ন্যায়নিষ্ঠ বিচারপতি, পুলিশ অফিসারের সাজাপ্রাপ্তি ও আজকের ভারতীয় রাষ্ট্র
the-indian-state-today

বিচারপতি ন্যায়বিচারের প্রতি একনিষ্ঠ হলে “সংঘর্ষ হত্যায়” হাত পাকানো পুলিশ অফিসারের পক্ষেও সাজা এড়ানো যে অসম্ভব হয়ে ওঠে সেরকমই এক বার্তা কয়েকদিন আগে এল মহারাষ্ট্র থেকে। পুলিশ অফিসার প্রদীপ শর্মার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সুবিদিত যে তিনি ১৫ বছরে ১১২টা ভুয়ো সংঘর্ষে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আগে মামলা হলেও সাজাকে পাশ কাটাতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। এবার কিন্তু বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি রেবতী মোহিতে দেড়ে ও বিচারপতি গৌরী গডসের বেঞ্চ সজ্ঞানে গুলি করে হত্যাকে “সংঘর্ষে হত্যা” বলে চালানোর তাঁর কৌশলকে খণ্ডন করে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তাঁর সঙ্গে কারাবাসের সাজা পেয়েছেন আরও ১২ পুলিশ কর্মী। হত্যাকাণ্ডের যে মামলায় প্রদীপ শর্মার এই সাজা তার ঘটনার দিকে তাকানো যাক।

দুর্বৃত্ত শিরোমণি ছোটা রাজনের সহযোগী বলে পরিচিত রামনারায়ণ গুপ্তা ওরফে লখন ভাইয়াকে মুম্বইয়ের ভাসির বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয় ২০০৬’এর ১১ নভেম্বর। আর এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন লখন ভাইয়ার বন্ধু অনিল ভেদা। আদালতে তাঁর সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল ২০১১’র ১৬ নভেম্বর। কিন্তু ১১ নভেম্বর নভি মুম্বইয়ের ভাসির বাড়ি থেকে তাঁকে অপহরণ করা হয় এবং চারদিন পর থানের মালে থেকে তাঁর আগুনে দগ্ধ পচাগলা দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত লখন ভাইয়া হত্যায় প্রদীপ শর্মার জড়িত থাকাকে খারিজ করে দেয়। পরে ২০০৯ সালে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার এম এম প্রসন্নর নেতৃত্বে তৈরি হয় বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। সিট ২০১০’এর এপ্রিলে তাদের রিপোর্টে জানায় রিয়েল এস্টেট এজেন্ট জনার্দন ভাঙে ব্যবসায় তার প্রতিদ্বন্দী লখন ভাইয়াকে দুনিয়া থেকে সরাতে চাইছিল। এবং তার সঙ্গে যোগসাজশ করেই পুলিশ অফিসার প্রদীপ শর্মা ও অফিসার সূর্যবংশী লখন ভাইয়াকে হত্যা করে। সিট লখন ভাই হত্যায় জড়িত ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়।

কিন্তু ২০১৩ সালের দায়রা আদালতের বিচারে ১৩ পুলিশকর্মী-সহ ২১ জন সাজা পেলেও প্রদীপ শর্মা রেহাই পেয়ে যান। এমনকি লখন ভাইয়ার মাথা ভেদ করা গুলি যে প্রদীপ শর্মার পিস্তল থেকেই বেরিয়েছিল, সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের রিপোর্ট থাকলেও দায়রা আদালতের বিচারক তাকে যথার্থ সাক্ষ্যপ্রমাণ বলে মানতে চাননি।

বিচারপতি রেবতী মোহিতে দেড়ে এবং গৌরী গডসের বেঞ্চ তাদের রায়ে বলেছে — “এটা একেবারেই স্ফটিক স্বচ্ছ যে একটা ভুয়ো সংঘর্ষকে সত্যিকার সংঘর্ষের রূপ দেওয়া হয়েছিল।” রায়ে আরও বলা হয়, দায়রা আদালত প্রদীপ শর্মার বিরুদ্ধে থাকা “অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণ” দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। অনিল ভেদার হত্যা সম্পর্কেও রায়ে বলা হয়েছে — “এটা লজ্জার বিষয় যে অনিল ভেদার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়নি। এই মামলার প্রধান সাক্ষী এক বীভৎস হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর পরিবারের কাছে এটা ন্যায়বিচারের প্রহসন।”

এই হত্যাকাণ্ড ও তার বিচার প্রায় একই সময় ঘটা বহুচর্চিত আর একগুচ্ছ হত্যাকাণ্ডকে আমাদের মনে পড়ায়। ২০০৫’এর নভেম্বরে বাস থেকে নামিয়ে গুজরাটের গান্ধিনগরের কাছে হত্যা করা হয় সোহরাবুদ্দিন শেখ ও তার স্ত্রী কৌসর বাইকে। সিবিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী হায়দ্রাবাদ থেকে সাংলি যাওয়ার সময় গুজরাট ও রাজস্থানের পুলিশ তাদের বাস থেকে নামায় ২২-২৩ নভেম্বর এবং সোহরাবুদ্দিনকে হত্যা করা হয় ২৬ নভেম্বর। এর কয়েকদিন পর তার স্ত্রী কৌসর বাইকে হত্যা করা হয় এবং অভিযোগ, হত্যার আগে পুলিশের এক সাব-ইন্সপেক্টর তাকে ধর্ষণও করে। ঐ একই বাসে থাকা সোহরাবুদ্দিনের সহযোগী তুলসিরাম প্রজাপতিকে রাজস্থানে নিয়ে গিয়ে রাখা হয় পুলিশি হেফাজতে। এবং প্রায় এক বছর পর তাকে হত্যা করা হয় ২০০৬’এর ২৮ ডিসেম্বর। এই সব হত্যাকেই “সংঘর্ষে হত্যা” বলে চালানো হয় এবং হত্যার “মূল মাথা ও প্রধান অভিযুক্ত” বলে সাব্যস্ত হন গুজরাটের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অমিত শাহ, শাহ-ঘনিষ্ঠ পুলিশ অফিসাররাও অভিযুক্ত হয়।

তদন্তে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, সোহরাবুদ্দিন ছিল তোলাবাজ, গুজরাট ও রাজস্থানের মার্বেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সে ও তার সহযোগীরা তোলা আদায় করত। রাজস্থানের মার্বেল ব্যবসায়ীরা সোহরাবুদ্দিনের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে সোহরাবুদ্দিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাওয়ার পরপরই এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটে। তবে, সোহরাবুদ্দিনের উত্থানের পিছনে কিন্তু রাজনীতিবিদ ও পুলিশ প্রশাসনের মদত ছিল। সিবিআই-এর তদন্তকারী অফিসার সন্দীপ তামাগাডগে সিবিআই আদালতে তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, সোহরাবুদ্দিন ও প্রজাপতি হত্যার পিছনে ছিল “রাজনীতিবিদ-দুর্বৃত্ত-পুলিশ” গাঁটছড়া। তিনি তাঁর সাক্ষ্যে আরও জানান, তোলাবাজ দুর্বৃত্তদের সঙ্গে বন্ধন থেকে যে রাজনীতিবিদরা লাভবান হয়েছিলেন, সোহরাবুদ্দিনদের আদায় করা তোলার ভাগ পেয়েছিলেন তাঁরা হলেন অমিত শাহ ও রাজস্থানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গুলাব চাঁদ কাটারিয়া।

প্রজাপতি হত্যার সময় অমিত শাহর সঙ্গে পুলিশ অফিসারদের ঘনঘন কথাবার্তার রেকর্ড তামাগাডগে সংগ্রহ করেন এবং পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে মন্ত্রীর ঐ ক্ষণে ক্ষণে বার্তালাপ “অস্বাভাবিক ও অদ্ভুত” বলে অভিহিত হয়। অস্ত্র আইনে এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ ধ্বংস করার অভিযোগে অমিত শাহ ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কয়েক মাস কারাবাসও ভোগ করেন। তবে, বিশেষ সিবিআই আদালতে অমিত শাহর বিচার শেষমেষ মহারাষ্ট্রের ঐ রেবতী মোহিতে দেড়ে ও গৌরী গডসের মতো বিচারপতিদের হাতে পড়ল না। অমিত শাহর বিচার প্রথমে যাঁর হাতে ছিল সেই বিচারপতি জে টি উৎপতকে বদলি করা হয় ২০১৪’র ২৪ জুন, এবং বদলি করা হয় তদন্তে নিযুক্ত অফিসারদেরও। বিচারপতি উৎপত আদালতে অমিত শাহর উপস্থিতি নিয়ে জোর দিচ্ছিলেন বলে জানা যায়। এরপর অমিত শাহর বিচারের দায়িত্বে থাকা বিচারপতি বি এইচ লোয়ার রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু ঘটে ঐ বছরের ডিসেম্বরে। বিচারপতি লোয়ার বোন এই অভিযোগও করেন যে, অমিত শাহর অনুকূলে রায় দেওয়ার জন্য বোম্বে হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোহিত শাহ লোয়াকে ১০০ কোটি টাকার ঘুষের প্রস্তাবও করেন। বিচারের ভার এরপর পড়ে বিচারপতি মদন গোসাভির ওপর। তিনি ঐ আদালতে আসার ১৫ দিনের মধ্যেই কোনো বিচার না করেই বলে দেন, ঐ মামলায় এমন কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই যার ভিত্তিতে অমিত শাহকে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা যায়। কিন্তু একমাত্র বিচারের মধ্যে দিয়েই যে ঐ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, বিচারপতি গোসাভি সে কথা বিস্মৃত হলেন! বিচারের মধ্যে না গিয়েই অমিত শাহ বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন!

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দুর্বৃত্ত মোকাবিলায় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বৃত্তদের সঙ্গে সংঘর্ষের যে নীতির প্রয়োগ করে চলেছেন স্থানাভাবে তা নিয়ে বিশদ আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। সে প্রসঙ্গে এখানে শুধু এটুকুই বলার যে, ঐ নীতি পুলিশের বিচার-বহির্ভূত হত্যা (একটা হিসাব অনুযায়ী ঐ ধরনের হত্যার সংখ্যা এখনও পর্যন্ত ১৪৬) এবং অপরাধ করেও শাস্তি থেকে পুলিশের অব্যাহতি পাওয়ার এক লাইসেন্স হয়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার রক্ষার সংগঠনগুলো এই অভিযোগ করে ঐ নীতিকে কাঠগড়ায় তোলেন যে তা নাগরিক স্বাধীনতা হরণের এক পন্থা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

বোম্বে হাইকোর্টের যে রায়ের উল্লেখ করে এই লেখার শুরু, সেই রায়ে বিচারপতিরা এই কথাও বলেছেন যে, “আইনের অভিভাবকদের উর্দি পরিহিত দুর্বৃত্ত হতে দেওয়া যাবে না। আর তা যদি অনুমতি পায় তবে তা নৈরাজ্যে পরিণতি লাভ করবে।” বিধি অনুসারে পুলিশের কাজ আইনকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু ভারতের বাস্তব পরিস্থিতি হলো, আইন সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘন করে পুলিশই। এবং অপরাধ জগতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তারা যেমন নিজেদের পকেট ভরায়, তেমনি আবার রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের পৃষ্ঠপোষক হিসাবেও কাজ করে। বর্তমান জমানা যখন একের পর এক দানবীয় আইন তৈরিতে নিয়োজিত হচ্ছে, নাগরিকদের স্বাধীনতা দমনে যখন রাষ্ট্রের উগ্ৰ মূর্তি অত্যন্ত প্রকট হচ্ছে, পুলিশ রাষ্ট্রীয় উৎপীড়নের মাধ্যম হয়ে উঠছে, তখন ভারতের পুলিশ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সংকেত একেবারে উপেক্ষার নয়। বিচার বিভাগে রেবতী মোহিতে দেড়ে ও গৌরী গডসের মতো বিচারপতিদের উপস্থিতি আজ অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু বিচার বিভাগের ওপরও বর্তমান জমানা থাবা বসানোয় ঐ বিচারপতিদের মতো বিচারপতিরা সংখ্যালঘু হয়েই থাকবেন।

- জয়দীপ মিত্র

খণ্ড-31
সংখ্যা-11