লোকসানে চলা সংস্থাগুলো কিনেছে কোটি কোটি টাকার বন্ড
bought-bonds-worth-billions-of-rupees

প্রায় প্রতিদিন নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত নানান তথ্য উঠে আসছে অনেক বড় বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে। কিভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে ব্যবহার করেছে মোদী-অমিত শাহ’র সরকার তাদের দলীয় তহবিল ভরাতে, কিভাবেই বা অবৈধ, অস্বচ্ছ, অন্যায় পদ্ধতিতে সরকারি বরাত পাইয়ে সংস্থাগুলোর কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করা হয়েছে, তার ভূরি ভূরি তথ্য এখন প্রকাশ পাচ্ছে। এখন, এই তথ্য বেরিয়ে এল, পর পর তিন বছর লোকসানে চলা সত্ত্বেও বেশ কিছু সংস্থা বিজেপির নির্বাচনী তহবিলে ঢালাও অনুদান দিয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, প্রথম সারির এমন ২০০টি সংস্থার মধ্যে অন্তত ১৬টি সংস্থা নির্বাচনী বন্ড কিনেছে যাদের সংস্থাগুলি লোকসানে চলছে। লোকসানে চলা এমন সংস্থাগুলি রাজনৈতিক দলগুলোকে ৭১০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে, যার মধ্যে ৪৬০ কোটি টাকার ও বেশি (৬০ শতাংশের বেশি) পেয়েছে বিজেপি। সংস্থার শেয়ারহোল্ডারদের কপালে এক কানাকড়িও না জুটলে গোপন পথ ধরে রাজনৈতিক দলগুলো পেয়েছে মোটা অঙ্কের তহবিল।

২০১৭ সালে চারটে আইনকে সংশোধন করে বিজেপি সরকার প্রথম যখন নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত স্কিম পেশ করে তখনই তদানিন্তন নির্বাচন কমিশন ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আশঙ্কা প্রকাশ করে যে এর ফলে বিভিন্ন ভূয়ো শেল কোম্পানি তাদের কালো টাকা বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলে চালান করে দেবে।

বিজেপি আইনের সংশোধন নিয়ে আসার আগে যে নিয়ম ছিল, তা হল, বন্ড কেনার তিনটি অর্থবর্ষ আগে গড় মুনাফার ৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত তারা দান করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো একটি সংস্থা যদি পর পর  তিন বছরে ১০০ লাভ করে থাকে, তবে চতুর্থ বছরে সে সর্বাধিক ৭.৫ শতাংশ দান করতে পারবে। কোনো সংস্থা যদি লাভের তুলনায় অনেক বেশি টাকার বন্ড কেনে তা হলে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে চোরা পথে সেই টাকা এসেছে। ২০১৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে মোদী সরকার কোম্পানি আইনের এই ধারাটি তুলে দেয়।

কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক : টেলিকম সংস্থা ভারতী এয়ারটেল এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে। ২০২০-২১ এবং ২০২২-২৩’র অর্থবর্ষে এই সংস্থাটি গড় লোকসান হয় ৯,৭১৬ কোটি টাকা। আগেকার অর্থবর্ষে পর পর আর্থিক লোকসান হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলিকে এয়ারটেল দিয়েছে ১৯৭.৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিজেপিকে দিয়েছে ১৯৭ কোটি টাকা, আর ৫০ লক্ষ ন্যাশনাল কনফারেন্স ও ১০ লক্ষ জুটেছে আরজেডি’র কপালে।

ডিএলএফ কমার্শিয়াল ডেভেলপার্স লিঃ ২০১৯-২০’র অর্থবর্ষে ২০ কোটি টাকা দিয়েছে যদিও ওই একই অর্থবর্ষে তার লোকসান হয় ২১০ কোটি টাকা। এই সংস্থাটি মোট ১৩০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড কেনে যার সবটাই গেছে বিজেপির সিন্দুকে।

লোকসানে চলা ১৬টির মধ্যে এগুলো ছাড়া আরও ৩১টি সংস্থা রয়েছে যারা তাদের বিগত তিন বছরের গড় মুনাফার তুলনায় বহুগুণ বেশি অনুদান দিয়েছে। কলকাতা স্থিত মদ বিক্রেতা সংস্থা ক্যাশেল লিকার প্রাইভেট লিঃ গত তিনবছরে গড়ে মাত্র ৬ লক্ষ লাভ করলেও ৭.৫ কোটি টাকা দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোকে যা ১১৮ গুণ বেশি! এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ৬.৮ কোটি টাকা বিজেপি পেয়েছে আর বাদবাকি ৭০ লক্ষ টাকা গেছে আরজেডি’র পকেটে।

২০২৩ এপ্রিল থেকে মোট চারটে কিস্তিতে এই টাকা ওই সংস্থাটি দিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের হিসাব না পেলেও দেখা যাচ্ছে ঠিক তার আগের বছরে এই সংস্থাটি মাত্র ১২ লাখ টাকা লাভ করেছে। আগের তিন বছরে এই সংস্থাটির লাভের পরিমাণ যথাক্রমে ৫ লাখ, ২ লাখ ও শূন্য!

দেশে লটারি ব্যবসার ‘মুকুটহীন সম্রাট’ সান্টিয়াগো মার্টিন ফিউচার গেমিং এবং হোটেল সার্ভিস প্রাইভেট লিঃ সর্ববৃহৎ অঙ্কের নির্বাচনী বন্ড কিনেছে — গত তিন বছরের গড় মুনাফার ১৬ গুণ বেশি! এই সংস্থাটি মোট ১৩৬৮ কোটি টাকার বন্ড কিনেছে যার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৫৪০ কোটি টাকা, ৫০৯ কোটি ডিএমকে, ১৫৯ কোটি ওয়াইএসআর কংগ্রেস, ১০০ কোটি বিজেপি, ৮০ লক্ষ সিকিম ক্রান্তিকারী মোর্চা এবং ৫০ লক্ষ সিকিম ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট।

একই ভাবে, রিল্যায়েন্সের কুইক সাপ্লাই চেন তৃতীয় বৃহত্তম দাতা হিসাবে সামনে উঠে এসেছে, যারা তাদের লাভের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি দান করেছে। এই সংস্থাটি দিয়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা (৯০ শতাংশের বেশি) বিজেপিকে, ২৫ কোটি টাকা শিবসেনা’কে আর বাদবাকি ১০ কোটি এনসিপি’কে।

প্রথম ১০টি দাতার মধ্যে রয়েছে কলকাতা ভিত্তিক কেভেন্টার গ্রুপের মদনলাল কোম্পানি লিঃ। তারা তাদের গত তিন বছরের গড় মুনাফার তুলনায় ৫৬ গুণ বেশি দান করেছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। ২০১৯-২০’র অর্থবর্ষে তারা ১৮৫.৫ কোটি দিয়েছে, যার মধ্যে বিজেপির তহবিলে ঢুকেছে ১৭৫.৫ কোটি আর অবশিষ্ট ১০ কোটি কংগ্রেসের পকেটে।

তথ্য ঋণ : রিপোর্টার্স কালেক্টিভ,
২২ মার্চ, ২০২৪

খণ্ড-31
সংখ্যা-11