এবারের নির্বাচন সংবিধানকে বাঁচানোর নির্বাচন
save-the-constitution

(দৈনিক প্রতিদিন পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে ২২ এপ্রিল ২০২৪, পার্টির সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যর
এই নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আমরা তা পুনর্মুদ্রণ করলাম (শিরোনাম আমাদের)।
- সম্পাদকমন্ডলী, আজকের দেশব্রতী)

দশ বছর ধরে ট্রেলার চললে আসল পিকচার এবার কেমন হবে?

সাত দফা নির্বাচনের প্রথম দফা সম্পন্ন। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রথম দফায় ভোটের হার বেশ কম। অশান্ত মণিপুর আবার জ্বলে উঠেছে, নাগাল্যান্ডের অন্তত চার লক্ষ ভোটারের বুথে একটিও ভোট পড়েনি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, রাজস্থানে ভোট পড়েছে বেশ কম। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের ভাষায় নিস্তরঙ্গ নির্বাচনের সংকেত। দেশজুড়ে শাসক দলের প্রচার ঝড় জনমানসে কেন ঢেউ তুলতে পারছে না? মোদীর ‘চারশ পার’ আহ্বানে কেন বুথে বুথে ভোটারদের ঢল নামল না? এর একটা জবাব অনুমান করা যায় সিএসডিএস-লোকনীতি প্রাক-নির্বাচন সমীক্ষা থেকে।

উনিশটি রাজ্যের দশ হাজার ভোটারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এবারের নির্বাচনে তাঁদের বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী। মার্চের শেষ ও এপ্রিলের গোড়ায় অনুষ্ঠিত এই সমীক্ষায় ২৭ শতাংশের জবাব বেকারত্ব। ২৩ শতাংশের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মূল্যবৃদ্ধি। এর বিপরীতে শাসক দলের দাবি করা সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব রাম মন্দিরে উৎসাহ দেখিয়েছেন ৮ শতাংশ। মাত্র ২ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির উন্নতি ঘটার প্রচারে বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন।

জনগণের এই চিন্তাভাবনা সাম্প্রতিক বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা ও অধ্যয়নেও ধরা পড়ে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ভারতে কর্মহীনদের ৮০ শতাংশেরও বেশি যুব প্রজন্মের। শিক্ষিত বেকারের হার ক্রমবর্ধমান — উচ্চশিক্ষা ও বেকারত্বের সম্ভাবনা বলতে গেলে সমানুপাতিক। কলেজ পেরোনোর পর ২৯ শতাংশ বেকার। মুম্বই আইআইটি’র সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান বলছে ৩৬ শতাংশ এখনও কাজ পায়নি। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাজনিত লাভ কথাটা একসময় খুব চালু হয়ে গিয়েছিল। ভারতের জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে। কিন্তু সেই জনসংখ্যার বড় অংশ যদি কর্মহীনতার শিকার হয়ে পড়ে তাহলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পর্যবসিত হবে জনসংখ্যাজনিত বিপর্যয়ে। ব্যাপক কর্মহীনতা, বাস্তবিক মজুরি সংকোচন এবং ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী আঘাতে শ্রমজীবী সমাজের বড় অংশ আজ ভীষণভাবে নাজেহাল।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে বিজেপির এবারের ম্যানিফেস্টোর আদৌ কি কোনো সামঞ্জস্য আছে? দশ বছর আগে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন সেসব প্রতিশ্রুতিকে কিছুদিনের মধ্যেই অমিত শাহ বলেছিলেন জুমলা। ভারতের রাজনীতিতে জুমলা শব্দের সঙ্গে সম্ভবত ব্যাপক জনগণের এই প্রথম পরিচয়। এর কিছুদিন পরেই এল ২০২২ সালকে ঘিরে এক প্রস্থ লক্ষ্য — সকলের জন্য পাকা বাড়ি, জল ও শৌচাগারের ব্যবস্থা, চব্বিশ ঘণ্টা বিদ্যুৎ, কৃষকের দ্বিগুণ আয়, একশটি স্মার্ট সিটি, দশটি বিশ্বস্তরীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। দশ বছর পেরিয়ে দেশ ভেবেছিল এবার এই লক্ষ্য অর্জনের সমীক্ষা নিয়ে নির্বাচনে হিসেব হবে। কিন্তু এবার গোলপোস্ট আরও পঁচিশ বছর এগিয়ে দেওয়া হল — ২০৪৭ সালে বিকশিত ভারত। দায়িত্বশীল আমলাদের দিয়ে বলানো হচ্ছে বেকারত্ব এবং মূল্যবৃদ্ধি শাশ্বত সমস্যা এবং সরকারের এ’ব্যাপারে তেমন কিছু করণীয় নেই। জুমলার নতুন প্রতিশব্দ ‘মোদীর গ্যারান্টি’ এ’ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব।

অর্থনীতির ব্যাপারে সরকারের মূল প্রচার হল ভারত এখন পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। কিন্তু প্রতিব্যক্তি আয়ের নিরিখে আমরা যে পৃথিবীর একেবারে শেষের সারিতে, প্রতিবেশী সমস্ত দেশের পেছনে, সে কথা ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’ কায়দায় গোপন রাখা হয়। ভারতের আর্থিক বৈষম্য আজ যে ঔপনিবেশিক জমানাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে, গোপন রাখা হয় সে কথাও। সর্বোচ্চ এক শতাংশ ধনকুবেরদের হাতে দেশের ৪০ শতাংশ সম্পত্তি এবং ২২ শতাংশ বার্ষিক আয় — সরকারের চোখে এ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। কোভিডকালে ভারতের বিলিয়নেয়ারদের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে, বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুশো — সরকারের চোখে এটাই হলো ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

সরকারের নীতি আয়োগের দাবি দেশে দারিদ্র্য বিরাটভাবে কমে গেছে। আজ মাত্র ৫ শতাংশ ভারতীয়কে নাকি গরিব বলা যায়। একই সাথে মোদী সরকার বিনামূল্যে আশি কোটি ভারতীয়কে মাসে পাঁচ কিলো খাদ্যশস্য বিতরণের কৃতিত্ব দাবি করে। এই দুই পরিসংখ্যানকে একমাত্র মোদী সরকারের প্রবক্তা এবং নীতি আয়োগের পক্ষেই মেলানো সম্ভব। মোদীর ঘোষণা একশ চল্লিশ কোটি ভারতীয়র আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই তাঁর লক্ষ্য। এই হল মোদী মিশন। আশি কোটি ভারতীয়র কি তাহলে কোনোরকমে পাঁচ কিলো রেশন পেয়ে বেঁচে থাকাটাই একমাত্র আকাঙ্ক্ষা?

পশ্চিমবঙ্গের এক নির্বাচনী সভায় মোদী বললেন গত দশ বছরে যা হয়েছে তা শুধুই ট্রেলার। আসল পিকচার এখনও বাকি। অন্য এক সমাবেশে মোদীর বক্তব্য, দশ বছরে শুধু স্টার্টার পরিবেশন করা হয়েছে। এবার মেইন কোর্সের পালা। মোদীর ঘোষিত ম্যানিফেস্টো বা তথাকথিত গ্যারান্টিকে ছাপিয়ে এই অঘোষিত আসল পিকচার বা মেইন কোর্স সংক্রান্ত ইশারাই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রহস্য।

to-save-the-constitution

এই ইশারা বুঝে ওঠা খুব কঠিন কাজ নয়। গত দশ বছরের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে মোদী সরকার সংবিধান ও সংবিধান-প্রদত্ত সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি বা বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্থার ভূমিকা সম্পর্কে কোনো তোয়াক্কা করে না। দেশের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একটি ছোট চক্রের হাতে কুক্ষিগত করা এবং অর্থব্যবস্থা ও যাবতীয় সম্পদ থেকে যথেচ্ছ মুনাফা অর্জনের ছাড় আদানি-আম্বানির মতো গুটিকয়েক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া — গত দশবছর ধরে, বিশেষত বিগত পাঁচ বছরে, এই অভিযান চলতে চলতে দেশ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যাকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এক নির্বাচনী নিরঙ্কুশ তন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন।

অনন্ত কুমার হেগড়ে, রাজস্থানের জ্যোতি মির্ধা বা উত্তরপ্রদেশের লল্লু সিং ও অরুণ গোভিলের মতো বিজেপি নেতা ও প্রার্থীরা খোলাখুলিভাবেই বলতে শুরু করেছেন যে সংবিধান সংশোধন বা নতুন সংবিধানের জন্যই মোদীর চারশোর বেশি আসন জেতার আহ্বান। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে থাকবে স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা বিবেক দেবরায় খবরের কাগজে রীতিমতো নিবন্ধ লিখে নতুন সংবিধানের ওকালতি করেছিলেন। আম্বেদকারের সংবিধানকে ঔপনিবেশিক সংবিধান বা বিদেশী সংবিধান হিসেবে অভিহিত করাটাও সংঘ পরিবারের চিরকালের প্রচার। সংবিধান গৃহীত হওয়ার সময় আরএসএস মুখপত্র অর্গানাইজার সম্পাদকীয় লিখে মনুস্মৃতিকে ভারতের প্রকৃত সংবিধান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

সংবিধানের পক্ষে ব্যাপক ভারতীয় জনগণকে সমাবেশিত হতে দেখে মোদী এবং শাহ উঠে পড়ে সংবিধান সম্পর্কে গ্যারান্টি দিতে শুরু করেছেন। নরেন্দ্র মোদী তো রাজস্থানের এক সভায় এমন কথাও বললেন যে স্বয়ং আম্বেদকার এলেও সংবিধানকে ধ্বংস করতে পারবেন না। কী অদ্ভুত অহঙ্কারী কথা! সংবিধান নির্মাতা আম্বেদকার আসবেন সংবিধানকে ধ্বংস করতে? মোদী যদি সত্যিই জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাইতেন তাহলে আম্বেদকারের বদলে গুরু গোলওয়ালকারের নাম নিতেন। আম্বেদকার তো জনগণকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন সংবিধানবিরোধী শাসকদের সম্পর্কে! এবারের নির্বাচন প্রকৃতই সংবিধানকে বাঁচানোর নির্বাচন। সাত দশকের নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় এমন নির্বাচন আগে আসেনি। সংবিধান ও গণতন্ত্র স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় ফসল, এই ফসলকে বাঁচাতেই হবে।

খণ্ড-31
সংখ্যা-15