প্রতিবেদন
অর্থনীতির আকাশে নিকষ কালো মেঘ

দুনিয়া জুড়ে গভীর আর্থিক সংকটের বার্তা নিয়ে আসছে নতুন বছর। খুব সম্প্রতি বিশ্বব্যাঙ্ক বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০২২ সাল জুড়েই বিরাট অনিশ্চয়তা নিয়ে চলার পর বৈশ্বিক অর্থনীতি আবার হোঁচট খেয়ে আরও বেশি মন্থরতার শিকার হয়েছে। অতিমারির ছোবলে ক্ষতবিক্ষত শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির প্রবল দাপট, ভেঙে পড়া জোগান শৃঙ্খল ও অন্যান্য সমস্যায় জর্জরিত ক্ষতবিক্ষত বিশ্বঅর্থনীতি।

বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্ট জানিয়েছে, ১৯৭০ সালের পর মন্দা পরবর্তী যে পুনরুর্জীবন শুরু হয় মন্থর গতিতে, এবারের পুনরুর্জীবন তার থেকেও অনেক বেশি ধীর গতি সম্পন্ন। দুনিয়া জুড়েই উপভোক্তাদের ভরসা এতটাই তলানিতে যে, এর আগে যতগুলো বিশ্বব্যাপী মন্দা এসেছিল, এবার তা অনেক গুণ বেশি। আর বিশ্বব্যাপী যে তিনটি সর্ববৃহৎ অর্থনীতি রয়েছে — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন ও ইউরো জোন — তাদের দিনের পর দিন গতিভঙ্গ হচ্ছে। গভীর উদ্বেগ নিয়ে বিশ্বব্যাঙ্ক জানিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর সামান্যতম আঘাত নেমে আসলেই তা গভীর মন্দার কবলে ঠেলে দেবে।

বিশ্বব্যাঙ্কের আরও কয়েকটি পর্যবেক্ষণ

  • ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চহারে মূল্যস্ফীতি, জোগান শৃঙ্খলের বিপর্যয়, বিশ্বজুড়েই আর্থিক গতিভঙ্গ — এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে সার ও অন্যান্য কৃষি ক্ষেত্রের আনুষঙ্গিক ইনপুট ও পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে দুনিয়াব্যাপী ২০২২ সালে নিদারুণ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

  • বিগত কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক দারিদ্র কমাতে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল, কোভিড তার উপর বিরাট আঘাত নামিয়েছে। নানা দেশে এর প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন।

  • এর পাশাপাশি, গতবছর জুড়েই উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ সংকট আরো ঘোরালো হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্তত ৬০ শতাংশ দরিদ্রতম দেশের ঋণ সংকট সেই সমস্ত দেশগুলোকে গভীর খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।

  • অতিমারী ও রিয়াল এস্টেটের নানা সংকট দেখে বিশ্বব্যাঙ্ক চিনের বৃদ্ধির আগেকার অনুমান কমিয়ে দিয়েছে। সামনের বছরের জুন মাসে তাদের ৪.৩ শতাংশের অনুমানকে কমিয়ে ২.৭ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি আগামী বছরের জন্য ৮.১ শতাংশের আনুমানিক বৃদ্ধিকে কমিয়ে ৪.৩ শতাংশ করেছে।

২০২২’র শেষে, আলোচ্য রিপোর্ট জানিয়েছে, ৬৮ কোটি ৫ লক্ষ মানুষ নিক্ষিপ্ত হবে চরমতম দারিদ্রের কবলে।

আইএমএফ অক্টোবরেই জানিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশের ও বেশি বিরাট সংকোচনের মুখে পড়বে আর, ২০২৩-এ বিশ্ব জিডিপি দুই শতাংশেরও কম হারে অত্যন্ত মন্থর গতিতে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে ২৫ শতাংশ।

ভারতের অর্থনীতির সামনে কী সমস্যাগুলো থাকছে?

আইএমএফ সামনের বছরের জন্য ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির যে অনুমান আগে করেছিল, তা কমিয়ে ৬.৮ শতাংশ করেছে। আগে তারা অনুমান করে বৃদ্ধির হার হবে ৭.৪ শতাংশ হারে। এই নিয়ে তৃতীয়বার আইএমএফ তাদের অনুমানিক বৃদ্ধির সংশোধন করল। আর, ২০২৪-এ তা আরো শ্লথ হয়ে দাঁড়াবে ৬.১ শতাংশ হারে।

এদিকে, রিজার্ভব্যাঙ্কের মনিটারি পলিসি কমিটির সদস্য জয়ন্ত আর ভার্মা ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির সম্ভাবনার পথে নিজের উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, “ভারতের আর্থিক বৃদ্ধি খুবই ভঙ্গুর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে”। তার অভিমত, দেশীয় অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে চারটি ইঞ্জিন — রপ্তানি, সরকারি ব্যয়, মুলধনী বা ক্যাপিটাল বিনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয়। যেহেতু বিশ্বব্যাপী মন্থর আর্থিক পরিমন্ডলে রপ্তানি কখনই বৃদ্ধির মুখ্য পরিচালক হতে পারেনা, সরকারও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করার মতো অবস্থায় নেই নানান বাধ্যবাধকতার জন্য, মুলধনী বিনিয়োগ ও ব্যক্তিগত ভোগব্যয় এখনও গতি পায়নি, অর্থাৎ চারটে ইঞ্জিনই বেশ কিছু সমস্যার মুখে পড়ে আর্থিক বনিয়াদের ভিত্তিকেই ভঙ্গুর করে দিয়েছে। ক্ষমতার অলিন্দে পোষ মানা অর্থনীতিবিদরা কান ঝালাপালা করা প্রচার চালিয়ে বলছেন যে বিশ্বের বৃহৎ অর্থব্যবস্থার তুলনায় ভারতের অর্থনৈতিক বনিয়াদ নাকি অনেক মজবুত। ভারতের শেয়ার বাজারে বিপুল পরিমাণে আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি প্রবেশ করে দেশের শেয়ার সূচককে বাড়িয়ে দেওয়ার যে ঢাক পিটিয়ে তারা ভারতের আর্থিক উজ্জীবনের গালগপ্পো শোনাচ্ছিলেন, দিন কয়েক আগে দেশের শেয়ার বাজারে হঠাৎ বিরাট ধ্বস নেমে নিফটিকে ১৭,৯০০’র নিচে নামিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কেড়ে নিল ৭ লক্ষ কোটি টাকা! যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো কোভিড কালীন ও কোভিড পরবর্তী ঝড়ঝাপ্টা সামাল দিতে সক্ষম হয়, রিজার্ভব্যাঙ্ক জানাল যে ২০২৩-এ তার সামনে বড় ধরনের সংকট আসছে।

২০২২-২৩-এ আর্থিক বৃদ্ধির যে আশা করা হয়েছিল, প্রকৃত বৃদ্ধির পরিমাণ তার থেকে কম হবে বলে অনুমান। গত অর্থবর্ষের তুলনায় এই অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে উৎপাদন ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে ৪.৩ শতাংশ হারে। উৎপাদন ও খনি — এই দু’টি ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে যেগুলো শ্রম নিবিড় শিল্প, আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে রপ্তানি হ্রাস, অত্যন্ত উচ্চহারে মূল্যস্ফীতি, ইনপুটের মূল্য বৃদ্ধি, যা দেশের আনুমানিক বৃদ্ধির হারকে টেনে নিচে নামিয়েছে। গ্রামীণ উদ্বৃত্ত শ্রমকে এই উৎপাদন ক্ষেত্রে স্থান করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে সুযোগ থাকে, তা বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। সরকারি তথ্যই তা কবুল করেছে। কোভিড হানা দেওয়ার আগে থেকে ভারতের মন্থর আর্থিক বৃদ্ধি এখনও বহাল রয়েছে, আম জনতার ক্রয় ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় বাজারে চাহিদার যে নাছোড় অভাব তৈরি হয়েছে, এই ধুঁকে ধুঁকে চলা আর্থিক পরিমন্ডলে বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগ করছে না। রেকর্ডবেকারত্ব অর্থনীতির সংকটকে দিনের পর দিন আরও ঘোরালো করে তুলেছে। বিশ্ব জুড়েই ২০২২-এ থমকে যাওয়া আর্থিক বৃদ্ধি, ২০২৩এ দুনিয়ায় নেমে আসা আর্থিক মন্দার সম্ভাবনা ঋণ ব্যবসার উপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দেশীয় অর্থনীতির আকাশে তাই অনিশ্চয়তার নিকষ কালো মেঘ। সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়ার সাবধানবাণী আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো অনবরত দিয়ে চলেছে। নতুন বছর তাই অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হচ্ছে ভারতীয় বামপন্থীদের কাছে।

- অতনু চক্রবর্তী

খণ্ড-29
সংখ্যা-50