্যুষিত আরকে রোডে। এই দুটি সমান্তরাল রোডই রিষড়া স্টেশন থেকে জিটি রোডের সংযোগকারী পথ। আরকে রোডের যে প্রান্ত জিটি রোডে মিশছে সেদিকেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইটের টুকরো, ভাঙা কাচ ভালো পরিমাণে চোখে পড়ল। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু দুই সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে একাধিক জনের সঙ্গে কথা বলে মোটের উপর যা বোঝা গেছে—গত কয়েক বছর ধরেই ঐ এলাকায় রামনবমীর মিছিল হয়, তবে সেই মিছিল সন্ধ্যার নমাজের আগেই মসজিদ চত্বর পেরিয়ে যায়। কিন্তু সেই মিছিল এবার বিকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে প্রায় ২০ মিনিট ওখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। মসজিদে নমাজের জন্য মানুষজন কিছু সমবেত হয়েছিলেন। পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতি ও তৎপরতা প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট পরিমাণ হালকা ধরনের ছিল। যেখানে গত বছর মসজিদের সামনে দিয়ে মিছিল যাওয়ার সময়ে রীতিমতো রাস্তার ধারে ব্যারিকেড করে মিছিল পার করা হয়েছিল সেখানে এ’বছর তেমন কিছু ছিল না এবং অল্প সংখ্যক কয়েকজন পুলিশকর্মী মসজিদের সামনে মোতায়েন ছিলেন, যাদের অধিকাংশই গণ্ডগোলের সময়ে ভালো রকম আহত হন। প্রথমত রামনবমীর দু’দিন পরেও বিভিন্ন এলাকায় উন্মত্ত মিছিল বাংলার পরিচিত দৃশ্যের মধ্যে একেবারেই পড়ে না। কারণস্বরূপ শোনা যায় যে, সম্ভবত রামনবমীর দিন প্রশাসনের কাছে সব এলাকায় পর্যাপ্ত বাহিনী না থাকার কারণ দেখিয়ে দু’দিন পরে মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয় ওখানে। কিন্তু প্রশাসনের কাছে নাকি এমন কোনো খবর ছিলই না যে, মিছিলে দিলীপ ঘোষ সহ বিজেপি নেতারা থাকতে পারেন। আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক পতাকাবিহীন এই ধর্মীয় মিছিলে সরাসরি বিজেপির উচ্চস্তরের নেতৃত্বের উপস্থিতিই এবার উত্তেজনা বাড়ানোর জমি তৈরি করেছে পরিকল্পিতভাবে, এটাই বহু মানুষের অভিযোগ। বেশ কিছু ডিজে বক্স বাজছিল মিছিল থেকে, যেগুলো বন্ধ রাখার জন্য নমাজের সময়ে মসজিদে জড়ো হওয়া মানুষজন প্রশাসনকে অনুরোধ করেন, কিন্তু সেই ব্যাপারেও প্রশাসনের তৎপরতায় ঢিলেঢালা মনোভাব দেখা যায়। প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে মিছিল যখন মসজিদের সামনে দাঁড়িয়েছিল তখন মিছিলের শেষাংশের কিছু লোকজন গেরুয়া ঝাণ্ডা নিয়ে মসজিদেও ঢোকার চেষ্টা করে বলে কেউ কেউ অভিযোগ করলেন, তবে তাতে বাধা পায় তারা। বেশিরভাগ ছিল বহিরাগত। বচসা শুরু হলে মসজিদ লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ে মিছিলের শেষভাগ থেকে কেউ, যার ঘায়ে আহত হন মসজিদের প্রধান মৌলবি সাহেব, তাঁর মাথা ফাটে। এরপরেই পরিস্থিতি ব্যাপক অশান্ত হয়ে ওঠে এবং সন্ধ্যা বাজারের দিক থেকে কয়েকটি বোমাবাজির শব্দ আসে বলেও কেউ কেউ জানালেন। কয়েকটি দোকানপাটে ভাঙচুরের কথা শোনা গেল যার সাক্ষ্য দিচ্ছে রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইটপাথরের টুকরো।

rishra riot

হেস্টিংস জুটমিলের গেটের কাছে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা কিছু পোড়া জিনিসের টুকরো দেখে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল দু’একটা বাইকে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মিছিলের সামনে পিছনে পুলিশ ও রাফের উপস্থিতি ছিল তবে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়। বেশি রাতের দিকে ১৪৪ ধারা ঘোষণা করা হয়। এলাকার থমথমে পরিবেশে বেশ কয়েকজন ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, এই এলাকায় বহু বছর ধরেই হিন্দু-মুসলিম মানুষ মিলেমিশে বাস করেন। মসজিদের কমিটি, পুজোর কমিটি দুইয়ের মধ্যেই উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন এবং মহরমের মিছিল যায় শান্তিপূর্ণভাবে। আর রামনবমীর মিছিল যে কয়েক বছর হচ্ছে তাতে সৌহার্দ্যের পরিবেশ বজায় রাখতে মসজিদে থাকা মানুষজনও সহযোগিতা করেন, কিন্তু এবার রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্যেই মিছিলকে ইচ্ছাকৃতভাবে মসজিদের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড় করানো হয় এবং অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসাবে ঝামেলা হয়, যে বিষয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন এবার গোড়া থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ ভিতরের দিকের বাটা গলি থেকেও গণ্ডগোলের খবর আসে। সন্ধ্যার পর থেকে শ্রীরামপুর লোকসভার টিএমসি সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জী ও রিষড়া পুরসভার চেয়ারম্যানকে এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু কিছু মানুষ প্রশ্ন তুললেন যে, জনপ্রতিনিধি হিসাবে তাঁরা শুরু থেকেই কেন মিছিলটিকে শান্তিপূর্ণভাবে এলাকা পার করানোর দায়িত্ব নিয়ে উপস্থিত থাকলেন না? পুলিশ-প্রশাসন উপস্থিত থাকলেও শুরুর দিকে যেন অনেকটাই উদাসীন ও অপ্রস্তুত ভাব লক্ষ্য করা যায় তাদের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের জায়গায় জায়গায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করার সুযোগ সংঘ বাহিনী কেন পাচ্ছে এটাই ক্রমশ অনিবার্যভাবে জ্বলন্ত প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

উদ্ভূত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে নাগরিকদের কাছে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে এবং গোলমালের সূত্রপাত ঘটানো ও দফায় দফায় উস্কানি দিয়ে চলা আরএসএস-বিজেপি নেতাদের গ্রেফতারের দাবিতে এবং গোটা ঘটনায় এলাকার তৃণমূল কংগ্রেসের ‘জনপ্রতিনিধি’দের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়ে ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় সিপিআই(এমএল) লিবারেশন কোন্নগরের বড় এলাকা জুড়ে পদযাত্রা সংগঠিত করে।

- সৌরভ

খণ্ড-30
সংখ্যা-9