সম্পাদকীয়
নতুন এক আরম্ভের লক্ষ্যে

২০২২ শেষ লগ্নে এসে উপস্থিত। নতুন বছর কি বার্তা, কী ধারাভাষ্য নিয়ে হাজির হবে তা এখনও অনাগত দিনের গর্ভে। তবে বর্তমানের মধ্যেই আগামীর এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে যা যথেষ্ট উদ্বেগের, দুশ্চিন্তার। সামনের বছরে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঘনিয়ে ওঠা বিরাট মন্দার কাঁপুনি ধরানো ইশারা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতো সংগঠন বড় ধরনের সামাজিক নৈরাজ্য বা অশান্তির সংকেত দিয়েছে। এই প্রথম, গত ১০০ বছরের মধ্যে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ঋণাত্মকের ঘরে (-০.৯) নেমেছে। অগণন মানুষ দুনিয়া জুড়েই নতুন করে নিক্ষিপ্ত হয়েছে দারিদ্রসীমার নিচে। গভীর খাদ্য সংকটের কারণে অনেক দেশেই দুর্ভিক্ষের বিভীষিকা দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। জলবায়ু সংকট পরিবেশের উপরই শুধু নয়, নতুন করে শরণার্থী সৃষ্টি করেছে, তৈরি করেছে নতুন নতুন দ্বন্দ্ব, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

মোদীর ফ্যাসিবাদী জমানা গোটা দেশকে ঠেলে নিয়ে গেছে জাহান্নামের উপান্তে। গণতন্ত্রের প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানগুলো মোদীর ইশারা ও আদেশের উপর চলছে। এমনকি বিচারব্যবস্থাও। অবসরপ্রাপ্ত প্রখ্যাত বিচারপতি ফলি নরিম্যান সঠিকভাবেই বলেছিলেন, ভারতীয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বলতম স্তম্ভ হল বিচারব্যবস্থা, অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে যাকে কাজ করতে হয়। দেশের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার সংগঠন মোদীর আজ্ঞাবহ ভৃত্যের দল। ৮৪ বছরের পাদ্রী স্ট্যানস্বামিকে জেলে পুরতে কিভাবে তাঁর অজান্তে তাঁর কম্পিউটারে নানা আপত্তিজনক বেআইনি তথ্য ঢুকিয়ে ফাঁসানো হয়, তা আজ ফাঁস হয়ে গেছে। বিজেপির মহিলা সাংসদ কর্ণাটকে এক ভাষণে খোলাখুলিভাবেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বান রাখলেও সরকার, বিচারব্যবস্থা চোখ-কান বন্ধ রাখে। সামাজিক বিদ্বেষ সূচক, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, লিঙ্গ-বৈষম্য সূচক — সব ক্ষেত্রেই ভারত ক্রমেই নিচে গড়িয়ে পরছে। সামাজিক রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপন্ন করে তুললে যে তার অভিঘাত অর্থনীতির উপরও পড়ে, তা বিভিন্ন অর্থশাস্ত্রীরা বারংবার সতর্ক করলেও মোদী তা কর্ণপাত করেন না।

বাংলাকে নিজের তাঁবে আনতে বিগত বিধানসভা নির্বাচনে অমিত-মোদী জুটির মরিয়া প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ সমুচিত প্রত্যুত্তর দেন। বিজেপি বিরোধী জনপ্রিয় জনমতের কাঁধে তৃতীয়বার চেপে রাজ্য ক্ষমতার মসনদে আসার পর মমতা ধরাকে সরা জ্ঞান করেছেন। গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রকে উপেক্ষা করে, আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত রাজ্য সরকার সমস্ত প্রশ্নেই ব্যর্থ। গোটা শিক্ষা দপ্তরই আজ জেলখানায়। নিয়োগ-আবাস-একশ দিনের কাজ — যেকোনো সংস্কার প্রকল্পের উপভোক্তাদের কাছ থেকে কাটমানি — এমন হাজারো দুর্নীতিতেই এই সরকার ধিক্কৃত, কলঙ্কিত। এর সুযোগ নিয়ে এরাজ্যে সিবিআই-ইডি’র মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো এক ধরনের বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। বিচারবিভাগ নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে খুবই সক্রিয়তা দেখালেও আজও আন্দোলনকারীদের নিয়োগ বিশ বাঁও জলে।

তৃণমূলী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী বামপন্থাই একমাত্র যোগ্য বিকল্প। তৃণমূলী শাসনকে উৎখাত করতে বিজেপির সাথে হাত মেলানোর বিজেমূল তত্ত্ব বিগত নির্বাচনে মানুষ প্রত্যাখান করলেও, বামফ্রন্টের মধ্যে প্রধান বামপন্থী দলটি ওই ধরনের জোটকে তাত্ত্বিক ভাবে খারিজ করলেও নিচুতলায় ওই প্রবণতা বেশ জোরালোভাবেই বইছে।

এর বিরুদ্ধে বামেদের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে, আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে গ্রাম বাংলায় প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। আর, তা করতে হলে গ্রামবাংলায় জীবন্ত ইস্যুকে সামনে রেখে একরোখা আন্দোলন, ব্যাপক প্রচার অভিযান আজ সময়ের দাবি। এখনো সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে বিজেপি অপ্রস্তুত। গ্রাম বাংলায় আজও তারা দুর্বল। তাই, আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বামপন্থীদেরই নতুন আরেক আরম্ভের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।

খণ্ড-29
সংখ্যা-50