প্রতিবেদন
২৬ নভেম্বর : নতুন এক আরম্ভের সূচনা করলো ভারতীয় জনতা
nov

একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ালো দুটো দল। দুটো পক্ষ। একদিকে দাঁড়িয়ে সারা দেশের মানুষ — শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র যুব-মহিলা — নানা পেশাজীবী আর বিপরীতে মুখোমুখি দানবীয় কেন্দ্রীয় সরকার, তার শ্রেণি চরিত্র কে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। যে মোদী সরকার ভারতীয় জনগণের সমস্ত সাংবিধানিক অধিকারকে কেড়ে নিচ্ছে উৎকট সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে, বলদর্পি আচরণে  সংসদের দুই কক্ষে, ২৬ নভেম্বর ৭১তম সংবিধান দিবসে তাই হৃত অধিকারকে ফের ছিনিয়ে নিতে ডাকা হয়েছিল দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট। শুধু ভারতের শ্রমিকশ্রেণিই নয়, ৫০০-র উপর কৃষক সংগঠন এদিন সারা ভারত গ্রামীণ বনধের ডাক দিয়ে রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে কাতারে কাতারে অংশ নেয় রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম দমনকে উপেক্ষা করে।

বিশ্বে এটা ছিল শ্রমিক শ্রেণির বৃহত্তম ধর্মঘট, যেখানে আনুমানিক সামিল হয় ২৫ কোটি শ্রমিক। ব্যাঙ্ক-বীমার মতো বিত্তিয় বা ফিনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নানান সরকারী ক্ষেত্র, ইস্পাত, কয়লা, তেল, পোর্ট ও ডক-এর মতো অত্যন্ত সংগঠিত ক্ষেত্র থেকে বাগিচা-নির্মাণ শিল্প-বিপুল অসংগঠিত ক্ষেত্র, অঙ্গনওয়াড়ি-আশা-মিড ডে মিল-এর মতো মহিলা শ্রমিকদের প্রাধান্যকারী কর্মক্ষেত্র এই ধর্মঘটে অত্যন্ত উদ্দিপনার সাথে সামিল হন।

ভারতের দুই বুনিয়াদি শ্রেণি, শ্রমিক ও কৃষকের উপর ফ্যাসিস্ট মোদী সরকার যে অভূতপূর্ব হামলা নামিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ২৬ নভেম্বর ছিল ভারতীয় জনতার সম্মিলিত প্রতিবাদ প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল উদ্ভাসন। আর, এই ধর্মঘটের সাথে তরুণ প্রজন্ম-ব্যাপক ছাত্র যুব সমাজের দৃষ্টান্ত মূলক অংশগ্রহণ গোটা প্রতিবাদকেই নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। দেখা গেল দিল্লির কাছে, কুরুক্ষেত্রের পুলিশ যখন জল কামান দিয়ে বিক্ষোভরত কৃষকদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে তৎপর, তখন এক অসমসাহসী তরুণ মারমুখী পুলিশ বাহিনীর ঘেরাটোপ ভেঙে জলকামানের গাড়ির উপর উঠে জল নির্গমের পাইপগুলোকে বন্ধ করে দিচ্ছে। দেখা গেল, দিল্লির বুকে প্রতিবাদরত জেএনইউ আইসার এক ছাত্রীকে দিল্লি পুলিশ (যা এখন অমিত শাহর রণবীর সেনায় রূপান্তরিত হয়েছে) গ্রেপ্তার করতে বলপূর্বক টানা হ্যাচড়া করছে, আর সেই বর্বরতার বিরুদ্ধে সেই ছাত্রীর অনমনীয় দৃপ্ত প্রতিবাদ। এরকম অজস্র ঘটনা, টুকরা টুকরো ছবির প্লাবন দেখা গেছে দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায়। নয়া শিক্ষা নীতির মোড়কে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বৃহৎ বেসরকারী সংস্থা ও কর্পোরেটদের কাছে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে তাই ছাত্র সমাজের ক্রোধ ও ঘৃণা ফুটে ওঠে ২৬ নভেম্বরের ধর্মঘটের মাধ্যমে। কৃষি-শিল্প-শিক্ষা কে কর্পোরেট কব্জায় আনার যে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করেছে মোদী সরকার, তার বিরুদ্ধে এই ধর্মঘট ও গ্রামীণ বনধ ছিল ভারতীয় জনতার প্রত্যয়ী প্রত্যুত্তর। সে কারণে, শ্রেণি স্তরের সীমানা অতিক্রম করে ২৬ নভেম্বর হয়ে ওঠে ভারতীয় জনতার প্রতিবাদী উৎসব। চিরদিন ধর্মঘটের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত যে সব সংবাদমাধ্যম রয়েছে, তারাও এবার ধর্মঘটের সাফল্য অস্বীকার করতে পারেনি।

tee

 

এ রাজ্যে দুই শ্রম নিবিড় শিল্প — চা ও চটকল অভূতপূর্ব সারা দিল ধর্মঘটে। ধর্মঘটের দিন কয়েক আগে শ্রম মন্ত্রী চটশিল্পের ইউনিয়নগুলোর সাথে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়ে ধর্মঘট থেকে সরে আসার জন্য আবেদন করেন, যা ইউনিয়ন গুলো পত্রপাঠ খারিজ করে দেয়। "ধর্মঘটের দাবিগুলো সমর্থন করি, ধর্মঘটকে নয়" — রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এমন উদ্ভট তত্ত্বকে রাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ ধর্মঘট করেই সমুচিত জবাব দিল। ধর্মঘটের দাবির সমর্থনে এদিন মিছিল করার যে ঘোষণা তৃণমূল ট্রেড ইউনিয়নের তরফ থেকে করা হয়েছিল, আদতে তার টিকি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর, গরুর দুধে যিনি সোনা খুঁজে পান, সেই তিনি দেখতেই পেলেন না আদৌ ধর্মঘট হয়েছে কি হয়নি। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে সাত দফা দাবিতে রাজ্যের শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষি আইন বাতিলের জন্য গ্রামীণ বনধ ডাকা হয়েছিল, তার রাজনৈতিক ভাষ্য যে রাজনৈতিক নেতা বা দল শুনতে বা বুঝতে পারে না, বা চায় না, তাদের কাছ থেকে হিসাব চাওয়ার বার্তা এনে দিল এই দেশব্যাপী ধর্মঘট। ধর্মঘট এটাও ঘোষনা করল, যে সংসদের কাজ হচ্ছে জনগণের স্বার্থে আইন প্রনয়ণ, সেই সংসদ আজ কর্পোরেটদের পকেটে। রাষ্ট্রনেতারা আজ আম্বানী আদানির পরম অনুগত ভৃত্য। তাই, শতাব্দী ব্যাপী অসংখ্য রক্তঝরা পথে ভারতীয় জনগণ যে সমস্ত অধিকার ছিনিয়ে আনে, আজ সংসদের একমাত্র কাজই হচ্ছে তা হরণ করা। সেজন্য একমাত্র রাস্তাই হচ্ছে রাস্তা — আবার ফিরে যেতে হচ্ছে রাজপথের লড়াই, ব্যারিকেড ভাঙার সংগ্রামে। যার রূপ শান্ত নম্র ভদ্র সুশীল সুশৃঙ্খল নাও বা হতে পারে। প্রতিবাদ প্রতিরোধের বলিষ্ঠ শাশ্বত পথেই, আন্দোলনের ভিন্ন ব্যাকরণই রচিত হবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নতুন পত্রলেখা।

344

 

কী নির্মম পরিহাস। গতকাল রাষ্ট্রপতিভবনে বন্দি খাঁচার পাখি শেখানো বুলি আওড়ে ভারতের ৭১তম সংবিধান দিবসে যখন সংবিধানের প্রি-অ্যাম্বেল পাঠ করে করে শপথ নেওয়া নাটক করছিলেন, ঠিক তখন, অদুরেই ভারতীয় জনগণের বুনিয়াদি শ্রেণি কৃষকদের শান্তিপূর্ণ জমায়েতকে ছত্রভঙ্গ করতে রাষ্ট্র চরম হিংস্রতা নিয়ে নামিয়ে আনে অত্যাচার।

আরও একবার প্রমাণিত হলো, মোদীর আমলে আমূল বদলে গেছে "জনগণের" পরিভাষা। পরিযায়ী শ্রমিক, অনুচ্চারিত অবয়হীন কোটি কোটি সম্পদ সৃষ্টিকারী মানুষ নয়, জনগণ হলো আম্বানী আদানির মতো কর্পোরেট ও নাগপুর সদর দপ্তরের গেস্টাপো বাহিনী।

২৬ নভেম্বর নতুন এক আরম্ভের ভূমিকা তৈরি করলো। আন্দোলনের নতুন নতুন মহাকাব্য রচনা করার আগে।

খণ্ড-27
সংখ্যা-42