deshabrati-logo-13-01-22
deshabrati-12-01-22

 against Deucha Mining Project

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৬ জানুয়ারি ২০২২ বীরভূম জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। সিপিআই(এমএল) লিবারেশন, স্বরাজ ইণ্ডিয়া, ইয়ং বেঙ্গল, আদিবাসী অধিকার ও বিকাশ মঞ্চ, অল ইণ্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, সারা ভারত কৃষক মহাসভা, আমরা এক সচেতন প্রয়াস, মহিলা স্বরাজ সহ বিভিন্ন সংগঠনের শ’খানেক কর্মী অংশ নেন। বাসস্ট‍্যাণ্ড থেকে মিছিল ডিএম দপ্তরে যায়।

স্মারকলিপিতে মূল দাবি ছিল,
১) অবিলম্বে দেয়ানগঞ্জের প্রতিবাদী গ্রামবাসীদের ওপর থেকে সরকারকে মামলা তুলে নিতে হবে।
২) ২০১৩’র আইন মাফিক কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা বিস্তারিতভাবে জনসমক্ষে আনতে হবে।
৩) পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট প্রশ্নে সংবেদনশীলতা দেখাতে হবে।
৪) খনির নামে এসসি-এসটি ও সংখ‍্যালঘুদের অধিকার হরণ বন্ধ করতে হবে।

সবদিক বিচার করে প্রকল্পটিকে বিপর্যয়কর আখ‍্যা দিয়ে প্রকল্প প্রত‍্যাহার করে নেওয়ার দাবি তোলা হয়।

প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাতে জেলাশাসক সম্পূর্ণ নতুন কথা শুনিয়েছেন। তিনি জানান, প্রকল্পটির ক্ষেত্রে ২০১৩’র জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত আইনটি প্রযোজ‍্যই নয়, কারণ সরকার জমি অধিগ্রহণ করছে না, সরকার জমি কিনে নিচ্ছে!

কিন্তু জমি কিনে নিলে পুনর্বাসন প‍্যাকেজের কথা কেন বলছে সরকার? সে প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি ডিএম। বিষয়টা যদি নিছক জমি কেনাবেচাই হয় তাহলে গ্রামবাসীদের ওপর অত‍্যাচার চলছে কেন? কেন সন্ত্রস্ত পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে? এসবের কোনও উত্তর নেই। তবে, গ্রামবাসীদের ওপর পুলিশী অত‍্যাচারকে ডিএম ‘অনভিপ্রেত’ বলেন। স্বীকার করে নেন যে সেরকম ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তাহলে গ্রামবাসীদের ওপর থেকে মামলা তুলে নেওয়া হচ্ছে না কেন? সেকথার উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

ডিএম বলেন, ইতিমধ‍্যেই প্রকল্পের প্রথম অংশের অধিকাংশ পরিবার জমি দেওয়ার স্বীকৃতিপত্রে সই করেছেন। যখন ডিএম’কে প্রশ্ন করা হয় যে, অসম্মতিপত্রে কতজন সই করেছেন, তখন জানা যায় যে সে রকম কোনও ফর্ম নেই। অর্থাৎ অস্বীকৃতি নথিভূক্ত করার কোনও জায়গাই নেই। তাহলে যারা সরকারকে জমি বিক্রি করবেন না তাঁদের কী হবে? একথার কোনও জবাব নেই।

Memorandum to District Magistrate

সব মিলিয়ে বোঝা যায় যে সরকার রাজ‍্যবাসীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ইচ্ছেমতো কাজ করছে। জোর করে সম্মতি আদায় করতে চাইছে। এবং ঠিক সেই সিঙ্গুরের সময়কার সরকারের মতোই ‘ইচ্ছুক চাষি’র গল্প হাজির করছে। ডিএম অফিস চত্ত্বরে বিক্ষোভসভায় বক্তারা বলেন, সরকার সাবধান না হলে পরিণতিও সিঙ্গুরের মতোই হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ‍্যালয়ের আইসা সভাপতি রুদ্র প্রভাকর দাস রাজ‍্যের সমস্ত দলিত ও আদিবাসীদের একজোট হয়ে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

৬ জানুয়ারি সন্ধ‍্যায় খবর আসে, ডেপুটেশন কর্মসূচির পরেই জেলাশাসক তড়িঘড়ি দেয়ানগঞ্জে গিয়ে হাজির হন স্থানীয় মানুষকে বোঝাতে। মানুষের সাথে কথা বলতে প্রকল্প এলাকায় এটিই ছিল জেলাশাসকের প্রথম পদার্পণ।

পরদিন, ৭ জানুয়ারি, উদ‍্যোক্তা সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে ২১ জনের প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে যান। বিশেষত দেয়ানগঞ্জের মানুষের সাথে কথা বলেন তাঁরা। সেখানকার মানুষেরা জানান যে তাঁরা কয়লা খনি চান না। জেলাশাসক দাবি করেছেন যে অধিকাংশ মানুষ জমি দিতে সম্মতি জানিয়েছেন — কিন্তু একথা সম্পূর্ণ মিথ‍্যা বলে জানান গ্রামবাসীরা। দেয়ানগঞ্জের আদিবাসী মানুষেরা একথা জানিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ব‍্যক্ত করেন এবং তাঁদের সাথে জেলা প্রশাসন প্রতারণা করছে বলে জানান। তাঁরা একথাও জানান যে আগাম খবর না দিয়ে ৬ তারিখ বিকেলে হঠাৎ জেলাশাসক এসে নিজের কিছু কথা বলে চলে যান, কারও কাছে কিছু জানতে চাননি। প্রকল্প এলাকার তিনটি গ্রামের বহু মানুষের সাথে কথা বলে প্রতিনিধিদল। সকলে বারবার জানিয়েছেন যে তাঁরা কয়লা খনি চান না, জমি দেবেন না।

প্রতিনিধিদলের এলাকা পরিদর্শন সম্পর্কে জেলাশাসকের যে মন্তব‍্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তাকে নিন্দা জানিয়েছেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের রাজ‍্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার। জেলাশাসক বলেছেন যে পরিদর্শকেরা উসকানি দিতে গেছে। অভিজিৎ মজুমদার বলেন, জেলাশাসকের একথা বলার অধিকার নেই। জেলাশাসক আসলে শাসক দলের নেতার ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন। যে কোনও রাজনৈতিক দল বা ব‍্যক্তির অধিকার আছে ওই এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের কথা শোনার এবং নিজেদের কথা বলার। বাংলার গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন সকলকে স্থানীয় মানুষের প্রকৃত মতামত জানার আহ্বান রেখে অভিজিৎ মজুমদার জানিয়েছেন, এই বিপর্যয়কর খনি প্রকল্প সম্পর্কে জনমত গঠন করা ও প্রকল্প এলাকার মানুষের পাশে রাজ‍্যবাসীকে দাঁড় করানোর লক্ষ‍্যে পার্টি অন‍্যান‍্য সম মনোভাবাপন্ন শক্তিকে ঐক‍্যবদ্ধ করে লড়াই চালিয়ে যাবে।

allowed to continue

একমাস আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলার বিশেষত, দক্ষিণাংশে গঙ্গার দুপাড়ে কৃষিপণ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। মরশুমটা শীতের শাকসবজির। শীতের ফসল প্রচন্ড আবহাওয়া কাতর হয়। সেখানে বিধ্বংসী বর্ষণ কদিন যাবত নেমে আসার প্রকোপ ছিল কল্পনাতীত। প্রকৃতির এই অকাল ঘোর বিরূপ হয়ে ওঠা নিয়ে পরিবেশবিদ, প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বহুবছর যাবত কেবল জলবায়ুর নিজের মধ্যেই বেগতিক হয়ে ওঠা কারণ বলে মনে করছেন না, দাবি করছেন এর জন্য দায়ি মুনাফা লোলুপ পুঁজির লালসা, যে পুঁজি 'উন্নয়নে'র নামে প্রাকৃতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে চলছে। আর তার ভয়ঙ্কর মাশুল গুণছে মরশুমী চাষ ও ফসলের প্রান্তর। এই দৌরাত্ম্য মদত আছে কেন্দ্র-রাজ্যের শাসকদের। এহেন ধ্বংসাত্মক নীতির পরিণামে বিপর্যয় যখন গত মাসে নেমে আসে, তখন গণ্য করা হয়েছিল এরকম দুর্যোগ বিগত তিন-চার দশকে ঘটেনি। তার ফলে মাঠের ফসল মারা যায় মাঠেই, আর গনগনে আঁচ লাগে কৃষিপণ্যের মজুদদারি এবং পাইকারি ও খুচরো সবরকমের বাজারে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা কি করবেন বুঝে উঠতে পারেননি। কিছু কিছু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে। এই গ্রামীণ ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি শহর ও শহরতলিতে সমস্ত কৃষিপণ্যের দাম ৩০-৪০-৫০-৬০ শতাংশ চড়ে যায়। রাজ্য সরকারের কৃষি বিভাগ ও মার্কেটিং বিভাগ আশ্বাস দিতে থাকে তিন-চার সপ্তাহে ফসলের প্রাদুর্ভাব ও অগ্নিমূল্য কেটে যাবে। বড় গলায় বলে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও কৃষিপণ্যের ক্রেতাসমাজের পাশে থাকবে তৃণমূল সরকারের 'বাংলা সুফলা প্রকল্প'। এই প্রকল্পে চাষিদের সাথে অন লাইনে সরকারের পণ্য বেচা-কেনার এবং সেই পণ্য ন্যায্য মূল্যে উপভোক্তা নাগরিক সমাজের কাছে বণ্টনের সেতু তৈরি হবে। কিন্তু ২০১৪ সালে চালু হওয়া 'বাংলা সুফল প্রকল্পে' ক্রেতাদের কাছে স্থায়ী দোকান ও চলমান কাউন্টারের সংখ্যা এখনও এত কম যে, একে কিছুতেই গণবণ্টন ব্যবস্থার সমতুল মানা যায় না। আর, দামেও খোলা বাজারে বিক্রির মূল্যের তুলনায় গড়ে এক-দু'টাকা কম মাত্র। অন্যদিকে, কৃষকদের থেকে সরাসরি ফসল কেনার পরিকাঠামোয়ও খুবই কম। এ ব্যাপারে খাদ্যশস্যের বিগ বাজারগুলোর সরাসরি সংগ্রহের হাত অনেকবেশি লম্বা-চওড়া, তার সাথে 'সুফল বাংলা প্রকল্প' কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই থাকে না, আসে না। সুতরাং রাজ্য সরকারের এই প্রকল্প এখনও উল্লেখযোগ্য কিছু, প্রতীকী পাইলট প্রজেক্টের মতো চালু আছে, মাসখানেক সময় আগেকার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির কোনও উপশম পুষিয়ে দিতে পারেনি।

উপরোক্ত বিপর্যয়ের ক্ষতে প্রলেপ দিতে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রক দাবি করছে, বেনো জল বের করায় সাহায্য করা সহ নতুন করে স্বর্ণ ধান চাষের জন্য বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। তিনটি জেলা — পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগণা ও দক্ষিণ ২৪ পরগণায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষের জন্য ৪ লক্ষ চাষিকে স্বর্ণ ধান চাষের বীজ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে অনুমান ২.৭ লক্ষ টন ধান হবে, যে ধানচাল দিয়ে রেশনে বিনামূল্যে গণবণ্টনের মজুদ তৈরি করা সম্ভব হবে। সে না হয় হবে, তবু যে ক্ষতিপূরণের দাবি রয়ে গেছে সে ব্যাপারে সরকার থাকছে নিষ্ক্রিয় নিস্পৃহ। এ চলতে দেওয়া যায় না।

Expose Women Character Of The Sangh

ভারতের মুসলমান মহিলাদের নতুন বছর শুরু হল বর্ষ পুরানো ইসলামবিদ্বেষী অবমাননার এক নতুন সংস্করণের অপমান দিয়ে, হিন্দু প্রভুত্ববাদী শক্তির দ্বারা। সোশ‍্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকে মুসলমান মহিলাদের নাম ও ছবি চুরি করে একটি অ‍্যাপের মাধ‍্যমে তুলে ধরা হল অনলাইনে ‘নিলাম’ করার বিজ্ঞাপন দিয়ে। এই মুসলমান মহিলাদের অনেকেই হলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও আন্দোলনকর্মী। গতবছর একই রকম একটি অ‍্যাপের মাধ‍্যমে মুসলমান মহিলাদের অনলাইনে ‘নিলাম’ করা হয়েছিল। এবারে সেই অ‍্যাপেরই এক নয়া সংস্করণ। অ‍্যাপটির নাম দেওয়া হয়েছে অবমাননাকর গালি ব‍্যবহার করে। হিন্দু প্রভুত্ববাদীরা মুসলমান মহিলাদের প্রতি এই গালি ব‍্যবহার করে থাকে, আমরা সেইসব শব্দ উচ্চারণ করব না।

দিল্লী পুলিশ জানিয়েছে যে তারা প্রথম অ‍্যাপটির বিষয়েই এখনও তদন্ত এগিয়ে উঠতে পারেনি। ফলস্বরূপ দুষ্কৃতিরা অবাধ ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। সর্বশেষ ক্ষেত্রটিতে অবশ‍্য মুম্বই পুলিশ খানিক এগিয়েছে এবং শ্বেতা সিং নামে এক তরুণী ও বিশাল কুমার ঝা নামক এক তরুণকে দুস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তদন্ত এগিয়ে নিয়ে এর পেছনে থাকা হিন্দু প্রভুত্ববাদী নেটওয়ার্ক ও তার কুশীলবদের সমগ্র চক্রটিকে উন্মোচিত করা একান্ত জরুরি।

একথা অবশ‍্যই স্মরণ করতে হবে যে এই ‘নিলাম’ অ‍্যাপগুলি আসলে মুসলমান মহিলাদের যৌন নিপীড়নের শিকার বানানোর বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রেরই অংশ মাত্র। যখন জামিয়া-মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্রী তথা সিএএ-বিরোধি আন্দোলনকর্মী সাফুরা জারগারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তখন তাঁর গর্ভবতী অবস্থাকে যৌন কুৎসার বিষয় বানিয়েছিল হিন্দু প্রভুত্ববাদী বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রের নেতৃত্ত্বে অনলাইন হাঙ্গামাকারী জনতা। যখন ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছিল তখন বিজেপি নেতারা জনসমক্ষে প্রকাশ‍্য বিবৃতি জারি করে বলেছিল যে হিন্দু পুরুষেরা এবার কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবে আর কাশ্মীরী মহিলাদের ‘বিবাহ’ করতে পারবে।

অবাক বিষয়, এই হিন্দু প্রভুত্ববাদীরাই, যারা মুসলমান মেয়েদের নিজের সম্পত্তি মনে করে, হিন্দু মেয়েদেরও যৌনতা ও প্রজননের যন্ত্র হিসেবে গণ‍্য করে। যতি নরসিংহানন্দ, যিনি মুসলমানদের গণহত‍্যা করার ডাক দিয়ে ঘৃণা সমাবেশ সংগঠিত করেন, বারংবার মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মেয়েদেরই যৌন সম্পত্তি ও শিশু উৎপাদন যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। য়াতি বলেছেন যে মুসলমান মহিলারা সব পুরুষের যৌনতার কাছে নিজেদের সহজলভ‍্য করে থাকেন। তারপর তিনি বলেন যে হিন্দু মেয়েদের অবশ‍্যই মুসলমান মেয়েদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে আরও বেশি ‘পবিত্র ডিএনএ’ সম্পন্ন সন্তান উৎপাদন করে, এবং তা করা সম্ভব হবে ‘ধর্মাচার্যদের’ (তাঁর মতো) অনেক স্ত্রী রাখার অনুমোদন দিয়ে।

যতির কথাগুলোকে ‘প্রান্তীয়’ মতামত বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। মুসলমান মেয়েদের অনলাইন নিলামে চড়নো অ্যাপগুলির একটির নির্মাতা শ্বেতা সিং কিছু পোস্টারও বানিয়েছেন হিন্দু মেয়েদের শিশু উৎপাদনকারী যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে। এই পোস্টারগুলি হিটলারী জমানার জার্মানিতে প্রচারিত পোস্টার থেকে নকল করা। ফ‍্যাসিস্টরা মেয়েদের দাসী হিসেবে গণ‍্য করে। সংঘ পরিবারের স্বপ্ন বাস্তব করে ভারত যদি কর্তৃত্ববাদী হিন্দু নেশন হয়ে ওঠে তাহলে সেই ভারতে মেয়েদের অবস্থা কী হবে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই ‘নিলাম’ অ‍্যাপ আর য্যোতি নরসিংহানন্দের বাণী।

ভারতের গরিব জনতা হিন্দু প্রভুত্ববাদীদের দ্বারা একেকটা সম্প্রদায়ের মহিলাদের ‘গর্ভ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সমগ্র সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার গণহত‍্যা সংগঠিত করতে দেখেছে। তাঁদের কাছে এ কোনও নতুন বিষয় নয়। ১৯৯০ দশকে সংঘী-সামন্তী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠি রণবীর সেনা দলিত ও অতি-পিছড়ে বর্গের গ্রামকে-গ্রাম নরসংহার সংগঠিত করেছিল। ওরা বিশেষভাবে নিশানা বানিয়েছিল ওইসব সম্প্রদায়ের মহিলাদের। রণবীর সেনাপ্রধান ব্রহ্মেশ্বর সিং মহিলা ও শিশুদের নিধন করার যুক্তি হিসেবে বারংবার বলেছিল, “মেয়ে সাপেরা সাপেরই জন্ম দেয়, এবং সাপের বাচ্চারা বড় হয়ে সাপই হয়”। আজ আমরা সেই একই বাণী একই শব্দ শুনছি — মুসলমানদের গণহারে হত‍্যা করার আহ্বান করা হচ্ছে এবং মুসলমান মহিলাদের যৌন সম্পত্তি ও প্রজনন যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

এরকম এক সময়ে ভারতের গ্রামীণ ভূমিহীন গরিবদের অতি অবশ‍্যই তাঁদের মুসলমান ভাইবোনদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। জার্মানির মহান ফ‍্যাসিবাদ-বিরোধী কবি বের্টল্ট ব্রেখট যেমন বলেছেন, “নিপীড়িতের জন‍্য নিপীড়িতের অনুকম্পা অপরিহার্য। এটাই দুনিয়ার একমাত্র আশার জায়গা।”

- এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ৪ জানুয়ারি ২০২২

party leader Kshitish Biswal

উড়িষ্যার বর্ষীয়ান সিপিআই(এমএল) নেতা কমরেড ক্ষিতীশ বিসওয়াল ১২ জানুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় সমগ্র পার্টি সংগঠন ও সুধীজন গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শোকপ্রকাশ করতে গিয়ে পার্টির সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছেন, আমরা এমন এক প্রবীণ নেতাকে হারালাম যিনি উড়িষ্যায় ও তার বাইরে পার্টিকে শক্তিশালী করে তুলতে প্রভূত অবদান রেখে গেছেন। কমরেড ক্ষিতীশ বিসওয়াল লাল সেলাম।

কমরেড ক্ষিতীশ বিসওয়াল ছিলেন আজীবন বামপন্থী। প্রথমে সিপিআই, তারপরে সিপিআই(এম) করতেন। ১৯৮০-৯০ দশকের সন্ধিক্ষণে তিনি সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সিপিআই(এমএল) সংগঠনে যুক্ত হন। এ নিছক দল বদল ছিল না, এটা ছিল সিপিআই(এম)-এর বামপন্থা'র নামে নানা রূপে সুবিধাবাদী ধারার বিরুদ্ধে শুরু করা মতাদর্শগত-রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বাভাবিক রূপান্তর। এক উল্লেখযোগ্য কমিউনিস্ট কর্মী-সমর্থকসারি সহ কমরেড ক্ষিতীশ বিসওয়াল নতুন পার্টিতে চলে আসেন। তার পর থেকে উড়িষ্যায় আমাদের পার্টির মানচিত্র, উদ্যোগ ও সক্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে। প্রয়াত প্রবাদপ্রতীম পার্টি নেতা নাগভূষণ পট্টনায়কের পাশাপাশি ক্ষিতীশ বিসওয়ালের নেতৃত্বে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন অনুসৃত সংগ্রামী বামপন্থার পতাকা উড়িষ্যায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ভুবনেশ্বরে কমরেড নাগভূষণের মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও স্মৃতিবিজড়িত অফিসভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কমরেড ক্ষিতীশ বিসওয়ালের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তাঁর বিশেষ পরিচিতি গড়ে উঠেছিল কৃষক সংগ্রামের নেতা হিসেবে। বহু কৃষক আন্দোলনের পেছনে তিনি ছিলেন সংগঠক। প্রবলভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন কলিঙ্গনগরে কৃষক গণহত্যার বিরুদ্ধে। তাঁর এই সমগ্র সুদীর্ঘ পরিচিতি তাঁকে উড়িষ্যার সীমানা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী অন্ধ্র ও বাংলায়ও কম-বেশি পরিচিত করে তুলেছিল। তিনি ছিলেন দৃঢ় পার্টি মানসিকতার ও দরাজ হৃদয়ের ব্যক্তিত্ব, খুবই সদালাপী ও বন্ধুবৎসল; নির্ভরযোগ্য সহায়তার নিশ্চিত চরিত্র। জীবনের শেষপর্বে বার্ধক্যের কারণে পার্টি কাজ করতে পারতেন না। কিন্তু পার্টি অফিসে যতদিন সম্ভব হয়েছে আসতেন। এরকম এক বিশিষ্ট পার্টি নেতার জীবন থেকে বহু অমূল্য শিক্ষা নেওয়ার আছে।

break the pigeon house

বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে জোর করে বিরোধীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আটকানো, মস্তানদের মাধ্যমে ছাপ্পা ভোট দিয়ে শেষ বিচারে ভোট গুনতে না দিয়েই পঞ্চায়েত দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামাঞ্চলের ক্ষমতা দখল করেছিল। তারপর কার্যত গ্রামাঞ্চলে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উপর নামিয়ে এনেছে কয়েকজনের রাজত্ব। সরকারি আমলাদের দু’একজনকে জো-হুজুরে পরিণত করা হয়েছে। দুর্নীতি ও দলবাজি অবাধ ও বেআব্রু হয়ে উঠেছে। এই সবের বিরোধিতা করলেই নামানো হচ্ছে সন্ত্রাস, দমন, জরিমানা এবং পুলিশী নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা। তাই মানুষের বিক্ষোভ বেড়ে চলেছে। মানুষের জীবন-জীবিকার সংকট ও দুর্নীতি-দলবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষোভ-প্রতিবাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়াই এই সময়ের দাবি। অন্যান্য গ্রামপঞ্চায়েতের মতোই পুর্ব বর্ধমান জেলার পুর্বস্থলী ২নং ব্লকের মেড়তলা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ১০০ দিনের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। মানুষ বছরে ১৫ দিনও কাজ পায়নি। যেটুকু কাজ দিয়েছে তাতে অনেকেই দীর্ঘদিন পরও মজুরি পায়নি। যারা মজুরি পেয়েছে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম পেয়েছে। যেখানে বর্তমান সরকারি এমজিএনআরইজিএ আইনে দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ২১৩ টাকা, সেখানে দেওয়া হয়েছে দৈনিক ১৫০ টাকা, ৭৫ টাকা, কোথাও আরও কম। বিডিও ডেপুটেশনে বলা হল মাপ অনুযায়ী মজুরি পেয়েছেন।

কিন্ত বাস্তব হল মেড়তলা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার কোথাও ১০০ দিনের কাজের মাটি জরিপই করা হল না। উল্টো দেখা গেল বোর্ড লাগানো হয়েছে কিন্তু রাস্তার কাজ না করেই টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। আমবাগানে ট্রাক্টর ঘুরিয়ে মাষ্টার রোল করে টাকা তোলা হয়েছে। দেখা গেল যেখানে অনেকেই মজুরি পেলেন না বা কম মজুরি পেয়েছেন। অথচ তৃণমূলের এক লোকাল নেতা কোনও কাজ না করেই পঞ্চায়েতের প্রতিটি গ্রামসভার কাজের মাষ্টাররোলে তিনি এবং তাঁর স্ত্রীর নামে পুরো মজুরি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ঘরের টাকা নিয়ে চলছে তোলাবাজি। অনেক গরিব মানুষের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। তাই কাঁচাবাড়ি থাকা সত্ত্বেও গরিব মানুষের ঘর হল না, অথচ অনেক দোতলা বাড়ির মালিকের নামেও টাকা তোলা হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে গত ১১ জানুয়ারী মেড়তলা গ্রাম পঞ্চায়েতে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পুর্বস্থলী-কাটোয়া এরিয়া কমিটির পক্ষ থেকে ডেপুটেশন সংগঠিত করা হল। ১০ জানুয়ারী অঞ্চলের সমস্ত গ্রামে মাইক নিয়ে প্রচার করা হয়। ডেপুটেশনে প্রতিনিধিত্ব করেন এরিয়া কমিটির সম্পাদক শিবু সাঁতরা ও কমিটি সদস্য বিনয় মন্ডল ও পার্থ মন্ডল। বিক্ষোভসভায় বক্তব্য রাখেন রাজ্য কমিটির সদস্য আনসারুল আমন মন্ডল ও আরওয়াইএ’র রাজ্য নেতা রণজয় সেনগুপ্ত। আলোচনার সময় দুর্নীতি প্রশ্নে নির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে সময় দেওয়া হল। সমাধান না হলে আগামীদিনে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়া হবে।

বিক্ষোভসভায় তোলা দাবিগুলি হল
১) এমজিএনআরজিএ প্রকল্পের কাজে বকেয়া মজুরি অবিলম্বে দিতে হবে। কম মজুরি দেওয়া চলবেনা। পর্যাপ্ত কাজ দিতে হবে। দুর্নীতি ও দলবাজি বন্ধ করতে হবে। বছরে ২০০ দিন কাজ ও দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ।

২) বাংলা আবাস যোজনার ঘরের নতুন তালিকা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করতে হবে। পুরনো ঘরের তালিকার বকেয়া তালিকা জানাতে হবে।

৩) অনতিভুক্ত ভাগচাষী, লীজ ও পাট্টাহীন গরিব কৃষকদের সরকারি প্রকল্পের সুযোগ দিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ধান সংগ্রহ নিয়ে গরিব কৃষকদের বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৪) সারের কালোবাজারী বন্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রি বন্ধ করতে হবে।

Jalpaiguri District Conference

বিজেপি’র দেশ বিক্রি, হিংসা, বিদ্বেষ-বিভাজনের ঘৃণ্য রাজনীতিকে নির্মূল করতে ও তৃণমূলের দুর্নীতি, দলতন্ত্র, সন্ত্রাস ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ৮ জানুয়ারী ২০২২ জলপাইগুড়ি দ্বাদশ জেলা সম্মেলন জলপাইগুড়ি শহরের বান্ধব নাট্যসমাজ হলে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের সভাগৃহ নামাঙ্কিত করা হয়েছিল কমরেড কার্তিক রায় ও কমরেড মিনু দেবগুপ্তের নামে। শহরের নামকরণ করা হয়েছিল জলপাইগুড়ি শহরের অগ্নিযুগের বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্তের নামে। বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন বিপ্লবী বাঘাযতীনের সহযোদ্ধা যাকে ইংরেজ জমানায় ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। পূর্ব নির্ধারিত দু’দিনের সম্মেলন কোভিড মহামারীর পুনরায় প্রকোপের কারণে একদিনে সম্পন্ন করা হয়। প্রারম্ভে রক্তপতাকা উত্তোলন করেন জেলার পার্টি নেত্রী রেবা দাস। সমগ্র অধিবেশন পরিচালনার জন্য প্রদীপ গোস্বামী, হবিবর রহমান, উদয় শংকর অধিকারী ও প্রদীপ দেবগুপ্তকে নিয়ে সভাপতিমন্ডলী গঠিত হয়। বর্ষীয়ান নেতা কমরেড মিহির সেন গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। তারপর রাজ্য কমিটি থেকে আগত পর্যবেক্ষক পবিত্র সিংহ তাঁর বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত পার্টির রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার জাতীয় পরিস্থিতি, রাজ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনে পেশ করা প্রতিবেদনের উপর ১৭ জন বক্তব্য রাখেন। বক্তাদের মধ্যে মহিলা প্রতিনিধি ছিলেন ৩ জন। বক্তব্য রাখেন রাজ্য কমিটির সদস্য বাসুদেব বসু। তারপর বিদায়ী জেলা সম্পাদক ভাস্কর দত্ত প্রতিনিধিদের বক্তব্য, পরামর্শের সারসংকলন করে সংযোজন ও সংশোধন সহ প্রতিবেদনকে সমৃদ্ধ করে বক্তব্য রাখেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। মাঝে প্রয়াত মিনু দেবগুপ্তের কন্যা প্রমিতা দেবগুপ্ত কবিতা আবৃত্তি করেন। সম্মেলনে মোট প্রতিনিধি ছিলেন ৬০ জন, পর্যবেক্ষক ছিলেন ৫ জন। সবশেষে ১৭ জনের জেলা কমিটি নির্বাচিত হয়। সম্মেলন কক্ষ থেকে ১৬ জনকে নির্বাচিত করা হয়। পরবর্তীতে ১ জনকে যুক্ত করার কথা ঘোষিত হয়। ২ জন মহিলা জেলা কমিটির সদস্য হন। নব নির্বাচিত কমিটি ভাস্কর দত্তকে জেলা সম্পাদক হিসাবে পুননির্বাচিত করে। সম্মেলন কক্ষ থেকে আগামী ২৩-২৪ দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট সফল করে তোলার আহ্বান জানানো হয়। সেইসঙ্গে জোরের সাথে ধানের সহায়ক মূল্য নিয়ে সরকারি উদাসীনতা, ফড়ে দালাল মারফত স্বল্পমূল্যে ধান কিনে নেওয়া, সারের কালোবাজারি নিয়ে গ্রামীণ প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন ও কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তাব নেন।

conference was held at Bishnupur

শহরের গোয়ালাপাড়া কমিউনিটি হলে বিষ্ণুপুরের প্রথম আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। পতাকা উত্তোলন করেন কমরেড তিতাস গুপ্ত। বেদীতে ফুলমালা দিয়ে শহীদ স্মরণ এবং নীরবতা পালনের পর সম্মেলনের অধিবেশন শুরু হয়। প্রারম্ভিক ভাষন দেন রাজ্য কমিটির সদস্য কমরেড ফারহান হোসেন খান। এরপর বিগত একবছর ধরে বিষ্ণুপুরে আমাদের কাজের একটি মৌখিক রিপোর্ট রাখেন তিতাস গুপ্ত। আগামী দিনে এলাকায় পার্টির কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপস্থিত ৩৫ জন পার্টি সদস্যের মধ্যে ১৮ জন তাঁদের মতামত রাখেন। সবশেষে৬ জন মহিলা সদস্যসহ সহ ১৭ জনের অঞ্চল কমিটি গঠিত হয়। নবগঠিত কমিটি জেলা পর্যবেক্ষক কমরেড বৈদ্যনাথ চিনার উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে তিতাস গুপ্তকে সম্পাদক নির্বাচিত করেন। এর পর জেলা সম্পাদকের সমাপ্তি ভাষন দিয়ে সম্মেলন শেষ হয়। সম্মেলন থেকে একগুচ্ছ প্রস্তাব নেওয়া হয়।

(১) আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং স্বৈরাচারী ও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত টিএমসি পরিচালিত পৌরসভার বিরুদ্ধে বাম-গণতান্ত্রিক মানুষের ব্যাপক জোট গড়ে তোলার চেষ্টার সাথে সাথে কয়েকটি সিটে লড়াই করা হবে।

(২) বিষ্ণুপুর শহরের ঐতিহাসিক জলাশয়গুলিকে সংস্কার করে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং মাছ চাষের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সহ শহরের ঐতিহ্য শালি তাঁত, কাঁসা-পিতল, শাঁখা, লন্ঠনের মতো হস্তশিল্পে সরকারি আর্থিক সহায়তা সহ বিপণনের দাবিকে মানুষের সামনে জনপ্রিয় ভাবে নিয়ে আসা হবে আগামী পৌরসভা নির্বাচনে।

(৩) আগামী ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি সারা ভারত শিল্প ধর্মঘটের (ভারত বনধ) দিন সরকার নির্ধারিত মজুরির দাবিতে পৌরসভাতে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক হরতাল করা হবে। এজন্য ১৯ টি ওয়ার্ডে প্রচার সংগঠিত করা হবে।

(৪) আগামী ২৩ জানুয়ারি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে “স্বাধীনতার ৭৫ বছরে নেতাজীকে ফিরে দেখা” বিষয়ের উপর ৫ এবং ৬নং ওয়ার্ডের নাগরিকদের আলোচনা সভা সংগঠিত করা হবে।

(৫) আগামী ২৮ জানুয়ারি জেলা সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ৫ এবং ৬নং ওয়ার্ডে প্রতিটি বাড়িতে অর্থ সংগ্রহ অভিযান করা হবে যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

A convention

১৭ জানুয়ারি জেলায় জেলায় ডেপুটেশন বিক্ষোভের ডাক

সবং সজনীকান্ত কলেজের অধ‍্যাপিকা পাপিয়া মাণ্ডি জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাঁর লড়াইকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সংগঠন ‘প্রতিবাদী ঐক‍্য মঞ্চ’ গঠন করেছে। গত ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মঞ্চের পক্ষ থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ধারাবাহিক প্রচার আন্দোলন চালিয়ে ৯ জানুয়ারি মেদিনীপুর শহরের প্রান্তে আদিবাসী গ্রামের পাশে অনুষ্ঠিত হল কনভেনশন।

৯ জানুয়ারি ডোমবারিবুরু শহিদ দিবস। ধরতি আবা বিরসা মুণ্ডার ডাকে উলগুলানের চূড়ান্ত পর্বে “আবুয়া দিশম, আবুয়া রাজ” শ্লোগান তুলে জমায়েত হওয়া আদিবাসীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। কয়েক হাজার আদিবাসী প্রাণ দিয়েছিলেন ডোমবারি পাহাড়ে। এই বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানিয়ে কনভেনশন শুরু হয়।

কনভেনশনে পেশ করা প্রস্তাবনার মূল বিন্দুগুলি সংক্ষেপে নিম্নরূপ।

  • আদিবাসী ও দলিত পরিবারভুক্তদের জাত তুলে লাঞ্ছনা, চাকরির ক্ষেত্রে সংবিধান সম্মত জাতভিত্তিক সংরক্ষণের বিরুদ্ধে বিষোদগার এবং অসভ্য, অসহনীয় ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা বারংবার সামনে আসছে, পাপিয়া মাণ্ডির প্রতি এই জাতিবিদ্বেষী হেনস্থা আরেকটি গুরুতর সংযোজন। মঞ্চ এর বিরুদ্ধে পাপিয়ার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত থাকবে।
  • এসসি-এসটি (প্রিভেনশন অব এট্রোসিটিস) অ‍্যাক্টের ৩(১)(সি)(কিউ)(আর)(এস)(ইউ) ধারা রুজু হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ, দু’মাস পেরিয়েও চার্জশিট জমা দেয়নি। আইন মেনে অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
  • অভিযোগ জমা করার পর থেকে অধ্যক্ষ মহাশয় ধারাবাহিকভাবে পাপিয়াকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন নিজের পদ-ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। অধ্যক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছেন। আন্দোলনের চাপে অভিযুক্ত অধ‍্যাপককে লোক দেখানো সাসপেণ্ড করেছেন অধ‍্যক্ষ, কিন্তু তিনি নিজে একই অপরাধে অভিযুক্ত। অবিলম্বে তাঁকে অধ্যক্ষের আসন থেকে সরিয়ে কলেজ থেকে সাসপেন্ড করতে হবে এবং গ্রেপ্তার করতে হবে।
  • কলেজের সভাপতি ও স্থানীয় বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া যেভাবে প্রকাশ্যে অপরাধ আড়াল করে বিবৃতি দিয়েছেন তাকে ধিক্কার। ক্ষমতাসীনদের এরকম ভূমিকার মাধ্যমে সমাজে এই জাতিবিদ্বেষী আধিপত্য বজায় থাকে এবং হেনস্থাগুলি ঘটে চলে।
  • জাতিবিদ্বেষী অপরাধের যারা শিকার হন তারা খুব কম ক্ষেত্রেই সুবিচার পান। কারণ সমস্ত প্রতিষ্ঠানেই তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষেরা ক্ষমতাসীন এবং এক গোপন বোঝাপড়া তাদের মধ্যে কাজ করে। ফলত পাপিয়া মান্ডির জন্য সুবিচার পাওয়ার লড়াই কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। সমাজের সমস্ত স্তরের বিবেচক মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে এই লড়াইকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে প্রতিবাদী ঐক‍্য মঞ্চ।
  • ব্যক্তিগত স্তরে অবজ্ঞা ও অবমাননার এইসব ঘটনাগুলি আসলে কাঠামোগত বৈষম্য ও বঞ্চনার সাথে সরাসরি সম্পর্ক যুক্ত। পোয়া আইনকে লঘু করে যেমন সুবিচার থেকে বঞ্চনা করা হয়, তেমনই অরণ্যের অধিকার আইনকে অগ্রাহ্য করে আদিবাসীদের জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। সংরক্ষণের সাংবিধানিক অধিকারকেও বিভিন্ন কায়দায় ফাঁকি দেওয়া হয়। সাঁওতালি ভাষা রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বহু যুগ ধরে শিক্ষা ও চাকরির জগতে তাকে চরম বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক আদিবাসী জনতার বসবাস সত্ত্বেও রাজ্যের কোথাও পঞ্চম তপশিল লাগু নেই। এইসব কাঠামোগত বৈষম্য দৈনন্দিন জাতিবিদ্বেষী হেনস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। প্রতিবাদী ঐক‍্য মঞ্চ এই কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সচেতনতা গড়ে তুলবে।

উপরোক্ত এই প্রস্তাবনার ওপর এবং আশু কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনার আহ্বান করা হয়। মোট ১১ জন বক্তব‍্য রাখেন। আগামী ১৭ জানুয়ারি রোহিত ভেমুলার শহীদ দিবসে জেলায় জেলায় ডেপুটেশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া বিকাশ ভবনে শিক্ষা দপ্তর, রাজ‍্য মহিলা কমিশন, রাজ‍্য আদিবাসী বিষয়ক পরিষদ ও কেন্দ্রীয় আদিবাসী মন্ত্রকে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এবং মামলার প্রথম শুনানির দিন আগামি ৪ ফেব্রুয়ারি গণনজরদারি জারি রাখতে হবে।

কনভেনশনে মোট ৫৫ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বক্তব‍্য রাখেন মনু হাঁসদা, লবান হাঁসদা, সুশীল চক্রবর্তী, তপন মুখার্জী, পর্ণেন্দু মান্ডি, বিনোদ বাস্কে, ঝর্ণা আচার্য, লক্ষ্মীমণি মান্ডি, মলয় তেওয়ারি, শৈলেন মাইতি প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন আইসা রাজ‍্য সম্পাদক স্বর্ণেন্দু মিত্র। বক্তাদের বক্তব‍্যে সামগ্রিকভাবে আদিবাসীদের অধিকার ও স্বায়ত্ততা আন্দোলনের বিভিন্ন দিক জোরালোভাবে উঠে আসে। প্রাতিষ্ঠানিক অবমাননার ঘটনাগুলির সাথে সাথে জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদের নানা ঘটনা চর্চায় আসে। কনভেনশন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল যে এলাকায় সেই কেরানীচটিতে আদিবাসীদের জমি রক্ষার দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন তপন মুখার্জী, যে লড়াই এখনও চলছে। দেউচা কয়লাখনি প্রকল্প ও ঠুড়গা বাঁধ প্রকল্পে আদিবাসী উচ্ছেদ ও বিপুল বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রসঙ্গ আলোচনায় উঠে আসে। সকলেই দেউচা প্রকল্প বাতিল করার দাবি তোলেন। ঠুড়গা প্রকল্প বিরোধী লড়াইয়ে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায় সরকারের পক্ষে গেছে। এই প্রসঙ্গে ঝর্ণা আচার্য বলেন, ২০০৮ সালে তৎকালীন রাজ‍্য সরকার নির্দেশিকা জারি করেছিল যে গ্রাম সংসদই গ্রামসভা হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ ২০০৬’র বনাধিকার আইনে প্রকল্প অনুমোদনে গ্রামের মানুষের অনুমতি নেওয়ার জন‍্য গ্রামসভার আয়োজন করার যে বিধান ছিল তাকে এড়িয়ে গিয়ে গ্রামসংসদের বকলমে প্রধানের অনুমতিকেই গ্রাহ‍্য করার নির্দেশিকা জারি করেছিল তৎকালীন রাজ‍্য সরকার। আজ সেই নির্দেশিকা উল্লেখ করে হাইকোর্ট রায় দিয়ে দিল যে ঠুড়গা প্রকল্পের জন‍্য সরকার যেভাবে প্রধানের দেওয়া অনুমতিপত্রকেই গ্রামের মানুষের অনুমতি হিসেবে গ্রহণ করেছে তা আইনসম্মত! পাপিয়া মান্ডির ছোট ভাই পর্ণেন্দু মান্ডি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আদিবাসীদের গৌরবোজ্জ্বল অগ্রণী ভূমিকা এবং ইতিহাসে তা উপেক্ষিত থেকে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন। দিশম আদিবাসী গাঁওতার রাজ‍্য সভাপতি লবান হাঁসদা ঐক‍্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাপিয়ার রুখে দাঁড়ানো আমাদেরকে অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক‍্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু আদিবাসীদের ওপর অন‍্যায় হলেই প্রতিবাদ করব অন‍্যক্ষেত্রে চুপ থাকব এমন হতে পারে না, আমরা সব অন‍্যায়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করব। আদিবাসীদের সমস্ত সংগঠন ও ব‍্যক্তিবর্গকে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে প্রতিবাদী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি, সংগ্রামী শক্তি হিসেবে ঐক‍্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান রাখেন। কনভেনশনের সিদ্ধান্তগুলিকে হাততালি সহ সমর্থন জানিয়ে, লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিতে শ্লোগান তুলে সভা সমাপ্ত হয়।

Why we are opposed

আমরা, নিম্ন-স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলি মেয়েদের বিয়ের আইনি বয়স ১৮ থেকে ২১ অবধি বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। এই সংশোধিত বিলটি পার্লামেন্টে প্রস্তাব করার পর স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। আমাদের ভয় এটাই যে মেয়েদের বিয়ের আইনি বয়স সংশোধনের প্রস্তাব বলবৎ হলে সেটি আদপে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিতে বিয়েকে অপরাধিকরণ ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের স্বায়ত্ততায় হস্তক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হবে। আমরা মনে করি, প্রসূতি ও শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয় যদি সরকার সত্যিই ভাবে তাহলে কিশোরী ও যুবতী মেয়েদের পুষ্টির মাত্রা শোধরানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মেয়েদের স্বাধিকারের গুরুত্ব জনমানসে তুলে ধরতে এবং মেয়েদের স্বায়ত্ততা নিশ্চিত করতে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা যাতে বিয়ে ও মাতৃত্ব নিয়ে জোরজুলুম ছাড়া স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

উপরোক্ত বিষয়ে আমাদের আশেপাশে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতামত উঠে আসছে। বারবার উঠে আসা প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার মধ্যে আমাদের উদ্বেগ ও অবস্থানকে পাঠকের কাছে আরও স্পষ্ট করা যাক।

মেয়েদের বিয়ের বয়স (আপাতত ১৮) ছেলেদের বিয়ের বয়স (আপাতত ২১)–এর সমতূল্য করে তোলা তো আদপে লিঙ্গসাম্যের দিকে এক পা বাড়ানো। তাহলে এর বিরোধিতা কেন করা হচ্ছে?

একজন নাগরিক প্রাপ্তবয়স্ক হন ১৮ বছর বয়সে। ১৮ বছর যদি সরকার বেছে নেওয়ার জন্য উপযোগী হয় তবে জীবনসাথী নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট নয় কেন? দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার যদি প্রাপ্তবয়স্কদের থাকে তবে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কেন? পারিবারিক আইন সংস্কার বিষয়ক ল’কমিশনের ২০০৮ সালের রিপোর্ট মেয়ে ও ছেলে উভয়ের বিয়ের বয়স ২১ নয়, ১৮ বছর করার সুপারিশ করেছিল। কমিশন উল্লেখ করে যে, “ছেলে ও মেয়েদের বিয়ের বয়সে ভেদাভেদের কোনও আইনি ভিত্তি নেই কারণ উভয়পক্ষ বিবাহে আবদ্ধ হন সমভাব থেকে এবং সমান অংশীদার হিসাবে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।” ভারতীয় প্রাপ্তবয়স্ক আইন ১৮৭৫ অনুযায়ী একজন শিশু প্রাপ্তবয়সে পৌঁছায় ১৮ বছর বয়সে। এছাড়াও এই আইনবলে যেকোনও চুক্তিতে অংশগ্রহণের জন্য লিঙ্গ নির্বিশেষে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। নারীর উপর সমস্ত ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ সম্মেলন (সিইডিএডব্লু) বিয়ের ন্যূনতম বয়স হিসাবে ১৮ বছরকে সুপারিশ করেছে।

এতদনুসারে আমরা, লিঙ্গ নির্বিশেষে বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করার পক্ষে সওয়াল করছি।

মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে বাড়িয়ে ২১ করার ফলে কি নবজাতক ও ছোট বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে না?

জেটলী কমিশন আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে কিশোরী (১০-১৯) মায়েদের জন্ম দেওয়া শিশুদের তুলনায় যুবতী (২০-২৪) মায়েদের জন্ম দেওয়া শিশুদের পুষ্টি ও ওজনের মাত্রা বেশি হয়।

কিন্তু ভারতের কিশোরী আর যুবতী মেয়েরা আমৃত্যু অপুষ্টির প্রভাবে ভোগে। সেক্ষেত্রে, মেয়েদের বিয়ের বয়স ২১ বছর অবধি বাড়ানো হলেও, আর ২২ বছর বয়সে সেই মেয়ে বাচ্চার জন্ম দিলেও মায়ের আর বাচ্চার স্বাস্থ্যের উন্নতির সম্ভাবনা নেই। সরকার যদি প্রসূতি আর নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতরভাবে চিন্তিত হয় তবে সমন্বিত শিশু উন্নয়ন প্রকল্প (আইসিডিএস বা অঙ্গনওয়াড়ি প্রোগ্রাম) খাতের বরাদ্দ টাকা ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে কেন? বরং আইসিডিএস প্রকল্পকে সার্বজনীন করা, প্রতিটি কিশোরী মেয়ের দৈনিক আহারে সুষম ক্যালোরি ও প্রোটিন নিশ্চিত করা, প্রতিটি ব্লকে শিশুদের সুরক্ষিত জন্ম নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবাসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা, কোনও শর্ত ছাড়া মাতৃত্বকালীন সুবিধা হিসাবে ৬,০০০ টাকার ভাতা দেওয়া, অঙ্গনওয়াড়ি ও আশা কর্মীদের সরকারি কর্মী হিসাবে স্বীকৃতি ও সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করছেনা কেন সরকার?

১৮ বছরে বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ হিসাবে গণ্য হলে মেয়েদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ কি বাড়বে না?

বর্তমানে কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সে মেয়েরা বিয়ে করতে পারে, মেয়েদের আইনি অধিকার রয়েছে এটা ঠিক করার যে ১৮ বা ১৮’র ঊর্ধ্বে কোন বয়সে তারা বিয়ে করবে।

প্রস্তাবিত সংশোধনটি কেবল সেই বিয়েগুলিকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করবে যেখানে মেয়েটির বয়স ২১’র কম। এরকম প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েটি এবং বিয়েতে জন্ম নেওয়া বাচ্চা আইনি সুরক্ষাও প্রজননগত স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

সরকারের উচিত মেয়েদের জন্য শিক্ষার (উচ্চশিক্ষাসহ) গুরুত্ব প্রচার করা, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা ও সক্রিয়ভাবে সেই মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো যারা পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া বিয়েকে আটকাতে চাইছে।

সরকার যদি সত্যিই মেয়েদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর এবং মেয়েদের শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক হয় তবে, তারা কেন নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি নিতে চাইছে না?

১) ১৮ বছর অবধি সমস্ত শিশুদের শিক্ষার অধিকার আইনের (আরটিই) আওতায় নিয়ে আসা, যাতে অষ্টম শ্রেণীর পর স্কুলছুট হওয়া মেয়েদের সংখ্যা কমে।

২) ‘কেজি থেকে পিজি’ বা ‘বাচ্চা থেকে যুবতী’ বয়সের মেয়েদের বিনামূল্যে গুনমান-সম্পন্ন শিক্ষার সুবিধা দেওয়া।

৩) মহিলা পড়ুয়াদের বৃত্তি বাড়ানো ও বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা।

৪) একটি সরকারি হেল্পলাইন তৈরি করা যার মাধ্যমে দ্রুত আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে — (ক) যে কোনো বয়সের মেয়ে বা ব্যক্তিমানুষকে, যাদের পরিবার বিয়ের জন্য জোর-জবরদস্তি করছে, (খ) সেই সমস্ত এলজিবিটিকিউ কমিউনিটির মানুষকে যাদের সমাজের মানদন্ড বজায় রাখতে জুলুম করে রুপান্তরের চেষ্টা করছে তার পরিবার, এবং (গ) আন্তঃজাতি, আন্তঃধর্ম, স্বগোত্র ও সমকামী সম্পর্কে থাকা প্রতিটি মানুষকে।

মেয়েদের বিয়ের সার্বিক বয়স পিছিয়ে দিয়ে প্রস্তাবিত সংশোধনীটি কি আসলে মেয়েদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করছে না?

ভারতের প্রতিটি নাগরিক প্রাপ্তবয়স্ক হয় ১৮ বছর বয়সে। কিন্তু জাতীয় পরিবার ও স্বাস্থ্য সমীক্ষা বলছে যে ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হয়না। সে সিদ্ধান্ত বাড়ির বাইরে পা রাখার মত খুঁটিনাটি বিষয়েই হোক বা বিয়ে, মাতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হোক। গবেষণা বলছে, ট্রায়াল কোর্টে পৌঁছানো ৪০ শতাংশ ধর্ষণের মামলায় দেখা যাচ্ছে ধর্ষণের অভিযোগকারী আসলে, স্বেচ্ছায় পালিয়ে বিয়ে করা মেয়েদের পরিবার এবং অভিযুক্ত মেয়েটির পুরুষ সঙ্গী। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও পরিবারের জিম্মায় থাকা মেয়েটিকে অত্যাচার করে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এক্ষেত্রে প্রায়শই অভিভাবকরা পরিবারের মান বাঁচাতে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নাবালিকা বলে দাবি করে। এমতাবস্থায় মামলা চলাকালীন মেয়েটির জায়গা হয় শেল্টার হোমে যেখানে শুধুমাত্র পরিবারের সাথে দেখা করার অনুমতি থাকে, কিন্তু মেয়েটির সঙ্গীর সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ থাকে না। অভিভাবক, পরিবারের জোর-জুলুমের সাথে বর্তমানে রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা সমর্থিত বেশ কিছু গোষ্ঠী ও সংগঠন যুক্ত হয়েছে যারা আন্তঃধর্মীয় বা আন্তঃজাতি বিয়ে/সম্পর্ককে ভাঙতে জুলুমবাজি থেকে শুরু করে হিংসার আশ্রয় নিতেও পিছপা হয় না।

মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে ২১ অবধি বাড়ানোর মানে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের থেকে নিজের পছন্দের সাথী বেছে নেওয়া ও নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিয়ে করার আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া। মেয়েদের ক্ষমতায়ন দূরের কথা, এই সংশোধনী আদপে মেয়েদের স্বায়ত্ততাকে দমিয়ে রাখতে পুরুষতান্ত্রিক শক্তিগুলির হাত শক্ত করবে। মেয়েদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহিত করার বদলে প্রস্তাবিত সংশোধন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পছন্দের উপর বিধিনিষেধ লাগু করার ও মেয়েদের সিদ্ধান্তের অপরাধীকরণ করার সুযোগ তৈরি করবে। এই ধরণের বিধিনিষেধ অসাংবিধানিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। কোর্টের নির্দেশমত বাল্যবিবাহ আইন যেকোন ব্যাক্তিগত বিবাহ আইনকে বাতিল করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাল্যবিবাহ আইনে সংশোধনের প্রভাব পড়বে সমস্ত জনগোষ্ঠীর মানুষের উপর। যদিও, প্রস্তাবিত সংশোধনের শাস্তিযোগ্য ধারাগুলির কোপে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হবেন গরিব মানুষ, যেহেতু জাতীয় পারিবারিক ও স্বাস্থ্য সমীক্ষা-৫ রিপোর্ট অনুযায়ী বাল্যবিবাহ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

অকাল গর্ভধারণ মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্য ব্যপকভাবে ক্ষতিকারক। সেক্ষেত্রে মেয়েদের অকাল গর্ভধারণের সমাধান কী?

বিয়ে থেকে মাতৃত্ব সহ প্রতিটি ব্যাক্তিগত প্রশ্নে মেয়েদের স্বায়ত্ততাকে দৃঢ় করাই মেয়েদের স্বাস্থ্যের বিপদের একমাত্র সমাধান। মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বলে কেবলমাত্র ১৮ বছরে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবার বাধ্য করতে পারেনা। মেয়েরা ১৮ বছরে বিয়ে করলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে মাতৃত্বের জন্য জোর করতে পারে না। সরকার চালিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচিগুলি মেয়েদের জন্য শাস্তিস্বরূপ, যেখানে দুটির বেশি সন্তানের জন্ম দিলে মেয়েরা বেশ কিছু মৌলিক অধিকার থেকে ও স্বাস্থ্য-পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হন। মেয়েদের বিরুদ্ধে এই ধরনের শাস্থিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদী পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি গ্রহণ করা, যা মেয়েদের প্রয়োজনের প্রতি সচেতন ও সুরক্ষিত আবহাওয়া তৈরি করতে সক্ষম হবে। সেক্ষেত্রে, ১৮ বছরে বিয়ে করলেও একটি মেয়েকে বিয়ের একবছরের মধ্যে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় পড়তে হবেনা। সরকার এখনো সর্বস্তরের মেয়েদের জন্য সুরক্ষিত গর্ভপাত ও গর্ভনিরোধক চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থ্যা করতে পারেনি। উল্লিখিত ব্যবস্থা সুলভ থাকলে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পরিবার পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবে মেয়েরা।

তাই আমরা নিম্ন-স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলি একসাথে সরকারের কাছে দাবি করছি অবিলম্বে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে বাড়িয়ে ২১ করার প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিল করা হোক। পরিবর্তে লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের বিয়ের আইনি বয়স ১৮ বছর করা হোক। আইসিডিএস, আরটিই সহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবার পরিধি বাড়ানো ও বলিষ্ঠ ফলপ্রসূ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে সব বয়সের মেয়েদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করুক সরকার।

মেয়েদের স্বশক্তিকরণের জন্য প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। মেয়েদের মধ্যে বেকারত্ব চরম অবস্থায় পৌঁছেছে। ফলস্বরুপ, মেয়েরা অসংগঠিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতাসহ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। মেয়েদের ক্ষমতায়ন বিষয়ে সরকারের চিন্তার প্রতিফলন হওয়া উচিত মেয়েদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে, যার সাহায্যে মেয়েরা স্বাধীন ও সম্মানের জীবন বেছে নিতে পারবে।

বেশকিছু উল্লেখযোগ্য রিপোর্ট বলছে ভারতে কিশোরীদের বিয়ে ২০০০ সাল থেকে ৫১ শতাংশ কমে গিয়েছে। রাজ্য গড় রিপোর্ট, ২০১৯ (মিন অফ স্টেটস রিপোর্ট, ২০১৯) অনুযায়ী ভারতে বিয়ের গড় বয়স ২২.১ বছর। সেক্ষেত্রে বুঝে নিতে হবে যে কোনপ্রকার আইনি বলপ্রয়োগ ছাড়াই এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বাল্যবিবাহ বা কম বয়সে বিয়ের হার কমার ক্ষেত্রে আলোচ্য মেয়েদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জীবিকা সদর্থক ভূমিকা পালন করেছে।

পরিশেষে বলি, যদি সরকার সত্যিই চায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাল্যবিবাহের ঘটনাকে রুখতে এবং মহিলাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারকে বলবৎ করতে, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পোষণ পরিষেবার উন্নতিসাধনের সাথে দারিদ্র্যকে নির্মূল করতে হবে। এবং একটি মেয়ে ১৮ বা তার ঊর্ধের কোন বয়সে, কাকে, কীভাবে ভালোবাসবে বা বিয়ে করবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিঃশর্ত অধিকার একমাত্র সেই মেয়েটির; অন্য কারোর নয়।

- মারিয়ম ধাওয়ালে (অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন),

কবিতা কৃষ্ণান (অল ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন),

অ্যানি রাজা (ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান উইমেন)

Santosh Kumari Devi 125th Birth Anniversary

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পালিত হচ্ছে এখন। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার শোরগোল ফেলেছে ‘স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব’ পালনের কথা বলে। তারা বলেছে অপরিচিত, স্বল্প পরিচিত, হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসার কথা। কিন্তু সরকারিস্তরে উচ্চকিত প্রচার সত্ত্বেও অনেকটা আড়ালেই থেকে গেলেন এক অত্যন্ত ব্যতিক্রমী স্বাধীনতা সংগ্রামী সন্তোষকুমারী দেবী। একদা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অত্যন্ত স্নেহভাজন সন্তোষকুমারী ছিলেন একাধারে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও অন্যদিকে শ্রমিক নেত্রী। বস্তুতপক্ষে আজ থেকে একশো বছর আগে সন্তোষকুমারী দেবী অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এক মহিলা শ্রমিক নেত্রী হিসেবে জুট শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন এবং অচিরেই তাঁদের অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। সেই সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি আবার জুট শ্রমিকদের সংগঠিত করছেন এক মহিলা শ্রমিক নেত্রী, তাঁদের দাবি দাওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিতর্কে সামিল হয়ে অধিকার আদায় করে আনছেন — এ ছিল বিশেষভাবেই এক ব্যতিক্রমী এক দিক।

সন্তোষকুমারী দেবীর পৈত্রিক ভিটে ছিল নৈহাটির গড়িফা অঞ্চলে। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মী। চাকরিসূত্রে তাঁকে যেতে হয়েছিল রেঙ্গুনে। রেঙ্গুনেই তাঁর লেখাপড়া। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী হিসেবে কৃতিত্ত্বের সঙ্গে সিনিয়র কেমব্রিজে উত্তীর্ণ হন। মেলে বিলেতে গিয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ। কিন্তু বিলেত যাবার ছাড়পত্র মেলেনি তাঁর। ততদিনে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মন্ত্রে তিনি দীক্ষিত হয়েছেন। জাতীয়তাবাদী নানা কাজ শুরু করেছেন বার্মায়। ফলে দ্রুতই ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে নজরবন্দী করে ফেলে। আটকে দেয় বিলেতে উচ্চশিক্ষার জন্য যাত্রাকে।

রেঙ্গুনে পুলিশী নজরদারিতে কার্যকলাপ সীমিত হয়ে যাওয়ায় সন্তোষকুমারী দেবী চলে আসেন নৈহাটির গড়িফায়, তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে। দেশজুড়ে তখন অসহযোগ আন্দোলন। বাংলায় এই আন্দোলনের মূল কারিগর তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। সন্তোষকুমারী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অনুগামী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সন্তোষকুমারী দেবীর কাজের মূল ক্ষেত্র ছিল শ্রমিকদের মধ্যে। বস্তুতপক্ষে তিনিই ছিলেন প্রথম মহিলা জুট মজদুর নেত্রী। অসাধারণ বাগ্মী এই নেত্রীর বক্তৃতা হিন্দিভাষী জুট শ্রমিকদের আপ্লুত করত। তাঁদের নানা আর্থিক ও অন্যান্য অধিকারের দাবিদাওয়া নিয়ে মিল ম্যানেজারদের সঙ্গে সন্তোষকুমারী দেবীর তীব্র দ্বন্দ্ব চলত।

শ্রমিকদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য সন্তোষকুমারী দেবী বিশেষ সচেষ্ট ছিলেন। এই উপলক্ষ্যে তিনি শ্রমিক মহল্লায় নাইট স্কুল চালু করেন। এইক্ষেত্রে তিনি এতটাই সফল হয়েছিলেন যে কলকাতা কর্পোরেশনের শিক্ষা সংক্রান্ত কাজের জন্য কর্পোরেশনের সেই সময়ের সর্বোচ্চ আধিকারিক সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে কর্পোরেশনের শিক্ষা কমিটির অন্তর্ভুক্ত করে নেন।

শ্রমিকদের রাজনৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বিশেষ সচেতন ছিলেন। শ্রমিকদের জন্য একপয়সা মূল্যের একটি কাগজ তিনি নিয়মিত প্রকাশ করা শুরু করেন। এই কাগজ চালানোর খরচ যোগাড়ে তিনি নিজের গয়নাও বন্ধক রেখেছিলেন।

সময়ের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিল সন্তোষকুমারী দেবীর ভাবনা ও কার্যকলাপ তা বোঝা যায় সোনাগাছি অঞ্চলের বারবণিতাদের জন্য নানা সামাজিক কাজের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ থেকে। সেই সময় যখন ভদ্র পরিবারের মহিলাদের নাটক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মতো ব্যাপারও সমাজ ভালো চোখে দেখে না, তখন একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চশিক্ষিতা নারী পতিতাপল্লীতে বারবণিতাদের জন্য কাজ করছেন — এ ছিল এক বিরাট ব্যাপার।

সন্তোষকুমারী দেবী বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ থেকে সরে যান। এর কারণ সঠিকভাবে জানা যায়না। তবে তিনি দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। প্রায় নব্বই বছর বয়েসে তাঁর জীবনাবসান হয়। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে মঞ্জু চট্টোপাধ্যায় এক বিস্তারিত আলোচনা করেন সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট পত্রিকায়। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটিই আজকের দিনে এই অনন্যাকে জানার অন্যতম সোপান। এছাড়াও তাঁর ছায়া অবলম্বনে এক চরিত্রকে অবলম্বন করে ‘বিকিকিনির হাট’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন নৈহাটি নিবাসী প্রখ্যাত অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়।

জন্মের ১২৫তম বার্ষিকী তথা স্বাধীনতার ৭৫ বছর পালনের সময় ইতিহাসচর্চায় অনেকটা উপেক্ষিতই থেকে গেলেন সন্তোষকুমারী দেবী। এই উপেক্ষার মধ্যেই উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হল অগ্নিবীণা সাংস্কৃতিক সংস্থার উদ্যোগে তাঁর জন্মের ১২৫তম বার্ষিকী পালনের আয়োজন। অগ্নিবীণা সংস্থাটি সন্তোষকুমারী দেবীর পৈত্রিক বাড়ি সংলগ্নই। সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁর লন্ডন নিবাসী পুত্র ও অন্যান্য পরিজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সন্তোষকুমারী দেবীর পরিবার খুশি যে অন্তত কেউ কেউ এই সময়ে তাঁকে মনে রেখে স্মরণ শ্রদ্ধার আয়োজন করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল কেন্দ্র বা রাজ্য — কোনও সরকারের তরফেই এরকম এক ব্যতিক্রমী অনন্যার স্মরণে যথাযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হল না। নারীর ক্ষমতায়নের মূর্ত এই সাহসী ছকভাঙা অনন্যাকে রাজ্য তথা দেশবাসীর সামনে হাজির করা দরকার। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছে, তরুণ তরুণীদের কাছে অনুসরণযোগ্য এক রোল মডেল হয়ে উঠতে পারেন এই অনন্যা, যদি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাঁর কথা স্কুল কলেজের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, প্রকাশ করা যায় তাঁর জীবন ও কাজের বিবরণ সমৃদ্ধ বইপত্র।

- সৌভিক ঘোষাল

AFSPA is again in force in Nagaland

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ৩০ ডিসেম্বর বিজ্ঞপ্তি জারি করে নাগাল্যান্ডে সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের (আফস্পা) মেয়াদ আরো ছ’মাস বৃদ্ধির যে পদক্ষেপ করেছে তা নাগাল্যান্ডের এক রাজনৈতিক দল এনপিএফ’এর কথায় “কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে” দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত যে নাগা জনগণের এবং তারসাথে সমগ্ৰ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগণের ক্ষোভ এবং অপমান বোধকে তীব্রতর করে তুলবে তা বোঝার জন্য বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন নেই। মাসখানেক আগে, ডিসেম্বরের ৪ ও ৫ তারিখে সেনারা নাগাল্যান্ডের ‘মন’ জেলার ওটিং গ্ৰামে সংঘটিত করল ১৪ জন শ্রমিক এবং নিরীহ, নিরপরাধ গ্ৰামবাসীদের গণহত্যা। সেনাদের গুলিতে আহত হলেন আরো ৩৫ জন স্থানীয় মানুষ। নাগা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগণের সেনা ও আফস্পা বিরোধী রোষ প্রবল মাত্রায় বিস্ফারিত হল। আফস্পা প্রত্যাহারের দাবি সোচ্চারে ফেটে পড়ল। নাগাল্যান্ড বিধানসভা ২০ ডিসেম্বর একদিনের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব নিল — নাগাল্যাণ্ড এবং সমগ্ৰ উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে আফস্পা প্রত্যাহারের জন্য বিধানসভা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নাগাল্যান্ডের নেতৃবৃন্দকে দিল্লীতে বৈঠকে ডাকলেন। বৈঠকে ডাকার জন্য নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেফিউ রিও, উপ-মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই প্যাটন এবং এনপিএফ নেতা টি আর জেলিয়াং অমিত শাহ’র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন “বিষয়টিতে চূড়ান্ত গুরুত্ব দেওয়া এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষায় ইতিবাচকভাবে সাড়া দেওয়ার” জন্য। ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আফস্পা প্রত্যাহার সম্পর্কে সদর্থক সংকেত পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু অমিত শাহ’র মতো ধুরন্ধর রাজনীতিবিদদের বাইরের হাবভাব দেখে ভেতরের ভাবনাকে ঠাওর করা যে দুঃসাধ্য, নাগাল্যান্ডের নেতাদের কি সেই বোধ ছিল না? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সিদ্ধান্ত তাঁদের প্রত্যাশার এবং নাগাল্যান্ডের ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষার’ যে কথা তাঁরা বারবার বলছিলেন, তার প্রতি এক প্রবল আঘাত হয়েই সামনে এল।

নাগাল্যান্ডের নেতারা বহুদিন ধরেই জানিয়ে আসছিলেন, নাগাল্যান্ডের আইন ও শৃঙ্খলার অবস্থা এখন অশান্ত নয়। নাগা বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলোর সঙ্গে কেন্দ্র সরকারের দীর্ঘকাল ধরেই যুদ্ধবিরতি চলছে। নাগা রাজনৈতিক ইস্যুটার সমাধানে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সংগঠনের সঙ্গে শান্তি আলোচনাও অব্যাহত। রাজ্য নেতৃবৃন্দের মতে তাই এই রাজ্যকে ‘উপদ্রুত এলাকা’ বলে ঘোষণা করার — যা আফস্পা জারির শর্ত — কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে পারে না। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্য রাজ্যগুলোর নেতৃবৃন্দ এবং জনগণও একই অভিমত পোষণ করে থাকেন। এই সেদিন, গত ২৯ ডিসেম্বর মনিপুর মানবাধিকার কমিশনও এই সুচিন্তিত মত প্রকাশ করল যে, মনিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি আফস্পা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করে না। মানবাধিকার কমিশনের মতে মনিপুরে ‘উপদ্রুত এলাকা’র মর্যাদা অব্যাহতভাবে চালিয়ে নিয়ে যাওয়াটা আর ‘ন্যায্য’ নয়, কেননা, বিদ্রোহীদের ‘প্রকোপ বৃদ্ধির’ কার্যকলাপ অনেক হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু, যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নিজের কঠোর ভাবমূর্তি নির্মাণে অত্যন্ত সচেতন ও সচেষ্ট, আফস্পা প্রত্যাহারের নাগাল্যান্ড বিধানসভার প্রস্তাবে সহমত পোষণের ‘নরম’ পদক্ষেপ তাদের ভাবমূর্তির সঙ্গে মানানসই হবে কিভাবে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে অতএব বলা হল, “কেন্দ্রীয় সরকার এই মত পোষণ করে যে, সমগ্ৰ নাগাল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এলাকা এমন এক অশান্ত ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে যে অসামরিক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোটা জরুরি।” স্থানীয় অসামরিক কর্তৃপক্ষ, রাজ্যের শাসকরা সেনাবাহিনীর সহায়তার কোনো প্রয়োজন অনুভব না করলেও কয়েক হাজার কিমি দূরে বসে থাকা নেতা ও আমলারা সেই সহায়তা কতটা অপরিহার্য তা অবলীলায় জেনে যাচ্ছেন! ভাষ্যকাররা যখন বলেন যে, বহু বছর ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দিল্লীর শাসকরা তার মর্ম উপলব্ধিতে ব্যর্থ, সেই অভিমতকে বোধহয় খুব একটা ভিত্তিহীন বলা যাবে না।

‘ওটিং’ গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত আর একটা উদ্বেগজনক বিষয় প্রত্যক্ষ করতে হল নাগাল্যান্ডের জনগণকে। শ্রমিক ও সাধারণ গ্ৰামবাসীদের হত্যাকাণ্ডে নাগাল্যান্ড সরকার যেমন এক বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে, সেনাবাহিনীও উচ্চপদস্থ সেনাকর্তার নেতৃত্বে গঠন করেছে তদন্ত কমিটি। সেই কমিটির লোকজন ঘটনার তদন্তে, ৪ ও ৫ ডিসেম্বরের ঘটনা কেন ও কিভাবে ঘটল তা জানতে হত্যাস্থলে গেলেন, প্রত্যক্ষদর্শী-চিকিৎসক-পুলিশদের সঙ্গে কথা বললেন। কিন্তু স্থানীয় জনগণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন, সেনা তদন্তকারীদের মধ্যে উপস্থিত রয়েছেন ‘ওটিং’ হত্যাকাণ্ডে জড়িত একাধিক কমাণ্ডো। কোন ভাবনা থেকে তাদের তদন্তকারী দলের সদস্য করা হল? যারা সরল, অহিংস শ্রমিক ও গ্ৰামবাসীদের হত্যা করল, সেই হত্যাকারীরাই আবার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করবে! অতজন মানুষের হত্যা এবং তার আড়াই গুণ মানুষকে আহত করার জন্য কারা দায়ী তা নির্ণয় করে তারা রিপোর্ট দেবে! সেই তদন্ত সত্যের প্রতি কতটা অনুগত থাকবে! স্থানীয় জনগণের এক সংগঠন যথার্থভাবেই বলেছে, “এই ঘটনা সেনার তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল। সেনাবাহিনী অভিযুক্তদের সাজা না দিয়ে কড়া নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছে এবং বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যাকারীদের ফের কনিয়াক (স্থানীয় জনজাতি) ভূমিতে নিয়ে আসার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।” হত্যাকারীদের হাতেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সত্যের পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই কি প্রকট নয়?

ওটিং হত্যাকাণ্ডের পর সংগঠন ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমগ্ৰ নাগা জনগণ যেমন আফস্পা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিলেন, তেমনি চেয়েছিলেন এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ন্যায়বিচার, নিরপরাধ জনগণের হত্যার জন্য দায়ী সেনাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। নাগা সংগঠন ‘টিপিও’ তাদের বিবৃতিতে বলেছিল, “ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কমাণ্ডোদের দ্বারা সংঘটিত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত গুলি চালনার ঘটনা ভারত সরকার ও তার প্রতিভূদের নাগা ইস্যুটার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।” দ্য নাগাল্যান্ড স্টেট কমিশন ফর উইমেন দাবি জানিয়েছিল, “যেকোনো মূল্যেই নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে ন্যায়বিচার দিতে হবে।” আফস্পার মেয়াদ ছ’মাস বৃদ্ধির কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সেনার তদন্তকারী দলের মধ্যে হত্যায় জড়িত কমাণ্ডোদের উপস্থিতি নাগা জনগণের এই উভয় আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের পথকে কন্টকিতই করল। প্রথমে আমরা জেনেছিলাম যে, নাগাল্যান্ড থেকে আফস্পা প্রত্যাহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা কমিটি ৪৫ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট দেবে। কিন্তু এখন আমরা জানছি সেই সময়সীমা এর দ্বিগুণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সূত্রকে উদ্ধৃত করে ৩১ ডিসেম্বর সংস্করণের দ্য টেলিগ্ৰাফ সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে, “উচ্চপর্যায়ের কমিটি তিনমাসের মধ্যে তাদের রিপোর্ট দেবে আর সেই রিপোর্ট যতক্ষণ না পেশ হচ্ছে ততক্ষণ (আফস্পা) সম্প্রসারণ করা হল।” কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষভাবে তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অভিপ্রায় অতএব — নাগা জনগণ এবং রাজ্যের সরকার আফস্পা প্রত্যাহার নিয়ে ছ’মাস মুখে কুলুপ এঁটে থাকুক। আর, ন্যায়বিচারের ব্যাপারটা সেনাদেরই বিচারসাপেক্ষ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগণ এবং সেখানকার রাজনীতিবিদরাও বারবারই এই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকেন যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট রাজ্যগুলোর কণ্ঠস্বরের প্রতি নরেন্দ্র মোদী সরকারের রয়েছে ‘চূড়ান্ত অবজ্ঞা’। অতএব, সেই অবজ্ঞা, উপেক্ষাকে চালিয়ে নিয়ে গিয়ে সংবিধান প্রদত্ত জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার বিপর্যস্ত হতেই থাকবে, জাতীয় নিরাপত্তার নামে প্রত্যাখ্যাত হতে থাকবে বুনিয়াদি অধিকার, মানবাধিকার সমূহ। নাগা সংগঠন এনপিএফ’এর বিধায়ক ইমকং এল ইমচেন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, “কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা কমিটি রিপোর্ট না দেওয়া পর্যন্ত নাগাল্যান্ডে আফস্পাকে মুলতুবি রাখা হোক”। সেটুকু করতেও স্বৈর সরকারের কি প্রবল অনীহা!

The situation in Kashmir

কাশ্মীরে সেনা অপরাধের অভিযোগে পুলিশের তদন্তে উপত্যকার জনগণ যদি অনাস্থা প্রকাশ করেন, সেটাকে কি অনধিকার কাজ বলা যায়? তদন্তে সত্য অনুদঘাটিত থাকছে এবং সেনাদের অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে মনে হলে তদন্তের সমালোচনা ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোটা কি স্বাভাবিক ও ন্যায্য ব্যাপার বলে বিবেচিত হওয়ার নয়? কিন্তু যেখানে জঙ্গি সক্রিয়তার পাশাপাশি সেনা ও পুলিশের নিপীড়ন ও নির্মমতা এক প্রশ্নহীন বিস্তৃত বাস্তবতা, সেখানে সাধারণ অসামরিক জনগণের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে। শ্রীনগর সংলগ্ন হায়দারপোরায় তথাকথিত সংঘর্ষের ঘটনাটা ঘটে গতবছরের ১৫ নভেম্বর, যে ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছিল। এদের মধ্যে তিনজন হলেন দন্ত চিকিৎসক মুদাসিসর গুল, ব্যবসায়ী ও যেখানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে সেই বাড়ির মালিক আলতাফ আহমেদ ভাট এবং গুলের অফিসে কাজ করা আমির মাগরে উপত্যকার নাগরিক এবং অন্যজন বিলাল ভাই হল পাকিস্তানি নাগরিক। নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ জনগণের দিক থেকে এটাকে ভুয়ো সংঘর্ষ এবং সেনাদের দ্বারা ঠাণ্ডা মাথায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করা এবং তার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ সংগঠিত হলে প্রশাসনের তরফে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তের জন্য গঠন করা বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ তাদের রিপোর্ট পেশ করে গত ২৮ ডিসেম্বর এবং তাতে নিহত চারজনকেই জঙ্গি ও জঙ্গি-সহযোগী বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু জনগণের উপলব্ধি ও বিশ্বাসে যেটা ভুয়ো সংঘর্ষ ছাড়া অন্য কিছু নয়, পুলিশের রিপোর্টে সেটি সম্পূর্ণ বিপরীত রূপে উপস্থাপিত হওয়ায় তাঁরা রিপোর্টের সমালোচনা করলেন। কিন্তু পুলিশ বলল সেই সমালোচনা আসলে হল ‘মনগড়া বিবৃতি’ যা সাধারণ জনগণ অথবা সমাজের বিশেষ অংশের মধ্যে “প্ররোচনা, গুজব, আতঙ্ক ও ত্রাস” সৃষ্টি করতে চায়। পুলিশ সেই সমালোচনা বন্ধের নির্দেশ দিল, বন্ধ না হলে দণ্ডবিধি কাজে লাগিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হল। যে ঘটনা এত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যাতে নিহতদের পরিবার ও জনগণ এবং পুলিশ ও প্রশাসন সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে, তথাকথিত সংঘর্ষের সেই ঘটনাটার দিকে ফিরে তাকানোটা জরুরি।

হায়দারপোরার ঘটনা প্রসঙ্গে পুলিশ জানিয়েছিল, সেই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদীদের উপস্থিতি রয়েছে বলে তারা খবর পেয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সেনারা বাড়ির মালিক আলতাফ আহমেদ ভাট ও দন্ত চিকিৎসক মুদাসিসর গুলকে তাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গিদের লুকিয়ে থাকা স্থানকে চিহ্নিত করার জন্যে। ওয়েব পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’এর ২১ নভেম্বর সংস্করণে অনন্যা ভরদ্বাজের প্রতিবেদনে হায়দারপোরা ঘটনা প্রসঙ্গে পুলিশের একটা বিবৃতি উল্লিখিত হয়েছে যাতে বলা হয়, “আলতাফ আহমেদ নামে বাড়ির মালিক এবং মুদাসিসর গুল নামে ভাড়াটেকে তল্লাশি দলের সঙ্গে যেতে বলা হয়।... কিন্তু প্রথম দিকে হওয়া গুলির বিনিময়ে তল্লাশি দলের সঙ্গে যাওয়া উভয় ব্যক্তিই গুলিতে গুরুতর রূপে আহত হন এবং পরে মারা যান। এরপর যে সংঘর্ষ শুরু হয় তাতে ঘরে লুকিয়ে থাকা উভয় জঙ্গিকে নিকেশ করা হয় এবং সংঘর্ষ স্থল থেকে তাদের দেহ উদ্ধার হয়।”

সংঘর্ষের ঘটনার পরপরই নিহত চার ব্যক্তির দেহ পুলিশ কবর দিয়ে দেয়। কিন্তু নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ জনগণের দিক থেকে প্রবল প্রতিবাদের মুখে পুলিশ মুদাসিসর গুল ও আলতাফ আহমেদ ভাটের দেহ কবর থেকে তুলে দুই পরিবারের হাতে দেয় এবং পরিবার যথাবিহিত নিয়ম মেনে তাদের সমাধিস্থ করে।

state's monstrous power be resisted

সেনারা যে আলতাফ আহমেদ ভাট এবং মুদাসিসর গুলকে তাদের সঙ্গে তল্লাশিতে নিয়ে গিয়েছিল, তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের সঙ্গে পুলিশের বিবৃতির মিল রয়েছে। কিন্তু পুলিশকে নিয়ে গঠিত ‘সিট’এর ২৮ ডিসেম্বরের রিপোর্টে যা বলা হল তারসঙ্গে পুলিশের দেওয়া আগের বিবৃতির আর মিল থাকছে না। ‘সিট’এর রিপোর্টে বলা হল — বিলাল ভাই ও আমির মাগরে ছিল প্রশিক্ষণ পাওয়া জঙ্গি আর মুদাসিসর গুল ও আলতাফ আহমেদ ভাট ছিল জঙ্গি সহযোগী। মুদাসিসর গুল, দুই জঙ্গি বিলাল ভাই ও আমির মাগরেকে কয়েক দিন নিজের চেম্বারে অর্থাৎ, আলতাফ আহমেদ ভাটের বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। তিনি দুই জঙ্গিকে আলতাফের বাড়িতে পৌঁছে দেন এবং বিলাল ভাই তাঁকে হত্যা করে প্রমাণ লোপের উদ্দেশ্যে। জঙ্গিরা আলতাফ আহমেদ ভাটকে মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে সেনাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে চলে।

‘সিট’এর এই রিপোর্টকে যেমন নিহতদের পরিবারের লোকজন মানেনি, সেরকমই প্রত্যাখ্যান করেছে সমস্ত রাজনৈতিক দল। আলতাফ ভাটের ভাই আবদুল মজিদ তার দাদাকে জঙ্গিদের মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করার পুলিশি আখ্যানকে আষাঢ়ে কাহিনী বলে অভিহিত করে বলেন, “তাঁর মাথাকে চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়েছিল এবং দেহের বিভিন্ন অংশ ভাঙ্গা হয়েছিল। পুলিশ যা বলছে তা নির্ভেজাল মিথ্যাচার।” ‘সিট’এর রিপোর্টে মুদাসিসর গুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে খণ্ডন করে তাঁর স্ত্রী হুমারিয়া বলেন, “ওরা বলছে মুদাসিসর নিজের গাড়িতে ওদের নিয়ে গিয়েছিলেন; তখন ওরা কেন তাঁকে গ্ৰেপ্তার করল না?” আমির মাগরের বাবা ৫৮ বছর বয়সী আব্দুল লতিফ মাগরে জঙ্গি দমনে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহসিকতার পুরষ্কার পেয়েছিলেন এবং ‘সিট’এর রিপোর্ট বেরোনোর পর তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল, “আমার ছেলে কি করে জঙ্গি হতে পারে, কেননা, এই অঞ্চলে জঙ্গি কার্যকলাপ শীর্ষে পৌঁছোনোর সময় আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি?”

হায়দারপোরার ঘটনা নিয়ে ‘সিট’এর তদন্ত রিপোর্ট যে কোনো রাজনৈতিক দলের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি, তার প্রমাণস্বরূপ দুটো মাত্র প্রতিক্রিয়া এখানে আমরা উপস্থাপিত করব। কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছে পাঁচদলের যে গুপকর জোট, তার মুখপাত্র সিপিআই(এম) নেতা ইউসুফ তরিগামি বলেছেন, “জনগণের মধ্যে এই ধারণাটা জোরালোভাবে রয়েছে যে নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনায় নিহত অসামরিক নাগরিকদের মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল এবং পুলিশের সাম্প্রতিকতম বিবৃতি ধামাচাপা দেওয়ার একটা বানানো গল্প। সাধারণ জনগণ এবং নিপীড়নের শিকার হওয়া নিহতদের পরিবারগুলোর ন্যায়সংগত উদ্বেগের পক্ষে এটা একেবারেই যথেষ্ট নয়।” বিজেপি ঘনিষ্ঠ পিপলস্ কনফারেন্স তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “এরআগে হওয়া হাজার-হাজার তদন্তের সঙ্গে কমা বা পূর্ণচ্ছেদের, এবং পুনরাবৃত্তির ও প্রতিরূপের একটাও অদলবদল নেই। ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করার নৈতিক সাহস এই সরকারের আছে বলে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস আমাদের নেই।”

দিন যত গড়াচ্ছে, ভারতীয় রাষ্ট্রের তুঘলকি শাসনের মাত্রা আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। সংবিধানকে অগ্ৰাহ্য করা, গণতন্ত্রকে পরিহার করা, হিন্দুত্বর বাহুবলী শক্তিগুলোর দাপটকে বাড়িয়ে চলার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। রাষ্ট্রের এই দানবীয় রূপের সামনে জনগণের অধিকারগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। ভারতে মানবাধিকারের এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আলোড়ন তোলে। কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা হরণের পর সেখানে ভারত সরকার সৃষ্ট মানবাধিকারের বিপন্নতা নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশলেট। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা, জনসমাবেশের অসম্মতি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের গ্ৰেপ্তারি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সম্প্রতি তিনি আবার বলেছেন, “সারা ভারতে ইউএপিএ’কে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক, আর দেশে এই আইন প্রয়োগের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে জম্মু ও কাশ্মীরে।” এছাড়া দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের এই দানবীয় রূপে ধারণাগত অবয়ব প্রদান করছেন রাষ্ট্রেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কিছু ব্যক্তিত্ব। অল্প কিছুদিন আগে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় যিনি প্রয়াত হলেন, প্রতিরক্ষা কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে প্রধান সেই বিপিন রাওয়াত বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ হত্যা করলে সেটা মানবাধিকারের কোনো লঙ্ঘন হতে পারেনা। তাঁর নির্দিষ্ট কথাগুলো ছিল এরকম, “কাশ্মীরের মানুষজন বলছেন যে তাঁরা জঙ্গিদের গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলবেন, তাঁরা এমন ব্যবস্থা করবেন বলছেন যার মাধ্যমে জঙ্গিরা গণপ্রহারের শিকার হয়। এটা একটা ইতিবাচক লক্ষ্মণ। জঙ্গিকে হত্যা করলে সেটা মানবাধিকারের লঙ্ঘন হবে কেমন করে? আপনার এলাকায় কোনো জঙ্গি সক্রিয় হলে তাকে আপনি হত্যা করতে পারবেন না কেন?” রাওয়াতের বক্তব্য শুধু কাশ্মীরের বাস্তবতার বিপরীতই নয়, তা বিজেপি’র প্রিয় বিষয় লিঞ্চিং বা গণপিটুনির ওকালতি করছে। তাঁর অভিমত অনুযায়ী ‘সন্ত্রাসবাদী’ বা ‘জঙ্গি’ বলে কাউকে দাগিয়ে দিতে পারলেই সে হয়ে পড়বে মানবাধিকার বর্জিত ব্যক্তি, বেঁচে থাকার অধিকার তার আর থাকবে না। হায়দারপোরার ‘সংঘর্ষ হত্যার’ ঘটনা নিয়ে ‘সিট’এর রিপোর্টও যেন রাওয়াত তত্ত্বেরই প্রতিফলন। সেনারা নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা যাদের দেখলেন, পুলিশের বিবৃতিতে যাদের তল্লাশি দলের সঙ্গে যেতে বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হল, ‘সিট’এর রিপোর্টে তারা হয়ে গেল জঙ্গি-সহযোগী। আর তাই তাদের হত্যাও কোনো আইনি বিধানের লঙ্ঘন এবং সেই হত্যার জন্য কেউ দায়ী হতে পারে না! কিছু কঠোর আইনই তো এই অবস্থানকে মদত জোগাচ্ছে! দানবীয় ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী ইউএপিএ এবং সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের দশক-দশক ধরে নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ রাষ্ট্রের দুরাচারী ভাবমূর্তিকেই প্রবলতর করছে। রাষ্ট্রের এই দানবীয় দাপটকে প্রতিহত করাটাই নতুন বছরে ভারতীয় জনগণের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে আসছে।

- জয়দীপ মিত্র

job-seeking youth

নির্বাচনের সময় এখন। উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড, মণিপুর ও গোয়া ৫ রাজ্যের নির্বাচনের ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। ফলে খবরের কাগজের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন বেরুচ্ছে। রাজ্যগুলি কীভাবে এগিয়ে গিয়েছে মোদী-যোগীর রাজত্বে। দেশ গত ৭ বছরে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ ও ‘সবকা বিশওয়াস’এর রাস্তায় এতটাই এগিয়েছে যে একদিকে ‘বুল্লি বাই এ্যাপ’ ঘুরে বেড়ায় শতাধিক কৃতি মহিলাদের নিলামে চড়িয়ে, অন্যদিকে ৫৬ ইঞ্চি ছাতির প্রধানমন্ত্রী ফি’বছর খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকেন, ধারাবাহিকভাবে সুরক্ষা বাড়তে থাকে, এসপিজির নিরাপত্তা, ১৪ কোটি টাকার নিরাপদ গাড়ির সুরক্ষা সত্বেও তাঁর প্রতিনিয়ত প্রাণ সংশয় ঘটে।

গত ৭ বছরে দেশে কত মানুষ বিনা চিকিৎসায় বা অপর্যাপ্ত চিকিৎসার দরুণ মারা গেছে, কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে লাখো রোগী হাসপাতালে শয্যার অভাবে অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছে, শ্মশানে স্থানাভাবে গঙ্গার পাড়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে কত মানুষের মৃতদেহ; ওদিকে সরকার অবলীলাক্রমে মিথ্যা বলেছে যে, কোন মৃত্যুই অক্সিজেনের অভাবে বা শয্যার অভাবে হয়নি। সরকারের পোষা প্রচারমাধ্যম গলা মিলিয়ে বিজ্ঞাপিত করেছে, বিপণন করেছে সরকারের মেকি সাফল্যের কথা, ঢাকা দিতে চেষ্টা করেছে দেশজোড়া লকডাউন ও মহামারিতে বেকারি-ক্ষুধা-অশিক্ষা-স্বাস্থ্যপরিষেবাহীনতার বিভৎসা।

দেশ বা রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে মিথ্যাচার কেবল বিজেপি করছে তাই নয়, কংগ্রেস-টিএমসি যেখানে ক্ষমতায় আছে সেখানেও করছে। দেশ বিদেশের অর্থনীতিবিদরা বারংবার ভারতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যেদেশে প্রচারমাধ্যম প্রধানমন্ত্রীর প্রাননাশের গল্প ফাঁদতে পারে অনায়াসে সেদেশে কেই বা পরিসংখ্যানের কারচুপি নিয়ে মাথা ঘামায়। ২০১৯ সালে নির্বাচনের আগে, কেবল নির্বাচনী সুবিধের জন্য, তৎকালীন জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর দ্বারা প্রস্তুত জাতীয় নমুনা সমীক্ষা দফতরের নিয়োগ-বেকারি সমীক্ষাকে অসম্পূর্ণ বলে প্রকাশ করা হয়নি। পরে ওই সমীক্ষাকেই প্রকাশ করা হয়েছিল। বেকারির হার ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ ছিল, ৬.১%। অবশ্য এরমধ্যে জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরে আমূল পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, তোতা পাখিরা এসে গিয়েছে, নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, পুলওয়ামাকে ঢাল করে বেকারি-মূল্যবৃদ্ধি-স্বাস্থ্যহীনতা-কুশিক্ষা-অশিক্ষাকে শত শত যোজন দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মোদী জিতে গিয়েছেন। ‘সবকা বিকাশ’এর রাস্তায় চলতে থাকা মোদীজি, ‘সবকা বিশওয়াস’ জুড়ে নিয়েছেন। কিন্তু বেকারি বেড়েই চলেছে, সাথে বেড়ে চলেছে শেয়ার সূচক। ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি সমীক্ষার এপ্রিল-মার্চ ২০২১’র প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে ভারতের শহরগুলিতে ওই সময়ে বেকারির হার দাঁড়িয়েছে ৯.৪%। মনে রাখা দরকার, সেই সময়ে অর্থনীতি এগোচ্ছিল, পরিসংখ্যান অনুসারে, কোভিডের পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ওই ত্রৈমাসিকে জিডিপি বেড়েছে তার আগের বছরের ওই ত্রৈমাসিকের তুলনায় ১.৬% হারে। কিন্তু বেকারির হার বেড়েছে। ২০১৯-২০’র ত্রৈমাসিকে শহুরে বেকারির হার ছিল ৯.১%। ফলে কোভিড পরবর্তী সমস্যাকে সুযোগে পরিণত করার কারিগর প্রধানমন্ত্রী বেকারদের বিকাশ করতে পারেননি, বিশ্বাসের কথা বাদই দিলাম।

about job-seeking youth

জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের উপরোক্ত সমীক্ষাই শ্রমশক্তি বিষয়ক শেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন। ওদিকে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনোমি (সিএমআইই) প্রতিমাসেই এমনকি দৈনন্দিন ভিত্তিতে বেকারির হার প্রকাশ করে থাকে। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী গত ডিসেম্বরে বেকারির হার আগস্ট পরবর্তী হারের মধ্যে সর্বোচ্চ, ৭.৯১%। শহরাঞ্চলে তা ৯.৩০% ও গ্রামাঞ্চলে ৭.২৮%। শহরাঞ্চলে ক্রমাগত বিপুল সংখ্যক বেকারি নির্বাচনে তেমন ছাপ ফেলছে না বলেই মনে হচ্ছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গ। ২০২১’র মে মাসে বেকারির হার ছিল ১৯%’র বেশি, কিন্তু রাজ্যে একদশক ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসক তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪টির মধ্যে ২১৩টি আসন পেয়েছিল, ৪৮% ভোটও। কোভিডকালে বহু সময়েই পশ্চিমবঙ্গে বেকারির হার যথেষ্ট বেশি ছিল। কিন্তু ভোটের বাক্সে তার ছাপ পড়েনি। এখন যখন ৫ রাজ্যে নির্বাচন আসছে তখনও দেখা যাচ্ছে দেশে বেকারির হার ভয়ঙ্কর। তাছাড়া কিছুদিন আগেই সরকারের তরফে জানানো হয়েছে যে ছোট শিল্পের অন্তত ৯% কোভিডের জন্য ঝাঁপ ফেলেছে। ফলে বেকারি বেড়েছে। এমনিতেই দেশে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার অত্যন্ত কম, জানুয়ারি-মার্চ ২০২১এ শহরাঞ্চলে তা ছিল ৩৭%। অর্থাৎ দেশের শহুরে মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ কাজ খুঁজতেই চাইছেন না। কারণ তাঁরা কাজ পাবেন না সেটা নিশ্চিত। মেয়েদের মধ্যে ৮৩% ও পুরুষদের মধ্যে ৪২% কাজ খুঁজতেই চাইছেন না। এরমধ্যে অবশ্য শিশুরাও রয়েছে। যদি ১৫’র বেশি বয়স্ক মানুষদের ধরা হয় তাহলে শহরে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার দাঁড়াবে ৪৭%, মহিলাদের মাত্র ২১% ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ৭৪%।

সারাদেশে বেকারির হার ভয়ঙ্কর হলেও কোনো কোনো রাজ্যে তা অতি প্রকটভাবে ভয়ঙ্কর, আবার কোথাও তেমন খারাপ নয়। কিন্তু কিছু রাজ্যের সরেজমিন অবস্থা যতটা ভয়ঙ্কর তা সিএমআইই’র বেকারির তথ্য ধরতে সক্ষম হয়নি, কারণ সেইসব রাজ্যে বহু মানুষ কাজের বাজারে আর আসছে না, হতাশ হয়ে। আগামী ৫ রাজ্যের নির্বাচনের মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরপ্রদেশের কথাই ধরা যাক। সারা ভারতে বেকারির হার যখন ৭.৯১% ঠিক তখনই উত্তরপ্রদেশে সেই হার কম, ৪.৯%। অবশ্যই শাসক বিজেপি ও যোগী এই তথ্য নিয়ে নিজেদের সাফল্য প্রচার করবে, যদিও ৪.৯% বেকারির হারই যথেষ্ট সংকটজনক। কিন্তু আদতে ওই তথাকথিত সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে আছে পরিসংখ্যানের রহস্য। বেকারির হার নির্ভর করে কত শতাংশ মানুষ কাজ চাইতে আসছে তার উপরে, অন্য কথায় কত শতাংশ মানুষের মনে আশা আছে যে কাজ পাওয়া সম্ভব। যদি পূর্বে উল্লেখিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি সমীক্ষার এপ্রিল-মার্চ ২০২১’র প্রকাশিত প্রতিবেদনকে দেখা যায়, তাহলে সারা ভারতে শ্রমশক্তিতে জনগণের অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৭.৫%, পুরুষদের মধ্যে ৫৭.৫% ও মহিলাদের মধ্যে ১৬.৯%। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে সেই হার ছিল যথাক্রমে ৩৩.৬%, ৫৫.২% ও ৯.৭%। লিপিবদ্ধ ২২টি রাজ্যের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের স্থান ছিল ২০তম। ফলে চাকরি পেতে ইচ্ছুক মানুষের সংখ্যা উত্তরপ্রদেশে কম, কারণ হতাশ হয়ে উত্তরপ্রদেশে জনতা কাজ করার জন্য ঘর ছেড়ে বের হচ্ছে না।

উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায় ‘অমর উজালা’য় প্রকাশিত প্রতাপগড় জেলা সংক্রান্ত প্রতিবেদন যেখানে যোগী সরকারের প্রতিশ্রুত মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা (যা ২০২২’র মার্চ পর্যন্ত দেওয়া হবে)-র জন্য শ্রমিক কার্ড পেতে ১২ লক্ষ ৫০ হাজার যুবক-যুবতী নাম লিখিয়েছে। প্রতাপগড় জেলার জনসংখ্যা ৩২ লক্ষ। অর্থাৎ ওই জেলায় ৪০% বেকার। বালিয়াতে বিএ-এমএ পাস নাম নথিভুক্ত করেছে শ্রমিক কার্ডের জন্য ওই মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা পেতে। ওই জেলায়ও ১১ লক্ষ ৫০ হাজার বেকার হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। উত্তরপ্রদেশ সরকার নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিচ্ছে যে দেড় কোটি মানুষকে দুইমাসের ভাতা হিসেবে ১,৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে। ফলে উত্তরপ্রদেশে কর্মহীনতার প্রকোপ ওই ৪.৯% বেকারির হার দিয়ে বোঝা যাবে না। ওই রাজ্যে ‘ইউপি রোজগার সঙ্গম’ নামক একটি ওয়েবসাইট রয়েছে যেটিতে কর্মপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তার মধ্যে সংযোগ ঘটানো হবে। ওই সাইটে ৪১ লাখ কাজ চাইছে, ৮,০০০ কাজ রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে কত চাকরি আছে। কিন্তু আগেই বলেছি সরকারি মিথ্যাচারের কথা। যোগী সরকারের বিজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকার সাড়ে-চার লাখ চাকুরি দিয়েছে। কিন্তু যদি সরকারের কাছে তালিকা চাওয়া যায় তাহলে কেউ পাবেনা। এটা কেবল বিজেপি সরকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, কংগ্রেস শাসিত বা তৃণমূল কিংবা অন্যদল শাসিত রাজ্যেও এমনটাই হাল। অন্যদিকে সরকারি চাকরির প্রক্রিয়া শুরু হলেই বিভিন্ন অনিয়ম বা বেআইনি কাজের জন্য আদালতে মামলা হয় ও পুরো প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে এব্যাপারে আমরা ওযাকিবহাল। তবে সেই অনিয়মও এরাজ্যের একচেটিয়া নয়, সারাদেশেই তা চলছে।

সিএমআইই’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ সালের মাঝামঝি মোট চাকরিরতের সংখ্যা ছিল ৪০৯ লক্ষ, ২০২১’র ডিসেম্বরে লকডাউনের ২১ মাস বাদে ৩০ লক্ষ কম হয়ে রয়েছে। যে চাকরি রয়েছে তাতে বেতনপ্রাপক কর্মরতের অনুপাত ক্রমাগত কমছে। ফলে যে কাজ পেলে শ্রমিক কর্মচারি কিছুটা নিরাপদ থাকে বা আনন্দ অনুভব করে তার পরিমাণ কমছে। সিএমআইই’র পরিসংখ্যানের সঙ্গে যদি জনগণনার তথ্যকে মিলিয়ে দেখা হয়, তাহলে ১৫-৫৯ বছরের মধ্যে থাকা কর্মঠ প্রায় ৯০ কোটি জনগণের মধ্যে ৫০ কোটি প্রকৃত অর্থে বেকার। এবং যারা কর্মরত তাদের কাজের শর্ত ও পরিবেশ ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে।

কর্মপ্রার্থী যুবকদের নিয়ে ছেলেখেলা শাসকরা করেই চলেছে। কারণ এখন ‘দেশপ্রেম’এর জোয়ারে, ‘রামমন্দির’এর ভক্তিতে, আর সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় ভরপুর হৃদয়ে বেকারদের অনেককেই নেশাগ্রস্ত করা গেছে। তার উপরে ভর করে নির্বাচনে জিততে পারা কর্মসংস্থান করে জেতার থেকে অনেক সহজ কাজ, দেশ ও দেশের মানুষ তাতে গোল্লায় গেলেই বা।

- অমিত দাশগুপ্ত

Ahare Nandalal

ভোটমুখী পাঞ্জাবে প্রথম নির্বাচনী প্রচারেই বিশাল ধাক্কা! কৃষক বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রীর হাই প্রোফাইল কনভয়কে শুধু আটকেই দিল না, মাঝরাস্তা থেকে ফিরিয়েও দিল!

তাই নিয়ে তরজা শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট অবধি গড়িয়েছে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের আচরণে বিরক্ত শীর্ষ আদালতকে তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গড়ে দিতে হয়েছে এবং কেন্দ্র-রাজ্য উভয়কেই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় গাফিলতি সংক্রান্ত তদন্ত থেকে আপাতত নিরস্ত থাকার নির্দেশ দিতে হয়েছে।

কিন্তু সেদিন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যে আচরণ এবং মন্তব্য করলেন তা অত্যাশ্চর্য (তবে অপ্রত্যাশিত নয়)! কৃষকরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনির অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে, আন্দোলনকারী কৃষকদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে রুজু করা মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবিতে, শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি গ্যারান্টির দাবিতে। কিছু মানুষ সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের উদ্দেশে ক্ষোভ জানাচ্ছিলেন। তারা তাদের প্রতিবাদ জানানোর পথ খুঁজবেন-এটাই স্বাভাবিক। তাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল — কণ্ঠের শ্লোগান। তাতেই তিনি এত ভয় পেয়ে গেলেন? ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি চুপসে গেল! প্রধানমন্ত্রীর সমস্ত সৌজন্য শিষ্টাচার জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি 'প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারার' জন্যে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীকে, পদস্থ আধিকারিকদের মাধ্যমে 'ধন্যবাদ' জানাতে গিয়ে কার্যত হুমকি দিয়ে রাখলেন! তার 'যোগচর্চিত' দেহে জীবনীশক্তি এত ক্ষীণ যে কৃষকদের শ্লোগানের ধাক্কায় 'প্রাণ সংশয়' হয়েছিল! এসপিজি'র ত্রিস্তরীয় কঠিন নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থেকেও! যে নিরাপত্তার দৈনিক খরচ প্রায় দেড় কোটি টাকা! যে খরচ আসে ঐ বিক্ষোভকারী কৃষকসহ দেশবাসীর করের টাকায়।

বহু অভিধায় তিনি অভিহিত, আপন স্বভাববৈশিষ্ট্যে। কিন্তু কোনও এক অখ্যাত স্টেশনের 'চা-ওলা' হিসেবে 'আমি তোমাদেরই লোক' বলে জাহির করাটা আসলে নেহাতই কথার কথা। মোটেই তিনি আমজনতার নন। তার চলন বলেন ঠাট বাঁট মেজাজ মর্জি সবই, যাকে বলে, রাজকীয়। সব সময় আশা করেন, রাস্তার দুধারে মানুষ শুধু তাঁর জয়ধ্বনি দেবে, পুষ্পবৃষ্টি করবে। আর সেখানে কিনা 'খালিস্তানী' 'সন্ত্রাসবাদীদের' শ্লোগানবৃষ্টি! (আন্দোলনকারী কৃষকদের এমন অভিধাই দিয়ে থাকেন তিনি ও তাঁর অমাত্যবর্গ!)। তার ওপর আবার ফিরোজপুরের জনসভা লোকশূন্য — সে খবরও কানে এসেছে। সে জন্যে তার গরিমা ক্ষুন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্যে একেবারে 'জীবন হানির' শঙ্কা — এটা বাড়াবাড়ি শুধু নয়, নাটকীয় এবং অত্যন্ত রহস্যজনক! বিশেষ করে তার অব্যবহিত পরেই বিজেপি'র সর্বস্তরের নেতা-নেত্রীদের মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়ার ঘটনা দেখে সন্দেহ গাঢ়তর হল! নির্বাচনের আগে হিন্দুত্বের ঢেউ জাগানোর চেষ্টা!

Ahare Nandalal_1

সেই যে বার বছরের মেয়েটা, পেটের জ্বালায় ভিন রাজ্যের লঙ্কা ক্ষেতে খাটতে গিয়েছিল, তারপর ঘরে ফেরার জন্যে শ' শ' মাইল হেঁটে ঘরের দরজায় এসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল — সেই যে অন্তঃসত্ত্বা হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাতেই মৃত সন্তান প্রসব করে এলিয়ে পড়েছিল — সেই চোদ্দ জন, নাছোড় ক্লান্তিতে রেললাইনে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল—আরও অসংখ্য ঘরফিরতি মানুষ শুধু খিদে তেষ্টা কষ্টে পথেই মারা গিয়েছিল – তাদের পিছনে 'মৃত্যু' লেলিয়ে দিয়েছিল কে? আপনার চার ঘণ্টার নোটিশের লকডাউন! কোভিড দ্বিতীয় ঢেউয়ে ওষুধ অক্সিজেন হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেল কেন? আপনার সীমাহীন ঔদ্ধত্যে এবং আপনার স্বাস্থ্য দপ্তরের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ঔদাসীন্যে!

কোভিড-এর আগে থেকেই খাবি-খাওয়া অর্থনীতির প্রভাবে কাজ হারিয়েছ কোটি কোটি মানুষ। কোভিড তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্র। কোভিড-এ হাজার হাজার শিশু ও কিশোর অনাথ। কোটি কোটি সংসার অনাহার, অপুষ্টি, রোগে ধুঁকছে। ২৮ শতাংশ স্কুল-ছুট পড়ুয়া আর কোন দিনও শিক্ষাঅঙ্গনে ফিরতে পারবে না। কী হবে তাদের? ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি রিপোর্ট বলছে, ভারত একই সঙ্গে গরিব এবং অতি বৈষম্যের দেশ। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের হাতে জাতীয় সম্পদের ৫৭ শতাংশ; বিত্তশালীদের একেবারে শীর্ষে থাকা ১ শতাংশের হাতে আছে ২২ শতাংশ সম্পদ। আর দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের হাতে আছে সম্পদের মাত্র ১৩ শতাংশ! ভারত এখন দারিদ্র্য, খাদ্য, স্বাস্থ্য, গণতন্ত্র, মানবাধিকার — সব সূচকেই বিশ্বতালিকায় অনেক নিচে নেমে গেছে। সৌজন্যে — আপনার সরকারের ভ্রান্ত একপেশে নীতি, আপনাদের করপোরেট তোষণ, আপনাদের উগ্র হিন্দুত্ব ও জাতিবিদ্বেষ। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার প্রাঙ্গণে যারা উৎকণ্ঠায় অসহায়ভাবে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তাদের সামনে শুধু অনিশ্চয়তার নীরন্ধ্র আঁধার। কারণ সব সরকারি সংস্থার দরজায় তালা পড়ে যাচ্ছে। দায়ী আপনার, আপনার সরকারের দেশ-বেচা নীতি। আন্দোলনকারী সাতশো কৃষকের হত্যার জন্য দায়ী আপনার সীমাহীন দম্ভ।

মান্যবর, এত অসংখ্য মৃত্যুর দায় যে আপনি কোনও দিন নেবেন না, ভুলক্রমেও সে চিন্তা কেউ করে না। কিন্তু আপনি যে কোন প্রতিবাদীর মুখেই আপনার 'সম্ভাব্য হত্যাকারী'র ছায়া খুঁজে পান এবং তাকে দানবীয় আইনে অভিযুক্ত করে কারান্তরালে পাঠাতে মুহূর্ত বিলম্ব হয় না। এ ব্যাপারে যে আপনার সরকারের ন্যূনতম নীতি নৈতিকতার বালাই নেই তা ভীমা কোরেগাঁও মামলায় জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেছে! কতটা অমানবিক ও ক্রূর হতে পারে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তা অশীতিপর পার্কিনসন্স আক্রান্ত স্ট্যান স্বামীর প্রাতিষ্ঠানিক হত্যায় গোটা বিশ্বের কাছে উন্মোচিত। কতটা মিথ্যাচার আছে সেই ষড়যন্ত্রে তা পেগাসাস স্পাই ওয়্যার-এর ব্যবহারের নমুনায় ধরা পড়ে গেছে। তাই আপনার 'বেঁচে ফিরে আসা' শব্দবন্ধটি বিশেষ উদ্বেগজনক-এর মধ্যে 'কালপুরুষের সুগভীর পরামর্শ' নেই তো — নেই তো নতুন কোন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত?

যাদের দিকে আপনার তর্জনী ইঙ্গিত, তারা কিন্তু দীর্ঘ এক বছর গনগনে গরমে, কনকনে ঠাণ্ডায়, অবিশ্রান্ত বর্ষণে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে সত্যাগ্রহে অনড় থেকেছেন, প্রাণপ্রিয় সাতশো সাথীকে হারিয়েছেন। কিন্তু আপনার দল ও সরকারের হাজার প্ররোচনাতেও কারও গায়ে একটি আঁচড়ও কাটেননি। কিন্তু সেই অনপনেয় দৃঢ়তা ও সহিষ্ণুতা আঘাত হেনেছে আপনার দম্ভে! যা আপনি ভুলতে পারছেন না কারণ আপনার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সেই দুর্জয় প্রতিরোধ আজ গণতন্ত্ররক্ষার প্রতিটি আন্দোলনের কাছে এক দিশা, অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। আর আপনার সামনে হয়ে উঠেছে ভোটমুখী রাজ্যগুলির ভোট বৈতরণী পারে এক কঠিনতম চ্যালেঞ্জ! তাই আপনি আরও বেশি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠছেন। কিন্তু ঐ জেদী মানুষগুলোর পাঁজরে যে শোকের আগুন জ্বালিয়ে তুলেছেন তাকে রুখবে কে?

- জয়ন্তী দাশগুপ্ত

first is Uttar Pradesh

গত অগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকার শুরু করেছিল ‘ই-শ্রম’ পোর্টাল। দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা দিতেই এই পোর্টালের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ওই পোর্টালে নিথভুক্তদের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গের। প্রথমে রয়েছে যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ।

প্রসঙ্গত কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রক পরিযায়ী শ্রমিক-সহ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের নথিভুক্তি শুরু করেছে ২০২০ সালের অগস্ট মাসে। কর্মীদের পোর্টাল ‘ই-শ্রম’ একটি জাতীয় ডেটাবেস। করোনাকালেই আন্দাজ পাওয়া যায় ভারতে কত পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন। এতদিন তার কোনও তথ্য সরকারের হাতে ছিল না। তাই এই পোর্টালে নির্মাণ প্রকল্পে নিযুক্ত কর্মী, পরিযায়ী শ্রমিক, রাস্তাঘাটে পণ্য বিক্রেতা, গৃহ সহায়িকা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ৩৮ কোটি শ্রমিককে নথিভুক্ত করার লক্ষ্য ঠিক হয়। এরপরে নথিভুক্ত শ্রমিকদের ১২ ডিজিটের ‘ই-শ্রম’ কার্ড দেওয়া হবে, যাতে শ্রমিকরা সরকার-প্রদত্ত সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পগুলির সুবিধা পেতে পারেন। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, নথিভুক্ত শ্রমিকদের ২ লাখ টাকা করে দুর্ঘটনা বিমার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নথিভুক্ত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হতে পারে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রের পোর্টালে রাজ্যের নথিভুক্ত শ্রমিকদের এক হাজার টাকা করে অনুদানের ভাবনাচিন্তাও করছে উত্তরপ্রদেশ সরকার।

সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছে, ‘ই-শ্রম’ পোর্টালে নথিবদ্ধ কেউ দুর্ঘটনার কবলে পড়লে বিমার সুবিধা পাবেন। মৃত্যু হলে বা পুরোপুরি অক্ষম হলে দেওয়া হবে ২ লক্ষ টাকা। আংশিকভাবে অক্ষম হলে ১ লক্ষ টাকা। জাতীয় টোল ফ্রি নম্বর ১৪৪৩৪এ ফোন করে প্রয়োজনীয় খোঁজ-খবর নেওয়া যাবে। নথিভুক্তির পরে মিলবে ‘ই-শ্রম কার্ড’। কেন্দ্রের দাবি, সমাজ কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিকে একসঙ্গে এক জায়গায় আনাও সরকারের লক্ষ্য।

শুক্রবার ওই পোর্টাল সম্পর্কে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে আবেদনকারীদের মধ্যে মহিলারা এগিয়ে। ৫২.৮৩ শ‌তাংশ রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন মহিলারা। সেখানে পুরুষ শ্রমিক ৪৭.১৭ শতাংশ। মোট আবেদনকারীর মধ্যে ৪৫.২৯ শতাংশ অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির। সাধারণ জাতির ২৫.৮০ শতাংশ। তফশিলি জাতি ও উপজাতি যথাক্রমে ২১.৯৮ এবং ৬.৯৩ শতাংশ।

এখনও পর্যন্ত নথিভূক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭ কোটি ২৩ লাখ ৬৩৯ জন। এরমধ্যে, ‘ই-শ্রম কার্ড’ পেয়েছেন ২০ কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার ৩৫০ জন। উত্তরপ্রদেশের মোট ৭ কোটি ২৭ লাখ ৭১ হাজার ৫০০ জন নথিভুক্ত হয়েছেন। এর পরেই পশ্চিমবঙ্গের নথিভুক্ত সংখ্যা ২ কোটি, ৩৯ লাখ ৫ হাজার ৯৬৫। আর তৃতীয় স্থানে থাকা বিহারের নথিভুক্ত শ্রমিক ১ কোটি ৯০ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬ জন। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড।

- আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ জানুয়ারি ২০২২

Dhik Dhik Dhikkar

লকডাউন বিরোধী গণ উদ্যোগের আহ্বানে ১১ জানুয়ারি মৌলালী থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত যে মিছিল হওয়ার কথা ছিল তার উপরে কলকাতা পুলিশের যে আক্রমণ নেমে এল তাকে আমরা তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি। মিছিল শুরু করতে না দিয়ে যেভাবে ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে গণ আন্দোলনের কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্য বিপদজনক বলেই আমরা মনে করি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্সী সহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু পড়ুয়াকে তালতলা এবং এন্টালি থানায় আটক করে রাখা হয়, পরবর্তীতে বিক্ষোভের মুখে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ।

আমরা অবিলম্বে সমস্ত আন্দোলনকারীর উপর চাপানো সমস্ত মিথ্যে মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের উচিত অবিলম্বে সমস্ত ছাত্র সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সব মহলের সঙ্গে আলোচনায় বসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিকল্প মডেল গঠনে উদ্যোগী হওয়া। সেই লক্ষ্যে আইসার আন্দোলন চলছে, চলবে।

Comrade Gauri Shankar Dutt

এক অস্বাভাবিক সময়ে কমরেড গৌরী শঙ্কর দত্ত চলে গেলেন। বিগত দু’বছর ধরে করোনার তান্ডব আমাদের স্বাভাবিক জীবন তছনছ করে দিয়েছে, স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি। এমন সময় আমৃত্যু কমিউনিস্ট গৌরীদার চলে যাওয়া বেদনাদায়ক। তিনি উলুবেড়িয়ার এক বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। গৌরীদার জন্ম ১৯৩৬ সালে অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায়। দেশভাগের কিছুদিন আগে পিতা দুর্গা মোহন দত্ত সপরিবারে শিলিগুড়িতে চলে আসেন। শৈশব থেকে কৈশোরে বেড়ে ওঠা, স্কুল থেকে কলেজ সমস্ত কিছুই শিলিগুড়িতে। ছাত্রাবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ নিতে চলে যেতেন তরাই অঞ্চলে। চা শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রচার ও শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্ম হতে শ্রমিকবস্তীতে থেকে যেতেন। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন এবং পূর্বরেলের ডিআরএম দপ্তরে চাকরি নিয়ে হাওড়াতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। চাকরি জীবনের মাঝপথে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে কৃষকদের মধ্যে কাজ করার জন্য হাওড়া জেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন অক্লান্ত গৌরীদা। রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তিনি ছিলেন একজন অনন্য সৃজনশীল কমরেড। গড়ে তুলেছিলেন ‘মনন’ সাংস্কৃতিক সংস্থা, মানুষের সঙ্গে আন্তরিক মেলামেশার সহজাত গুণ ওনাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। একসময় ছিলেন সিপিআই’র রাজ্য পরিষদের সদস্য। ৯০’র দশকে সিপিআই’এর সঙ্গে মতাদর্শগত মতবিরোধের ফলে ২০০২ সালে তিনি সিপিআই(এমএল) লিবারেশনে যুক্ত হন। পার্টির প্রাক্তন জেলা কমিটির সদস্য গৌরীদার বহুমাত্রিক কর্মকান্ডে তাঁর অদম্য প্রাণশক্তি ছিল। তবুও প্রাকৃতিক নিয়মের কাছে হার মানতেই হল। এক বর্ণময় জীবনের অবসান হল। আমরা হারালাম একজন সহযোদ্ধাকে। তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ ও আত্মীয় বন্ধু সহ অগণিত গুণমুগ্ধ মানুষকে। তাঁর শোর্কাত পরিবারের সঙ্গে আমরাও সমব্যথী।

কমরেড গৌরী শঙ্কর দত্ত লাল সেলাম।

== সমাপ্ত ==

খণ্ড-29
সংখ্যা-2
13-01-2022